আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৪

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১০:০০, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, জানুয়ারি ০৩, ২০১৯

পালিয়ে যাওয়া আর মরে যাওয়ার বাইরে ওয়াকারের সামনে নতুন সমস্যা এসে দাঁড়ালো আন্দামানিজদের আক্রমণ। দিনে দিনে জঙ্গল সাফ করা কয়েদিদের ওপর আন্দামানিজদের আক্রমণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। এই অবস্থায় ওয়াকার এক চিঠিতে প্রতি বছর নতুন ১০,০০০ কয়েদি আন্দামানে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করলো। কারণ ইতোমধ্যে শুধু আন্দামানিজদের তীরবল্লমের আক্রমণেই ১৮৫৯ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ২৮৪ জন কয়েদি নিহত হয়েছিলো। ১৪ এপ্রিল আন্দামানিজরা আবার আক্রমণ করলো। আন্দামানিজরা ঐ সকল কয়েদিদের উপর বিশেষ করে আক্রমণ করতো যাদের পায়ে শিকল থাকতো না। অর্থাৎ যাদেরকে ছোট দ্বীপগুলোর বাইরে বর্তমান পোর্টব্লেয়ার এলাকায় আন্দামানিজদের বসতি উচ্ছেদের লক্ষ্যে কাজ করতে পাঠানো হতো।

ইংরেজদের এই দখলি কার্যক্রম স্তব্ধ করতে ছোট খাটো আক্রমণের ধারাবাহিকতায় আন্দামানিজরা এক বিশাল যুদ্ধের প্রস্ততি নেয়। যুদ্ধটি সংঘটিত হয় ১৪ মে ১৮৫৯ সালে। সেই যুদ্ধটিই ছিল আজকের সকলের পরিচিত আবেরদিনের যুদ্ধ। ব্রিটিশ নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা এম.ভি. পোর্টম্যানের বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল ১৭ মে ১৮৫৯ তারিখে। তবে অনান্য সকলের মতে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল ১৪ মে ১৮৫৯ তারিখে। কিন্তু সেই বড় যুদ্ধটি দুঃখজনকভাবে দুধনাথ তেওয়ারি নামের একজন ভারতীয়ের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ব্যর্থ হয়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এ যুদ্ধের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে।

‘দুধনাথ তেওয়ারির কৃপায় সে যাত্রা উদ্ধার পেয়েছিল ইংরেজ কলোনিবাজরা। দুধনাথ মানুষটাই কেমন ছিলেন!

‘দুধনাথ ছিলেন সেপাই। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ছিল তাঁর বড় ভূমিকা। দ্বীপান্তর হয়ে গেল। এলেন আন্দামানে। ১৮৫৮ সালের ২৩শে এপ্রিল নব্বই জন বন্দীকে নিয়ে বিদ্রোহী দুধনাথ রস আইল্যান্ডের ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। কোথায় পালাবেন, কিভাবে পালাবেন জানা নেই। শুনেছেন উত্তর আন্দামানের শেষ প্রান্তে একটি গুপ্ত স্থলখন্ড ব্রহ্মদেশের ন্যাজের দিকে ঠেকিয়ে রেখেছে। ভাগ্য ভাল হলে সন্ধান মিলতে পারে। সমুদ্র থেকে দলবল নিয়ে সিপাই দুধনাথ ডাঙ্গায় উঠলেন। গভীর দিকশূন্য জঙ্গল। পড়লেন আদিম মানুষদের হাতে। কিছু মারা পড়ল তীরের আঘাতে। কিছু জঙ্গলে পথ হারিয়ে মরল অনাহারে। আহত দুধনাথ। আরো কিছু আহত সাহসী মানুষ কোনো রকমে পালালেন। কিন্তু পালাবার যে পথ নেই। আবার আহত দুধনাথ এবার বন্দী। আন্দামানিজরা এই আহত যোদ্ধাটিকে ভালবেসে ফেলল। দুধনাথের বন্য জীবন শুরু হলো। শিকার ফলমূল আহরণ, মৎস্য শিকার, বন্য ফলার। দুটি মেয়ে তাকে ভালবেসেও ফেলল। প্রথামত বিয়েও হয়ে গেল। দুই বউ নিয়ে দুধনাথের সংসার। সেই দুধনাথ বিশ্বাসঘাতক হলেন। সভ্য মানুষের রক্তে ভেজাল। দুধনাথ কয়েকদিন ধরেই আন্দামানিজদের সন্দেহজনক চালচলন লক্ষ করছিলেন। কিসের একটা জোর প্রস্তুতি চলছে। অনেকটা রণসজ্জার মতোই। একদিন দেখলেন কুড়িটা ডোঙায় চেপে আড়াইশ আদিবাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দ্বীপ ছেড়ে ইংরেজদের ঘাঁটির দিকে চলে গেল। অন্যদিক থেকে আর একটা দল এল। তাদের নেতা আবার দুধনাথের মতই একজন পলাতক আসামি। নাম সাদলু। দুটো দল এক হয়ে ১৩ মে বিকেলে আবেরদিনের দুই মাইলের মধ্যে ঘাঁটি গেড়ে বসল। ইংরেজ প্রভুরা এ সবের কিছুই জানেনা।

‘এবার শুরু হলো দুধনাথের মীরজাফরি খেল। যে দুধনাথ ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে দ্বীপান্তরিত, যে দুধনাথ প্রাণের ভয় না করে পলাতক, জীবনমৃত্যুর সঙ্গে জুয়া খেলে অবশেষে নিভৃত জঙ্গলে আদিবাসীদের আশ্রিত এবং সংসারীও, সেই দুধনাথ সাদলুকে হাত করে আশ্রয়দাতা আদিমানবদের ঋণ শোধ করতে (!) ছুটলেন আবেরদিনের ইংরেজ নিবাসের দিকে। যোদ্ধারা নিদ্রিত। গভীর নিস্তব্ধ রাত। দুধনাথ আর সাদলু চুপিচুপি বেরিয়ে ছুটলেন আবেরদিনের ইংরেজ নিবাসের দিকে।

‘রাত দুটো নাগাদ ইংরেজ ছাউনিতে পৌঁছে দুধনাথ গুপ্তচরের ভূমিকা নিলেন। সাবধান ইংরেজ, শ’পাঁচেক আদিবাসী আসছে তোমাদের আক্রমণ করতে। ওয়াকার সাহেব প্রতিরোধের সব রকম ব্যবস্থা শেষ করার আগেই শেষ রাতে আক্রমণ শুরু হয়ে গেল। একটা দল এগিয়ে আসছে সমুদ্রের তীর ধরে। নৌবাহিনী কামান দেগে দলটিকে থামিয়ে দিল। দ্বিতীয় দল লাফিয়ে পড়ল ডাঙ্গার দিক থেকে। কামান দেগেও তাদের প্রতিহত করা গেল না। ইংরেজ ছাউনি তারা দখল করে নিলো। অবশ্য বেশিক্ষণ দখলে রাখতে পারল না। লেফটেন্যান্ট ওয়ার্ডেনের সৈন্যরা এসে ছাউনি পুনর্দখল করে নিল। আদিবাসীরা যাবার আগে যথাসর্বস্ব নিয়ে গেল। কিছু মারা পড়ল, কিছু সাংঘাতিকভাবে আহত হল। ইংরেজদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পলাতক দুধনাথ প্রাণদন্ডের বদলে পেলেন পুরস্কার, মার্জনা।’

এ কাহিনি আন্দামানীদের গৌরবের এক ঐতিহসিক কাহিনি। বিপুল গোলাবারুদ আর কামানের অধিকারী ইংরেজ শক্তির বিপক্ষে লড়াই করে তীর-ধনুকের আন্দামানিজরা আবেরদিনকে অল্পক্ষণের জন্য হলেও স্বাধীন করে নিয়েছিল। সুতরাং এটি ছিল ভারতের সফল স্বাধীনতা যুদ্ধসমূহের একটি। আজ ২০১৮ সালে আবেরদিন বাজারের রাস্তা ধরে আমরা পূর্ব-বংলার দুটি ক্লান্ত প্রাণী এক গরিবি অটোতে চড়ে যাচ্ছি আর সে-দিনের সেই কঠিন স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনটির কথা ভাবছি। শুধু আমরা নই। আজ সেই তীর-ধনুকের অসহায় মানুষগুলোর বীরত্বের কথা বুক ফুলিয়ে ভাবছে সারা ভারতবর্ষ। সেই ভেবেই ভারত সরকার সেলুলার জেলের সন্নিকটে রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্সের প্রবেশ পথে ২০১২ সালে নির্মাণ করেছে আবেরদিন যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ।

আবেরদিন বাজারের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম এই সব রহসাবৃত দিনের কথা। ভাবছিলাম কীভাবে স্কটল্যান্ডের একটি বন্দর নগরীর ‘আবেরদিন’ নামটি দূর বঙ্গোপসাগরের বুকে এসে ঠাঁই নিয়েছিল। ভাবছিলাম এক নাম ‘আবেরদিন’ কীভাবে বাঙালি লেখকদের কলম ধরে ‘আবারদিন’, ‘এবারডিন’, ‘আবার দিন’ ইত্যাকার অজস্র নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই ফাঁকে ভাবনায় এ-ও একবার উদয় হলো যে, হয়তো হঠাৎ কোন কল্পবিহারী ঐতিহাসিক এমনই বলে বসবে—পোর্টব্লেয়ারের প্রথম দিকে বসতি স্থাপনকারী কোনো এক জয়নাল আবেদিনের নামানুসারে এই বাজারখানা আবেদিন বাজার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে উচ্চারণের বিবর্তনে আজ নামটা আবেরদিন বাজারে এসে ঠেকেছে।

এসব ভাবাভাবিতে হঠাৎ ব্রেক কষতে হলো কারণ আমাদের কালো কুচুকুচে গোপাল ভাই তার অটোর ইঞ্জিনখানায় হঠাৎ ব্রেক কষে বসেছেন। হয়তো আমাদের নামতে হবে বা কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু ব্যাপারটা আরো গোলমেলে ঠেকলো। কারণ, স্টিয়ারিং, ক্লাচ সব থেকে সরিয়ে নিয়ে সে তার একখানা হাত দিয়ে আমাদের দূরে একটা কিছু দেখাতে চাচ্ছে আর অন্য হাত তার পকেটে ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করতে চেষ্টা করছে। আমাদের ভাবাভাবির পুরো সেন্টার তখন ঠান্ডা হতে বসেছে। মুহূর্তেই টের পেয়ে গেলাম যে, আমাদের ছত্তার ভাইয়ের গল্পের সেই দেশে পৌঁছেছি যেখানে আস্ত মানুষ চুন মেখে চালের উপরে ছুঁড়ে মারে আর চালা থেকে পড়ে যাওয়া চুনমাখা মানুষটাকে কেটেকুটে তারা চালকুমড়ো হিসেবে খেয়ে ফেলে। সামনে চালা না থাকলেও পাশের সাগরের নুনমাখা পানিতে ফেলে দিয়ে আমাদের মতো দুজন ক্যবলা-কান্তকে সাবাড় করে দিতে এই গনগনে কালো জোয়ানের পক্ষে খুব একটা ঝামেলার ব্যাপার হবে না বলেই মনে হলো। এমন ভাবনায় জীবনের শেষ মুহূর্তের সব কলেমা-কালাম খুঁজতেছি এর মধ্যে দেখলাম ভাই গোপাল পকেট থেকে একখানা ২০ টাকার ভারতীয় নোট বের করে তার উল্টো পিঠের একটি ছবির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আর বলছে—‘লুক, দ্যাট হিল, হিয়ার অন দি রুপি’। এতক্ষণে বুঝলাম আমাদের কালো গোপাল ভাই একেবারে মহব্বতের কৃষ্ণ গোপাল। সে বাম হাত দিয়ে দেখাচ্ছে দূরে দাঁড়ানো নর্থ বে আইল্যান্ড আর ডান হাতে দেখাচ্ছে ভারতীয় ২০ টাকার নোটে মুদ্রিত সেই নর্থ বে আইল্যান্ডের ছবি। দেখছি পাহাড় আর পাহাড়ের ছবি, আর ভাবছি ভয় মনের মধ্যে থাকলে কতো তুচ্ছ কিছু থেকেই না ভয়ের তুফান ছুটে আসে।

আমরা দেখলাম আর প্রীত হলাম। কিন্তু সাগরের পাড়ে যে হোটেলখানা গোপাল ভাই দেখালো তাতে প্রীত বোধ করলাম না, বরং মনে হলো গায়ের চামড়ায় বাঙ্গাল মুলুকের ছাপ আছে দেখেই হয়তো বাঙ্গালীকে গোপাল ঐ রকম একটি কাঙালি হোটেলে নিয়ে এসেছে। হোটেল পছন্দ হয়নি দেখে গোপাল আমাদেরকে নিয়ে ছুটলো নতুন হোটেলের ঠিকানায়। মনে মনে ভাবছি, এমন ঘুরাচ্ছে যাতে একই সাথে অটোর ভাড়াটাও যথেষ্ট বাড়াতে পারে আর হোটেলের কমিশনটাও যুৎসইভাবে নিতে পারে। এরপর অনেক ঘুরিয়ে নিয়ে আসলো আন্দামান সরকারের কেন্দ্রীয় পূর্তভবনের সামনে, মোটামুটি দৃষ্টিনন্দন এক হোটেলের সামনে। হোটেলের রিসেপশনে ঢুকে যখন দেখলাম রিসেপশনের লোকটি পরিস্কার বাংলায় কথা বলছে তখন অনেকখানি শান্তি লাগলো। আমার ভিতরে তখন ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার বাড়াবাড়ি অবস্থা।

বাঙ্গালের এই ঠিকানা থেকে বের হতে আর আমার ইচ্ছে নেই। এদিকে, আমার বন্ধু শামীম রেজা রুমখানা ৫ তলায় শুনে কোনোভাবে সেখানে থাকতে রাজি নয়। কিন্তু দুনিয়ায় দাঁড়ি-মোচওয়ালাদের অধীন থেকেই যেহেতু দাঁড়ি-মোচহীন নারী জাতিকে দিন গুজরান করতে হচ্ছে, সেই ধারাবাহিকতায় দাঁড়ি-মোচমুণ্ডিত শামীম রেজাকেও এই দাঁড়ি-মোচওয়ালা মুহম্মদ মুহসিনের ইচ্ছে মেনে নিতে হলো। গোপাল ভাই এতক্ষণ ঘুরিয়ে দেখিয়ে যখন ভাড়া চাইলো মাত্র ৫০ টাকা, তখন শামীম রেজার মনটাও অনেকখানি ভাল হয়ে গেল। কারণ গোপাল এতখানি প্রেমময় কৃষ্ণ গোপাল হিসেবে এই বিদেশ বিভূঁয়ে আবির্ভূত হবে, একথা আমরা ভাবতেই পারিনি। এই সুখে ফুরফুরে মেজাজ আর টইটুম্বুর ক্লান্তির দেহ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উঠলাম পঞ্চম তলায়। পাশেই হোটেলের রেস্টুরেন্টখানা। সেখানে আন্দামানের কোকারি মাছ আর বাঙ্গাল বাবুর্চির রান্নায় সেরে নেয়া লাঞ্চ আরো এক দফা চাঙ্গা হতে সাহয্য করলো। এরপর ফুল চাঙ্গা হতে শরীর দুখানা শুইয়ে দিলাম পাশাপাশি দুইখানা বাহারি খাটে।

ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখনো হাতে অনেকখানি দিন। আমাদের রহস্যময় ভাল মানুষ গোপালকে ফোন দিলাম, তখনো সেলুলার জেল দেখতে যাওয়ার সময় আছে কি-না তা জানতে। গোপাল জানালো আলবৎ আছে। রেডি হয়ে পাঁচতলা দিয়ে নিচে নামতে না নামতে কালো গোপালের সবুজ অটোখানা হাজির। উঠে বসলাম সেলুলার জেলের দিকে।

সেলুলার জেল আন্দামানে কয়েদি উপনিবেশ শুরুর সমান পুরনো নয়। আন্দামানে কয়েদি উপনিবেশের প্রথম পত্তন হয়েছিল ১৭৮৯ সালে এবং প্রথমবারের সে প্রয়াসের পরিসমাপন ঘটানো হয়েছিল ১৭৯৬ সালে। এ কথা ইতোমধ্যেই আমরা বলেছি। এখানে কয়েদি উপনিবেশের পরবর্তী প্রয়াসের কাগজ-কলমীয় শুরু হয় ১৮৫৬ সালে এবং একেবারে কয়েদিসহ আন্দামানের দিকে জে.পি. ওয়াকারের যাত্রা শুরু হয় ৪ মার্চ ১৮৫৮ সালে। কিন্তু পোর্টব্লেয়ারের দুনিয়াবিখ্যাত এবং একই সাথে দুনিয়াকুখ্যাত সেলুলার জেলের নির্মাণ শুরু হয় প্রথম যাত্রা কয়েদি উপনিবেশের প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার ১০০ বছর পরে অর্থাৎ ১৮৯৬ সালে। ফলে আন্দামানে কয়েদি উপনিবেশ বা কয়েদি সেটেলমেন্ট শুরু হয়েছে সেলুলার জেলের মধ্য দিয়ে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

প্রত্যেক কয়েদিকে এক একটি ভিন্ন সেলে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে এই জেলখানা তৈরি হয়েছিল এবং এখানে ৬৯০ বা মতান্তরে ৬৯৮টি সেল ছিল। এত বিশাল সংখ্যক সেল দিয়ে গঠিত বলেই কালক্রমে এর নাম হয় সেলুলার জেল। আবার কেউ কেউ কালাপানি বলতেও এই জেলকেই বুঝিয়ে থাকে, যদিও কালাপানি বলতে মূলত পুরো আন্দামান দ্বীপকে বোঝানোই স্বাভাবিক।

প্রতি সেলে আলাদা করে এক একজন কয়েদি রাখার পরিকল্পনার কথা শুনে মনে হতে পারে কয়েদিদেরকে সিঙ্গেল সিঙ্গেল কক্ষ দিয়ে তাদের জন্য তো অনেকটা দুলামেয়া আদরের ব্যবস্থাই করা হচ্ছিলো। কিন্তু, আগেই বলেছি, আদতে পরিকল্পনাখানা অমন ছিল না। ১৮৮৯ সালে চার্লস জেমস লায়াল ভারতে স্বরাষ্ট্র সচিব হয়ে আসলে তাঁকে পোর্টব্লেয়ারের কয়েদি উপনেবেশের অগ্রগতি, ও অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনের দায়িত্ব দেয়া হয়। ওয়াকার পোর্টব্লেয়ার থেকে চলে যাওয়ার পরে কয়েদিদের শাস্তি ধীরে ধীরে কমে গিয়ে এই অবস্থা এসেছিল যে, লায়াল দেখলেন কয়েদিরা আগ্রহ করে সবাই আন্দামান যেতে চায়, যেন ইন্ডিয়ার জেলখানায় পঁচার চেয়ে আন্দামান গিয়ে সেটেলমেন্ট পাওয়ার অবস্থা অনেকটা সতীনের ঘর হলেও শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার মতো। তিনি দেখলেন যে আন্দামানে বন্দীকে আটকানোর চেয়ে বরং মুক্তির ব্যবস্থাই বেশি। তাই তিনি এবং তার সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা ১৮৯০ সালে তাদের প্রতিবেদনে সুপারিশ করলো যে পোর্টব্লেয়ারে এমন জেল বানাতে হবে যেখানে থাকলে বন্দী বুঝতে পারবে বন্দীত্ব বলতে কতখানি ভয়াবহ শাস্তি ও একাকীত্ব বোঝায়। তিনি লিখলেন—‘Prison regime must be punitive and humiliating, even more dreadful than hangman’s noose’। জেল ব্যবস্থা হতে হবে শাস্তির এবং অপমানের। জেলের সেল হতে হবে ফাঁসির দড়ির চেয়েও বিপজ্জনক।

মি. লায়ালের সুপারিশ অনুযায়ী যতদ্রুত সম্ভব, সেলুলার জেল নির্মাণের কথা থাকলেও মূলত কাজ শুরু হয় ১৮৯৬ সালে। রস আইল্যান্ড, ভাইপার, ফিনিক্স বে, নেভি বে—যত জায়গায় কয়েদি ছিল সব জড়ো করা হলো পোর্টব্লেয়ার আটলান্টা পয়েন্টের কাছে এই সেলুলার জেল নির্মাণের কাজে। এই কয়েদিরা ২০০০০ ঘনফুট পাথর ভেঙ্গেছিল সাত ডানার এই জেল ভবনের ২১ টি ছাদ রচনার কাজে। সাত ডানার প্রতিটির ১মাথা মিলিত হয়েছে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে আকৃতিটা অনেকটা তারা মাছ বা স্টার ফিশের মতে। কেন্দ্রের এই ঘরটি ছিল জেলের ওয়াচ টাওয়ার। ১৯০৬ সালে এই সাত ডানার সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ হয়। প্রত্যেক ডানার সামনের স্পেসে ছিল কঠিন সব শ্রমের এক একটি ওয়ার্কশপ। যেখানে তেলের ঘানি টানা, যাঁতা ঘুরানো বা কামারশালার কাজে লাগানো হতো কয়েদিদেরকে। প্রত্যেকটি ডানা তিন তলা বিশিষ্ট। ১ম ও ২য়  ডানার সেল সংখ্যা ছিল ১৫৬ টি, ৪র্থ টিতে ৬৬টি, ৫ম টিতে ৭৮টি, ৬ষ্ঠ টিতে ৬০টি এবং ৭ম টিতে ছিল ১২০টি সেল। প্রত্যেক সেলের দৈর্ঘ ছিল ১৩.৫ ফুট, প্রস্থ ৭ফুট। প্রত্যেক সেলে করিডোরের দিকে ১টি লোহার দরজা ছিল। প্রত্যেক ডানার সম্মুখভাগ ছিল পাশের ভবনের পিছনের দিকে মুখ করা। প্রত্যেক সেলে ১টি ভেন্টিলেটর ছিল ওয়ালের ১০ ফুট উচুঁতে স্থাপিত। সে ভেন্টিলেটর থেকে বাইরের দুনিয়া দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। সেলুলার সেলে যে কয়েদিদের রাখা হতো তাদের স্ট্যাটাস ছিল ‘D’ মানে ডেঞ্জারাস বা ‘P’ মানে পারমানেন্টলি ইনকারসারেটেড।

জাপানিরা আন্দামান দখল করার পরে ১৯৪৩ সালে তারা এই সাত ডানার সেলুলার জেলের দুটি ডানা ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীতে আন্দামানের কেন্দ্রীয় চিকিৎসালয় গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য আরো দুটি ডানা ভেঙ্গে ফেলা হয়। বর্তমানে জেলের ১ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম ডানাটি অনেকটা জাদুঘর হিসেবে অক্ষত রাখা হয়েছে। চারতলা ওয়াচ টাওয়ারের দেয়ালে এখানে থাকা রাজনৈতিক বন্দীদের নামের ফলক উৎকীর্ণ হয়েছে। ১৯৭৯ সালে শ্রী মোরারজি দেশাই সেলুলার জেলকে একটি জাতীয় স্মৃতি সৌধে রূপান্তর করেছেন।

অল্পক্ষণেই গোপাল বাবু আমাদেরকে নামালেন এই ঐতিহাসিক জেলের গেটে। গুগল ইমেজে এবং ইউটিউবে সেলুলার জেলের যে ছবি দেখেছি, বাইরে থেকে তার মিল না পেয়ে, মনে মনে একটু থতমত খাচ্ছিলাম। প্রেমের অবতার আমাদের শ্রী গোপাল গোপীর অভাবে আমাদের সাথে আবার কোনো ছলাকলা বা লীলাখেলা করলো না তো? নাহ্। টিকেট কাউন্টারে গিয়ে এন্ট্রি টিকেট কাটতে গিয়ে সন্দেহ ভঙ্গন হলো। কোনো কথা না বলে ২০ টাকায় ইন্ডিয়ান নাগরিক হিসেবে টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকতেই বোঝা গেল আসল জেলখানাটি টিকেট কেটে ভেতরে না ঢুকে, দেখার সুযোগ নেই। আর তাই তো হওয়া উচিত। যা দেখার জন্য টিকেট কাটতে হবে তা যদি টিকেট কাটার আগেই দেখা যায় তাহলে আর টিকেট কেন? ভাবলাম দেশে ফিরে আহসান মঞ্জিলে গিয়ে বলতে হবে—ভাই আপনারা আপনাদের মঞ্জিলখানা বিশফুটি দেয়ালে চারপাশ দিয়ে ঢেকে না দিয়ে টিকেট বেচলে তা দু’চারটা পাগল ছাড়া ভাল কোনো মানুষে তো কিনবে না।  দেখেন না, আমি কখনো ঐ টিকেট কিনতে যাইনি। সদরঘাটে লঞ্চ থেকে নেমে চারপাশ দিয়ে মাগনাই তো সব দেখে ফেলছি। টিকেট কিনে দেখতে যাব কোন দুঃখে? (চলবে)

আরো পড়ুন: কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৩

//জেডএস//

লাইভ

টপ