আমিনুল ইসলাম : রোমান্টিক মনের চির আধুনিক কবি

Send
আনিস মুহম্মদ
প্রকাশিত : ০৬:০০, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮

‘মানুষের স্বভাবের মধ্যেই কাব্যের সম্ভাবনা আছে’। আরিস্টটল তাঁর ‘কাব্যতত্ত্বে’ আরো বলেন, কাব্য একটি বিশেষ পরিশ্রম ও পরীক্ষার ফল। কাব্য আপনা-আপনি বিকশিত হয়ে উঠেনি।...কবিরা লেখেন এক দৈব শক্তির সাহায্যে। দৈবশক্তি যেন কবিদের উপর ভর করে; কোন জ্ঞান নয়, কোন বুদ্ধি নয়, এক অব্যাখ্যায় প্রেরণায় কবিতার জন্ম। কাব্য আমাদের আবেগকে জাগায়, চিত্তকে উদ্বেলিত করে, উত্তেজিত করে। কাব্যের সত্য বিশ্বজনীন সত্য, অর্থাৎ মানুষকে জানবার ও বোঝার পক্ষে তার মূল্য অপরিসীম। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতা পাঠে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তার কবিতা পাঠ আমাদের মুগ্ধ করে, ভালোবাসায় আপ্লুত করে—অন্তর পরিশুদ্ধ হয়।

প্রকৃত কবিতা মননে প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই অদ্ভুতভাবে পাঠকের অনুভবে ঝংকৃত হয়। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতা পাঠে অবাক অনুরণনে প্রকৃত পাঠকমাত্র মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। কবিতার আধুনিক নামকরণ, ডিজিটাল কাব্যভাষা নির্মাণ, ত্রিকালদর্শিতা, বিষয়ের চিরন্তনতা, সমসাময়িক ভাবনা ও মহাকবিদের সাথে চিন্তার সেতুবন্ধনে কবি আমিনুল ইসলাম বর্তমানকালের পাঠকদের হৃদয় জয় করেছেন। কবি আমিনুল ইসলাম গভীর মননশীল পাঠকের কবি। তাই সাধারণ পাঠকগণ তাকে সব সময় বুঝে উঠতে পারেন না।

আরিস্টটল প্লেটোকে জানতেন আধুনিক কবি হিসেবে। সে আধুনিকতা কালগত। আমরাও তাঁকে বলি আধুনিক, সে আধুনিকতা ভাবগত। আধুনিকতার কাল ও ভাবগত মাত্রা ভিন্ন হয়ে থাকে। কবিমাত্রই আধুনিক। ইস্কিলাসে আছে দুঃখের রহস্য সন্ধান, মানুষের অনিশেষ শক্তি, মানুষের বিদ্রোহ; সোফোক্লিসে মানুষের সহনক্ষমতা, দুঃখজয়ের শক্তি, আর এউরিপিদিসে বিদ্রোহ নয়, সমালোচনা, মানুষের অমানবিক মহত্ত্ব নয়; তার অসহায়তা, তার করুণা তার আশাহীন ভাষাহীন মুখ। ইস্কিলাস, সোফোক্লিস ও এউরিপিদিস তাই তাঁদের সময়কালের আধুনিকতম কবি ছিলেন। চিন্তা-চেতনায় ভিন্ন হয়েও তাঁরা তাঁদের সময়কালে আধুনিকতম কবি হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। আধুনিকতার মানদন্ডে তাঁরা চির আধুনিক কবি। কবি আমিনুল ইসলাম এর কবিতা পাঠে পাঠকমাত্রই এক অদ্ভুত অনুরণনে ঝংকৃত না হয়ে পারেন না। সমসাময়িক বিষয় তাকে ভাবিত করে। দুঃসাহসী মানবপ্রেমিকের মতো তিনি মাঝে মাঝে কাব্যিক বিদ্রোহ করতে চান চলমান সামাজিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে। সাহিত্য সত্য নির্ভর বলেই তিনি কবিতার মাধ্যমে সত্য প্রকাশে উচ্চকন্ঠ। সাহিত্য এক ধরণের চিত্ত সংস্কার। সাহিত্যের বিচার হয় তার নিজস্ব নিয়েমে, অন্য কোন আরোপিত নিয়মে নয়। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতা সাহিত্যের বিচারে উত্তীর্ণ কি-না সেটিই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিৎ; কোন কোটারী গোষ্ঠীর ক্ষুদ্র গোষ্ঠী স্বার্থে তার কাব্য বিচার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কবি আমিনুল ইসলাম এর কাব্যগ্রন্থ পাঠের শুরুতেই তার কবিতার সূচিপত্র পাঠ এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। কবি মাত্রই আধুনিক মানুষ। প্রকৃত কবি প্রকৃত অর্থেই সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে চলেন। বর্তমান সময়ের গর্ভে জন্ম দেন চিরকালীন বেদনার ভ্রণ। তার প্রায় প্রতিটি কবিতার শিরোনাম অন্যরকমভাবে নতুন ও সমকালীন। তাই তার কবিতার সূচিপত্র পাঠ করে যে কোন পাঠক তাঁর কবিতা পাঠে কৌতুহলী হয়ে উঠেন। কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে তার কিছু কবিতার শিরোনাম এখানে উদ্ধৃত করা হলো—

কুয়াশাপ্রিন্ট

বিকিনি রাত এবং ফুটো কনডম

বহুমূত্র বর্তমান ভেঙে পড়া ভবিষ্যত

আমার শরৎ দিন বিলি কাটে আকাশের চুলে

এইসব শেয়ালেরা

পাখির টক শো

ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র

দ্বন্দ্ব সমাস

কবির ডায়েরী থেকে

শীতের কাছে লেখা পত্র

এই ডিজিটাল যুগে শহুরে কিংবা গ্রামীণ মানুষের যাপিত জীবন অত্যন্ত জটিল। এই জটিল জীবনে কবিতা যখন মোবাইল ফোনের ওয়েলকাম টোন হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন বলতেই হয় কবি তাঁর কবিতা নির্মাণে সার্থক। কবির এমনই একটি কবিতার নাম ‘ ড্রেসিং টেবিল’। চার লাইনের কবিতা, অথচ কী অসাধারণ—

‘আয়না থেকে চোখ সরিয়ে আমার চোখে রাখো

আমার চোখের দৃষ্টিটুকু তোমার চোখে মাখো

কেভবে কত মধু ঝরায় তোমার ঠোঁটের হাসি

বুঝবে কেন ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট রাখিতে আসি।’

কবি আমিনুল ইসলাম ‘কবির জন্মদিন’ কবিতায় তার নিজের জন্মদিনকে আমাদের বাংলাদেশের বিজয় দিবসের সাথে তুলনা করেছেন অপূর্ব মুন্সীয়ানায়। তিনি যখন লিখেন, ‘কবি, জন্মতারিখ দিয়ে কী হবে/তুমি বাঙালি/বিজয়ের প্রসববেদনায় ঊজ্জ্বল ডিসেম্বরেই তোমার জন্ম!’, তখন কবির কবিতা প্রসবের বেদনা টের পাওয়া যায়। ইঙ্গিত পাওয়া যায় কবির ব্যক্তিগত আর্তনাদের তীব্রতার। অতীতের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও শৈশবের প্রতি প্রবল আকুতি লক্ষ্য করা যায় তার কবিতায়। প্রকৃত অর্থেই তিনি একজন আধুনিক রোমান্টিক কবি।

কবির যাপিত জীবন ও ব্যক্তিগত পঠন-পাঠন তার কবিতার মধ্যে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। পেশায় সরকারি চাকুরিজীবি হওয়ার কারণেই বোধ হয় কবি আমিনুল ইসলাম এর কবিতায় দাপ্তরিক শব্দের অপূর্ব প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। কী সহজেই দাপ্তরিক পরিভাষাকেও কাব্যভাষায় রূপান্তরিত করা যায় তার সুস্পষ্ট উদাহরণ কবির কবিতা পাঠে জানা যায়। কী অপূর্ব শৈলীতে বাংলা-ইংরেজি শব্দের মিশেলে নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ করা যায় তা আমরা কবির কাছ থেকে জানতে পারি। এমনই কিছু শব্দ ও বাক্যবন্ধ হলো: ক্যনস্পীরেসী অব সাইলেন্স, বর্ষাকালেরই এক্সটেনশান, মহাকালের গ্রামাফোন কোম্পানির ডিস্ক, আমাকে শত্রুসম্পত্তি ঘোষণা করা হোক, মর্নিং শিফটের ভিজিটিং প্রফেসর, তুমি দেখাওনি ব্যালান্স সীটের ভাঁজ/আমিও চাইনি বাংক-রিজার্ভের চাবি,  সকলেরই গায়ে একই রঙের ভালোবাসার ইউনিফর্ম, ভাঙে ড্রিমল্যান্ড স্ট্রাইকারের পা/ ভাঙে মধুবন লেফট-আউটের কনুই, ইত্যাদি।

সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কবি আমিনুল ইসলাম তেমনই একজন কবি। তাই তার কবিতার কিছু কিছু চরণ প্রবাদের মতো হয়ে উঠে। আসলে গন্তব্য একটি ভুল ঠিকানার নাম এবং সভ্যতার ধোঁয়া টেনে কেশে ওঠে সমুদ্রের প্রাণ তেমনই তার দুটি কবিতার চরণ। ইতিহাস, পূরাণ ও যাপিত জীবনের অন্দরমহল হাতড়ে দক্ষ ডুবুরির মতো শব্দ আহরণ করে তিনি গেঁথে দেন কবিতার শরীরে। তাইতো তার কবিতা এতো তুলতুলে নরম ও চিত্তাকর্ষক।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান সাহিত্যের ইমিরিটাস অধ্যাপক লরেন্স বোয়েল কোন সাহিত্য কর্মে পরিবেশ সচেতনতা কতটা বিদ্যমান তা চারটি মানদন্ডে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন।  প্রথমত, কেবল মানবজাতি ব্যতিরেকে অন্যান্য জৈব-জড় বিষয়ের কতটুকু সত্যিকার উপস্থিতি আছে তা দেখতে হবে। এতে মানুষ ও অন্যান্য জৈব-জড়ের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, সবকিছুর উর্ধ্বে শুধু মানুষের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে কি না, তা বিচার্য। তৃতীয়ত, মানুষ পরিবেশের নিকট দায়বদ্ধ। তাদের ক্রিয়াকলাপ ইকোসিস্টেম এর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। চতুর্থত, পরিবেশ কোন অপরিবর্তনশীল বিষয় নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া। অর্থাৎ যে সাহিত্যকর্ম প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক প্রভাব বিষয়ে আলোকপাত করে তা একটি পরিবেশ সচেতন কর্ম। এ প্রেক্ষিতে দেখা যায়, কবি আমিনুল ইসলামের কবিতা সত্যিকার অর্থেই পরিবেশ সচেতন। তিনি একজন পরিবেশবাদী ব্যক্তি মানুষ। তিনি মানবকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা নয়, পরিবেশকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার একজন মুখপাত্র। তাই দেখা যায়, বায়ু দূষণ, সমুদ্র দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর কুপ্রভাব তার কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠে অপূর্ব দক্ষতায়। খাল-বিল-নদীখেকোর প্রতি তার তীব্র কাব্যিক আর্তনাদ ও প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়।

কবি আমিনুল হক এর কবিতা পাঠে মাঝে মাঝে চরম নিঃসঙ্গতার বয়ান লক্ষ্য করা যায়। একইসাথে একজন কবিকে জীবনের সব ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হয়। একই সাথে রোমান্টিক বেদনায় সিক্ত কবি আধুনিক জীবনের নানামুখী টানাপোড়েনে জর্জরিত। একইসাথে তিনি রোমান্টিক, আধুনিক ও উত্তরাধুনিক। বাস্তব ও পরাবাস্তবের মাঝখানে কবি মেঘের মতো ভাসতে থাকেন; কুয়াশার মতো ঝরতে থাকেন পাঠকের মন-মননে। তার কবিতা পাঠে মনে হয় সত্য ও মিথ্যার ক্রমাগত পরিবর্তনশীলতায় কবি মাঝে মাঝে বিস্মিত ও হতবাক হন। মাঝে মাঝে মহাবয়ান এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে লাঠিমের মতো ঘুরতে থাকে মাথার ভেতর।

বিশ্ববিখ্যাত সমাজতাত্তিক ও নৃতাত্ত্বিক পিয়েরে বোর্দোর মতে ক্ষমতা কোন স্বাধীন ক্ষেত্র নয় যে এর থেকে সংস্কৃতি ও অর্থনীতি আলাদা, ইহা এক সর্বব্যাপৃত শক্তি। তাঁর ভাষায়, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বলয়ে বিভক্ত এবং বলয়গুলো প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে সম্পর্কিত; বেশির ভাগ বলয়ই অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর ক্ষমতা-বলয় ও শ্রেণি সম্পর্কের অধীনস্ত হয়ে পড়ে। এ বিবেচনায় মনে হয় কবি আমিনুল ইসলাম এর কবি হিসেবে স্বীকৃতি কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতা-বলয়ের দুষ্টচক্রে বন্দি হয়ে আছেন।

কবিমাত্রই ত্রিকালদর্শী। কবি আমিনুল ইসলাম তেমনি এক কবি। পরশপাথর পদ্ধতিতে যাচাই করে আমিনুল ইসলাম-এর কবিতার মধ্যে মহাকাব্যিক উপাদান পাওয়া যায়। তার এমনই একটি কবিতার নাম ‘থার্ড আম্পায়ারের চোখে’। ওয়ার্ডর্সওয়ার্থ, কীটস, কোলরীজ, শেলীর মতোই তিনি একজন প্রকৃত রোমান্টিক কবি, তবে বায়রনের মতো ব্যাভিচারী নন। তার কবিতা পাঠ ক্ষণিকের জন্য হলেও আমাদের অপার্থিব কল্পলোকে নিয়ে যায়; আমাদের মন ভিজিয়ে দেয় অবাক জোছনায়। প্রতিবাদে-প্রতিরোধে পরিচ্ছন্ন এক সুন্দর পৃথিবী নির্মানে তার নিরন্তর প্রচেষ্টা আমাদের মনকে পবিত্র করে, সিক্ত করে কুয়াশার শীতলতায়, নান্দনিক ব্যকরণে স্বচ্ছ করে আমাদের জীবনের ভাষা। এক কথায়, আধুনিক ও উত্তরাধুনিক জীবন-ভাবনা ও চিন্তায় জারিত আমিনুল ইসলাম রোমান্টিক মনের এক চির আধুনিক কবি। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ