প্রেসক্রিপশনের বাইরে

Send
রায়হানুল হক
প্রকাশিত : ১৮:২০, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২২, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

‘ডাক্তারদের লেখা’ কথাটি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লেখার দৃশ্য। কিন্তু ডাক্তাররা কি শুধু প্রেসক্রিপশন লেখেন? একজীবনে ডাক্তারদের হাতের লেখা দেখার সৌভাগ্য কমবেশী সব মানুষেরই আছে।  সে কারণেই হয়তো এমন দৃশ্য ভেসে ওঠে। তবে শুধু প্রেসক্রিপশন নয়, ডাক্তাররাও এর বাইরেও লিখতে জানেন। তবে আমি কিন্তু ২০১০ সালে পুলিৎজার পুরস্কার প্রাপ্ত ‘দ্য এম্পেরর অফ অল ম্যালাডিস: এ বায়োগ্রাফি অফ ক্যান্সার’ বইটির কথা বলতে যাচ্ছি না। ভাবছি চিকিৎসা আর সাহিত্যের সম্পৃক্ততা নিয়ে—‘অ্যাপোলো’ কেনো একই সাথে কবিতা ও চিকিৎসার দেবতা হতে যাবেন! সম্ভবত সেই প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসা এবং সাহিত্যের মধ্যে একটি অন্তর্গত সম্পর্ক রয়েছে। কারণ চিকিৎসার মাধ্যমে ডাক্তার একজন মানুষের শারীরিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন, আর বইয়ের মাধ্যমে একজন সাহিত্যিক মানসিক রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। আর সে কারণেই হয়তো চিকিৎসা আর সাহিত্যের মধ্যে একটি অন্তর্গত সম্পর্ক রয়েছে।

যুগে যুগে বিশ্বসাহিত্যকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই ডাক্তারি পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়—ইংরেজি সাহিত্যের প্রেমের কবি জন কিটস, রাশান ছোটগল্পকার ও নাট্যকার অ্যান্তন চেখভ, শার্লক হোম্‌সের লেখক স্যার আর্থার কোনান ডায়েল, জার্মান ভাষার অন্যতম প্রধান কবি ও দার্শনিক ফ্রিডরিশ শিলারসহ বিশ্বসাহিত্যের অনেক নামজাদা সাহিত্যিককে খুঁজে পাওয়া যাবে যারা পেশাগতভাবে ডাক্তার ছিলেন।

আমাদের বিখ্যাত সাহিত্যিক বনফুল প্যাথলজি চর্চা করতেন করতেন। ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপাপ্ত শাহাদুজ্জামানও একজন চিকিৎসক। হালের আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাকির তালুকার এবং মামুন হোসাইনসহ আরো অনেক ডাক্তার রয়েছেন যারা সাহিত্যিক হিসেবে নিজের অবস্থান অনেক আগেই পাকা করে ফেলেছেন। তাদের লেখা পড়লে অনেকসময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে যে তিনি সারাদিন ডাক্তারি নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে কাটিয়েও সাহিত্য যাপনের জন্য সময় বের করেন, লেখালেখি করেন। বাংলাদেশের অন্যতম প্রিয় ডাক্তার প্রাণ গোপাল দত্তের একটি লেখার প্রথম কিছু অংশ পাঠ করা যাক, “সৃষ্টির অনাদিকাল থেকে পরিবার-পরিবারকে, গোত্র-অন্য গোত্রকে, দেশ-ভিনদেশকে, জাতি-ভিন্ন জাতিকে, ধর্ম- পর ধর্মকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই শতাব্দিতে এসে মানুষ কিছুটা সমাজ সচেতন হয়েছেন বলেই জাতিসংঘ তার Gender equality and women empowerment-এর কথা তুলে ধরেছে। যার মাধ্যমে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে নারীর প্রতি আগে অবিচার করা হচ্ছিলো। অন্য কোন ধর্মের প্রসঙ্গ আমি টানবো না, কেননা এটা স্পর্শকাতর বিষয়। হিন্দুশাস্ত্রে একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে—‘স্ত্রী বুদ্ধি প্রলয়ঙ্কারী’। এটা কখন, কিভাবে কার মুখ থেকে নিঃসৃত বানী। তা যখন-তখন যে কাউকে বলতে শোনা যায়। হতে পারে তখন নারী শিক্ষার প্রচল ছিলো না। শিক্ষা ছাড়া বুদ্ধি ও চরিত্র গঠন করা যায় না। সেহেতু তাদের কম বুদ্ধিসম্পন্ন মনে করা হত। তবে একইভাবে হিন্দুশাস্ত্রে নারীদের প্রতি যথেষ্ট সন্মানও প্রদর্শন করা হয়েছে। কুমারী পূজা হয়, কুমার পূজার করা হয় না। তবে বিশাল প্রশ্ন, কেন বলা হলো ‘স্ত্রী বুদ্ধি প্রলয়ঙ্কারী’?”

এভাবেই ‘স্ত্রী বুদ্ধি...’ শিরোনামের একটি লেখা শুরু করেছেন প্রাণ গোপাল দত্ত। লেখাটিতে যাপিত জীবনে তিনি নিজের সাথে স্ত্রীর বিভিন্ন বোঝাপড়ার কথা তুলে এনেছেন। আর সাথে সাথে সেটাকে বিশদভাবে ব্যাক্ষা করে নারীর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। লেখাটা পড়া শুরু করলেই প্রথমেই ধরা কঠিন যে, লেখক একজন পুরোদস্তুর ডাক্তার। লেখাটি ছাপা হয়েছে ‘স্টেথোস্কোপ রেখে কিবোর্ডে’ শিরোনামের একটি গ্রন্থে। প্রাণ গোপাল দত্ত শুরু নয়, বাংলাদেশের অনেক ডাক্তার আছেন যারা ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখির জন্য সময় বের করেন, যাদের এক মলাটে পাওয়া যাবে বইটিতে। বাদ যাননি সাহিত্যিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারগন। কেউ লিখেছেন তাদের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার অনেকে গল্প, কবিতা প্রবন্ধও লিখেছেন। তসলিমা নাসরিন, আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাকির তালুকদার, সজল আশফাক, মামুন হোসাইনসহ প্রায় ৮০ জন ডাক্তার, যারা সাহিত্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে নিজেকে যুক্ত করে রেখেছেন তাদের প্রায় সবাইকেই এক মলাটের মধ্যে পাওয়া যাবে। সম্পাদনা করেছেন আবিদ করিম মুন্না। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ বেরিয়েছে গত মার্চে। দাম রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ