উপমহাদেশীয় গল্পকথনে নতুন পদধ্বনি

Send
মিহির সেনগুপ্ত
প্রকাশিত : ১০:০০, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০০, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

আমি খুব একজন বহু পঠনশীল পাঠক নই। দ্রুতগতিশীল এই বিদ্যা তথা জ্ঞান চর্চার জগতে বিভিন্ন প্রজন্মের লেখকদের রচনার সঙ্গে সে কারণে পাল্লা দিতে পারি না। অথচ বয়সটা যে কারণেই হোক প্রলম্বিত হয়েই চলেছে।

সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, চিত্রকলা এক কথা সৃজনশীল কথাশিল্পের ক্ষেত্রটাকেই ধরি, সেখানেও আমি Up to date নই। তার অর্থ এই নয় যে, সমসাময়িক লেখা আমি ছিটেফোঁটাও পড়ি না। পড়ি, তবে তাকে up to date বলা যায় না। আসলে সবকিছুর মতো বইয়ের জগতটাও এত বিশাল এবং সেখানে Printed debris এতই ভিড় করে আছে যে তার মধ্য থেকে মুক্তো খুঁজে নেওয়ার মতো একটা পরিশ্রম সাপেক্ষ কাজ আলস্যবসত করে উঠতে পারি না। কিন্তু সে অনেক কথা। আপাতত, একটি আকারে ক্ষুদ্র কিন্তু প্রকারে তথা সৌন্দর্যে দামি মুক্তোর সন্ধান, আমার মতো পাঠকদের দেওয়ার জন্য এই সামান্য প্রচেষ্টা।

সেই মুক্তোটি একটি অনতিদীর্ঘ, আঁটোসাঁটো, তন্বী গড়নের রচনা। গল্প এবং উপন্যাসের মাঝামাঝি যে কথাশিল্পটিকে ইদানিং ‘নভেলা’ নামে বিশেষিত করা হয়, সেই গোত্রের। রচনাটি প্রাথমিকভাবে ইংরেজি ভাষায় হলেও প্রখ্যাত প্রবন্ধিক, কবি এবং অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারা ভাষান্তরিত। ‘ফোরটি-স্টেপস’ নামে ইংরেজি রচনাটি এবং তার ভাষান্তরিত পাঠ ‘চল্লিশ কদম’ একসঙ্গে এক মলাটে বন্দী হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘বেঙ্গল লাইটস বুকস’ ঢাকা থেকে। বইটির সৃজনকর্তা কাজী আনিস আহমেদ। আনিসের বহির্জগতে খ্যাতি ভালো, এমনকি ঈর্ষণীয়ও।

সম্প্রতি আমার এক অনুজ-আত্মীয় ঢাকা থেকে বইটি আমায় উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে এই বঙ্গে এর পরিচিতি সম্ভাব্য পাঠকদের কাছে সুসংবাদ হিসেবেই বিবেচিত হবে। বইটির বিস্তারিত পর্যালোচনা, এমন কী তার বিষয় সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেও প্রভূত পরিসরের প্রয়োজন হবে। সে কারণে, সামান্য দু’একটি কথায় এটির পরিচয়মাত্র জ্ঞাপন করব।

এরকম রচনা-কৌশল এবং মননশীলতা আমি অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় লাভ করিনি। পণ্ডিত-সমালোচকেরা কোনো কোনো রচনা বা গ্রন্থ বিষয়ে ‘ব্যতিক্রমী’ বলে একটি শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। সেই শব্দটি দ্বারা অনেক কিছুই বোঝায় আবার ঠিক ব্যতিক্রমটা কী তা কুয়াশাচ্ছনই থেকে যায় তা আমি বলব না।

বইটি পড়ে আমার যা অনুভব করেছি তাতে, ওই শব্দটি দিয়ে সেই অনুভূতিটিকে এই নিবিষ্ট পাঠকদের অনুভূতি তরঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারবো না। তারা শুধু এই অত্যাশ্চর্য বইটি পাঠ করলেই একমুহূর্তেই সঠিক ব্যতিক্রমটি অনুভব করবেন।

গল্পটি শুরুই হয়েছে এক অদ্ভুত চমৎকারিত্বে। সেই শুরুয়াৎটি আমি নিবন্ধ পাঠকদের উদ্দেশ্যে উদ্ধৃত না করে পারছি না— “আগের সন্ধ্যাতেই মারা যাবার পর শিকদার সাহেব এমন মাটির ছ’ফিট তলায় শুয়ে আছেন। মারা যে গেছেন সে সম্বন্ধে নিজে তিনি খুব একটা নিশ্চিন্ত ছিলেন না বটে, তবে যারা তাকে কবর দিয়েছিল তারা অবশ্য পুরোপুরি নিঃসন্দিগন্ধই ছিল। সাদা কাফনে আপাদমস্তক ঢাকা, সেখানে শুয়ে শুয়ে এখন আর তার মুনকার আর নাকির এই দুই ফেরেশতার জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।”

কাহীনির শেষে অনুভব হয় শিকদার সাহেব একইসঙ্গে জীবিত এবং মৃত। এ যেন মৃত্যুর অনিবার্যতাকে ঘোষণা এবং তাকে অস্বীকার করার যে ক্ষমতা কাহিনীটির অন্তর্গত বয়ানে তাকে তুলে ধরার এক অসামান্য শিল্পশৈলী—যা প্রখর মনন এবং একই সঙ্গে হৃদয়াবেগ ব্যাতিরেকী প্রকাশভঙ্গীতে আশ্লিষ্ট। এরকম ট্রিটমেন্টই অভিনব মনে হয়েছে আমার।

প্রসঙ্গক্রমে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সাহেবের ‘প্রাককথন’ থেকে কিছু কথা উদ্ধৃতিযোগ্য বলে মনে করছি। তিনি লিখেছেন— “আহমেদের আকর্ষণীয় রচনা-শৈলী, কাহিনীর বাস্তবধর্মী কাঠামোর মধ্যে জাদুময়তাকে জায়গা দেবার ক্ষমতা, ক্ষমতাশালী ভাষা, চরিত্র সৃষ্টি এবং তাদের ইতিহাস, ভূগোল এবং সমসাময়িক রাজনীতির বিচিত্র দৃশ্যে চালনা করার সহজ দক্ষতা, লোকগল্পের ঐতিহ্যকে নতুন করা ব্যবহার করা, কাহিনী বয়নের সমান্তরাল কিংবা পরস্পর বিরোধী সম্ভাবনা সমূহকে পাশাপাশি রাখার প্রবণতা এ সবকিছুকে আশ্চর্যজনকভাবে, কাহিনীর শেষের দিকে এসে ভারসাম্যে স্থিত করা হয়েছে আর কাহিনীতে উত্তেজনা সৃষ্টি ও তার প্রশমন নিয়ে তাঁর ক্লান্তিহীন খেলা আহমেদকে গল্পকথক হিসেবে অনন্য করে তুলেছে।”

আমি মনজুরুল সাহেবের এই বিশ্লেষণের পর বইটি সম্বন্ধে নিজের অর্বাচীন বাচালতা না বাড়িয়ে সহমত জ্ঞাপন করছি। সাহিত্যে এই বইটি একটি মূল্যবান সংযোজন।

চল্লিশ কদম, বেঙ্গল লাইটস বুকস, ঢাকা, বাংলাদেশ। মূল্য ২৭৫ টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ