আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৬

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৯:০০, জানুয়ারি ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

এনায়েত আহমেদ কাকুরী নির্বাসিত জীবনে ‘তাকবীমুল বুলদান’ নামক গ্রন্থের অনুবাদ করে জনৈক ইংরেজ রাজ কর্মচারীর অনুগ্রহ লাভ করেন এবং নির্বাসিত জীবন থেকে মুক্তি অর্জন করেন। মুক্তিলাভের পরে আন্দামান থেকে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে বিদায় নেওয়ার জন্য তিনি মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীর নিকট যান। তখন মাওলানা খয়রাবাদী কাফনের কাপড় বলে কথিত এক টুকরো কাপড় এবং কতিপয় বিচ্ছিন্ন টুকরো কাগজে কয়লা ও পেন্সিল দ্বারা লিখিত একটি পত্র মাওলানা কাকুরীর হাতে দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন বস্তুগুলোকে ভারতে তার পুত্র মাওলানা আবদুল হক খয়রাবাদীর হাতে পৌঁছানোর জন্য। সেই কাফনের কাপড় ও টুকরো কাগজের কয়লা ও  পেন্সিলে যা লেখা ছিল তা-ই হলো মাওলানা খয়রাবাদীর নির্বাসিত জীবনের লেখা দুটি গ্রন্থ—‘আসসাওরাতুল হিন্দিয়া’ ও ‘কাসিদাতু ফিতনাতিল হিন্দ’।

বস্ত্রখন্ড ও টুকরো কাগজ থেকে নকল করে ‘আসসাওয়াতুল হিন্দিয়া’ এবং ‘কাসিদাতু ফিতনাতিল হিন্দ’ গ্রন্থদ্বয় প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে দেওবন্দ আন্দোলনের আলেমগণ ‘আসসাওরাতুল হিন্দিয়া’ গ্রন্থের বিপুল সংখ্যক কপি হাতে লিখে প্রচার করেন। ১৯৪১ সালে কংগ্রেসের বিখ্যাত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের আগ্রহে মাওলানা আবদুস শাহেদ খান শিরওয়ানী ‘আসসাওয়তুল হিন্দিয়া’ গ্রন্থটি মূল আরবি থেকে উর্দুতে অনুবাদ করেন এবং বিজনূরের বিখ্যাত উর্দু অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মদিনা’র স্বত্বাধিকারী মৌলবি মজিদ হোসাইন মূল আরবিসহ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। তখন ভারতের স্বাধীনতার একেবারে প্রাক্কাল হলেও পুস্তকটি প্রকাশের সাথে সাথে ইংরেজ সরকার এটি নিষিদ্ধ করে এবং প্রকাশক ও অনুবাদককে অনেক নির্যাতনে পড়তে হয়।

মাওলানা খয়রাবাদী তার বইয়ের প্রকাশও দেখে যেতে পারেননি, ভারতের স্বাধীনতাও দেখে যেতে পারেননি। এমনকি ভারত সরকার তার পাণ্ডিত্য ও বার্ধ্যক্য বিবেচনায় এনে আন্দামানের নির্বাসন থেকে তাকে যে মুক্তি দিয়েছিল সে মুক্তির সনদও তিনি দেখে যেতে পারেননি। আন্দামান থেকে মুক্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তার পান্ডিত্য বিবেচনায় আসার পিছনে একটি কাহিনি ছিল। মাওলানা খয়রাবাদী যখন রস আইল্যান্ডে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন তখন সেখানে জেলখানার ডেপুটি জেলার হিসেবে দায়িত্বরত ইংরেজ ভদ্রলোক একটি ফারসিতে লেখা জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থের পান্ডুলিপিটি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। পাঠোদ্ধারের জন্য জেলার সাহেব পান্ডুলিপিটি একজন শিক্ষিত কয়েদীর নিকট সমর্পন করেছিলেন। উক্ত কয়েদি মাওলানা খয়রাবাদীর পান্ডিত্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি পান্ডুলিপিটির টীকাভাষ্য প্রণয়নের জন্য উহা মাওলানা খয়রাবাদীর নিকট সমর্পন করেন। মাওলানা খয়রাবাদীকে এবার আর কয়লা দিয়ে লিখতে হলো না। জেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তিনি কাগজে-কলমে পান্ডুলিপিটির পাঠযোগ্য কপি প্রস্তত করলেন এবং প্রয়োজনীয় সকল স্থানে টীকাভাষ্য সংযোজন করলেন। জেলার সাহেব এসব নোট ও ব্যাখ্যা পাঠ করে এত মুগ্ধ হলেন যে, তৎক্ষনাৎ মাওলানার দর্শন লাভের জন্য ব্যারাকে ছুটে আসলেন।

মাওলনা তখন ব্যারাকে ছিলেন না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখা গেল কাঁধে কোদাল ও বগলের নিচে টুকরি লইয়া সশ্রম কারাদন্ডের কয়েদি মোঘল সরকারের এক সময়ের প্রধান আইন বিশ্লেষক ব্যারাকের দিকে ফিরে আসছেন। এই দৃশ্যে কঠোর ইংরেজ জেলারের অন্তরও বিগলিত হলো। তিনি সেদিন থেকে মাওলানাকে কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি দিলেন। জেল থেকে মাওলানার পূর্ণ মুক্তির জন্যও তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন। জেলারের সহায়তায় মাওলানা খয়রাবাদীর পুত্র মাওলানা আব্দুল হক ও মাওলানা শামসুল হক বিলাতে প্রিভি কাউন্সিলের নিকট আপিল দায়েরে সক্ষম হন। ১৯৬১ সালে মাওলানা খয়রাবাদীর মুক্তির আদেশ হয়। সেই আদেশ নিয়ে পুত্র শামসুল হক আন্দামান রওয়ানা হন। আন্দামানে অবতরণ করে তিনি দেখতে পান একটি শোক মিছিল যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পান মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীর জানাজার কাফেলা যাচ্ছে। ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতার পক্ষে ফতওয়া দিয়ে এ ভাবেই মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদী নিজের সর্বস্ব দিলেন আন্দামানের মাটিতে। কিন্তু আজ স্বাধীন ভারতের সরকার বা জনগণ আন্দামানের মাটিতে কোথাও তাঁর একটি নাম উচ্চারিত রাখেনি। এই মহান নামটিকে স্মরণ করে সারা ভারতে কোথাও একটি ফলক নেই, একটি শিলালিপি নেই, একটি সড়ক নেই—কিচ্ছু নেই।

মাওলানা খয়রাবাদীর চেয়েও কঠিন ইতিহাস ওয়াহাবি আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ কয়েদি শের আলীর। পুরো নাম শের আলী আফ্রিদি। ভারতে ইংরেজ শাসনের সর্বোচ্চ ইংরেজ কর্তাব্যক্তি থাকতেন ভাইসরয় বা বড় লাট। কোনো সশস্ত্র ভারতীয়ের হাতে এই সর্বোচ্চ পদের ইংরেজ ব্যক্তির অর্থাৎ বড় লাটের নিহত হওয়ার ঘটনা ভারতে ইংরেজ শাসনের দুশো বছরের ইতিহাসে মাত্র একবার। আর সেই ঘটনাটি যিনি ঘটিয়েছিলেন তিনি ছিলেন আন্দামানে দ্বীপান্তরিত এক ওয়াহাবি কয়েদি শের আলী আফ্রিদি।

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ভারতের বড় লাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন  মায়োর ষষ্ঠ আর্ল যার মূল নাম রিচার্ড সাউথওয়েল বুর্ক (Richard Southwell Bourke)। ভারতে তিনি লর্ড মেয়ো (Lord Mayo) হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন। ব্রিটিশ কনজার্ভেটিভ পার্টির এই রাজনীতিবিদ এবং আর্ল অব মেয়ো আয়ারল্যান্ডের চিফ সেক্রেটারি হিসেবে তিন মেয়াদে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৮৬৯ সালে চতুর্থ ভাইসরয় হিসেবে ভারতের সর্বোচ্চ ইংরেজ প্রশাসক হিসেবে কাজে যোগাদন করেন। এখানে আন্দামান কয়েদি উপনিবেশের জন্য কিছু রেগুলেশন প্রণয়নেরও তিনি ভার নেন। আন্দামানের চিফ কমিশনার তখন জেনারেল স্টুয়ার্ট। আন্দামান সম্পর্কিত রেগুলেশন প্রণয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আন্দামান পরিদর্শন ব্যপদেশে বড়লার্ট রিচার্ড বুর্ক তথা লর্ড মেয়ো ১৮৭২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টায় চারখানা গানবোটে করে আন্দামানে পৌছান এবং সঙ্গী-সাথীসহ সকাল ৮টায় রস আইল্যান্ডে অবতরণ করেন। চিফ কমিশনার জেনারেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে বড়লাটের সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি দেয়া হয়। আজাদ ও কয়েদি হাজার হাজার নরনারী তখন রস আইল্যান্ডের ঘাটে উপস্থিত ছিল। রস আইল্যান্ড পরিদর্শন শেষে দুপুরের দিকে তিনি ভাইপার আইল্যান্ডে গমন করেন। তখন মূলত এই রস আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড, চ্যাথাম আইল্যান্ড এবং মুল পোর্ট ব্লেয়ারের আবেরদিন বাজার সংলগ্ন কিছু এলাকাই ছিল সমগ্র জেলখানা। এর মধ্যে ৩০/৪০ একরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ রস আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড ও চাথাম  আইল্যান্ড অনেকটা প্রাচীরবিহীন জেলখানা। সমুদ্রই তাদের প্রাচীর।

ভাইপার আইল্যান্ড দেখে লর্ড মেয়ো চ্যাথাম দ্বীপে যান এবং সেখান থেকে বিকালে তিনি মাউন্ট হেরিয়েট যান। মাউন্ট হেরিয়েটে  তিনি একটি হাসপাতাল বানাবেন মর্মে পরিকল্পনা ছিল। তাই বিকালটায় স্থানটি পরিদর্শন করবেন এবং সন্ধায় মাউন্ট হেরিয়েটের পাদদেশে বসে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখবেন—এই পরিকল্পনায় তিনি মাউন্ট হেরিয়েট পৌঁছলেন। তার প্রাইভেট সেক্রেটারি এবং চিফ কমিশনার উভয়ই তাকে সন্ধায় মাউন্ট হেরিয়েটে যাওয়ার ব্যাপারে নিরস্ত করতে চাইলেন, কিন্তু লর্ড বাহাদুর তাদের কথা খুব আমলে নিলেন না। হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন শেষে সওয়ারীযোগে তিনি ইয়াবু পর্যন্ত আরোহণ করলেন। সেখানে সূর্যাস্ত দৃশ্য তার খুবই মনোরম মনে হলো। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকারে মশাল জ্বলে উঠলো। তিনি মশালের আলোতে নিচে অবতরণ করলেন। নিচে জেটিতে তার বোট। সেখানে লেডি মেয়ো উৎকন্ঠার সাথে অপেক্ষা করছেন। প্রাইভেট সেক্রেটারি ও  চিফ কমিশনার লর্ড মেয়োর গা ঘেঁষে হাঁটছেন। পিছনে বহুসংখ্যক অফিসার। সমুদ্রতীরে পৌঁছে গেছেন। চিফ কমিশনার লর্ড মেয়োর অনুমতি নিয়েই একটু পিছনে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে জেটির পাশে লুকায়িত এক ব্যক্তি একখানা ছুরি হাতে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়লো লর্ড মেয়োর শরীরের ওপর এবং তাঁর পিঠে এমন দুটো আঘাত হানলো যে লর্ড মেয়ো কম্পিত শরীরে সমুদ্রে পড়ে গেলেন। এফ.এ.এম দাশকে উদ্ধৃত করে বিচারপতি এস.এন আগারওয়াল তার বইয়ে এই মুহূর্তের বর্ননায় লিখেছেন—In a second, twelve men were on the assailant; an English officer was pulling them off, and with his sword hilt kept back the guards, who could have killed the man on the spot. The torches had gone out, but the Viceroy, who had slathered over the pier side, could be dimly seen riding up in the knee-deep water and clearing the hair off his brow with his hand as if to remove himself. His private secretary was instantly at his side helping him up the bank. “Byrne” he said quickly, “They’ve hit me”. Then in a louder voice, which was heard on the pier, “It’s all right. I don’t think I am much hurt”.

কিন্তু পরক্ষণেই লর্ড মেয়োকে ধরে নিয়ে জেটির পাশের একটি স্থানীয় নোংরা লড়বড়ে টানা গাড়ির ওপরে বসানো হলো এবং দেখা গেলো তার পিছনে বড় রকম দুটি আঘাত। সেখান থেকে গল গল করে রক্ত ঝরছে। লোকগুলো তাদের রুমাল বা গামছা দিয়ে ক্ষতের রক্ত আটকানোর চেষ্টা করতে লাগলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বসে থাকতে চেষ্টা করা লর্ড মেয়োর মাথাটা পেছন দিকে ঢলে পড়লো।  তিনি চিৎকার দিয়ে বললেন—‘Lilt up my head’। এটিই ছিল তার শেষ শব্দ। এরপর লর্ড মেয়োর মৃতদেহ বোটে তোলা হলো। ফরেন সেক্রেটারি ক্যাপ্টেন এ্যাটিকসন শের আলীকে জিজ্ঞেস করলেন—‘তুমি এটা কেন করেছ?’ শের আলী এক কথায় উত্তর দিলেন—  ‘খোদা নে হুকুম দিয়া।’ তার কাছে জানতে চাওয়া হলো এই কাজে তার সাথে আর কে ছিল। এবারও তিনি এক বাক্যে জবাব দিলেন— ‘মেরা শারিক কুই আদমি নেহি, মেরা শরিক খোদা হায়।’

পরের দিন চিফ কমিশনার সেশন জজ হিসেবে আদালত বসালেন। সেখানে শের আলী দীর্ঘ বয়ানে বললেন: ১৮৬৭ সাল থেকে আমার সংকল্প ছিল আমি কোনো একজন উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারীকে হত্যা করবো। সেই উদ্দেশ্যেই কয়েক বছর ধরে আমি এই ছোরাখানা তৈরী করে রেখেছিলাম। গত ৮ ফেব্রুয়ারি যখন লর্ড বাহাদুর আগমন করলেন এবং তার জন্য সালামির তোপধ্বনি হলো তখন আর একবার আমি ছোরাখানা ধার দিয়ে নিলাম। সারাদিন আমি রস আইল্যান্ডে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলাম, যেখানে লর্ড বাহাদুরের চলবার পথে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটতে পারতো। কিন্তু সেখানে যাওয়ার অনুমতি পাইনি। বিকালে যখন আমি পুরো নিরাশ হয়ে পড়েছি তখন তকদির আমার বাড়িতেই লর্ড মেয়ো বাহাদুরকে নিয়ে এলো। আমি তার সঙ্গে পাহাড়ের  উপরেও উঠেছিলাম এবং তার সঙ্গেই ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু যাওয়া কিংবা ফেরার পথে কিংবা পাহাড়ের উপরে কোথাও এরূপ কোনো সুযোগ পাইনি। তখন জেটির আড়ালে এসে লুকিয়ে রইলাম এবং সেখানেই আমার মনের সাধ পূর্ণ হলো।

আত্মস্বীকৃত এই অপরাধে চিফ কমিশনার শের আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। কোলকাতা হাইকোর্ট এই রায় বহাল রাখে। ১৮৭৩ সালের ১১ মার্চ ভাইপার আইল্যান্ডে তাকে ফাসি দেয়া হলো।

কে এই শের আলী? তার নামের অর্থ পরাক্রমশালী বাঘ। কাজেও তাই তিনি দেখিয়েছেন। কিন্তু দেখতে শুনতে মোটেই বাঘের মতো কিছু তিনি ছিলেন না। একসময় ইংরেজ সরকারের অধীনেই অশ্বারোহী পুলিশে কাজ করেছেন।

বাড়ি পেশোয়ারে খাইবার অঞ্চলে। তিরাহ উপত্যকা তার জন্মস্থান ছিল। একটি পারিবারিক দ্বন্দ্বজনিত হত্যা মামলায় প্রথমে ১৮৬৭ সালে তার ফাঁসি হয়েছিল। পরে সেই শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে কর্নেল পলক তাকে কালাপানি পাঠান। কালাপানিতে বাধ্যগত কয়েদির সুনাম নিয়ে তিনি অল্পদিনে পোর্টব্লেয়ারে নাপিতের পেশায় অবাধ চলাফেরার লিভ টিকেট অর্জন করেন। তখন পোর্টব্লেয়ারে কয়েদিরূপে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ও ওয়াহাবি বিদ্রোহীদের প্রচুর বাসবাস ছিল। তাদের প্রেরণায় তিনি ইংরেজ বিরোধী হয়ে ওঠেন এবং ইংরেজ হত্যাকে পুণ্য জ্ঞানে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। ১৮৭২ সালে সেই পরিকল্পনা তার সফল হয়। কিন্তু তার এই সাফল্য ভারতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কোন গুরুত্ব পায়নি। ইংরেজ দাসত্বকে নাকে খত দিয়ে  গ্রহণকারী সাভারকারের নামে আন্দামানে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদদের মাঝে ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। আন্দামান বিমানবন্দরের নামকরন হয়েছে তার নামে। অথচ ভারতের সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে ইংরেজ ভাইসরয়কে হত্যা করতে পারার একমাত্র এবং অনন্য ঘটনার নায়ক শের আলীর নামে আমাদের জানামতে কোথাও একটি ভাস্কর্য নেই। তার নামে একটি রাস্তা, পুল, ভবন বা এমন কোনোকিছুর কোনো নামকরন নেই। জন্ম-মৃত্যু দিবসে তার কোনো স্মরণ নেই। কেন এমন হলো? খুব সহজ উত্তর আপনা-আপনি এসে যায়: কারণ তার নাম শের আলী। এই উত্তরে সাম্প্রদায়িকতা নেই, বরং এই প্রশ্ন না তোলার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে।

ক্ষুদিরাম বসু একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। সেই চেষ্টায় তিনি যে গাড়িতে বোমা ছুঁড়েছিলেন সেই গাড়িতে ম্যাজিষ্ট্রেট কিংসফোর্ড ছিলেন না, ছিলেন দুজন সাধারণ ব্রিটিশ মহিলা। ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করতে না পারলেও তার সেই চেষ্টা ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর ঘটনার মর্যাদা লাভ করেছে। সেই ঘটনাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অমর গান—‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। সে গানে এমনকি অসত্য বাক্য যোজনা করেও তার মহত্ব উচ্চারিত হয়েছে। গানে লেখা হয়েছে— ‘বড় লাটকে মারতে গিয়ে মরল ভারতবাসী’। মূলত ক্ষুদিরাম বড়লাটকে মারতে যাননি এবং ভারতবাসীকেও তিনি মারেননি। সে যাই হোক; গানের বাক্যের সত্যাসত্য কোনো বড় প্রসঙ্গ নয়।  বিষয় হচ্ছে একজন সশস্ত্র সংগ্রামীর প্রয়াস ও প্রচেষ্টাকে অমর করে রাখার প্রচেষ্টা। সে প্রচেষ্টা শুধু গানে নয়, বাংলার শহরে-বন্দরে সর্বত্র সে প্রয়াস গৌরবজনকভাবে লক্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনো বড় শহর নেই যেখানে ক্ষুদিরামের নামে কিছু নেই। অথচ শের আলী ইংরেজ শাসনের সর্বোচ্চকর্তাকে কোনো বন্দুকে বা পিস্তলে নয়, বরং মাত্র একটি ছোরা দিয়ে কুপোকাত করলেন, অথচ তার নাম ইতিহাসের পাবলিক আয়োজনে সর্বতোভাবে বিস্মরণে চলে যেতে দেয়া হলো, বা বলা যায় বিস্মরণে ঠেলে দেয়া হলো। কেন? উত্তরটি খোঁজা দরকার।

শের আলীর ক্ষেত্রে যা ঘটলো তার সাথে সংযুক্ত রয়েছে আরো কঠিনতর জঘন্য বিষয়। ক্ষুদিরামের নাম ভারতীয় ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হবে এটি যেমন কাম্য, তেমনই কাম্য হলো ক্ষুদিরাম যাকে হত্যা করতে প্রয়াস পেয়েছেন বা হত্যা করেছেন তাদের নাম কোনোভাবে ভারতের মাটিতে উচ্চারিত না হওয়া। কিন্তু শের আলীর ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সংঘটিত ঘটনা বরং সম্পূর্ণ উল্টো। শের আলীকে অবিস্মরণীয় করে তোলার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এ ক্ষেত্রে বরং শের আলীর হাতে নিহত লর্ড মেয়োর নামকে স্মরণীয় করে তুলতে ইংরেজ শাসনামলে তো বটেই, এমনকি স্বাধীন ভারতের শাসনামলেও নেয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। ইংরেজ আমলে তো মেয়োর মৃত্যুর পরের বছরই আন্দামানে নব-আবিষ্কৃত একটি প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম মেয়োর নামানুসারে রাখা হয় ‘papilio mayo’। তার হত্যার পর পরই ইংরেজ তোষণে সিদ্ধ জয়পুরের মহারাজা রাম সিং লর্ড মেয়োর ৯ ফুট লম্বা একটি লৌহমূর্তি নির্মাণ করে তা ব্রিটিশ রাজকে হাদিয়া দেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরপরই ধ্বংসতাণ্ডব থেকে রক্ষার জন্য উক্ত লৌহভাস্কর্যটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। ২০০৭ সালে আলবার্ট হল যাদুঘরের আঙ্গিনা থেকে সেই পুঁতে রাখা মূর্তি তুলে তা জয়পুরের মেয়ো কলেজে স্থাপন করা হয়। অথচ মেয়ো কলেজে লর্ড মেয়োর মার্বেল পাথরের মূর্তি আগে থেকেই ছিল। এভাবেই চলছে ইংরেজ লর্ড হত্যাকারী সশস্ত্র ওয়াহাবি শের আলীর নাম মুছে ফেলার প্রয়াস; আর তার হাতে নিহত ভারত-শত্রু ইংরেজ লর্ডের নাম প্রতিষ্ঠার নির্লজ্জ উদ্যোগ।

শের আলীর সাথে আরো হারিয়ে গেছে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম, যারা আন্দামানে দ্বীপান্তরিত ছিলেন। সঞ্জীব চট্ট্যোপ্যাধায় মাত্র তিনটি নাম তার ভ্রমণ কাহিনীতে উচ্চারণ করতে পেরেছেন। ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অন্যতম ও একইসাথে ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরি তার ‘তাওয়ারিখ-ই-আজিব’ গ্রন্থে ১৮৫৭ সালের কয়েক হাজার সংগ্রামী আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন মর্মে উল্লেখ  করেছেন কিন্তু নাম বলেননি ২০টিও। এভাবেই নামগুলো প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই শের আলীর দেশ পেশোয়ারেরই এক পরিবারের উত্তরসূরী, আন্দামান সেলুলার জেল মেমোরিয়ালের কিউরেটর, রাশিদা ইকবার এই চির অমর নামগুলো হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। ১৮৫৭ সালের ৩১০ জন স্বাধীনতা সংগ্রামী যাঁরা আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন তাঁদের নাম ও পরিচয়সহ একটি গ্রন্থ তিনি রচনা, সংকলন ও  সম্পাদন করেছেন। গ্রন্থটির নাম—Unsung Heroes of Freedom Struggle in Andamans: Who’s Who । পরবর্তীতে লাহোর ন্যাশনাল আর্কাইভস থেকে বিচারপতি আগারওয়াল আরও জানতে পেরেছেন যে, জাফর থানশ্বরি হাজার হাজার বললেও মূলত ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে মোট ৩৬২ জনকে আন্দামানে দ্বীপান্তর করা হয়েছিল। ভাস্কর্যে, ভবনে না হোক; বইয়ের পাতায় অন্তত ৩১০ জনের নামগুলো যে সংরক্ষিত হয়েছে এজন্য ড. রাশিদা ইকবালের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।চলবে

আরো পড়ুন: কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৫

//জেডএস//

লাইভ

টপ