আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৭

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১০:০০, জানুয়ারি ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৬, জানুয়ারি ২৩, ২০১৯

ড. রাশিদা ইকবালের এই কঠিন শ্রমলব্ধ গবেষণা এবং হোটেল গুরু ইন্টারন্যাশনালের বাঙালি বাবুর্চিদের রান্না আর বাঙালি মেসওয়েটারদের আন্তরিক আপ্যায়ন থেকে অর্জিত খোশ মেজাজ নিয়ে ঘুমুতে গেলাম। ঘুমের ব্যাপারে আন্দামানে ঘুমের মালিক সব সময় সদয় থাকেন। বাইরে বৃষ্টি আর বাতাসের আয়োজনটা ভালো থাকলে ভিতরে ঘুমের আয়োজনটাও জব্বর হবে এটা বাঙালিমাত্রই জানে। বিশেষ করে সে বৃষ্টিকে ঘুমের সঙ্গীতে রূপান্তর করতে যদি একখানা টিনের চালা থাকে তাহলে তো আর কথাই নেই। সেই চালার ব্যবস্থাটাও ঘুমের মালিক আমাদের জন্য এখানে করে রেখেছিলেন। আমাদের পাঁচতলার হোটেলটির সর্বোচ্চ ফ্লোরের ছাদ ছিল টিনের। টিনের চালার নিচে চমৎকার ইন্টেরিয়ার ডিজাইন সমৃদ্ধ সিলিং। বাইরের বৃষ্টি বাতাসকে স্বাগত জানাতে জানালার কাচটা সামান্য ফাঁকা রেখে এয়ারকন্ডিশনারটা পুরো অফ করে দিয়ে চলে গেলাম নাক ডাকা ঘুমের রাজ্যে।  আমাদের চোখে যখন ভোর নামলো তখন বাইরে সকাল ৯টারও বেশি। কিন্তু বৃষ্টি বাতাস হালকা চালে এখনও আছে বিধায় দিনের আলো ভালো করে ফুটতে পারেনি।

কিন্তু আমাদের তাড়া আছে। আজ ২৭ আগস্ট। ৩১ আগস্ট আমাদের ফিরতি যাত্রা। আজ আমাদের আইটিনেরারিতে রয়েছে রস আইল্যান্ড, নর্থ বে আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড যদি পারা যায় এবং যদি সম্ভব করবিন কোভ বিচ। হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি বাঙালি ব্রেকফাস্ট সেরে নেমে পড়লাম। পূর্বকথামতো আমাদের  উদ্ধার অবতার গোপাল দাদা হোটেল লবিতে এসে হাজির। তবে গোপাল আমাদেরকে তাঁর ‘নমস্তে’র পরের শব্দে জানালো যে রস আইল্যান্ড যাওয়ার বোট এই আবহাওয়ায় হয়তো ছাড়বে না। তারপরও ‘ফয়সালা মালিকের হাতে আর কোশেশ বান্দার হাতে’ এই পুরোনো আপ্তবাক্য সম্বল করে নেমে পড়লাম। সেলুলার জেলের পাশেই রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স।  সেখান থেকে নৌকা ছাড়ে। আমাদের বরিশাল অঞ্চলের ডিঙ্গি নৌকার চেয়ে সামান্য ছোট সাইজের এক একটি নৌকা। পাড়ি দিতে হবে ১ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব। সেই এক কিলোমিটারে ঢেউয়ের  যা সাইজ দেখলাম তার উপরে আমাদের মেঘনা পাড়ের জেলেরা আরামসে তাদের তালের ডোঙ্গা চালিয়ে বেয়ে হেলেদুলে চলে যেতে পারে।  অথচ কর্তৃপক্ষের ঘোষণা রয়েছে এই আবহাওয়ায় নৌকা চলবে না। নৌকার ছেলেগুলো মজা করেও নৌকা চালিয়ে ঘুরে আসছে। কিন্তু যাত্রী তুলতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেই। কি আর করা! ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে মাত্র ১ কিলোমিটারের দূরত্বে দাঁড়ানো রস আইল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকলাম আর ভাবতে থাকলাম ১৮৫৮ সালে দ্বীপান্তরিত কয়েদিদের কাছে এই এক কিলোমিটার কত শত কিলোমিটার দীর্ঘ এক দূরত্ব ছিল। বন্দীদের এনে প্রথমে নামানো হতো এই রস আইল্যান্ডে। সেখান থেকে এই এক কিলোমিটার পথটুকু পাড়ি দিয়ে পোর্টব্লেয়ারে এসে বাস করার অনুমতি বা প্রচলিত শব্দে ‘টিকেট’ পেতে তাদের লেগে যেত অনেক অনেক বছর। অনেকে ছিলেন যারা এই অনুমতি পেয়ে মরতে পারেননি।

এই পেনাল সেটেলমেন্ট গড়ে তুলতে স্বাভাবিকভাবেই কিছু নিয়মকানুন ছিল। এখানে এনেই কয়েদিদেরকে স্বাধীনভাবে বাস করার অনুমাতি দেয়া হলে তো অপরাধীদের কালাপানি হওয়া মানে জেল থেকে খালাস পেয়ে যাওয়া। আবার এখানে এনে সারাজীবন জেলের ভিতর আটকে রাখলেও তো এখানে কয়েদি উপনিবেশ গড়ে উঠবে না। জমি আবাদ হবে না। একটি জাতি-গোষ্ঠী বা বসতি সৃষ্টি হবে না। রস আইল্যান্ড বা ভাইপার আইল্যান্ডে কয়েদি এনে রাখার পরে ধীরে ধীরে কীভাবে তাদেরকে দিয়ে কৃষি বা অন্য পেশা ভিত্তিক সমাজ সৃষ্টি হলো সেটা অবশ্যই একটি কৌতূহলের বিষয়।

এর পিছনে ছিল একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এ নিয়ম কালে কালে পরিবর্তিত হলেও প্রথম দিকে সে নিয়ম কেমন ছিল সে সম্পর্কে জানা যায় মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরির ‘তাওয়ারিখ-উল-আজিব’ গ্রন্থ থেকে। থানেশ্বরি লিখেছেন যে, আন্দামানের আইন-কানুন মানে হলো চিফ কমিশনারের হুকুম। তার হুকুমের মধ্যে একমাত্র ফাঁসির হুকুম কার্যকর করতে গর্ভনর জেনারেলের অনুমোদন দরকার হতো। বাকি সকল হুকুমের একছত্র মালিক ছিলেন তিনি। তার কোনো হুকুমের ক্ষেত্রে কোনো আপিল চলতো না। এই বিশাল হুকুমের হাকিম লোকটি এই রস দ্বীপে থাকতেন। তার  মাসিক বেতন ছিল তিন হাজার টাকা। তার হুকুমই আইন হওয়ার কারণে আন্দামানে কয়েদিদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নিয়মকানুন তার হুকুম অনুযায়ী যখন তখন পরিবর্তন হতো।

জাফর থানেশ্বরি লিখেছেন যে, বছরে ২০০০ কয়েদি ভারত থেকে আন্দামানে পাঠানো হতো। জাহাজ থেকে রস দ্বীপে বা ভাইপার আইল্যান্ডে অবতরণের এক মাস পরে তাদের পায়ের বেড়ি কেটে দেয়া হতো। মূল ভূখণ্ডের প্রাচীরবেষ্টিত জেলাখানার অর্থে তখন এখানে কোনো জেলখানা ছিল না। চতুর্দিকের সাগরই ছোট ছোট এই দ্বীপগুলোর জন্য ছিল জেলের প্রাচীর। দিনের বেলায় মূল ভূখণ্ডের কয়েদিদের মতো দ্বীপে কায়িক শ্রম দেয়া ছিল বাধ্যতামূলক। রাতে কর্মচারীরূপে নিযুক্ত কয়েদিদের অধীনে তাদেরকে ব্যারাকে বাস করতে হতো। ব্যারাকগুলো পাহারা দেবার জন্য কোনো পুলিশ বা সৈন্য থাকতো না। কয়েদি কর্মচারীরাই সব রক্ষণাবেক্ষণ করতো। মোটকথা কয়েদিদের দেখাশুনা করা ও পাহারা দেওয়া, তাদের ভাগ করে কাজে লাগানো এবং তাদের দ্বারা কাজ আদায় করে নেয়ার সকল দায়িত্ব কয়েদি কর্মচারীরাই পালন করতো। এই কয়েদি কর্মচারীরা মাথায় লাল পাগড়ি ও গলায় চাপরাশ পরতো। খোরাক ছাড়াও পদ-মর্যাদা অনুসারে গভর্নমেন্ট থেকে এরা নগদ বেতন পেতো।

নতুন কয়েদিরা আমলে-আখলাকে সাহেবদের প্রতি বশংবদ হলেও তারা তিন চার বছর পর কিছু বেতন পেতে আরম্ভ করতো। বেতনভোগী হওয়ার পরে এদেরকে পাট্টাদার কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা হতো। দশ বছর ধরে ইংরেজদের ও অফিসারদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে প্রত্যেক পুরুষ কয়েদি ‘লিভ’ টিকেট বা অবাধ বিচরণের টিকেট অর্জন করতে পারতো। লিভ টিকেট বা টিকেট পাওয়ার অর্থ হতো এই যে, এই টিকেট থাকলে কয়েদি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার পেতো। তখন সে আবেরদিন শহরে বা অন্য কোন বস্তিতে যে কোনো পেশার সাহায্যে ইচ্ছেমতো জীবন যাপন করতে পারতো। শুধু সুযোগ ছিল না নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার।

১৮৭০-এর দশকে লিভ টিকিটপ্রাপ্তদের এমন বস্তির সংখ্যা প্রায় ষাটে দাঁড়িয়েছিল। এ সকল বস্তিতে কয়েদিরাই ছিল নম্বরদার, চৌকিদার  এবং পাটোয়ারী। যারা কৃষিকাজের টিকেট সংগ্রহ করতো তারা গ্রামের ভিতরে ১৫ বিঘা জমি পেতো। সে জমিতে ৩ বছর পর্যন্ত খাজনা মাফ ছিল। কখনো কখনো সরকার থেকে গরু, খোরাক ও টাকা-পয়সা সাহায্যও দেওয়া হতো। অন্য পেশার টিকেট যারা নিতো, যেমন রুটিওয়ালা, মিঠাইওয়ালা বা নাপিত, তারাও নিজ নিজ পেশার জন্য মাঝে মাঝে সরকারি সাহায্য পেতো। টিকেট লাভ মানেই ছিল ভবিষ্যৎ আন্দামানের জাতীয় বুনিয়াদের একটি ইট হয়ে ওঠা। স্বাধীনভাবে নিজের জীবন যাপন মানেই হলো আন্দামানের সমাজ গঠনে একটি স্বাধীন ভূমিকা পালন।

১৮৭০-এর দশকের যে বাস্তবতার বয়ান জাফর থানেশ্বরি দিয়েছেন সে অনুযায়ী তখনকার সময়ে আন্দামানে নারী কয়েদিরা নারী কর্মচারীদের অধীন একটি পৃথক দ্বীপে ব্যারাকে বাস করতো। ব্যারাকে বাসকালে যাতে তাদের নৈতিক চরিত্রের পতন না ঘটে সে জন্য যথোপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতো। ব্যারাকে তারা জাতাপেষা, সেলাই ইত্যাদি জাতীয় হালকা কাজ করতো। পুরুষের লিভ টিকেট বা আজাদি টিকেট পেতে ১০ বছর লাগতো। আর মেয়েদের লাগতো ৫ বছর। তবে টিকেট পেলেও বিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত যুবতীদের ব্যারাকের বাইরে স্বাধীনভাবে বাস করতে দেয়া হতো না। ৫ বছর মেয়াদ ফুরোবার পরে মেয়েরা ইচ্ছানুসারে যে কোনো টিকেটপ্রাপ্ত পুরুষ কয়েদির সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে পারতো। আজাদির টিকেটপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্ত্রীলোকদের দ্বীপে গিয়ে যাকে খুশি পছন্দ করে প্রয়োজন হলে টাকা-পয়সা দিয়ে মহিলাটির সম্মতি আদায় করে তাকে বিয়ে করতে পারতো। দুই জনে রাজি হওয়ার পরে তাদের সম্মতির কথা এবং ভালোবাসার সাথে জীবন নির্বাহের একটি অঙ্গীকারপত্র চিফ কমিশনারের সম্মুখে বসে লিখে দিতে হতো। তখন চিফ কমিশনার তাদের সংসারকে স্বীকৃতি দিতেন এবং তারা পরিবাররূপে সামাজিকভাবে স্বীকৃত হতো।  টিকেটপ্রাপ্ত কয়েদিরা তাদের দেশ থেকে নিজ স্ত্র-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে আসারও অনুমতি পেতো।

টিকিটপ্রাপ্ত কোনো কয়েদি আরও দশ বছর অভিযোগহীনভাবে ইংরেজ সাহেবদের সন্তুষ্টি নিয়ে বাস করতে পারলে চিফ কমিশনার তাকে দেশে যাওয়ার অনুমতি পর্যন্ত দিতেন। অর্থাৎ তখন উক্ত কয়েদি সম্পূর্ণ স্বাধীন মানুষ হয়ে যেতো। টিকিটপ্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত  কোনো কয়েদি বিনা অনুমাতিতে কোনো টাকা-পয়সা জমাতে পারতো না। টিকিটপ্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত কোনো কয়েদি ১ বছর  ৩ মাসে মাত্র ১টি চিঠি দেশে পাঠাতে পারতো আর ১টি চিঠি দেশ থেকে পেতে পারতো। কিন্তু টিকিটপ্রাপ্তির পরে কয়েদিরা মাসে ১টি করে চিঠি লিখতে পারতো।

জাফর থানেশ্বরির বর্ণনা অনুসারে টিকিটপ্রাপ্ত কয়েদিরা এভাবে ধীরে ধীরে আন্দামানে গড়ে তুললো এক সমাজ জীবন এবং তৈরী হলো ইংরেজ পরিকল্পনার পেনাল সেটেলমেন্ট। কিন্তু সেই সমাজ জীবনের মূল ইউনিট হিসেবে যে পরিবার ব্যবস্থা প্রয়োজন সেই পরিবার গঠনে আবশ্যিক নারীর যোগান কি আন্দামানে ছিল? একেবারেই ছিল না। এমনকি নারী ছাড়া যে পেনাল সেটেলমেন্ট নামের সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না সেই বিষয়টিই মনে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের মাথায় প্রথম দিকে অন্তত ছিল না। ড. জে. পি. ওয়াকার ১৮৫৮ সালের ১০ মার্চ যে দুশো কয়েদি নিয়ে চ্যাথাম দ্বীপে নেমেছিল সেই দুশো কয়েদির মধ্যে ১ জনও নারী ছিল না। তাহলে শেষ পর্যন্ত আন্দামানে নারীর যোগান কীভাবে আসলো? সঞ্জীব চট্টোপ্যাধায় সে কাহিনির বর্ণনা দিয়েছেন খুব করুণভাবে। সঞ্জীব তাঁর বর্ণনায় জাফর থানেশ্বরির ১৮৭০ দশকে দেখা বাস্তবতার আরো পূর্বের অবস্থাও বর্ণনা করেছেন এবং লায়াল কর্তৃক সেলুলার জেল বানানোর পরের অবস্থারও বর্ণনা করেছেন। তবে সে বর্ণনায় একটু পূর্বকথা আছে।

সঞ্জীবের বর্ণনামতে ড. জে. পি. ওয়াকার আন্দামানে কয়েদি উপনিবেশ শুরু করেছিলেন সিংগাপুরের গভর্নর বাটারওয়ার্থের দেয়া রুলস অনুযায়ী। এই রুলস অনুযায়ী ভারতের মুল ভূখণ্ড থেকে পাঠানো কয়েদি আন্দামানে নামানোর সাথে সাথে তাদের শ্রেণিভাগ করে ফেলা হতো।  প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ। আরো একটি  বিশেষ শ্রেণি ছিল ‘ডি’ ক্লাস। ‘ডি’ মানে ডাউটফুল গ্যাং। এই শ্রেণিতে পড়তো অপরাধীর অপরাধীরা। খুবই মারাত্মক চরিত্রের অপরাধীর গলায় ঝুলতো এই টিকেট। গলায় ‘এল’ লকেট থাকলে বোঝা যেত ‘লাইফ টার্ম’ অর্থাৎ যাবজ্জীবন। ‘ডি’ ক্লাসের জন্য প্রথম দিকে বিশেষ জায়গা ছিল ভাইপার আইল্যান্ড আর চ্যাথাম আইল্যান্ড। পরবর্তীতে লায়ালের রিপোর্ট অনুযায়ী সেলুলার জেল তৈরী হলে ১৯০৬ সাল থেকে এই ক্লাসের জন্য ছিল সেলুলার জেল। ভাইপারে থাকতো চেইন গ্যাং। মোটা লোহার চেইন দিয়ে এক সঙ্গে চারজন বাঁধা। সেই অবস্থায় খাওয়া, শোয়া, স্নান, প্রকৃতির কর্ম, সবকিছু।

অপরাধীর অপরাধীরা ছাড়া প্রথম দিকে সকলেই হতো তৃতীয় শ্রেণির অপরাধী। অপরাধীরা ভালো আচরণের জোরে তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এবং পরবর্তীতে প্রথম শ্রেণিতে প্রোমোশন হতো। আচরণ উল্টো হলে ঘটতো উল্টোটা—তৃতীয় থেকে চতুর্থ—আরো খারাপ হলে ভাইপার, নয়, চ্যাথাম। তবে প্রথম শ্রেণিতে ওঠার আগে অন্তত এগারো বছর অন্য শ্রেণিতে খাটতে হতো। প্রথম শ্রেণি মানে মুক্ত অপরাধী, সেলফ সাপোর্টার। অর্থাৎ আজাদির টিকেটপ্রাপ্ত। এই টিকে প্রাপ্তদেরকে ইতোমধ্যে তৈরী গ্রামে চাষবাস ও বসতি স্থাপনের জন্য জমি দেয়া হতো।  দেয়া হতো গরু, মোষ, ছাগল। তাদের সমস্ত উৎপাদন সরকার কিনে নিতো। এদের মাথাপিছু উপার্জন মাসে ১০ টাকার কম ছিল না। এই সেলফ-সাপোর্টারারা বিয়ে করার অনুমতি পেতো। কারণ, লোক বাড়াতে হবে। না হয়, পেনাল সেটেলমেন্ট অর্থাৎ কয়েদি উপনিবেশ কীভাবে হবে?

একদিকে থাক তারা, যারা মেয়াদ খাটছে, আর একদিকে গড়ে উঠুক সংশোধিত অপরাধীদের গ্রাম সংসার। এটিই বাটারওয়ার্থ রুলসের অংশ। তবে রসদ্বীপ, ভাইপার আইল্যান্ড বা বিংশ শতকের শুরুতে সেলুলার জেল থেকে গ্রামে ঘর-সংসারের পথে যাওয়াটা খুব সহজ ছিল না। বিশেষ করে ১৯০৬ সালের সেলুলার জেল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে লায়ালের বিধি চালু হলে এই পথ অনেক কঠিন হয়ে ওঠে। জাফর থানেশ্বরির দেখা সময়ে এই নিয়ম যত সহজ ছিল, লায়াল ও লেথ ব্রিজের বিধি প্রবর্তিত হওয়ার পরে ১৮৯৬ সাল থেকে মোটেই তা অতো সহজ ছিল না। তখন থেকে বিধি হলো ভারত থেকে এখানে আনার পরে প্রত্যেক কয়েদিকে প্রথমে ছ’মাস ছোট ছোট নির্জন খুপরি ঘরে আটকে রাখতে হবে। ৬ মাস এভাবে সেলে কাটাবার পর ১৮ মাস কাটাতে হবে ব্যারাকে অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে। এখানে কঠোর শ্রম দিতে হতো। ১৮ মাস ব্যারাকে কাটানোর পরে তৃতীয় স্তরে ব্যারাকের বাইরে যাওয়া যেত, তবে কড়া পাহাড়ায়। ব্যারাকের বাইরে কড়া পাহারায় তখনও কঠিন কায়িক শ্রম দিতে হতো। গাছ কাটা, জঙ্গল পরিষ্কার জাতীয় কাজ। কাজের বিনিময়ে তখনও কোনো পারিশ্রমিক নেই। এর পরের পাঁচ বছর পেতো কয়েদি শ্রমিকের মর্যাদা অর্থাৎ তখন শ্রমের বিনিময়ে কিছু অর্থ প্রদান করা হতো। এই পাঁচ বছর শেষে কারাজীবনের ১১ বছরের মাথায় কর্তৃপক্ষের সন্তষ্টি সাপেক্ষে মিলতো ছুটির টিকিট। সেলফ সাপোর্টার। অনুমতি মিলতো বিয়ের।

কিন্তু যে কথা দিয়ে এই প্রসঙ্গের অবতারণা সেই নারী কোথায় মিলবে? বিয়ের নারী কোথায় পাওয়া যাবে? নারী পাওয়া নিয়ে পেনাল সেটেলমেন্টে ঘটলো মহা এক সমস্যা। মানুষ সৃষ্টিকর্তার এক পরম কৌতুক। মৃত্যুর মিছিলে বসেও তার কাম যায় না। কাম হলো এমনই এক অদমনীয় ভাইরাস। ভাইপার দ্বীপে চেইনে বাঁধা কুখ্যাতরা শিকল বাজিয়ে বেত খেতে খেতে পশুত্ব মোচনের সাধনা করছে। ব্যারাক থেকে রোজ বন্দীরা পালাতে গিয়ে আদিবাসীর হাতে ধরা পড়ে মরছে। রাত ভোর হলেই গাছে গাছে ঝুলছে শুকনো দেহ। তবু নারী চাই। প্রজননের নেশা। শরীর নেই—অর্ধমৃত, ক্ষতবিক্ষত তবু রাত্রি আসে আর সাথে আসে উলঙ্গ ইচ্ছারা। দেহ চাই। ওয়াকার কোলকাতায় চিঠি লিখলেন—‘তেল, চাল, ডাল, নুন যেমন পাঠাচ্ছো পাঠাও, সঙ্গে পাঠাও মহিলা। এখানকার ২৫ জন বাঙালি আসামী তাদের পরিবারের সাথ মিলিত হতে চায়।’

ওয়াকারের চিঠির বরাত দিয়ে সেই ২৫ জন স্ত্রীলোকের হাতে পায়ে ধরা হলো। চল, তোমাদের স্বামীর কাছে। কেউ রাজি হলো না।  তখন ব্যবস্থা হলো ভারতের জেলখানার ইচ্ছুক নারী কয়েদিদের আন্দামান পাঠানো হবে। আসামী হলেও মেয়েছেলে তো। ১৮৬০ সালে প্রথম ৩৫ জন মহিলা অপরাধী আন্দামানে এলো দ্রৌপদী হতে। পুরুষদের সামনে তারা মিছিল করে হেঁটে গেল। স্বয়ম্বর সভা, যার যাকে মনে ধরে। টোপর মাথায় না দিয়েই বিলেতি কায়দায় বিয়ে। এইভাবে ধীরে ধীরে শ’কয়েক মহিলা এলো। তখন তিন হাজারের মতো সেলফ সাপোর্টার পুরুষ। আর শ’চারেক মাত্র মহিলা। চলবে

আরো পড়ুন : কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৬

//জেডএস//

লাইভ

টপ