মনন রেখা বাংলাদেশের উর্দু কবি নওশাদ নূরী সংখ্যা

Send
মুহাম্মদ মহিউদ্দিন
প্রকাশিত : ১০:০০, জানুয়ারি ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০০, জানুয়ারি ২০, ২০১৯

আমি একজন কিংবদন্তীর কথা বলছি। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ষান্মাসিক ‘মনন রেখা’র বর্তমান (৪র্থ) সংখ্যাটি না পড়লে বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তী সম্পর্কে আমি জানতেই পারতাম না। এ সংখ্যার পুরোটাই মলাটবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের উর্দু কবি নওশাদ নূরীকে নিয়ে। বাঙালি জাতির অহংকার ভাষা আন্দোলন, মায়ের মুখের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় এবং দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর করালগ্রাস থেকে একটি স্বাধীন ভূমি হিসেবে বাংলাদেশকে মুক্ত করবার আন্দোলনে একজন উর্দুভাষী মানুষ কবি নওশাদ নূরীর ত্যাগ সত্যিই আমাকে বিমোহিত করে। গর্বে বুক ভরে যায়। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল একজন মানুষ নওশাদ নূরীকে নিয়ে তার সমসাময়িক, অনুজ এবং বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিকের কলম থেকে যে নির্যাস চিত্রায়িত হয়েছে তা বাঙালির ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে বলে আমি মনে করি।

কবি নওশাদ নূরী ১৯২৬ সালের ২১ অক্টোবর বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার বসন্তপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত উর্দুভাষী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নওশাদ নূরী কবির ছদ্মনাম। তার আসল নাম মোহাম্মদ মোস্তফা মাসুম হাশমী। তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম কবি ও গীতিকার ফয়েজ আহমদ ফয়েজ প্রতিষ্ঠিত প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনের বিহার শাখার সেক্রেটারি। ১৯৫১ সাল।  নবীন ভারত তাদের নব্য স্বাধীনতাকে ‘ঐশ্বর্যমণ্ডিত’ করার লক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দান-ভাণ্ডারের দুয়ারে। সে সময় পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে মার্কিন সাহায্য নেয়া থেকে বিরত থাকার জন্যই লিখলেন কবিতা—‘দে দে রাম ফেলাদে রাম, দেনে ওয়ালা সীতারাম’। কবিতাটি প্রকাশের পরপরই সারাদেশে আলোড়ন তোলে। জওহরলাল নেহেরু কবি নওশাদ নূরীর নামে হুলিয়া জারি করেন। হুলিয়া মাথায় নিয়েই তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

বাংলাদেশে আসার কিছু সময়ের মধ্যেই কবি নওশাদ নূরী রাজনৈতিক মতাদর্শে মওলানা ভাসানী, কমরেড আবদুল হক সহ খ্যাতিমান রাজনৈতকি ব্যক্তিত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁকে ভীষণ পছন্দ করতেন। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত তার ‘টুঙ্গিপাড়া’ কবিতায় বাংলার আপামর জনগণের আস্থার স্থপতির কথাই যেন প্রতিফলিত হয়। তিনি লিখেছিলেন— ‘হে ধুলোয় জীর্ণ মানুষেরা, তোমরা কি জানো, টুঙ্গিপাড়াতেই সেই স্থান আছে যেখানে দেশের স্বাধীনতা স্থির হয়ে আছে?’

কবি নওশাদ নূরী একজন অবাঙালি উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও বাঙালির রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির পক্ষে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার স্পষ্ট সমর্থন ও ‘মহেঞ্জাদারো’ নামে এক সুন্দর কবিতা রচনা করেন। এ কবিতা ছাপা হওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাঁকে দেশ ছাড়ার হুকুম দেন। কবি দেশ ছেড়ে যান। ১৯৬০ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা ফিরে আসেন। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় উর্দু সাপ্তাহিক ‘জারিদা’; ১৯৬৯-৭১ সাল পর্যন্ত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন নওশাদ নূরী।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কবি নওশাদ নূরীর অনেক আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে গেলেও তিনি থেকে গেলেন ঢাকার মায়ায়। বঙ্গবন্ধুর মায়ায়। স্বাধীনতার পর তাকে বঙ্গবন্ধু আবারো ‘জারিদা’ প্রকাশের কথা বলেছিলেন।

কবি নওশাদ নূরী একজন আপাদমস্তক কবি ছিলেন। ‘মনন রেখা’-এর খ্যাতিমান লেখকদের স্মৃতিচারণ পড়ে আমার তাই মনে হলো। প্রকৃতির কবিরা কখনো কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না। আপোস করেন না। কবি নওশাদ নূরীও তাই সময়ের প্রয়োজনে জ্বলে উঠেছেন বারবার। কবি আসাদ চৌধুরী তার মন্তব্যে বলেছেন—‘কবিতায় নওশাদের উপমা, উৎপ্রেক্ষা, তাঁর চিত্রকল্প অসাধারণ, তুলনাহীন। কোথাও বাড়াবাড়ি নেই।’

নওশাদ নূরী ছিলেন বাংলাদেশের উর্দু লেখকদের অভিভাবক। ভারত-পাকিস্তানের যে কোনো উর্দু কথাশিল্পী ঢাকায় এলে প্রথমে তাঁর সাথেই যোগাযোগ করতেন। তিনি বিভিন্ন উর্দু পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশে উর্দু সাহিত্য চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। ‘মনন রেখা’-এর এই সংখ্যাটিতে আলোচকদের অনেকের কথায়ই উঠে এসেছে কবি নওশাদ নূরী ছিলেন একজন দ্রোহের কবি। তাঁর কবিতার অসংখ্য পঙক্তিমালায় অন্যায়ের প্রতিবাদ ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত উপন্যাস আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের নামকরণের পরামর্শটাও কবি নওশাদ নূরী দিয়েছিলেন। তিনি একজন আন্তর্জাতিক কবি। তার বিবরণ পাই ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর বর্ণনায়—‘কবি নওশাদ নূরী আন্তর্জাতিক বিষয়ে খবর রাখতেন। সময়ে সময়ে কলম ধরতেন জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল আক্রমণ করে বসে ফিলিস্তিন। তখন তিনি আক্রমণের প্রতিবাদে কবিতা লিখে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। ১৯৮২ সালে ইসরাইল আবার আক্রমণ করে বসে লেবাননের উপর। তখন তিনি প্রতিবাদে ‘রাহগুজার আশনাই’ কবিতা লিখেন। ইরাকের উপর আমেরিকার আক্রমণের প্রতিবাদে লিখেন— ‘তুফান সাহারা’। এছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোক্তা এবং সমন্বয়কারী হিসেবেও ভূমিকা রাখেন যা একজন আন্তর্জাতিক চিন্তা ও চেতনার কবির পক্ষেই সম্ভব।

শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ষান্মাসিক ‘মনন রেখা’-এর বাংলাদেশের উর্দু কবি নওশাদ নূরীকে নিয়ে আয়োজনে আমরা পাই কবির কবিতা ও গজলের অনুবাদ। কবির কাছে লিখা চিঠি, সাক্ষাৎকার এবং কবিকে নিয়ে গল্প। কবি নওশাদ নূরীর উত্তরসুরী কবি হাইকেল হাশমীর ‘বাবা’কে নিয়ে স্মৃতিচারণ সত্যিই সুখপাঠ্য এবং শিক্ষণীয়। এই পত্রিকার অনেকের আলোচনাতেই লক্ষ্য করা গেছে কবি নওশাদ নূরীকে ‘বোহেমিয়ান’ বলা হয়েছে। সাধারণত নেগেটিভ অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও কবি নওশাদ নূরীর উপর লেখা বৃত্তান্ত পড়ে আমার মনে হয়েছে তাঁর এই ‘বোহেমিয়ান’ বেশ শুধু মানুষ ও মানবতার কল্যাণের জন্যই।

সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের পরিক্রমায় কবি নওশাদ নূরীর অবদান ইতিহাসের পাতা থেকে খসে পড়েছে মনে হয়। কারণ আমার মতো অনেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ও ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে একই সূত্রে গাঁথা এই মানুষটি সম্পর্কে জানার সুযোগ পািনি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কীর্তিমান কবি নওশাদ নূরীকে উপস্থাপনের জন্য পুনরায় আমি ‘মনন রেখা’ পরিবারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি এই পত্রিকাটির ব্যাপক প্রচার ও প্রসার কামনা করছি।

মনন রেখ। বর্ষ-২ সংখ্যা : ৪। সম্পাদকমিজানুর রহমান নাসিম। প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ২০১৮। প্রচ্ছদ : মামুন হোসাইন, মূল্য১০০ টাকা

//জেডএস//

লাইভ

টপ