আমাদের মৃত ভুবন ।। লিলিয়ানা কোলানসি

Send
তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:১৮, জানুয়ারি ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৬, জানুয়ারি ২১, ২০১৯

আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার-পরবর্তী কালের সবচেয়ে বড় অভিযান এটি!

মার্সিয়ানা লটারির স্লোগান

১.

নতুন করে এখানে জীবন শুরু করার এক বছর পরের কথা। টমি আমাকে লিখে জানাল যে সে অন্য একজনের সঙ্গে গাঁট বেঁধেছে এবং সেই মেয়ে সন্তানসম্ভবা। মেসেজটা ছোট তবে এখনো পুরোনো অনুরাগের দাগ লক্ষ্য করা যায় : ‘আমাকে আর লিখো না। নিজের জীবনকে উপভোগ কর, আমি যেমনটা করছি। তুমিই ছেড়ে চলে গিয়েছো। টমি।’

        মনিটরটা বন্ধ করলাম এবং আমার হাড়ে অনুভব করলাম এই গ্রহের অপার নির্জনতা। বাইরের দিকে মুখ ফেরানো সিকিউরিটি ক্যামেরার দিকে তাকালাম : মার্সিয়ানা লটারির নীল পতাকা পত পত করে উড়ছে গৈরিক রঙের বালিয়াড়ির উপর যেখানে জীবন্ত বলতে কোনও কিছুই নেই। নিস্তব্ধ এক মরু যা আপনার গলায় চেপে বসেছে, আপনাকে খুন করার ইচ্ছায় আকুল।

        এই প্রথম আমি স্বীকার করলাম যে এই মঙ্গল মিশনটা আত্মহত্যার নামান্তর, রাগে গজগজ করতে করতে। টমির সন্তান হবে, নিজেকে অনেকবার বললাম, আর প্রতিবার একথা উচ্চারণের সঙ্গে নিজেকে আরও একটু করে অনুভব করলাম এই প্রতিবেশে, এত হালকা যেন প্রায় ভারহীন। আমার দেহের সমস্ত কোষ এই শূন্যতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অন্য এক নারীর গর্ভে টমির সন্তান হবে আর আমি পড়ে আছি এই নিস্ফলা গ্রহে মার্সিয়ানা লটারি কোম্পানির সঙ্গে আজীবনের এক চুক্তি করে।

        অনুভব করলাম আমার শরীর গলে যাচ্ছে আর আমার চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। অরণ্য, পাইন গাছের শাখায় শাখায় আলোর ছটা, কুয়াশার চাদর গলে পথ করে নিচ্ছে টমি। তা ছাড়িয়ে, দূরে আরও দূরে, ছোট্ট বাড়ি, কাঠকয়লার ঘ্রাণ আর ইউক্যালিপটাস। বাইরে কতিপয় ধুলো শয়তান পেরিয়ে গেল এই ঊষর ভূমি, ছত্রভঙ্গ হয়ে চলতে থাকা ঘূর্ণিঝড়কে ভড়কে দিয়ে। ইশ্ যদি ওর ভেতর মিলিয়ে যেতে পারতাম, যদি হয়ে যেতাম এক জন্তু। আমার রিস্টব্যান্ডে আলো জ্বলে ভেসে উঠল যুকফস্কি’র মেসেজ : এক গহ্বরের কাছে সে বেতার-সঙ্কেত সনাক্ত করেছে এবং চাইছে আমরা যেন একটু দেখে আসি।

        কাঁপতে কাঁপতে, বাইরে বেরুনোর জন্য আমি কাপড় পরলাম।

২.

মেঘহীন, পারদতুল্য আকাশের নিচে আমি রোভার চালালাম। আমরা এগুলাম ভাঙাচোরা যন্ত্রপাতিতে ছড়িয়ে থাকা সমতল ধরে, একেবারে মরিয়া হয়ে অনুসন্ধান করতে করতে এই চেষ্টায় যে কোনো রকম যোগাযোগ স্থাপন করা যায় কিনা পৃথিবীর সঙ্গে যে পৃথিবীকে খারিজ করে দিয়েছে চীনা, ভারতীয়, রুশ এবং মার্কিনিরা। অকেজো যন্ত্রপাতির এই আঁস্তাকুড় অনেক আগে থেকেই এখানে রয়েছে, প্রথমবার মানুষ আসবারও আগে থেকে।

        যুকফস্কি আশপাশে এক অদ্ভুত তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রের কথা বলল যা আগ্নেয়গিরিজাত কিছু একটার উপস্থিতি জানান দেয়। কিংবা অতিমর্ত্য জীবন? পেছনের আসন থেকে পিচ বলল, ঠাট্টাচ্ছলে। কিন্তু আমরা হাসলাম না : যোগাযোগ মাধ্যমে সেই চোকে স্ক্যান্ডালের ঘটনা চাউর হওয়ার পর থেকেই যুকফস্কি কেমন অস্থির হয়ে আছে, আর আমি সেই বাচ্চাটাকে মেনে নিতে পারছিলাম না যে আমাকে সুনির্দিষ্টভাবে পৃথিবী ছেড়ে আসতে বাধ্য করেছে। আমি চাই ওটা মরুক। আমি চাই ওটা মরুক। ঈশ্বর, আমি চাই ওটা মারা যাক। মেরে ফেলুন।

        রোভারের সামনে দিয়ে একটা হরিণ লাফিয়ে গেল এবং আমার দিকে মিনতির চোখে তাকালো। মঙ্গলগ্রহে হরিণ! উরাল পর্বতমালার সোনালি হরিণগুলির মতো, যেগুলি সেই গ্রীষ্মের শুরুতে, সুখের দিনগুলিতে, টমি আর আমি দুজনে যখন মোটরবাইক চালিয়ে যাচ্ছিলাম ইরবিতের বার্ষিক মেলায়, তখন রাস্তার মাঝখানে ঝাঁপ দিয়েছিল। মির্কা, টমি ডাকে, আর আমি ওর কোমর ধরে ওর কাঁধে রাখি আমার গাল : রাস্তার পর রাস্তা আর আমাদের গালে হাওয়ার নাচন। হরিণের চোখ আমার মধ্যে বিঁধে যায়। বহুদিন কোনও জন্তু দেখিনি, দেখিনি কোনও প্রাণী। বার্ষিক মোটরবাইক মেলায় স্বাগতম! আমাদের সুস্বাদু আদার রুটি, সুগন্ধী মাছ এবং ক্রিম-দেওয়া বিস্ননি পিঠা খেয়ে দেখুন। সাইবেরিয়ো শিয়ালের পশম দিয়ে তৈরি ওভারকোট! পেত্রা প্লেভকোভা’র তেজস্বী সাত ফুঁয়ে আপনার প্রেমিক চিরদিনের জন্য আপনার হয়ে যাবে। আমি কষে ব্রেক চাপলাম। রোভারের চাকাগুলি পাহাড়চুড়োয় হড়কে গিয়ে যানটি স্থির হয়ে গেল, পাহাড়ের খাড়ায় প্রান্তদেশে শিলাপাথরের উপর এক টালমাটাল নৌকা। আমরা ভিন্ন ভিন্ন দিকে ছিটকে পড়লাম, লালচে বাদামি রঙের মাতাল ধুলোর ঝড়ের কেন্দ্র অভিমুখে। যুকফস্কি চেঁচিয়ে উঠল, পিপ চেঁচিয়ে উঠল। আমি চেঁচালাম কিনা জানি না। লণ্ডভণ্ড অবস্থার পর পেছনের আসনে বসে পিপের মুখে ঝড়ল রাগ ও হতাশা আর যুকফস্কি আমার দিকে ছানাবড়া চোখে তাকালো।

        দেখলে...? আমি বলা শুরু করলাম, কিন্তু যুকফস্কি খ্যাপার মতো ফুঁসে উঠল : ‘কী দেখব, খানকি মাগী, কী দেখব?’ হরিণের খোঁজে আমি বালিয়াড়িতে তাকালাম : মরুতে কিছুই নজরে এলো না। কিন্তু এরপরও আমি মন থেকে কিছুতেই এই ভাবনাটুকুকে বাদ দিতে পারলাম না যে কিছু একটা আমাদেরকে দেখছে।

৩.

তুমি পেছনে লাগলে কেন? কাপড়চোপড় বদলের রুমে পিপ ফিসফিসিয়ে বলল, আমরা যখন স্যুট পরছিলাম, প্রতিকূল মরুতে আবার যাওয়ার আগে।

        হরিণটা ওখানে ছিল, আমি জোর গলায় বললাম। হ্যাঁ ছিল, মির্কা, ঠিক না?

        পাশেই, এরিকা, পিচ্চি কার্লোস ও থাঙ লিন মিলে বাজি ধরছিল এবারের রাগবি টুর্নামেন্ট কে জিতবে তা নিয়ে, ওল্ড ব্ল্যাকস্ নাকি কোইয়োতেস দেল নোর্তে। ওসব কথাবার্তা-আড্ডায় আমার মন খারাপ হয়ে যায়, যেমনটা হল আমাদের ফেলে আসা জীবনের ছোট ছোট আনন্দের কথা ভেবে : বারবিকিউ, সাইকেলে ঘোরাঘুরি, উষ্ণ জলে গোসল। আমরা প্রত্যেকে, যে যার  মতো করে, পৃথিবীকে পরিক্রমণ করতে থাকলাম, হৃত জিনিসের চারপাশে বৃত্তাকারে অবিরাম ঘূর্ণায়মান স্যাটেলাইট। আমরা ব্লুবেরি কুড়িয়ে পাই এবং একটার পর একটা খেতে থাকি যতক্ষণ না পেট ফেটে যায়। টমি ঢেঁকুর তোলে। একটা পিঁপড়া কামড় দেয় আমার বাহুতে, আর আমি এক হাতে ওটাকে মারি। গাছের পাতায় জলের ফোঁটা জমে দাগ পড়ে। ছায়ারা গাছেদের মাঝে যাওয়া-আসা করে, শাখায় শাখায় ঝিরঝির শব্দ হয়। টমি শোনে, সতর্ক।

        আমি কিছু দেখিনি, পিপ বলল, কণ্ঠে উদ্বেগ। মির্কা, কী বলছ, পাগল নাকি, মঙ্গলে হরিণ?

আমার মন ও মস্তিষ্ক তখনও নিয়ন্ত্রণহীন বোধ করছে। ওই হরিণটার কারণে ওইদিন সকালে অন্য এক গ্রহে আমরা প্রায় মরতেই বসেছিলাম। কিন্তু আমি বেঁচে আছি। নিজেকে বললাম : আমি বেঁচে আছি আর একটা মরীচিকা এই মরুতে আমাকে বিমনা করে দিচ্ছে, এটাই যা বলার। কিন্তু পিপের পীড়াপীড়ি ও তাকানোয় এমন একটা কিচ্ছু ছিল যা আমাকে খেপিয়ে দিল, স্পর্শকাতর জায়গায় উস্কানি। সে তাক করে গুলি ছোড়ে। অরণ্যে রাইফেলের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়। গাছেদের আড়ালে হরিণটি মুখ থুবড়ে পড়ে। শিকারের ছোরা দিয়ে হরিণটির নাড়িভূঁড়ি বের করি। টমি ওর বুকটা চিড়ে উষ্ণ হৎপিণ্ডটাবের করে আনে, এখনো ধুকপুক ধুকপুক করছে। আমার ইচ্ছে হল আমার সেলে ফিরে গিয়ে পিল খাই, যেগুলি খেলে স্বস্তিকর জ্যামিতিক মাত্রার স্বপ্ন দেখা যায়। কিংবা মেসেজ কেবিনে গিয়ে গুটিগুটি মেরে থাকি। কিন্তু ওই হতচ্ছাড়া সোলার প্যানেলটাকে খাড়া করে তুলবার কাজটা এখনো আমাদের বাকী। মার্সিয়ানা লটারির ভেসেলটা ইতোমধ্যেই মঙ্গলের দিকে যাত্রা শুরু করেছে এবং আমাদেরকে বসবাস করতে আসা নতুন এই দলের জন্য শক্তি উৎপাদন করতে হবে।

দেড় বছর আগে আমিও এদের মতই একজন ছিলাম, পৃথিবী থেকে বহু বহু দূরে মহাজাগতিক আঁধারকালোয় সন্তরণরত এক পশু। ঝলমলে স্যুটের মধ্যে আমার দুই হাত ঢুকিয়ে দিলাম, বিশেষভাবে নকশা করা স্যুট যেন অনিঃশ্বাসযোগ্য মরু হাওয়ায় বেঁচে থাকতে পারি। কাঁটাতারের বেড়া। মরচে-পরা সাইনবোর্ড। নি ষি দ্ধ। বিস্ফোরণটা এখানে ঘটেছে। আমরা বেড়া টপকালাম। পরিত্যক্ত নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট। ছাদে সারসের বাসা, জানালার ভাঙা কাচ, দেয়াল বেয়ে গজানো হানিসাকল। ধুলিমলিন ডেস্কে একটি বালকের ছবি। ব্লুবেরি সবখানে, দেখতে কি রসালো! একটি পেড়ে আমি মুখে দেই। এক থাবায় টমি ওটাকে মুখ থেকে সরিয়ে দেয়। ওগুলি বিষাক্ত, সে বলে। সবকিছুই বিষাক্ত।

        চোকেও অদ্ভুত সব জিনিস দেখেছে, পিপ বলল, চারদিকে তাকিয়ে, এই ভয়ে যে কেউ না আবার আমাদের কথা শুনে ফেলে।

        কী?

        সে যখন পাগল হয়ে গেল।

        চোকে, কলোনির মালী। গ্রীণহাউজের দায়িত্বে নিয়োজিত, যে পালিয়েছিল। ওরা তাকে গহ্বরের পাশে পেয়েছিল, হাতে হেলমেট, বেগুনি দিগন্তের দিকে স্থিরশীতল ও বড় বড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওই দুর্ঘটনার কারণে লোকজন যে মার্সিয়ানা লটারি সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করল তা আজও যায়নি। তারা লোকজনকে মিথ্যা বলেছে। বলেছে চোকের মৃত্যু ঘটেছে নায়কের মতো, মুক্তাঙ্গনে এক মিশনে নিহত। তুমি কি গোসল করবে? টমি জিজ্ঞেস করে। হরিণের গাঢ় রক্তে ওর শার্ট ভেজা। সে কাপড়-চোপড় ছাড়ে। তার প্রশস্ত কাঁধ আমার চোখের সামনে, গলায় পুরোনো আঘাতের চিহ্ন যখন ওর থাইরয়েড অপসারণ করা হয়েছিল। নদীর দিকে দৌড়োয় সে। ঝপাং! কিছুক্ষণ পর জলের উপর তার মাথা ভাসে, সে হাসে। আসো, সে ডাকে। বৃষ্টি হচ্ছে। ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। আমি ডকে বসে থাকি, চুপচাপ, চিন্তাশীল। টমি ও আমি ইগরের বারে বসা অবস্থায় টেলিভিশনে চোকের খবরটা দেখি : খবরে জানাল যে মঙ্গলগ্রহে এই প্রথম একজন বাসিন্দা মারা গেছে এবং এও বলল যে মাগাইয়ানেস নক্ষত্রপুঞ্জের একটি তারার নাম রাখা হয়েছে তার নামে। খুব ভালো করে মনে আছে আমার, কারণে সে রাতে টমির সাথে আমার ঝগড়া হয়েছিল এবং তুষারে ঘন হয়ে থাকা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একা একাই হেঁটে ফিরেছিলাম। ওই নিঃসঙ্গ হাঁটার ক্রুদ্ধ সময়ে প্রথমবারের মতো আমি মার্সিয়ানা লটারিতে নাম লেখানোর কথা ভাবি। কিছুদিন পর, সত্যি সত্যি চোকের কী হয়েছিল—সত্যি বলে যদি কিছু সম্ভব হয়—তা লোকজন জানতে পারল, কিন্তু ততদিনে আমার দেরি হয়ে গেছে। ওই সমস্ত কিছু—অরণ্য, টমি, উরালের জীবন—ছিল এক বিধ্বংসী, জ্বলজ্বলে প্রভা যা আমি ছেড়ে দিতে চাইনি। তোমাকে আমার কিছু বলার আছে, টমি। সে আমাকে চুমু খায়। কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। সে আবারও চুমু খায়, খেতেই থাকে। সত্যি বলছি, টমি, আমাদের একটু কথা বলা দরকার। আমি অন্তঃসত্ত্বা।

        তোমার কোনও ধারণাই নেই কী হচ্ছে আমার, আমাকে একলা থাকতে দাও, আমি পিপকে বললাম, মাথা ঘোরাচ্ছে, কান্নায় ভেঙে পড়ব। বেকুব কোথাকার, তোমাকে কিছুই বলা ঠিক হয়নি।

        ভুল হয়ে গেছে, সে বলল, লজ্জিত এবং আমার চোখের দিকে চাইল : দেখতে সে একেবারে বাজে, নাকটা কন্দাকার আর দাঁতগুলি হলুদ। তোমাকে একটা কথা বলতে পারি, মির্কা?

        তার কদর্যতা অস্পষ্ট হয়ে গেল, ফোকাস গেছে সরে, আমার চোখের জল।

        তোমাকে আমার ভালো লাগে, সে বলল এবং মরুভূমিতে যাবে বলে হেলমেট পরে নিল।

৪.

আমরা রান্না করছি। দরজায় এক দল লোক কড়া নাড়ে। ওরা মহাকাশ প্রোগ্রামের লোক, পোশাকে আশাকে জবরদস্ত। আমাদের স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন, তারা বলল। ডাক্তারি পরীক্ষা, তারা বলল। ডাক্তারি পরীক্ষা, তারা বলল। সারা জীবন ধরে যারা রেডিয়েশনের সামনে ছিল সেসব মানুষ এবং যারা এগুলির প্রভাব থেকে নিরাপদ, তারা বলল। মঙ্গলযাত্রা, তারা বলল। টমি ও আমি পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলাম।

        যুকফস্কির নেতৃত্বে, আমরা পায়ে হেঁটে উত্তর দিকে এগুলাম কলোনির চাঁদে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য। ছোট কার্লোস, থাঙ লিন ও এরিকা সবার সামনে, মেয়েদেরকে পচানো কৌতুক বলতে বলতে যা শুনে এরিকা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। (‘মহাকাশে এক স্বর্ণকেশী মেয়ের মস্তিষ্কের ওজন কত? পৃথিবীর মতোই : কোনও ওজন নাই।’) পিপ ইচ্ছে করেই পেছনে থাকল আমার উপর নজর রাখার জন্য। যদিও ওখানটায় অনেকদিন হয়ে গেছে, কিন্তু বাইরে একমাত্র ওই ইউনিফর্ম ব্যতীত আর কোনও রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়া বের হওয়ার কথা ভাবলে আমার এখনো ভয় করে। অন্তর রোভারটা আমাদের আর ওই প্রাণঘাতী প্রতিবেশের মধ্যে আস্থার খোলস হিসেবে কাজ করছে। এয়ারলক কামরা থেকে বেরিয়ে মঙ্গলগ্রহের খোলা জায়গায় পা রাখা মানেই শূন্যে লাফ দেয়ার সামিল। আমি জানি না কী বলব, মির্কা, তুমি নিশ্চিত?

        নাইলন ও নিয়োপ্রিনের তৈরি এই বিশেষ পোশাক এবং মাথার উপর রঙহীন সূর্য জ্বলজ্বল করলেও, আমার হাড়ে ঠান্ডার চাপ অনুভূত হল। ভয়ার্ত রক্তমাংস তাপমাত্রায় মানিয়ে যায়, পোশাকের বদৌলতে, কিন্তু হাড়—কিন্তু হাড় টের পায়। আমরা সূর্য থেকে অনেক অনেক দূরে। গৌরব, লোকগুলি বলল। দেশ, লোকগুলি বলল। ইতিহাস। যাওয়ার আগে, আমাদের হাতে মার্সিয়ানা লটারির পুস্তিকা দিল। আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার-পরবর্তী কালের সবচেয়ে বড় অভিযান এটি!

        আমি মেপে মেপে এক একটা পা ফেলছিলাম বাইরের খোলা জায়গায়, আমি যেখাবে খণ্ডিত হচ্ছিলাম সেটা খেয়াল করতে করতে। কলোনির মধ্যে আমরা এক রকম স্বাভাবিকই আছি। দিনভর আমরা টেবিল টেনিস, দাবা, চেকার খেলা, ব্যায়াম করে কাটিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু বাইরে মরু এলাকায় পা দিতেই আমাদের পরিস্থিতির প্রকাণ্ড অর্থহীনতা আমাদের উপর চেপে বসছে। মাইলের পর মাইল বিরানভূমি, রংচটা এক নিসর্গ যেখানে শিলাপাথরের রূপালি শিরা আর মৃত মৌন আগ্নেয়গিরিরা কখনোসখনো ঝিলিক মারে। দেহকে শুষে নিয়েছে—ধ্বংস করে দিয়েছে—সেই নিস্পৃহতা। আমার কী করা উচিত, আমি টমিকে জিজ্ঞেস করি। সে আমার দিকে তাকায় না। গ্রীষ্মকাল শেষ, এবং লার্চ গাছের পাতারা প্রাণোচ্ছল হলদে রঙে ছেয়ে যাচ্ছে। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি, টমি বলে। মোটরবাইকের গর্জন। অনেক রাত পর্যন্ত আমি ওর অপেক্ষায় জেগে থাকি, কিন্তু ও আর ফিরে আসে না বিছানায়।

        মির্কা, বলল যুকফস্কি, এবং তার বিকট বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হল আমার হেলমেটে, আমার কানে বাজল চিৎকার। ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী করছ? আমাদের কি সারাদিন পড়ে আছে?

        কলোনির ছাদে আমি দাঁড়িয়েই থাকলাম, অনড়, আমার হাতে প্যানেল। দেখলাম পিপ ঘুরে আমার দিকে তাকালো, মনোযোগী ও বিপন্ন। আমি ডান হাতের বুড়ো আঙুল তুলে দেখালাম যেন সে বুঝতে পারে যে আমি ঠিক আছি। আমি কি ঠিক আছি? এই মিশনে পিপের অগাধ বিশ্বাস, অন্য ভুবন আবিষ্কারের জন্য নিজের জীবনকে সে তুচ্ছ ভেবেছে। এক আদর্শবাদী, কিংবা এক গর্দভ। মাস কয়েক আগে তার দেহের ত্বকে কর্কট রোগের নিশানা পাওয়া গিয়েছিল, রেডিয়েশনের ফল। আর আমাদের যদি দৈত্য জন্ম নেয়? দুই মাথাওয়ালা ছেলে? মীন-শিশু? দরিয়ার মতো, হাত পায়ের বদলে মাছের পাখনা। কিংবা ইভান ইভানোভিচের সন্তানের মতো, বুকের বাইরে হৃৎপিণ্ডনিয়ে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল। তুমি কি এসব ভেবেছো? অবশ্যই আমি ওসব ভেবেছি। আমি সব সময়ই এ নিয়ে ভাবি। কলোনিতে রেডিয়েশন থেরাপির যন্ত্রপাতি নেই, এরপরও কোনও অভিযোগ না করেই পিপ দিব্যি তার কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। চোকে, অন্য দিকে, হাল ছেড়ে দিয়েছিল। বাগানের সার দিয়ে তৈরি করা বিস্ফোরক দিয়ে চারপাশ ঘেরাও করে নিজেকে একদিন আটকে রাখল সেলে, এবং ঘোষণা দিল যদি তাকে পৃথিবীতে ফেরত না পাঠানো হয় তাহলে বিস্ফোরক দিয়ে কলোনি উড়িয়ে দেবে। কয়েক ঘণ্টা পর, যখন প্রেসিডেন্ট তার জন্য একটা স্পেসশিপ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি তাকে দিল, চোকে মরুভূমিতে গিয়ে আত্মহত্যা করে। আমি মীন-শিশু নিতে পারব না, টমি। একেবারেই পারব না। এই অদৃষ্টের বিধানটা কখনোই তামাদি হবে না যে পৃথিবীতে ফেরার একমাত্র উপায় হল লাশ হয়ে ফেরা।

                       ছাদে, পিপ সোলার প্যানেলটা স্থাপন করে আমাকে সাহায্য করতে আসল, ভারী স্যুটে হাঁটাচলার ঝামেলা নিয়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই সে ছাদের ব্র্যাকেটে আমার প্যানেলটা বসাতে পারল ঠিকঠাক। তার এই অবিরাম ভালো ভালো ভাবটা দেখে আমার গা জ্বালা করল, মার্সিয়ানা লটারির ব্যাপারে তার সরলসিধে বক্তব্য, কিন্তু যা হোক একজন কাউকে তো কাছে পাওয়া যাচ্ছে, সাহায্যও করছে। আমি চোখ তুলে তাকে ধন্যবাদ জানালাম। এরপর ওর কাঁধের উপর, ওটা দেখলাম। মঙ্গলগ্রহের তলদেশ থেকে এক অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক মাছ বেরুল এবং শূন্যে কয়েক মিটারের একটি বক্ররেখা চিহ্নিত করল, মরুভূমিতে আবারও বিলীন হয়ে যাওয়ার আগে।

৫.

আমাকে বিছানায় নাও, আমি পিপকে বললাম যখন সে আমার সেলে ঢুকে দেখে আমি শুধু একটা ড্রেসিং গাউন পরে আছি। বাইরের ক্যামেরায় দেখা যায় নির্মল আকাশে দুইটি কিমাকার চাঁদ উঠছে। আর একশো মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে পৃথিবী মিটমিট করছে। আমাদের আর ফেরা হবে না। টমিকে আমি আর কখনো দেখব না। তুমি কী করলে? ড্রেসিং গাউনটা গড়িয়ে পড়ল আমার পায়ের কাছে। পিপ আমার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল, তার শুকনো চেহারায় চোখগুলি জ্বলজ্বল করছে। শিরটান। ব্যথা, ব্যথা, ব্যথা। একটা কুঞ্চন, এরপর আর একটা, এরপর আর একটা। যতক্ষণ না আমি গুনতে ভুল করলাম। তুমি কী নিয়েছো? টমি জিজ্ঞেস করে। ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় সে পায়চারি করে।

        তুমি ঠিক নেই, পিপ বলল, কিন্তু ওর চোখগুলো আমার শরীরের উপর স্থির। সেলের নিস্তেজ আলোয় আমি ওর কাছে গেলাম। তুমি ঠিক নেই, আবার বলল সে ওর পোশাক খুলতে খুলতে। আমার মনে হয় আমি মারা যাব, টমি। হলপ্ করে বল তো তুমি কী নিয়েছো? নগ্ন, পিপকে আরও বিদঘুটে লাগছে, এতটা হাড্ডিাসার ও ফ্যাকাশে, হাতের কনুইয়ের কাছে জেলিফিশের একটা উল্কি। ক্যান্সার ওকে খেয়ে ফেলছে। শেষ কুঞ্চনের পর ওটা টয়লেটের কমোডে পড়ে যায়। রক্তের ডেলা। আমি ওটাকে তুলে রান্নাঘরে নিয়ে যাই। দশ বছর পর, আমাদের কেউই বেঁচে থাকব না। হয়তো পাঁচজনও নয়। মঙ্গলগ্রহের প্রতিবেশে আস্তে আস্তে শরীর মিলিয়ে যায়, কুরে কুরে খায় ক্যান্সার ও অস্টিওপোরোসিস। মনটাও।

        আমরা কনডমের খোঁজ করলাম না। পিপের শরীর থেকে পচা গন্ধ বেরুল কিন্তু আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম, আমার বিকর্ষণকে জয় করে। রান্নাঘরের টেবিলে, একটা কাঁটাচামচ দিয়ে আমি রক্তাক্ত ডেলাটাকে আলাদা করলাম যতক্ষণ না অর্ধস্বচ্ছ ছোট পিণ্ডটাকে পেলাম। যা যা থাকার সবই আছে। হাত। পা। আঙুল। এমনকি ছোট ছোট ভ্রু। আমার উরুতে ওর পুরুষাঙ্গ ঘষল, এবং আমি চোখ বন্ধ করলাম, আমার সবচেয়ে পছন্দের দৃশ্যগুলি মনে করবার চেষ্টায়, চিত্রাভ সাদা তুষারঢাকা পর্বতমালা। কিন্তু উল্টো আমার মনে পড়ে গেল চোকের কথা, কল্পনায় দেখলাম ওই জনমানবহীন ঊষর ভূমিতে সে দৌড়াচ্ছে। কোথায় পালাচ্ছে? আর হেলমেট খুলে ফেলেছে কেন? হয়তো এভাবে পাঁচ মিনিটও যায়নি তার আগেই তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফাটতে শুরু করেছিল। দ্রুতগতির এবং প্রচণ্ড বেদনাদায়ক এক মৃত্যু।

পিপ গোঙানো এবং অন্ধের মতো আমার মধ্যে ঝাঁপ মারল, কিন্তু সেও ঠিক নেই। সে ওটাকে জাগাতে পারল না, মৃত থাকাই ওটার জন্য ভালো। সে যদিও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। কারণ যদি আপনি হাল ছেড়ে দেন, মরুভূমি তার বড়সড় অনিবারনীয় মুখটা নিয়ে আপনাকে গিলে ফেলবে, যেমনটা হয়েছিল চোকের সাথে। পিপ তা জানে, সে কারণেই আমার মধ্যে সে তার নরম পুরুষাঙ্গটাকে বারবার ঘষে দিচ্ছিল। আমাকে একটা সন্তান দাও, তার কানে কানে বললাম, এবং দেখলাম আমাদের পুত্র প্রাক-ক্যাম্ব্রিয়ান মহাসাগরে ঝপাৎ ঝপাৎ করছে। সাত মাস ধরে আমি মহাকাশের পেটের মধ্যে ভেসেছি। আমাকে একটা সন্তান দাও, আমি দাবি জানালাম, যখন পিপ তার নিস্তেজ পুরুষাঙ্গটা বারবার আমার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। এরপর আকস্মিকভাবে আমার চোখের সামনে অরণ্য চলে এল, এবং আতঙ্কে বশীভূত হয়ে, অনুভব করলাম আমার আঙুলগুলি মাটিকে আঁকড়ে ধরেছে, একটু আয়ত্তের খোঁজে যেন পড়ে না যায়

যেন পড়ে না যায়

আকাশে


(লিলিয়ানা কোলানসি বোলিবিয়ার লেখিকা। জন্ম ১৯৮১ সালে, সান্তা ক্রুসে। ইতোমধ্যেই ছোটগল্প লিখে নাম করেছেন। বাকাসিয়োনেস পের্মানেন্তেস (২০১০) এবং নুয়েস্ত্রো মুন্দো মুয়ের্তো (২০১৬) তার দুটি গল্পগ্রন্থের নাম। অনুদিত গল্পটি তার নুয়েস্ত্রো মুন্দো মুয়ের্তো গ্রন্থের শিরোনাম গল্প। লিলিয়ানা যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, বিষয় লাতিন আমেরিকান সাহিত্য। ছোটগল্পের জন্য গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সাহিত্য পুরস্কারের পাঁচজনের হ্রস্ব তালিকায় তার নাম ছিল। দুম দুম এদিতোরেস নামের একটি প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশক ও সম্পাদকও লিলিয়ানা।)

//জেডএস//

লাইভ

টপ