আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৮

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১১:৩১, জানুয়ারি ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩১, জানুয়ারি ২৪, ২০১৯

‘সন্ধেবেলা কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শুনে উপবাসী পুরুষদের খিদে আরো বেড়ে যেত। একটা খুন করে এসেছি, আর একটা করতে আপত্তি কি! সকালে দেখা গেল একটি কিশোরের মৃতদেহ পড়ে আছে। ছেলেটি ছিল অনেকেরই রাতের সঙ্গী। সে-রাতে কোনো এক অপরাধীর সাথে রাত কাটাতে রাজী হয়নি সে। তারই শাস্তি মৃত্যু। গুরুদাস খুন হলো। তার নতুন বিয়ে করা বৌ তার অনিচ্ছায় ভাড়া খাটতে গিয়েছিল অন্য এক অপরাধীর ঘরে। রমেশ খুন করেছে তার স্ত্রীকে কারণ, তার চালচলন কুকুরের মতো। জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট মার্ক হেড কোয়ার্টারসে চিঠি লিখলেন—১৯০৪ সাল: There was a horrible state of immorality in the settlements. কড়া হাতে আমি কিছু করতে গেলে ওয়াকারের মতো মার খেয়ে মরতে চলার দাখিল হবে। কারুরই মন টিকছে না এই দ্বীপে। সকলেই পালাতে চায়। পুরনো জীবনে ফিরে যেতে চায়। রক্ত চায়, খুন চায়। এদের শান্ত করার জন্য জাহাজ ভরে মেয়েছেলে পাঠাও। বাংলায় দালাল ঠিক কর—লালা মুন্ডম সিং। উত্তর-পশ্চিম ভারতের জন্য লালা রাম দয়ালকে। মাসে মাসে মাইনে ৫০ টাকা। প্রতি মেয়ে পিছু কমিশন দুই টাকা। ধরে ধরে জাহাজ ভরে মেয়ে পাঠাও। এদের পোড়া শরীরে রক্তের শোরগোল।’

এদের হাতেই তৈরি হয়েছে আজকের আন্দামানস, আইল্যান্ড অব দি মেরিগোল্ড সান। রস আইল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে এভাবেই ভাবছিলাম কীভাবে ঐ ছোট ছোট দ্বীপে ছেড়ে দেয়া কয়েদিদের দিয়ে ধীরে ধীরে আবাদ হলো পোর্টব্লেয়ার আর পরবর্তীকালে গোটা আন্দামান। সেই শুরুর সময়ের সাথে আজকের বাঙাল মুলুকের এই আদনা-আদমির একটাই মিল পাচ্ছিলাম। তারাও সেই ১৮৬০/৭০ সালে রসআইল্যান্ড থেকে মাত্র ১ কিলোমিটারের দূরত্বে পোর্টব্লেয়ারের দিকে তাকিয়ে আজকের আমার মতোই ভাবতো—‘এই এক কিলোমিটার যে কত দূরেরর পথ! স্বাভাবিকভাবে এগোলে পুরো ১০টি বছর লেগে যাবে এই রস আইল্যান্ড থেকে মুক্তি পেয়ে ঐ পোর্টব্লেয়ারের সেলফসাপোর্টার রূপে বাঁচার টিকেট পেতে।’ আর আমার মনে হচ্ছিল আমার পুরো জীবনটায়ই এই ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার সুযোগ হয়তো আর আসবে না। কারণ, আজ যদি আবহাওয়ার এই হাঁচি-কাশির অজুহাতে নৌকা না-ই ছাড়ে, ৩১ তারিখ আমার প্লেন ছাড়া পর্যন্ত আমার আর শিডিউলে আর কোনো একটি ঘণ্টা নেই যা রস আইল্যান্ড আর নর্থ বে আইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য আমি ব্যয় করতে পারি। ফলে এ যাত্রায় রস আইল্যান্ড যাওয়ার সাধ  আর আমার পূরণ হবে না।  আর আন্দামানে এ জীবনে আর দ্বিতীয়বার আসার সুযোগ হবে তেমন ভাবার পক্ষে কোনো যুক্তিও আমার চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটারের চৌহদ্দিতে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই মনের খেদে এমনটা ভেবে শান্তি পাচ্ছিলাম যে, দরকার নেই ঐ পাতকী জায়গায় যাওয়ার। অত্যাচারী ইংরেজ চিফ কমিশনারের পরিত্যক্ত অফিস আর তাদের পরিত্যক্ত রাজধানী দেখতে গিয়ে মীরজাফরের মাজার দেখে তিনবার থুথু দেয়ার সেই নোংরা অনুভব আবার একবার জাগিয়ে তুলে লাভ নেই। এইভাবে প্রবোধ দিয়ে চলে আসলাম রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশের রস আইল্যান্ড যাওয়ার নৌকাঘাট থেকে। এবার আমারা যাবো ফিনিক্স বে। সেখানে হ্যাভলক যাওয়ার জন্য সরকারি শিপে টিকেট পাওয়া যায়। সরকারি শিপে টিকেটের দাম খুব কম।  বেসরকারি শিপের ৫ ভাগের ১ ভাগ।

আমাদের দাদা গোপাল তার পঙ্খীরাজ অটোতে বৃষ্টি-বাদলা ভেদকরে আমাদের নিয়ে গেল ফিনিক্স বে। সেখানে শিপের টিকেট কাটা দেখলাম এক মহাযজ্ঞের বিষয়। প্রথমত প্রতি যাত্রীর একটি করে ফরম পূরণ করতে হবে। সেখানে যাত্রীর পূর্ণাঙ্গ পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর সব লিখে এবং ভ্রমণের তারিখ, শিপের নাম, সিটের ক্লাস সব উল্লেখ করে দীর্ঘ কিউতে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তারপর ঘণ্টা আধেক পরে যখন পূরণকৃত ফরমখানা কাউন্টারের কর্মচারীর নিকট দেয়া হবে তিনি হয়তো বলবেন যে, চাহিত ক্লাসের টিকিট নেই, অন্য ক্লাসের চাইলে পেতে পারেন। তখন যে-ক্লাসের সিটটি পাওয়া যাবে সেটির টিকিট চাইলে বলবে—তাহলে আবার ফরম পূরণ করে আনুন। ফরম পূরণ করে দ্বিতীয়বার ঐভাবে আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে ঐ ক্লাসের সিট আর নেই। তবে পরের দিনের শিপে সিট আছে। পুরোটাই একেবারে সরকারি কায় কারবার।

তবে আমাদের ভাগ্যটা ভালো ছিল। আমরা মিনিট পনেরো দাঁড়িয়ে ফরম দুটো জমা দিতে পারলাম। কাউন্টারের ভদ্রমহিলা বললেন—সিট নেই। অথচ একই তারিখের একই শিপে আমার পরে যিনি দাঁড়িয়ে তিনি যখন সিট পেলেনে এবং টিকেট পেলেন তখন আমি যতখানি সম্ভব রাগতভাবে বললাম—আমাকে কেন ঐ সিট দেয়া হলো না। খুব সংক্ষেপে জবাব পেলাম কারণ আমি ফরেইনার। হায় মালিক, আমাদের মুলুক হলে তো ফরেইনারের সিটটিই আগে হওয়ার কথা। কোলকাতায়ও তো দেখেছি ফরেইন পাসপোর্টের জন্য ট্রেনের সিট আলাদাভাবে থাকে। তো এ কোন ফরেইনে আসলাম রে বাবা!

রেগে মেগে বের হয়ে এসে আমাদের সাক্ষাৎ উদ্ধর-অবতার গোপাল দাদাকে বিষয়টি জানালে সে একগাল হেসে জানালো, এখানে ফরেইনারদের জন্য সরকারিশিপে খুব কম সিট রাখা হয়। ধরেই নেয়া হয় ফরেইনাররা ট্যুরিস্ট, তাদের হাতে অনেক টাকা। তাই তাদের জন্য রয়েছে বেসরকারি শিপে অনেক টাকার টিকেট। এতে দুই দিকে লাভ। সরকারি শিপ কম টাকায় দেশীয় মানুষদের সেবা দিতে পারছে। আবার বেসরকারি শিপে ট্যুরিস্টদের বেশি টাকার টিকেট থেকে বেশি পরিমাণ ট্যাক্স নিয়ে সেই ট্যাক্সের টাকায় দেশীয়দের সেবা দিতে পারছে।  দেশীয়দের এভাবে সেবা দিতে পারছে বলেই তো আন্দামানের স্থানীয় প্রতিটি  মানুষের জন্য সরকার দিচ্ছে রেশন। তারা তেল, চিনি, ডিম, আটা সবকিছু রেশনে কম দামে পায়। সেই ভর্তুকিটা কাউকে না কাউকে তো দিতে হবে। সেই কাউকের মধ্যে অল্প একটু পরিমাণে আমিও আছি—ভেবে খারাপ লাগলো না।

এবার আমাদের ছুটতে হবে বেসরকারি শিপের টিকেটের জন্য। পোর্টব্লেয়ার থেকে হ্যাভলক ও নীল আইল্যান্ড যেতে দুটো বেসরকারি কোম্পানির শিপ আছে। একটি Makruzz, অন্যটি Green Ocean, প্রথমে ম্যাক্রুজে গেলাম। নো টিকেট। মনে হলো হ্যাভলক আমাদের জন্য ‘নো’ হয়ে গেল। দুপুরের খাওয়া দাওয়া ভুলে পড়িমরি করে গেলাম গ্রিন ওশেনের অফিসে। সেখানে কাউন্টারের স্মার্ট ক্যাডেট গার্লটি জানালো একটি টিকেট আছে যাওয়ার, আর দুটো টিকেট আছে আসার। মনে হচ্ছিলো ব্যাপারটা বরিশালের হলে কোনো ভয় ছিলনা। কারণ বরিশালে সুরভী, সুন্দরবন, পারাবত কোনোটির কাউন্টারে বিক্রয়ের জন্য কোনো কেবিন-টিকেট থাকে না। কিন্তু দিন শেষে সকল আকাঙ্ক্ষী যাত্রীই কেবিনে করে ঢাকা রওয়ানা দিতে পারে। বরিশালে মহান আল্লাহ তায়ালা এই বিশেষ সুবিধাটারই ব্যবস্থা করে রেখেছেন ‘দালাল’ নামের এক ধরনের রহমতি পরোপোকারী প্রাণীর মাধ্যমে।

এই দালালদের হাতে কোম্পানীর লোকেরা কেবিনগুলো বিক্রয় করে দেয়। তাতে কোম্পানী পুরো কেবিনের ভাড়া পায় আর লঞ্চ কোম্পানির টিকেট বিক্রয়ের কর্মচারীরা দালালদের কাছে থেকে কিছু উপরি পায়। এর পরে দালালরা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীদের জন্য এভাবে টিকেট নিয়ে অপেক্ষা করে বিধায় যাত্রীরা তাদের  সেই ঘামের দাম প্লাস টিকেটের দাম শোধ করে সন্ধ্যায় আরামসে কেবিনে ঢাকা রওয়ানা দিতে সক্ষম হয়। লঞ্চের টিকেট বিক্রয়ের কর্মচারী, দালাল এবং যাত্রী প্রত্যেকের জন্য বরিশালে ধাপে ধাপে এই যে সুবিধার ব্যবস্থা তা বরিশালের জন্যই খাস, কারণ বরিশাল খোদার এক রহমতি জায়গা।

এই রহমতের মূল কারণ ছোটবেলা থেকেই মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে আছে। সেই কারণ হলো, এটা রসুলুল্লাহর (স.) উপঢৌকন দেয়া একটি বিশেষ জায়গা। হযরত ফাতিমার বিয়েতে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর জামাতা হযরত আলীকে উপঢৌকন হিসেবে মালামাল আর যা দিয়েছেন তো দিয়েছেন, সাথে সহায়-সম্পত্তি হিসেবে দিয়েছিলেন আমাদের বরিশাল জেলাকে। লাঙ্গল-জোয়াল-গরুতে অভ্যস্ত ছিলেন না বলে এই পানির দেশের জমির পত্তনি নিতে আলীর কখনো আসা হয়নি। কিন্তু তাই বলে আল্লাহ তো আর ভোলেননি যে জমিটা তার দোস্তের জামাইর। তাইতো অনেক রহমত আর শান্তির স্থান এই বরিশাল। ঝড়ঝাপ্টা-বন্যায় সারা দুনিয়া ওলটপালট হলেও এখানে কিছু হয় না। ফলে এখানে লঞ্চের টিকেট কাটতে যে সুবিধা পাওয়া যাবে তা আন্দামানে পাওয়ার কথা ভাবাই তো গুনাহ।  তাই সাহস করে টিকেট বিক্রির কোনো দালালের খোঁজ পাওয়া যাবে কি না এমন সওয়াল আমাদের গোপাল দাদাকে এতক্ষণে আমি করতে সাহস পাইনি।

আমাদের সওয়াল ছাড়াই গোপাল এবার উত্তর দিতে শুরু করলো। গ্রিন ওশেন সিওয়েজ প্রা. লি. এর জংলিঘাটের অফিস ছেড়ে বের হয়েই গোপাল তার তিন চাকার পঙ্খীরাজ খানা ছোটালো অলিগলি ধরে যেন সত্যিকার কোনো জঙ্গলের ঘাটের দিকে। বার দুই পাহাড় বেয়ে উঠে নেমে এক মসজিদের পাশে গিয়ে সে তার পঙ্খীরাজখানা থামালো। আমার চিন্তা হলো, গোপাল এবার না বলে ‘যাও বাপুরা, চেষ্টা-তদবির যা হাতে ছিল তাতো সবই করেছি এবার এই মসজিদে সেজদায় পড়ে আল্লাহ মালিকের কাছে গিয়ে বল, দেখ সেই রিয়াল মালিক তোমাদের হ্যাভলকের টিকেট দুখানা জোগাড় করে দেয় কি না’।  কিন্তু না, গোপাল আমাদেরকে মসজিদে ঢোকালো না, বরং মসজিদের পাশ ধরে চললো ছোট একটি অফিস ঘরের দিকে। ঘরটির সামনে সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘মুসাফির হলিডেজ’। সেখানে গোপালজি পুরা মুসলমানি কায়দায় লম্বা একখানা সালাম ঠুকলো, সাথে দুইখানা টিকেট দিতেই হবে মর্মে জোর দাবি জানালো। মুসফির হলিডেজ গোপালজির সে দাবি অগ্রাহ্য করতে পারলোনা। 

মিলে গেল আমাদের হ্যাভলক যাওয়ার ছাড়পত্র। ভাড়া নিলো আসা যাওয়ার সব মিলিয়ে সাড়ে চার হাজার রুপির মতো।  সরকারিটায় যেতে পারলে সব মিলিয়ে এক হাজার রুপিরও কম লাগতো। তার চেয়েও মজার ব্যাপার হলো ৬৯ কিলোমিটার পথ পানির জাহাজে যেতে একজনের টিকেট খরচ গেল ২২০০/২৩০০ রুপি। আর কোলকাতা থেকে পোর্টব্লেয়ার ১৩০২ কিলোমিটার পথ হাওয়াই জাহাজে যেতে আমাদের এক একজনের খরচ হয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন হাজার রুপি। ছোট বেলায় গল্পে শুনেছিলাম কোনো দেশে দুধের চেয়ে ঘিয়ের দাম কম দেখলে বুঝতে হবে সে দেশে বিচার আচার নাই। যদি দুধের চেয়ে ঘিয়ের দাম কম হলে দেশটি অরাজকের দেশ বলে সাব্যস্ত হয়, তাহলে পানির জাহাজের চেয়ে হাওয়াই জাহাজের ভাড়া কম হলে দেশটি অরাজকের দেশ না হয়ে পারে কেমনে একথা বোঝার মতো ঘিলু আমার মাথা বারকয়েক ঝাঁকিয়েও আমি খুঁজে পেলাম না।

যাই হোক শরীরে মনে আনন্দ ধরলে তা বুঝতে যেহেতু বুদ্ধির দরকার হয় না সেহেতু উপরোক্ত পরিমাণ বুদ্ধি ছাড়াই আমি বুঝতে পারছিলামযে টিকেট পেয়ে শরীরে মনে যথেষ্ট আনন্দ ধরেছিল।  সেই আনন্দ নিয়ে হোটেল গুরু ইন্টারন্যাশনালের দিকে ছুটলাম। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। গোপালকে বললাম, টিকেট তো হলো, এবার চলো দাদা, এক জায়গায় গিয়ে দুটো ডালভাত মুখে দেই। গোপাল খুশি মনে চললো। সে জানে আমরা ডাল-আলুভর্তার দেশের মানুষ।  খাস বাংলায় লেখা সাইনবোর্ডের এমন এক ডাল-আলুভর্তার দোকানেই আমাদের সে হাজির করলো। দেখলাম দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও সেখানে দুপুরের খাবারের খদ্দেরে এখনও দোকান ভরা। সবাই বাংলায় খাচ্ছে, বাংলায় কথা বলছে আর বাঙালিদের গোষ্ঠী উদ্ধার করছে। এমন দৃশ্য বাঙালিদের ছাড়া আর কোথাও সম্ভব হয় কি না জানি না। আমরাও বাঙালি। আমারাও বাঙলায় কথা তোলার একশো পারসেন্ট হক আছে। অথচ, আমরা কথা বলার শুরুতেই টের পেলাম আমাদেরকে কেউ দলে নিচ্ছে না। কারণ, হয়তো বাক্যেই টের পাওয়া যাচ্ছে আমরা পূর্ববঙ্গের শেখ বা মিয়া গোষ্ঠীর বাঙাল যাদেরকে আদত আঙালিরা বাঙাল ভাবতে একটু একটু ঘিন বোধ করে। যাক, সে নিয়ে আমরা ভাবিত হলাম না। আমাদের গোপালজি আমাদের সব ভালবাসার নিরংকুশ আধার। অথচ তাকে আমরা অনেক পীড়াপীড়ি করলাম আমাদের ট্রিট হিসেবে লাঞ্চটি আমাদের সাথে করতে। সে কোনোভাবেই রাজি হলো না। তার বাসা সেখান থেকে খুবই কাছে। বাসায় খেয়ে সে ফেরত আসবে আমাদের হোটেলে গুরু ইন্টারন্যাশনালে। সন্ধ্যায় আমাদেরকে  করবিনস কোভ বিচ, জগারস পার্ক ও গান্ধী পার্ক দেখাবে।

কোরবিনস কোভ বিচ দেখে মনে হলো সাগর আন্দামানের মানুষদেরকে একটা বিচ বা সৈকত দেয়ার কথা বলে স্রেফ একটা মশকরা করেছে। আমরা যারা কুয়াকাটায়, কক্সবাজার বা কটকার সমুদ্র সৈকত চিনি তারা কোনোভাবেই স্বীকার করবে না যে এটাও একটা সমুদ্র সৈকত। এই মসকরায় যোগ না দিয়ে তাই তাড়াতাড়ি জগারস পার্কের দিকে রওয়ানা হলাম। প্রথমে মনে করেছিলাম জগার কোনো ইংরেজ সাহেব-টাহেব হবেন যার নামে এই পার্ক। পরে দেখলাম জগার পার্কের ‘জগার’ একেবারেই এক নিরীহ কমন নাউন Jogger । এখানে মানুষ জগিংয়ে আসে বলে পার্কের নাম জগারস পার্ক (Jogger’s park)

আমি বা শামীম রেজা কোনো জগিংয়ের লোক নেই বলে এখানে শান্তি পেলাম না। তবে শান্তির দৃশ্যটি ছিল এই যে, পাহাড়ের উঁচুতে স্থাপিত এই পার্ক থেকে নিচে বিমানবন্দর দেখা যাচ্ছিলো। এখান থেকে আবার একবার দেখলাম কীভাবে রানওয়ে ক্রস করে একের পর এক বাস ও ট্রাক পার হচ্ছে। সেই দৃশ্যও আমাদের বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না। চলে এলাম গান্ধী পার্ক। সেখানে গোপাল আমাদেরকে আজকের মতো বিদায় জানালো। দিন শেষে সে যে ভাড়া দাবি করলো আমরা তার সাথে আরো একশো টাকা বাড়তি দিয়েও ভাবলাম বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমরা অন্তত পাঁচশো টাকা জিতেছি। মনে মনে ভাবছিলাম গোপালকে যদি বাংলাদেশে ধরে নিয়ে আসতে পারতাম তাহলে সিএনজি রিক্সার ভাড়া দিতে গিয়ে কোনো দিন ঠকতে হতো না।

পরের দিন ২০/৮/২০১৮ তারিখ পোর্টব্লেয়ারের হাড্ডোহোয়ার্ফ থেকে গ্রিন ওশেন নামক বিখ্যাত বোট বা জাহাজ নামক বস্তুতে চড়ে আমরা রওয়ানা হলাম হ্যাভলক আইল্যান্ড। হাড্ডো জেটিটা আর্ন্তজাতিক জাহাজ জেটি, বড় বড় ইমিগ্রেশন কাউন্টার দেখে তাই মনে হলো। জেটিটা  লম্বায়ও অনেক। সেই বিশাল জেটিতে আমাদের পুচকে জাহাজখানাকে বাংলাদেশের ‘কাডামি নাও’য়ের চেয়েও অনেক ছোট মনে হচ্ছিল। জাহাজ না বলে বোট বলাই ভালো। সব মিলিয়ে আড়াই-তিনশো যাত্রী। সবচেয়ে কম টাকার টিকেট নিচ তলায়। সেখানে পোর্টহোলগুলো পানির নিচে। মধ্যম ক্লাস দোতলায়। আর তিন তলায় রয়াল ক্লাস। আমাদের একখানা টিকেট রয়্যাল ক্লাসের হওয়ায় আমরা পালা করে এক একজন রয়্যাল ক্লাসে বসে দেখে নেয়ার চেষ্টা করলাম রাজা-রাজা ভাব আসে কি না। কিন্তু খুব সুবিধা লাগলো না।

এদিকে সুবিধা লাগার একটি আয়োজন টের পাওয়া যাচ্ছিল। তিন তলায় রয়াল ক্লাসের সামনে বক্সিংয়ের রিং-এর মতো চারপাশ দড়ি দিয়ে ঘেরা একটি খালি জায়গা। এতক্ষণ বুঝতে পারিনি এখানে কী হয়।  এদিকে জোর আওয়াজে হিন্দি গানের কঠিন ড্রাম বিটের নাচের গান বাজতে শুরু করেছে। প্রথমে দেখলাম দুটি ছেলে সেই রিং এর মধ্যে ঢুকলো। চতুর্দিক থেকে তালি বাজলো। নাচের গানের বিট আরো যেন বড় হয়ে উঠলো। ছেলেদুটো গানের তালে নাচতে শুরু করেছে।  ওদিকে বেশ জোরালো ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নাচছে আমাদের পুরো বোটখানা। তার মধ্যেই রিং-এর মধ্যে ঢুকলো মধ্য বয়সী এক মহিলা। ওজন ৭০  কেজির কম হবে না।  সেই মহিলাকে অমন লাফাতে থাকা বোটের পিঠের উপরে অমন ব্যালেন্স নিয়ে নাচতে দেখে মনে হচ্ছিল মহিলা ছোটবেলায় অবশ্যই আমাদের লক্ষণ দাসের সার্কাসে দড়ির উপরে হাঁটার খেলা দেখিয়েছে অন্তত তিনশো রাত।  আমার এই তাক লাগাকে ভ্রূকুটি দেখিয়ে রিং-এ ঢুকলো একেবারে এক সুন্দরী ষোড়শী। এবারে বোটের দোতলা, নিচতলা সব যেন তাদের জঠরের সব মানুষ উগরে দিলো রিং-এর চার পাশটায়। চলবে

আরো পড়ুন : কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৭

//জেডএস//

লাইভ

টপ