জীবনানন্দের পত্রালাপ : কবি ও ব্যক্তিমানুষের টানাপোড়েন

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১০:০০, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০০, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৯

জীবনানন্দের মৃত্যুসংবাদটি কলকাতার তৎকালীন একটি নামকরা পত্রিকার ভেতরের পৃষ্ঠায় জায়গা পায় এবং সংবাদটিতে ছিল একাধিক ভুল। যেমন, লেখা হয়েছে ‘গত বৃহস্পতিবার দেশপ্রিয় পার্কের নিকটে ট্রামের ধাক্কায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং শুক্রবার রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটের সময় তাঁর মৃত্যু হয়।’

বস্তুত জীবনানন্দ ট্রামের ধাক্কায় আহত হয়েছিলেন তার আগের বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায়। দ্বিতীয়ত, ১৪ অক্টোবর আহত হওয়ার পর এ সম্পর্কিত কোনো খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। মাঝখানে ৮দিন যে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করলেন বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের একজন—সেই খবরের কোনো গুরুত্ব তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের কাছে ছিল না। কারণ জীবদ্দশায় জীবনানন্দ ওই অর্থে খুব খ্যাতিমান কেউ ছিলেন না। ছিলেন না বলেই মৃত্যুর পরে তার কলেজের নামও ভুল ছাপা হয়। লেখা হয়, মৃত্যুকালে তিনি হাওড়ায় নরসিংহ দত্ত কলেজে অধ্যাপনা করতেন। আসলে মৃত্যুকালে তিনি অধ্যাপনা করতেন হাওড়া গার্লস কলেজ। এই সংবাদে আরও একটি ভুল ছিল। তারা লিখেছে, তিনি স্ত্রী ও এক কন্যা রেখে গেছেন। অথচ তখন তার এক পুত্র এবং এক কন্যা ছিল।

গোপালচন্দ্র রায় (জীবনানন্দের সঙ্গে, দেবকুমার বসু সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ স্মৃতি’) এই ঘটনাটি লিখে নিজের আক্ষেপ ঝেড়েছেন এই বলে যে, আমি যে কাগজে জীবনানন্দের মৃত্যু সংবাদ পড়ি সেটা একটা অতি বিখ্যাত বাংলা দৈনিক পত্রিকা। তখন আমি ঐ কাগজটাই শুধু পড়তাম। তাই জীবনানন্দের বাড়িতে ঐ সময় না যাওয়ায় তাঁর ঐ সময়কার কোনো সংবাদই জানতে পারিনি। যদি জানতে পারতাম, তাহলে নিশ্চয়ই হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যেতাম।’

এই গল্পটি বলার কারণ, যে কবির মৃত্যুর পরে তার মৃত্যুসংবাদটি পত্রিকার নিদেনপক্ষে পেছনের পৃষ্ঠায়ও জায়গা পায়নি এবং সেই সংবাদে একাধিক ভুল তথ্য—মৃত্যুপরবর্তী সেই কবিরই ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা এবং যাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে অজস্র গবেষণা। মূলত মৃত্যুর পরেই আবিষ্কৃত হতে থাকে তার সোনার খনি। সেই খনির ভেতরে রাশি রাশি কবিতা, উপন্যাস, গল্প, গান এবং বেশ কিছু চিঠি।

বিখ্যাত লেখকদের ডায়েরি ও চিঠির প্রতি পাঠকের আলাদা আকর্ষণের বড় কারণ, এইসব ডায়েরি ও চিঠির মধ্য দিয়ে লেখকের ব্যক্তিসত্ত্বা, ব্যক্তিজীবন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, জীবনবোধ ও ভাবনা—যেগুলো অনেক সময় তার কবিতা-গল্প-উপন্যাসে নাও আসতে পারে বা এলেও সেখানে বিমূর্ততা স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত ডায়েরি বা চিঠিতে সেই দেয়ালটুকু থাকে না। বরং চিঠির ভেতর দিয়ে লেখকের নিজস্বতা তথা ব্যক্তিমানুষকে জানবার সুযোগ ঘটে।

জীবনানন্দের মৃত্যুর পরেও যখন তার সোনার খনিতে অব্যাহতভাবে খননকাজ চলেছে, তাতে বিচ্ছিন্নভাবে এমন সব চিঠিপত্রের হদিশ মিলেছে যা তার সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে কর্মহীন জীবনের টানাপোড়েন, জন্মস্থান বরিশালের প্রতি ভালোবাসা, বিরক্তি কিংবা ফিরতে চাওয়ার ব্যাকুলতা থেকে শুরু করে ছাত্রজীবনের নানা ঘটনাবলি; প্রিয়জনের সঙ্গে কষ্টের ভাগাভাগি—এসব খুব সরল ও নির্মোহভাবে প্রকাশ করেছেন ব্যক্তি জীবনানন্দ—যেখান থেকে কবি জীবনানন্দকে ঠিক বিচ্ছিন্ন করা চলে না।

এ যাবৎকাল তার যতগুলো চিঠি আবিষ্কৃত বা উদ্ধার হয়েছে, সংখ্যার বিচারে তা খুব বেশি নয়। আবার অনেককে চিঠি লেখার যে ফ্রিকোয়েন্সি, তাতে মনে হয় তিনি প্রচুর চিঠি লিখতেন। ফলে এ ব্যাপারে এখন এই উপসংহারে পৌঁছানোই সঙ্গত যে, আবিষ্কৃত চিঠির বাইরেও আরও অজস্র চিঠি আমরা হারিয়েছি। যাদেরকে লিখেছিলেন তারা হারিয়েছেন। অনেকে হয়তো সংরক্ষণের প্রয়োজনই বোধ করেননি। আজকের দিনে জীবনানন্দ কাউকে এক লাইনের একটি চিঠি লিখলেও তিনি সেটি সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতেন। কিন্তু যে সময়ে তিনি বেঁচে ছিলেন এবং যেরকম দীনতার ভেতরে দিনাতিপাত করেছেন, সেরকম একজন ব্যক্তির কিংবা কবির চিঠিপত্র সযত্নে সংরক্ষণ করার তাগিদ যে অনেকেই অনুভব করবেন না, সেটিই বরং স্বাভাবিক। যে বাস্তবতায় মৃত্যুর পরেও ভুল সংবাদ শিরোনাম হতে হয়েছিল। অথচ আজকের দিনে এসে অতি সাধারণ ভাষায় ও শব্দে লিখিত তার চিঠিপত্রগুলো আমাদের কাছে সোনার চেয়েও দামি।

নানা জায়গায় চেষ্টা-তদবির চালিয়ে এ যাবৎ সাকুল্যে ১৩১টি চিঠি উদ্ধার করা গেছে এবং জীবনানন্দের জীবনীকার প্রভাতকুমার দাস এই চিঠিগুলোর একটি সংকলন করেছেন, যার নাম দিয়েছেন, পত্রালাপ জীবনানন্দ দাশ। প্রকাশ করেছে কলকাতার ‘এবং মুশায়েরা’। এর মধ্যে ১১৭টি জীবনানন্দ লিখেছেন এবং বাকি ১৪টি জীবনান্দকে লেখা।  ৩২০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে প্রভাতকুমার একটি দীর্ঘ ভূমিকা এবং বেশ কিছু টিকা লিখেছেন। জীবনানন্দের লেখা এবং জীবনানন্দকে লেখা কয়েকটি চিঠির হাতেলেখা কপিও এই বইয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। সেইসাখে জীবনানন্দের কয়েকটি ছবিও রয়েছে যেগুলো সচরাচর দেখা যায় না।

জীবনানন্দের পত্রপ্রাপকদের মধ্যে আছেন তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ, মেয়ে মঞ্জুশ্রী দাশ, বোন সুচরিতা দাশ, ভাই অশোকানন্দের স্ত্রী নলিনী চক্রবর্তী, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দের আবিষ্কারক বুদ্ধদেব বসু, সুহৃদ সঞ্জয় ভট্টাচার্য, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ।

মাকে লেখা মাত্র দুটি চিঠির হদিস পাওয়া যায়। যেগুলো লিখেছিলেন কলকাতার হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে থাকার সময়। অর্থাৎ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তেন (আইন পড়া শেষ করেননি। তিনি মূলত ইংরেজিতে এম.এ. করেন। আইন নিয়েছিলেন হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেতে। কারণ এই হোস্টেলটি ছিল আইনের ছাত্রদের আবাসিক হল)।

জীবনান্দকে লেখা চিঠির প্রেরকদের মধ্যে আছেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম চৌধুরী, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, ধূর্জ্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, অশোককুমার মিত্র, প্রভাকর সেন, সিগনেট প্রেসের মালিক দিলীপকুমার গুপ্ত। কিন্তু জীবনানন্দ ছাত্রাবস্থায় যখন কলকাতায় থাকতেন, তখন বরিশাল থেকে নিশ্চয়ই তার বাবা-মাও তাকে অনেক চিঠি লিখেছেন। কিন্তু সেসব চিঠির কিছু আর উদ্ধার করা যায়নি। আবার যাদের সাথে তিনি অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন, যেমন বোন সুচরিতা, ভাই অশোকানন্দ, ভূমেন্দ্র গুহ, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অরবিন্দ গুহ, শামসুদ্দিন আবুল কালাম—এই মানুষগুলোরও কোনো চিঠি পাওয়া যায় না। তারা কি জীবনান্দকে কোনো চিঠি লেখেননি? নিশ্চয়ই লিখেছেন। বিশেষ করে চাকরিসূত্রে বন্ধুপ্রতিম ছোটভাই অশোকানন্দ যখন ভারতের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, এবং যে সময়ে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ছিল না, সেই সময়ে তিনি বড় ভাইকে যে অসংখ্য লিখেছেন, তাতে আর সন্দেহ কী? কিন্তু জীবনানন্দ নিজেই হয়তো এসব চিঠি সংরক্ষণ করেননি। অথবা হারিয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা মৃত্যুর পরে আর সেগুলোর সন্ধান মেলেনি।

তারপরও ১৩১টি চিঠির এই সংকলনটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যক্তি জীবনানন্দকে বোঝার জন্য। এটা ঠিক, তিনি তার উপন্যাসে যেসব ঘটনা ও চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন, তার সবই তার ব্যক্তিজীবন, কিন্তু তারপরও সেগুলো গল্পই। চিঠি কোনো গল্প নয়। এগুলো সত্যভাষণ। নিজের সমস্যা ও ভাবনার কথা তিনি প্রিয়জনদের সাথে বিনিময় করেছেন একেবারে অকপটে। নিজের দীনতার কথা প্রকাশে বিন্দুমাত্র সঙ্কোচবোধ করেননি। করেননি এ কারণে যে, তিনি মানুষকে বিশ্বাস করতেন। হাতেগোনা যে সামান্য সংখ্যক মানুষের সাথে মিশতেন, তাদের সঙ্গে নিজের সমস্যার কথা লিখতে তিনি রাখঢাক করেননি। কারণ তিনি সমস্যাগুলোর সমাধান চেয়েছেন।

কবিতার মতো চিঠি লেখার ব্যাপারেও তিনি খুব সাবধানী বা খুতখুতে ছিলেন। যে কারণে ছোট বড় সব চিঠিরই খসড়া করে নিতেন। পরে ফাইনাল করে পাঠাতেন। উদ্ধারকৃত বা আবিষ্কৃত চিঠিগুলোর বেশ কয়েকটা এরকম খসড়া। অর্থাৎ শেষতক জীবনানন্দ হয়তো চিঠিগুলো পোস্ট করেননি।

প্রভাতকুমারের ভাষায়, ‘তাঁর চিঠি লেখার ধরন দেখলে বোঝা যায়, নিজেকে তিনি নিছক ‘অলস’ কিংবা ‘ভালো চিঠি লিখিয়ে’ নন ভাবতেন না কেনো, তার যথেষ্ট কারণ আছে। সাহিত্যরচনার মতো পত্ররচনাকেও তিনি যথেষ্ট অভিনিবেশযোগ্য মনে করতেন। যেজন্য অনেক ক্ষেত্রেই পত্র পাঠানোর পূর্বে প্রাথমিক একটা খসড়া করে নিতেন। তাছাড়া সংসারের মোটা লেনদেন-এর সঙ্গে সম্পর্কিত চিঠি লিখতে হলেও প্রধানত সেই লেনদেন-এর থেকে দূরে দাঁড়িয়েও বেশ কিছু উত্তর লিখেছেন, যেগুলি তিনি এক শুদ্ধ চৈতন্যের জিনিস বলে মনে করতেন।’

বেশির ভাগ চিঠি তিনি লিখতেন সংক্ষিপ্ত, পোস্টকার্ডে, এবং সাধারণত প্রাপ্ত পত্রের উত্তর হিসেবে। আবার সেসব চিঠির ভেতরে নিজের মানসিক পরিস্থিতি, কর্মহীন বেকার জীবনের গ্লানি, নতুন কাজের সন্ধানে প্রিয়জনের কাছে বুদ্ধিপরামর্শ চাওয়া, কখনো মান-অভিমানের প্রসঙ্গও ছিল।

‘ময়ূখ’ জীবনানন্দ স্মৃতি সংখ্যায় সঞ্জয় ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘চিঠিপত্রে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ছিলেন তিনি (জীবনানন্দ দাশ)। তাঁর চিঠি পেলে মনে হত, সব সময় তিনি কবিতার কথা ভাবেন। এমন তো কেউ ভাবে না—রবীন্দ্রনাথেরও অন্যান্য ভাবনা আছে—কিন্তু কবিতার দুর্ভাবনা ছাড়া কি এই ব্যক্তিটির (জীবনানন্দ) ভাববার মতো আর কিছু নেই। ভাবতাম, জীবনানন্দের চিঠি পড়তে পড়তে। কাব্যময় চিঠি নয়—কবিতা বস্তুটির জন্যে চিন্তা আর উৎকণ্ঠা থাকত তাঁরই চিঠিতে।’

জীবনানন্দের এই চিঠিগুলো এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, বরিশাল ও কলকাতার যেসব স্থানে তিনি থেকেছেন, সেই জায়গাগুলো সম্পর্কে পাঠকের একটা পরিষ্কার ধারণা হয়। যেমন বরিশাল থেকে পাঠানো চিঠিতে কেবল তার বাড়ির ঠিকানা বগুড়া রোডের সর্বানন্দ ভবন উল্লেখ থাকলেও কলকাতায় বসে পাঠানো চিঠিগুলোর ঠিকানায় রয়েছে হার্ডিঞ্জ হোস্টেল, ৬৬ হ্যারিসন রোড (প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং), ১৮/২/এ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট (সিটি কলেজে অধ্যাপনার সময় কিছুদিন এই ঠিকানায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ভাই অশোকানন্দও এখানে থাকতেন। মাঝেমধ্যে মা কুসুমকুমারী এসে এখানে ছেলেদের সাথে থেকেছেন)।

তার আবিষ্কৃত চিঠিগুলোর অধিকাংশ দক্ষিণ কলকাতার কালিঘাট এলাকায় ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের (এখন শরৎ বোস রোড) বাসায় বসে লেখা। এই বাড়ি নিয়ে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাড়ির কাছেই রাসবিহারী এভিনিউয়ে রাস্তা পার হবার সময় অন্যমনস্ক থাকার কারণে তিনি যে ট্রামের মতো অতি ধীর একটি বাহনের নিচে পড়ে গিয়েছিলেন, তার নেপথ্যেও বাড়ির এই দুশ্চিন্তাকে দায়ী করা হয়। তিনি এই বাসায় ভাড়াটিয়া ছিলেন। আর্থিক সংকট কাটাতে একজনকে সাবলেট (উপভাড়াটিয়া) দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সাবলেট নেয়া নারীর অত্যাচারের কথা তিনি বিভিন্ন জনকে জানিয়েছেন। এমনকি কীভাবে তাকে উৎখাত করা যায়, সেই পরামর্শের জন্য একজন আইনজীবীর কাছেও গিয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালের ১৪ আগস্ট সুরজিৎ দাশগুপ্তকে লেখেন—‘এ বাড়ি যত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে পারা যায় ততই ভালো। কিন্তু ঠিকমতন বাড়ি পাচ্ছি না কোথাও।’

এসব চিঠিতে জীবনানন্দের জন্মশহর বরিশাল সম্পর্কে তার আবেগ এবং কখনো কখনো কিছুটা বিরক্তির কথাও ফুটে ওঠে। ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে বলছেন, ‘কলকাতায় থাকলে পাঁচ মিনিটে যে জিনিষ পাওয়া যেত এখানে (বরিশাল) তা পেতে এক সপ্তাহেরও বেশি লেগে গেল। মফস্বলের এই শহরগুলো এখনও নানা দিক দিয়ে Intellectually backward হয়ে আছে। এখানে Culture  জিনিষটা একরকম নেই বল্লেই হয়। সাহিত্যসৃষ্টি তো দূরের কথা, সাহিত্যচর্চাও খুব কম লোকই করে। সেই জন্যেই কলকাতায় কোনো কাজ নিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে, এই আবহাওয়ার ভিতর মন আর টিকে থাকতেই চায় না।’

তিনি বিশ্বাস করতেন, কলকাতার অলিগলি মানুষের শ্বাসরোধ করে বটে, কিন্তু কলকাতার ব্যবহারিক জীবনে একটা প্রান্তরের মতো মুক্তি পাওয়া যায়; এখন যখন জীবনে কর্মবহুলতার ঢের প্রয়োজন, কলকাতার এই স্বচ্ছন্দ পটভূমির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা চলে না আর।

চাকরি-বাকরি বিশেষ করে শিক্ষকতা নিয়েও তার যে অসন্তুষ্টি ছিল, সেটিও ফুটে ওঠে তার কোনো কোনো চিঠিতে। বরিশাল থেকে ১৯৪২ সালের ৩১ অক্টোবর নলিনী চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘অধ্যাপনা জিনিষটা কোনো দিনই আমার তেমন ভালো লাগেনি। যে সব জিনিষ যাদের কাছে যে রকমভাবে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তাতে আমার বিশেষ আস্থা নেই। এই কাজে মন তেমন লাগে না, তবু সময় বিশেষে অন্য কোনো কোনো প্রেরণার চেয়ে বেশী জাগে তা স্বীকার করি।’

তবে শুধু ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের গল্পই নয়, এসব চিঠিতে কখনো কখনো নিজের জীবনবোধ ও সাহিত্যসম্পর্কিত আলোচনাও তিনি করেছেন। বরিশালের সর্বানন্দ ভবন থেকে ১৯৪৩ সালের ৩০ অক্টোবর সিগনেট প্রেসের মালিক দিলীপকুমার গুপ্তকে লেখা চিঠিতে বলছেন, ‘আমাদের এই পৃথিবীর ভিতরেই আরো অনেক পৃথিবী রয়েছে যেন; সাধারণ চোখ দিয়ে স্বভাবত তা খুঁজে পাওয়া যাবে এমন নয়; থাকে তা সৃষ্টিপরায়ণ মানসের ভিতর; এরাই আমাদের দেখান।’

কবিতা সম্পর্কেও নিজের ভাবনা ফুটে ওঠে ১৯৪৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রভাকর সেনকে লেখা এক চিঠিতে—‘ভালো কবিতা লেখা অল্প কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার নয়; কবিতাটিকে প্রকৃতিস্থ করে তুলতে সময় লাগে। কোনো কোনো সময় কাঠামোটি, এমন কি প্রায় সম্পূর্ণ কবিতাটিও খুব তাড়াতাড়ি সৃষ্টিলোকী হয়ে ওঠে। কিন্তু তারপর—প্রথম লিখবার সময় যেমন ছিল তার চেয়ে বেশি স্পষ্টভাবে—চারদিককার প্রতিবেশচেতনা নিয়ে শুদ্ধ তর্কের আবির্ভাবে কবিতাটি আরো সত্য হয়ে উঠতে চায়।’

চিঠি নিয়ে তার ব্যক্তিগত আবেগও ছিল। তিনি যে চিঠি লিখতে এবং পেতে ভালোবাসতেন তা জানা যাচ্ছে ১৯৪৯ সালের ১৪ জুন ল্যান্সডাউন রোডের বাসায় বসে লেখা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লেখা এক চিঠিতে—‘তোমাকে চিঠি লিখতে লিখতে আমার বরিশালের সেই সব দিনের কথা মনে পড়ছে, যখন তোমাদের একটা পর একটা চিঠি আসত, উত্তর দিতাম, প্রত্যাশা করতাম। তখনকার দিনের বরিশাল আজকের চেয়ে প্রায় সব দিক দিয়ে ভালো ছিল।’ এই চিঠিতেই তিনি জীবিকার তাড়নায় এখানে-ওখানে ঘুরে ক্লান্তি নিয়ে আক্ষেপের সুরে বলছেন, ‘সব ছেড়ে দিয়ে শুধু লিখে যেতে পারলে ভালো হত।’

চিঠিকেও যে তিনি সাহিত্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, তার প্রমাণ ১৯৪৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রভাকর সেনকে লেখা একটি চিঠি—‘যে সব চিঠি নেহাত লোকাচারের ব্যাপার তাদের উত্তর আমি যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দিই। কিন্তু যেগুলি মনস্পর্শিতার জন্য বিখ্যাত—যেমন আপনারটি—সে সবের উত্তর দিতে মাঝে মাঝে আমার খুব দেরি হয়ে যায়।’

একসময় নানা কারণে জন্মস্থান বরিশাল ছাড়ার জন্য ব্যাকুল হলেও শেষদিকে এসে সেই প্রিয় মাতৃভূমিতে ফেরার তাড়নাও যে তার মধ্যে তীব্র হয়, সেটিও বিভিন্ন চিঠিপত্রে স্পষ্ট। তিনি যখন (১৯৪৬) শেষবারের মতো বরিশাল ছেড়ে কলকাতায় যান, তখন পর্যন্ত দেশভাগ হয়নি। ফলে পাসপোর্ট ভিসারও প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু ১৯৪৭-এ দেশভাগের পরে তিনি আর তৎকালীন পূর্ববাংলায় ফিরে আসেননি। এ প্রসঙ্গে মৃত্যুর আগের বছর ১৯৫৩ সালের ২৩ এপ্রিল কায়সুল হককে লেখা এক চিঠিতে নিজের সেই ব্যাকুলতার কথা জানান—‘আমি বড্ড অলস, শরীরও অসুস্থ, মনও নানা কারণে ভেঙে পড়ছে। পূর্ব পাকিস্তান নিজের জন্মস্থান; সেখানে যেতে আমি অনেকদিন থেকেই ব্যাকুল; কিন্তু পাসপোর্ট ইত্যাদি কবে যোগাড় করে উঠতে পারব বলতে পারছি না।’

চিঠিতে চাকরিহীন জীবনে পরিচিতজনদের কাছে বিশেষ করে প্রমথ চৌধুরী, অনিল বিশ্বাস, হরপ্রসাদ মিত্র—প্রমূখের কাছে এ বিষয়ে বুদ্ধিপরামর্শ চেয়েছেন। ১৯৫১ সালের ২৩ নভেম্বর অনিল বিশ্বাসকে লেখেন, ‘আমি আজকাল বড্ড মুস্কিলের ভিতর আছি, কাজ খুঁজছি, কলকাতায় কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি কিছু করতে পারেন? কালকের কাগজে দেখলাম Jangipur College এ (Murshidabad) একজন ইংরেজির লেকচারার চায়। আমার বর্ত্তমান অবস্থা এমন হয়েছে যে ও সব জায়গায় এ ধরনের কাজেও যেতে দ্বিধা করলে চলবে না।’ দেখা যাচ্ছে, ১৯৫১ সালে অর্থাৎ বায়ান্ন বছর বয়সী একজন অধ্যাপক একটি অখ্যাত কলেজের লেকচারার পদে চাকরি পেতেও তিনি প্রস্তুত। এসব চিঠিতে তার আর্থিক দীনতা খুব স্পষ্ট।

জীবনানন্দের যেসব চিঠি আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা চিঠিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বাংলা ১৩৩৫ সালের ৩ পৌষ ৬৬ হ্যারিসন রোডে বসে রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠি জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। কেননা চিঠিটি আবিষ্কৃত হলেও এটি রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালায় নেই। ফলে প্রভাতকুমার দাস ধারণা করছেন, ভুলে হয়তো চিঠিটি তিনি (জীবনানন্দ) ডাকে দেননি। তাছাড়া চিঠির পরিপাটি চেহারা দেখলে এই মন্তব্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালকের একটি কপি জীবনানন্দ পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। সেই বই পড়ে তিনি জীবনানন্দকে একটি ছোট চিঠি লিখেছিলেন। বাংলা ১৩৩৫ সালে লেখা ওই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন—‘তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহ মাত্র নেই। কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারি নে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদীকে পরিহাসিত করে।’ এরপর ধূসর পাণ্ডুলিপি পড়ে রবীন্দ্রনাথ আরেকটি চিঠি দেন মাত্র দুই লাইনে। শান্তিনিকেতন থেকে লেখা ওই চিঠিতে কবিগুরু লেখেন—‘তোমার কবিতা পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।’ দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথে এ দুই চিঠির সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জীবনানন্দের কবিতার বাঁক বদলের ইঙ্গিত বেশ স্পষ্ট। কেননা, প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালকে তার যে নজরুলীয় ভাষা ও ঢং, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপিতে তা থেকে বেরিয়ে একেবারে নিজস্ব ভাষা ও ঢংয়ে আবির্ভূত হন তিনি। রবীন্দ্রনাথ মাত্র তিনটি শব্দে বলছেন, ‘তাকিয়ে দেখার আনন্দ’; অর্থাৎ জীবনানন্দের কবিতার যে চিত্ররূপময়তা, রবীন্দ্রনাথ সেদিকেই ইঙ্গিত করেন।

পত্রালাপ জীবনানন্দ দাশ / সম্পাদনা, ভূমিকা ও টিকা : প্রভাতকুমার দাস / প্রকাশক : এবং মুশায়েরা, ১৫ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা / প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৭; মূল্য চারশত টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ