আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৯

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১০:০০, জানুয়ারি ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২১, জানুয়ারি ৩১, ২০১৯

আমি অবশ্য ভিড় ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে নিচ তলায় চলে গেলাম। বোটও কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলো হ্যাভলক জেটিতে। হ্যাভলক নেমে লাইন দেয়া দীর্ঘ অটোরিক্সার সারির একেবারে সামনে পর্যন্ত চলে এলাম। ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে গিয়ে দেখলাম অটোরিক্সা ড্রাইভার পরিষ্কার বাংলায় উত্তর দিচ্ছে। আর বাংলা মানে কোলকেতে বাংলা নয়। প্রায় পূর্ববঙ্গীয় বরিশাল খুলনার বাংলা। খুশিতে গদগদ হয়ে একখানা অটোরিক্সায় চেপে বসলাম। সে আমাদের বিজয়নগর ভালো একটি হোটেলে নিয়ে যাবে। পথে যেতে যেতে দেখলাম বাংলা তো এখানে খালি অটোরিকক্সাওয়ালার মুখে নয়; রাস্তায়, দেয়ালে, সাইনবোর্ডে সর্বত্র। স্থানের নাম গোবিন্দ নগর, বিজয়নগর, রাধানগর, কালাপাথর ইত্যাদি। অ-বাংলা যা কিছু আছে তা শুধু হোটেল আর রেস্টুরেন্টের কিছু ইউরোপিয় নাম। অটোরিক্সাওয়ালার কাছে জানতে চাইলাম—আইল্যান্ডের নাম হ্যাভলক, মনে হয় যেন ভূমধ্যসাগরীয় এক দ্বীপের নাম, অথচ সেই দ্বীপের মধ্যের রাস্তাঘাট, গ্রামপঞ্চায়েত সব আমাদের বাঙালমুলুকের—এর সহস্যটা কী? অটোওয়ালা বললো—ওনারা মানে ইউরোপিয়ানরা আইল্যান্ডখানার নাম দিয়ে চলে গেছেন, ভেতরটা আবাদ তো করে যাননি। আবাদ তো হয়েছে ১৯৫৪ সালে শ্যাখের (মুসলমানের) অত্যাচারে টিকতে না পেরে উদ্বাস্তু হয়ে আসা পূর্ববঙ্গীয় হিন্দুদের হাতে। সুতারং তাদের পাড়া-পঞ্চায়েতের নাম তারা রাধা-গোবিন্দের নামে রাখবে তা-ই তো স্বাভাবিক।

ব্যাখ্যাটা খারাপ লাগলো না। তবে ‘শ্যাখের অত্যাচারে টিকতে না পারা’ কথাটায় নিজেদের গায়ের উপর একটু কাদা ছিটলো দেখে ডিফেন্স দিতে বললাম—বাংলাদেশে সেই অবস্থা কিন্তু এখন আর নেই; এখন কিন্তু হিন্দুরা সেখানে যথেষ্টই নিরাপদ ও নিরুপদ্রব জীবন যাপন করছে। তাকে দাওয়াতও দিলাম—‘আসুন একবার বাংলাদেশে, দেখুন আজকের বাংলাদেশ, ভালো লাগবে আশা করি।’ এ দাওয়াতের প্রতি আমাদের সম্মানিত অটোওয়ালাকে খুব বর্তে যেতে দেখলাম না বরং যে প্রত্যুত্তর সে করলো তাতে আমরাই কিছুটা বেকায়দায় পড়লাম। সে বললো—‘এখন যে দেশ চালায় তার নামের আগেও তো শুনেছি শেখ আছে। আমার ঠাকুমা-ঠাকুরদারা তো শুনেছি ঐ শেখদের অত্যাচারেই দেশ ছেড়েছিল; ফলে পার্থক্য কীভাবে হবে তাতো খুব বুঝতে পারছি না।’ এ উত্তরে আমরা রীতিমতো ঠান্ডা হয়ে গেলাম।  আমরা আর সাহস করে এই দুই ‘শেখ’-এর পার্থক্য বোঝানোর প্রয়াস পেলাম না, বরং চুপ হয়ে যাওয়ার সর্বতো প্রয়াস অবলম্বন করলাম।

অটোওয়ালা আমাদের নামালো গ্রিন ভ্যালি রেস্ট হাউজে। চেহারাছুরত আর রুমের ভাড়া সবকিছুই খাপের খাপ হওয়ায় অটোওয়ালাকে ওখানেই ছাড়লাম। অটোভাড়াটা মনে হলো পোর্টব্লেয়ারের আমাদের গোপালের ভাড়ার হিসেবে দ্বিগুণ।  গুনাগুনের ভাবনা ছেড়ে রুমে কাপড় ছেড়ে চললাম গ্রিনভ্যালি রেস্ট হাউজের নিজস্ব বিচের দিকে। এখানে বিচের পাশ ঘিরে একের পর এক একটা করে হোটেল বা রেস্ট হাউজ। ফলে মনে হয় রেস্টহাউজগুলো বিচটাকে খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করে নিয়েছে। আমাদের রেস্ট হাউজের ভাগে যে খণ্ড পড়েছে সেখানে ঝুলে পড়া অনেক নারকেলে গাছের ছায়া আছে।  সে সুবাদে শুধুমাত্র ব্রা-প্যান্টির পোশাকে শোভিত সাদা ইউরোপিয় নারীগণের একটি বড় সমাবেশ আমাদের গ্রিন ভ্যালির লাগোয়া বিচে স্থায়ীভাবে রয়েছে। সাগর সুন্দর, নারিকেল-বীথির ছায়া সুন্দর, প্রায় নাই-পোশাকে ইউরোপিয় নারীদের স্নান সুন্দর, একমাত্র অসুন্দর খালি ছোট একটি শরীরে বড় একটি পেট বহনকারী আমি মুহম্মদ মুহসিন। সে-কারণেই আমি সবাইকে দেখলেও কেউ আমাকে দেখছে না—এমন শান্তিতে ঘণ্টাদুয়ের সমুদ্রস্নান ভালোই কাটলো। তারপর বাঙাল মালিক গৌরাঙ্গ ছুতারের গ্রিন ভ্যালি রেস্ট হাউজে আলুভর্তা-ভাজি-মাছ-শুটকির আয়োজনে এক জব্বর বাঙালি মধ্যাহ্নভোজন মধ্য-অপরাহ্নে সমাপ্ত করে একখানা খাসা বৈকালিক ঘুমের আয়োজনে বিছানায় লম্বা হলাম। ঘুমটা কেবল ধরেছে, নাকটা ডাকতে শুরু করবো—এর মধ্যে আকাশে খোদ খোদাওন্দে করিমের আয়োজনে শুরু হলো ডাকাডাকি। ঐ ডাকাডাকিটি ঘুমের অনুকূলে হলেও সন্ধ্যায় কালাপাথর বিচে যাওয়ার আশায় খোদ খোদাওন্দে করিম নিজ হাতে পানি ঢেলে দিচ্ছেন দেখে বুকের মধ্যে একটা খচখচ খোঁচাখুচি শুরু হলো। আর তাতে ঘুমটা অশান্তিতে পড়ে গেল।

ঘুমটা শেষ না করেই উঠলাম। বৃষ্টি বন্যার মধ্যেই কালাপাথর বিচ দেখার সাধ চাড়া দিয়ে উঠলো। দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়ায় একখানা অটো ঠিক হলো কালাপাথর বিচ যাওয়ার জন্য। যতক্ষণে সেখানে পৌঁছলাম ততক্ষণে মেঘ আর সন্ধ্যার অন্ধকারের কালোতে কালাপাথর এত কালো হয়ে বসে আছে যে আমাদের চামড়ার চোখে তা আর দেখার সুযোগই থাকলো না। কালাপাথর বিচের কালোটুকু অর্থাৎ কালো অন্ধকারটুকুই শুধু দেখে আসতে পারলাম, পাথরটুকু আর দেখা হলো না। ফিরলাম রেস্টহাউজ। জব্বর একখানা ঘুম হলো। ঘুম শেষে হলে দেখলাম চতুর্দিকে ফকফকা নতুন দিন।

হ্যাভলক পর্ব প্রায় শেষ হয়েছে। একমাত্র রাধানগর যাওয়া হয়নি। এত উদোম দিনের আলোয় রাধার সাথে লীলাখেলা খুব জমবে না দেখে আমার বন্ধু শামীম রেজা রাধানগরেরর পর্বটি বাদ দেয়ার সুপারিশ করলো। আমি দাঁড়িওয়ালা সে সুপারিশ মানলাম না। এবারও দাঁড়িমুণ্ডিত আমার বন্ধুর হার হলো দাঁড়িমণ্ডিতের কাছে। রাধানগর অনেকখানি পথ। গ্রামের ফসলের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে সরু পাকা রাস্তা। অটোতে প্রায় ৪০/৪৫ মিনিট লেগে গেল। পথে গ্রামগুলোর বাড়িগুলো দেখে কোনোভাবে বুঝতে পারছিলাম না যে, এ আমাদের বরিশাল ঝালকাঠির কোনো গ্রামের থেকে আলাদা কিছু। ঘরের কাঠামো, নারিকেল-সুপুরিতে সাজানো বাড়ির চেহারা, উঠানে বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি—সবটাই আমাদের কৈবর্তখালী, জীবনদাসকাঠী, মনোহরপুরের চিরায়ত রূপ। আমার বাংলাদেশ এতদূর পৌঁছে গেছে দিকে ভিতরে অভাবনীয় এক পুলক অনুভব হচ্ছিল। মনে পড়ছিল কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার সাহসী পংক্তি— ‘যতদূর বাংলাভাষা ততদূর বাংলাদেশ’। এই কথার সাহসেই আমার মনে হচ্ছিল বলি— ‘যতদুর এমন বাড়ির উঠোন, ততদূর আমার বাংলাদেশের কৈবর্তখালী, জীবনদাসকাঠী আর মনোহরপুর ।’

এই পুলক শেষ না হতেই রাধানগর বিচে পৌঁছে গেলাম। বিশাল বিচ, উত্তাল সাগরের ঢেউ, পাশের পাম ও পাইন গাছের ভিতরে সো সো করে ছুটছে ‘রাধার কেশ আউলানো’ সাগরের উন্মত্ত বতাস। আর সেই অবারিত সুন্দরের বুকে আমরা দুই খর্বাকৃতি বাঙালি আদমি অসুন্দরের পদাঙ্ক রেখে যাচ্ছি। রাধা, তোমার গোবিন্দের দিকে তাকিয়ে আমাদের ক্ষমা করে দিয়ো—এই বলে সলজ্জ ক্ষমা চেয়ে ফিরতি পথে উঠলাম। পথে গোবিন্দনগরে এক রেস্টুরেন্টে বসলাম সকাল আর দুপুরের মধ্য সময়ে ব্রাঞ্চ (Brunch) জাতীয় একটা পর্ব সারতে। সেখানে রেস্টুরেন্টের দাদা, বৌদি, ঠাকুরপো সব বাঙালি। আবার সেই বাংলাদেশের গল্প। সেখানে ‘শ্যাখদের’ (মুসলমানদের) অত্যাচারে তাদের ঠাকুরদারা এই পানির দেশে এসে প্রাণ বাঁচিয়েছে। সে-গল্প শুনলাম, কষ্ট পেলাম, কিন্তু কিছু বলার পেলাম না।

রাধাগোবিন্দ শেষ করে বিজয়নগরের আমাদের জ্ঞাতিভাই গৌরাঙ্গ ছুতারের রেস্টহাউজ পৌঁছলাম বিদায় নিতে। সেখানে আদি নিকোবারিজ একটি ছেলে পেয়েছি। হোটেল বয়। নাম মাইকেল। নিকোবারিজরা নিজেদেরেকে ‘হোলচু’ বলে, নিকোবারিজ বলে না। হোলুচ মানে বন্ধু। তারা যে আসলেই মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু মাইকেলের দিকে তাকিয়ে তা বোঝা যায়। একদম ওয়ার্ডসওয়ার্থের মাইকেলের মতো সহজ সরল। চেহারার দিকে তাকালেই বোঝা যায় সভ্যতার পাপপঙ্কিলতাগুলো এখনো ওদেরকে আচ্ছাদন করতে পারেনি।  শুধু একখানা নয়াধর্ম পায়ে নতুন জুতোর মতো কিছুটা অস্বস্তি দিয়ে যাচ্ছে। ওর সাথে অনেকগুলো ছবি তুলে পা তুললাম পোর্টব্লেয়ারের দিকে। বিকালে পোর্টব্লেয়ার পৌঁছে প্রথম কাজ হলো পরের দিন ৩০ তারিখ জারোয়া রিজার্ভে যাওয়ার জন্য বাসের টিকেট কাটা। পোর্টব্লেয়ারের সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল আমাদের হোটেল গুরু ইন্টারন্যাশানাল থেকে মাত্র হাঁটা পথ। বাস টার্মিনাল গিয়ে দেখলাম ঐ পথে সারা দিনে বাস যায় মাত্র গোটা তিনেক। রওয়ানা দিতে হবে ভোর চারটায়। হোটেল থেকে নামতে হবে রাত সাড়ে তিনটায়। সে মতে রাজি হয়েই দুইখানা টিকেট করলাম কদমতলার বাসে। নামতে হবে বারাটাং, কদমতলার একটু আগে।

আন্দামান আসার স্বপ্ন-কল্পনা যেদিন শুরু করেছিলাম সে-দিন সে-স্বপ্নের কেন্দ্রে তো ছিল একটাই বস্তু—আমার ছত্তার ভাইয়ের বর্ণনার সেই মানুষদের দেখবো যারা বুড়ো মানুষদের চালকুমড়ো বানিয়ে খেয়ে ফেলে, টলেমির বর্ণনার সেই মানুষদের দেখবো যারা উলঙ্গ থাকে এবং মানুষ খায়। তবে ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছিলো আমার মতো হুজুর-মার্কা এক গজকুতুমের চোখে সেই তেজ নেই যা দিয়ে দেখতে পারবো টলেমির দেখা বস্তু। আবার আন্দামানের ইতিহাস ও ভ্রমণবৃত্তান্তমূলক গ্রন্থগুলোর পৃষ্ঠায় চোখ বোলাতে বোলাতে আন্দামানের জঙ্গলে কিছু প্রস্তরযুগীয় সাধারণ মানুষ দেখতে পারার আশাও ধীরে ধীরে উবে যাচ্ছিলো। কারণ, সেই বইগুলো খুব করুণভাবে বলে দিচ্ছে আন্দামানের ‘আসল’ মানুষদের উৎখাত করে কীভাবে সভ্যতার কৃত্রিমতায় ক্রমবর্ধিষ্ণু ‘নকল’ মানুষেরা এই দ্বীপটিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। ফলে এখন আর সেই খাঁটি প্রস্তরযুগীয় মানুষদের সাক্ষাৎলাভ আমার মতো অভাগাদের নসিবে না জোটাই স্বাভাবিক। এই দ্বীপে তথাকথিত সভ্যতার এই গ্রাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে ২২০ বছর আগে। যে লোকটি কাজের শুরুটা করেছিলেন তিনি হলেন লে. আর. এইচ. কোলব্রুক। কলোনাইজেশনের রীতিসিদ্ধ ধারায় তিনিও কাজটি শুরু করেছিলেন প্রলোভন-নির্ভর বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে।

সে-দিন ছিল ১৭৮৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর। আর. এইচ. কোলব্রুক আন্দামানের অরণ্যে আসল ও আদিম মানুষের খোঁজ চলছেন। ঢেউয়ে দোলায়িত জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন কোলব্রুক সাহেব। হঠাৎই তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো দক্ষিণ আন্দামানের আজকের পোর্টব্লেয়ারের সন্নিহিত ডানডাস পয়েন্ট এলাকার এক সমুদ্রতটে। একটা গাছে একটা কালো কুচকুচে উলঙ্গ মানুষ। জাহাজ কাছে আসতে দেখেই উলঙ্গ মানুষটি বানরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের নিচে নেমে এলো। চিৎকার করে সে আরো কয়েকজনকে ডাকলো। তাদের মধ্যে একজনের কণ্ঠস্বর মহিলার। নোঙ্গর করা জাহাজ থেকে কয়েকটা নারকেল সমুদ্রতীরে ছুঁড়ে দিলো কোলব্রুকের লোকজন। কিন্তু সমুদ্রের দিকে নেমে এই উপহার সামগ্রী নিতে আদিম লোকটি বারবার দ্বিধা করছিলো। এই দেখে জাহাজ একটু পিছু করলেন কোলব্রুক সাহেব। উলঙ্গ লোকটি এবার নারকেল ক’টা হাতে নিয়ে চিৎকার করতে করতে সঙ্গীদের নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। একই দিনে কোলব্রুক আরেকজন আদিম মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে আসেন। ইতস্তত করে এগিয়ে আসা সেই আদিম যুবকের হাতে কোলব্রুক তুলে দেন একটি ছুরি; বিনিময়ে তিনি চেয়ে নেন একটা তীর ও ধনুক। যুবকটির হাতভরে আরো তুলে দেয়া হয় বিস্কুট। এই ছিল আন্দামানে আদিম মানুষদের সাথে সভ্য ইংরেজদের প্রথম বাণিজ্য এবং এটিই ছিল আন্দামানের জনজাতি গ্রাসে ইংরেজদের প্রথম থাবা।

তবে সে-দিনের ছুরি আর বিস্কুটের প্রলোভন এই ‘আসল’ মানুষগুলোর মাঝে খুব কাজ করেনি। এরা এখানে কোনো মিরজাফর তৈরি করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করে তাদের স্বভাবসুলভ জবরদস্তির চর্চা দিয়ে। সেটি ১৭৯১ সালের দিকের বর্ণনা। ইতোমধ্যে আন্দামানের পোর্টব্লেয়ারের কাছাকাছি জঙ্গলে বৃটিশরা কয়েদি উপনিবেশ বানানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। সেই সিদ্ধান্তের লক্ষ্যে যখন কাজ চলছে তখনকার এক দিন কর্তৃপক্ষের খেয়াল হলো আন্দামানের আদিম মানুষ কী জিনিস সে ব্যাপারটা গভর্নরকে একটু দেখানো হোক। তখন দক্ষিণ আন্দামানের কয়েকজন আদিম জনজাতির মানুষকে জোর করে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসকে দেখানোর জন্য কোলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়ে। আন্দামান জনজাতিকে সভ্যতার স্বাদ পাইয়ে দিয়ে বশীভূত করার লক্ষ্যে জবরদস্তির এই ছিল প্রথম উদ্যোগ। কিন্তু আন্দামানিজরা এই জবরদস্তির কাছে মাথা নোয়াতে রাজি নয়। তদুপরি তাদের চিরায়ত বাসস্থান কেড়ে নিয়ে সেখানে কোথাকার কোন চোর ডাকাত জেল থেকে বের করে এনে থিতু করে দেয়ার উদ্যোগ কোনোভাবেই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাই তাদের হাতে যেটুকু সম্বল ছিল তাই নিয়েই তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো উপনিবেশ স্থাপনকারী ইংরেজদের বিরুদ্ধে এবং মূলভূখণ্ডের ইংরেজদের সহযোগী ভারতীয়দের বিরুদ্ধে।

কঠিন মনোভাবের এই আন্দামানি আদিবাসীদের মধ্যে ছিল গ্রেট আন্দামানিজ, জারোয়া, ওঙ্গি, সেন্টিনেলিজ—সকল জনজাতি। এদের মধ্যে ইংরেজ ও তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যারা প্রথম প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন তারা ছিলেন গ্রেট আন্দামানিজ। ইংরেজ সরকার দ্বিতীয় দফায় ১৮৫৮ সালে আন্দামানে কয়েদি উপনিবেশ স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করেছিল। এবার ইংরেজরা কয়েদিদের দ্বারা একের পর এক রস আইল্যান্ড, চ্যাথাম আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড ও বর্তমান পোর্টব্লেয়ারের আবেরদিনের জঙ্গলাদি সাফ করতে শুরু করে এবং আন্দামানিজদের চিরায়ত বসতি উজাড় করতে শুরু করে। আন্দামানিজরা তখন ব্যাপক আয়োজনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৮৫৯ সালের ১৪ মে বা মতান্তরে ১৭ মে সংঘটিত আবেরদিনের যুদ্ধ নামে পরিচিত এই যুদ্ধের কথা ইতোপূর্বেই বলা হয়েছে।

এই আবেরদিন যুদ্ধে ইংরেজরা আন্দামানে প্রথম খোঁজ পায় এক মিরজাফরের। সেই মিরজাফর দুধনাথ তিওয়ারির বিশ্বাসঘাতকতায় আন্দামানিজরা ১৮৫৯ সালের যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট ওয়ার্ডেনের হাতে পরাজিত হয়েছিল। তবে ইংরেজদেরও ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছিল না। আবার সেই মিরজাফর আন্দামানি রক্তের না হওয়ার প্রেক্ষিতে তাদের অনুভব হয় যে, আন্দামানিজ জনজাতিদের সাথে স্থায়ী সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে খুব লাভ হবে না। ফলে ইংরেজ সরকার আবার কৌশল পাল্টালো। তারা ঠিক করলো এই আদিবাসীদেরকে প্রলোভন বা বন্ধুত্ব দিয়ে বশীভূত করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে হঠাৎ আদিবাসীদের প্রতি ইংরেজদের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসলো। ইংরেজরা এখন ঘন ঘন নানা উপহার নিয়ে আদিবাসীদের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে আসে। ঘাগরা নাও, কুর্তা নাও, তামাক নাও, এসো দোস্তি করি। ১৮৬৩ সালের ১৮ জানুয়ারি। এমনই রং-বেরঙের জিনিস সাজিয়ে আদিবাসীদেরকে লোভ দেখাতে এক ইংরেজ জাহাজ গেছে আন্দামানিজদের এক দ্বীপে। জাহাজের ইংরেজ নাবিক প্র্যাট লোভ সামলাতে না পেরে আন্দামানিজ এক মহিলার শ্লীনতাহানি করে বসলো। দুটি আদিবাসি ছোকরা প্র্যাটকে সোজা জবাই করে ফেলে দিলো। ভারতীয় ইংরেজরা এই ঘটনায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। রব উঠলো—ওই জংলিদের সাথে আর পিরিতের দরকার নাই। এবার ওদের মারো, কাটো, পোড়ো যতদূর পারো। কিন্তু  সরকার অতদূর জ্বালাও-পোড়াও নীতিতে আগালো না।  মাসখানেকের মধ্যে প্র্যাটের হত্যাকারীরা ধরা পড়লো। তাদের কাছ থেকে শোনা গেল প্র্যাটের ধর্ষণের সমাচার। এবার খুনের পিছনের মূল কাহিনি শুনে এতক্ষণ ধরে রাগে ফালমারা ইংরেজরাও কিছুটা চুপসে গেল। হত্যাকারী জাম্বোর ৭ মাস জেল হলো আর তার সাথে থাকা স্নোবল খালাস পেলো। জাম্বোও মাস খানেকের মধে ছাড়া পেয়ে গেল।

এরপর ইংরেজদের ধর্মকর্মওয়ালাদের মধ্যে এই আদিম প্রকৃতির সন্তানদের জন্য আরো বেগে মায়ার স্রোত শুরু হলো। এই ধর্মকর্মওয়ালাদের একজন ছিলেন পোর্টব্লেয়ারের ধর্মযাজক রেভারেন্ড এইচ. করবিন। তাঁর নামে পোর্টব্লেয়ারের একটি বিচের নামকরণ হয়েছে—সে কথা আগেই বলেছি। এই এইচ. করবিনের প্রয়াসে এবার তৎকালীন আন্দামানের রাজধানী রস আইল্যান্ডে আন্দামানিজদের সভ্য করে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হলো ‘আন্দামান হোম’। আন্দামান হোমে তারা ধরে এনে আদিম জনজাতির মানুষদেরকে ধরে-বেঁধে সভ্যতা শেখাতে শুরু করলো। তবে গ্রেট আন্দামানিজ, জারোয়া, ওঙ্গি, সেন্টিনেলিজ প্রমুখ জনজাতির মধ্য থেকে শুধু গ্রেট আন্দামানিজ কিছু মানুষকেই ধরে এনে তারা এই আনদামান হোমে আটকাতে সমর্থ হলো। অন্যরা ইংরেজদের এই বশীকরণ কৌশল থেকেও দূরে থাকতে সমর্থ হলো। ফলে আন্দামান হোমে অনেকটা শুধু গ্রেট আন্দামানিজদের নিয়েই সভ্যতার কুচকাওয়াজ শুরু হলো এবং শেষ দিকে কিছু ওঙ্গিকেও এই সভ্যকরণ খাঁচায় আটকাতে সমর্থ হলো। তাদের ওপর চললো সভ্যকরণ মহড়া। ‘প্যান্ট পর, জামা পর, ইংরেজি পড়, সেলাই শেখ, ছাঁটকাট শেখ, বাস্কেট বানাও, বাগান কর। জঙ্গল ভোলো, শহর চেনো। খুপরি ঘরে থাকো, আকাশ ছোট হয়ে আসুক, বাতাস নিয়ন্ত্রিত হোক, জীবনকে সীমাহীন থেকে রস দ্বীপের এই ঘেরা আশ্রমে গুটিয়ে আন। এই নাও সুস্বাদু খাবার, আয়না, চিরুনি, খেলনা, টাকা।’

রেভারেন্ড করবিনের পদত্যাগের পরে আন্দামান হোমের পরিচালকের দায়িত্ব নেন জে. এ. হামফ্রে, তারপর টুসন সাহেব। টুসন সাহেব আরও কয়েক জায়গায় আন্দামান হোম প্রতিষ্ঠা করেন। টুসনের পরে দায়িত্ব পেলেন ই. এইচ. ম্যান এবং সবশেষে ইংরজে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এম. ভি. পোর্টম্যান। শেষোক্ত জন দায়িত্বে ছিলেন ১৮৭৯ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত। চলবে

আরো পড়ুন : কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০

//জেডএস//

লাইভ

টপ