নিজেকে জানতেই জীবনটা পেরিয়ে গেলো : হাসান আজিজুল হক

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শ্যামল চন্দ্র নাথ
প্রকাশিত : ১২:০০, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০০, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৯

হাসান আজিজুল হক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গল্পকার। তিনি ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য, আত্মজা ও একটি করবী গাছ,  জীবন ঘষে আগুন,  টান,  আগুনপাখি বৃত্তায়ন নামহীন গোত্রহীন ইত্যাদি। সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি ও আনন্দ পুরস্কার সহ অসংখ্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আগামীকাল তার আশিতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শ্যামল চন্দ্র নাথশ্যামল: আপনি প্রথম যৌবনেই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। রাজনীতি করার কারণে পাকিস্তান সরকারের নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল। কলেজও ছাড়তে হয়েছিল। এ সম্পর্কে জানতে চাই।

হাসান আজিজুল হক: সামান্য ঘটনা। এগুলো নিয়ে কখনো লিখিনি। মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবনারই ফলাফল সেটা। যে ভাবে না সে মানুষ না। মানুষ মাত্রই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

শ্যামল: আপনার বড় ভাই আপনার লেখক জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। আপনার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে আপনি বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্রের বই নিয়ে পড়তেন। একজন জীবনঘনিষ্ঠ লেখক হিসেবে বলবেন কি এরা আপনার সাহিত্যজীবনকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন?

হাসান আজিজুল হক: আমি তো সেটা বলতে পারবো না। এই ব্যাপারগুলো কেউই বলতে পারবে না। হ্যাঁ, একটা বই পড়লাম এবং ভিতরে পরিবর্তনগুলো কী রকম করে আসছে বা কী রকম চিন্তা আসছে—এ কথা কেউ বলতে পারে না। দেখা যায় যে, একই বই বিভিন্ন জনে পড়ে এবং বিভিন্ন জনকে যদি জিজ্ঞেস করা যায় তখন যে একটাই মত পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়। কাউকে হয়তো স্পর্শই করেনি বইটা, কেউ হয়তো অনেকবার পড়েছে, এরকমই হয়তো। কাজেই কার ক্ষেত্রে কী হবে সেটা তো ব্যাখাধীন বিষয়। তবে এটা ঠিক কথা, তুমি যদি তোমার অল্প বয়সের মনটাকে মনে করো এটা একটা শূন্য ভাড়ার ঘর, বিশেষ কিছু এখানটাতে নেই—এভাবে তুমি যদি ধরো, তাহলে নানাভাবে তোমার এই ভাড়ার ঘর পূর্ণ হবে।

অন্য অনেক মানুষের সঙ্গে যখন তোমার দেখা হবে, কথা হবে, তখন তোমার মনের মধ্যে, মনের স্লেইটে একটা করে আঁচড় পড়বে। আমি যখন ওই বইগুলো পাই সেটা ছিল আমার দাদার বাড়িতে, সেখানে ওনার বিয়ে হয়, শশুরবাড়ি সূত্রে ওখানে বইয়ের সংগ্রহ ভালো ছিল। সেগুলো বই নয়, সব মাসিক পত্রিকা। ওগুলো একেক বছর করে বেঁধে রাখা হতো। মোটা মোটা করে বাঁধাই করা এক বছরের ভারতবর্ষ, প্রবাসী, কিংবা বসুমতী। সেগুলো পড়েছি। তুমি যদি বলো, পড়তেন কেন? তার জবাব আমার কাছে নেই।

তবে এটা ঠিক যখন আমি পড়ছি তখন কিছু না কিছু জমা হচ্ছে। যেটা তোমায় আমি প্রথমেই বলেছি যে, মানুষের শৈশবে ভাড়ার ঘর অনেক ফাঁকা থাকে। যত বয়স বাড়তে থাকে তত ভাড়ার সঞ্চয়টাও বাড়তে থাকে। এই সমস্ত বইগুলো ওই সমস্ত ভাড়ারে জমা হয়। কখনো আধখান জমা হয়, কখনো তিতা জমা হয়, কখনো খণ্ড জমা হয়। পরবর্তীকালে যা কিছু করতে যাচ্ছি ওই ভাড়ারে যা জমা আছে তার উপর নিশ্চিত হয়েই তো কাজ করবো আমি। তখন সেগুলোর সব ঢেলে দিই, এই তো।

শ্যামল: আপনার কী মনে হয় আত্মোপলদ্ধি কতটা প্রয়োজন শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে?

হাসান আজিজুল হক: কী করে বলবো বলো, সন্তান এবং স্ত্রী রেখে সিদ্ধার্থ, গৌতম বুদ্ধ সংসার ত্যাগ করলেন। এবং সবশেষে চরম জ্ঞান ও বোধি লাভ করলেন। আত্ম-আবিষ্কার বলো, আত্ম প্রতিষ্ঠাই বলো—এ লেখাই যে একটা পথ তাও তো বলা যায় না—মানুষ একটা কারণেই যে লেখে তাও তো না।

অনেক মানুষ আছে তাদের মনে হয়, জীবনে কোনোদিন লিখলাম না। লম্বা একটা জীবন কাটিয়েছি, লিখে রাখলে কী হতো! অনেকের হয়তো নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখতে ভালো লাগে। কেউ হয়তো একটা লেখার পরেই বলবে, বাহ! বাহ! ভালো লিখেছি।

শ্যামল: তবে আপনার ক্ষেত্রে কোনটি ঘটেছিলো?

হাসান আজিজুল হক: দেখো, শ্যামল আত্মোপলব্ধি শব্দটা খুব অস্পষ্ট। এটা দিয়ে কিছু বোঝানো যায় না। নিজেকে জানতেই জীবনটা পেরিয়ে গেলো। রবীন্দ্রনাথ যেমন বললেন, আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না, ফুরাবে না। এই কোন আপনি? নিজেকে জানো মানে কী? তুমি কে? তুমি কী? তোমার সত্তা কী? না, জীবনের সর্বোত্তম লক্ষ্য আসলে কী? তুমি কী—মানুষ, বাদর না হনুমান, তুমি কী! বেদে বলছে যেমন—‘আত্মানং বৃদ্ধি’। সেটাই বা আবার কী ধরণের আত্মা—কে বলবে বলো? কাজেই এই সমস্ত কঠিন কঠিন প্রশ্ন করার তোমার দরকার কী!

শ্যামল: আমি আপনার একটি বিখ্যাত গল্পের কথা বলছি,‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ সেখানে মূল চরিত্রটি শুধু করবী গাছ লাগাতে চায়, ওই গাছের ফুল খেয়ে মারা যেতে চায়...

হাসান আজিজুল হক: তুমি যা বললে, সেটা তোমার প্রশ্ন নয়, সেটা তোমার মন্তব্য, সুগর্ভ মন্তব্য। আমি তো তোমার মন্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণও করতে পারি। অন্যেরাও পারে। তাই না?

সব চাইতে বড় কথা হলো—যেটা আমি বারবার বলেছি—গল্প লিখেছি, যার যা ভালো লেগেছে তা পড়েছে। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই ছোটোগল্প লিখেছি প্রথম দশ বছর, তখন বয়স বেশি হয়নি, অনেকেই বললো গল্প সংখ্যায় এত কম! বিশ বছর পর একজন লিখলেন, বাংলা গল্পে এরকম তুলনা পাওয়া যায় না। সব্যসাচী দেব দেশ পত্রিকায় গত ৫০ বছরে বাংলা সাহিত্যর শ্রেষ্ঠ ১২ টি গল্পের নাম বলেছেন। আমি দেখলাম সেখান আমার নামটি রয়েছে। আমি অবাক হয়ে গিয়েছি!

শ্যামল: ১৯৭৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত আপনি রাজশাহীতে ছিলেন। ওখানে আপনার অনেক স্মৃতি রয়েছে, কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতির কথা কি বলবেন?

হাসান আজিজুল হক: না, জীবন কেটেছে—প্রতিটি প্রত্যেক দিন প্রত্যেক দিনের মতো। এ নিয়ে আমি পৃথক করে কিছু পাই না।

শ্যামল: রাজশাহী কলেজে পড়ার সময় মিজবাহুল আজীমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ভাঁজপত্র’। এতে আপনার একটি রম্য লেখা ছাপা হয়। সেটাই কি প্রথম লেখা?

হাসান আজিজুল হক: আমি ১৯৫৭-৫৮ সালে রাজশাহী এসেছিলাম। ওটা আমি হাসি-ঠাট্টা করে লিখেছিলাম। তার আগে আমার অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। এমনকি একটা উপন্যাসও লিখেছি। যতদূর মনে পড়ে আমার প্রথম লেখা গল্পই। কবিতাও বেরিয়েছিলো কিনা মনে পড়ে না। তবে ৫৪-৫৫ সালের দিকে গল্পই বোধহয় ২-৩ টি বেরিয়েছিলো।

শ্যামল: খুলনায় সাহিত্য সৃষ্টির উৎসমুখ ছিল ‘সন্দীপন’। ষাটের দশকে নাজিম মাহমুদ, মুস্তাফিজুর রহমান, জহরলাল রায়, সাধন সরকার, খালেদ রশীদ প্রমুখ সংগ্রামী কয়েকজন তরুণের চেষ্টায় গঠিত হয় ‘সন্দীপন গোষ্ঠী’। ওই সম্পর্কে জানতে চাই?

হাসান আজিজুল হক: আমি সন্দীপনের দ্বিতীয় আসর থেকে যুক্ত। ও যতদিন ছিল ওর সঙ্গে ততদিন ছিলাম। সন্দীপনে প্রথম গল্প লিখি ‘ওরে সুনীল’। লেখা প্রথম পাঠ করে শোনালাম। সন্দীপন আমাদের প্রাণ ছিল, সন্দীপন আমাদের সংগ্রাম ছিলো। সন্দীপন আমাদের সাহিত্য চর্চার, জ্ঞান চর্চার, রাজনীতি চর্চার একটা কেন্দ্র ছিলো। নেতৃত্বও দিয়েছে সারা দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে। ওটা আমার জীবনের একটা সুবর্ণ সময়।

শ্যামল: খান সাওয়ার মুরশিদ সম্পর্কে জানতে চাই। যিনি আপনাকে ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন।

হাসান আজিজুল হক: খান সারওয়ার মুরশিদ আমার শ্রদ্ধেয় মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার মনে হয়, আমার যা প্রাপ্য তার চেয়ে তিনি আমাকে অনেক বেশি দিয়েছেন।

শ্যামল: আপনি দর্শনের ছাত্র ছিলেন। জানতে চাই সাহিত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে দর্শনশাস্ত্রের ভূমিকা কেমন?

হাসান আজিজুল হক: দর্শনে আছে তত্ত্বজ্ঞান, চিন্তার গভীরতা, উপলব্ধির উৎকর্ষতা, সত্যপ্রিয়তা— তাহলে দর্শন পড়লে লাভ হবে। দর্শন পড়লেই তো আর সবাই সাহিত্যিক হয়ে যায় না। অনেকেই আছেন দর্শন পড়েন নাই কিন্তু অসাধারণ সাহিত্যিক। সাহিত্যিক হওয়ার জন্য তো আর দর্শনে এম. এ. পাশ করার প্রয়োজন পড়ে না। রবীন্দ্রনাথও করেন নাই, নজরুলও করেন নাই। কে কীভাবে নিতে পেরেছে সেটাই বড় কথা।

শ্যামল: সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

হাসান আজিজুল হক: আমি দু’জন সম্পর্কে লিখেছি। দু’জনেই অনেক উঁচু মানের লেখক। এখন আর নতুন করে কী বলবো? আমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ সম্পর্কে বলেছি যে, বিশেষ করে এই বাংলার লেখকদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র দৃষ্টিভঙ্গি যতটা আবেগের ছিল, যতটা বৈশ্বিক ছিল তা আমাদের বিশ্বের সাথে যুক্ত করেছে। তার তো বেশি লেখা নেই। আমাদের সাহিত্য তার অপরিসীম অবদান আছে।

হাসান আজিজুল হক ও শ্যামল চন্দ্র নাথ

শ্যামল: আপনি নিজের লেখাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

হাসান আজিজুল হক: আমি শুধু এইটুকু বলবো, আমি আমার কাজ করেছি। আমার এতদিন পরে মনে হয় পৃথিবীতে প্রচুর কাজ আছে। কোন কাজের চাইতে কোন কাজ বেশি গ্রহণযোগ্য তা বলাও মুসকিল। যেমন আমার জীবিকার জন্য আমার শিক্ষকতা, ঠিক তেমনি আমার একটি কাজ হলো আমি যা কিছু জেনেছি, আমার নিজের ভিতর যা ঘটছে তা অন্যদের শেয়ার করা দরকার। সেজন্য আমি লেখা ছাড়া অন্যকোনো রাস্তা খুঁজে পাইনি। জীবনে মানুষকে কিছু না কিছু করতে হয়, আমার মনে হয় লেখাটাই আমার কাজ। আমি এখনো বলি, বহু কাজ আমার কাজের চাইতে উন্নত, কিন্তু সেখানে আমার যাবার সাধ্য হয়নি।

শ্যামল: আপনি দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে গল্প লিখেছেন। আপনার লেখায় তার প্রভাব কেমন পড়েছে?

হাসান আজিজুল হক: দেশভাগের ফলে নানাভাবে, তাড়া খেয়ে, কত ভাবেই তো মানুষকে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে কিছু ঘটে নাই। আমি দেশভাগের সাত বছর পরে, বলা যেতে পারে নেহাতই পারিবারিক কারণে এই বাংলায় এসে লেখাপড়া শুরু করি। আমার দিদি খুলানায় থাকতেন, তার কাছে আসি। তাদের কাছে ৫৪ সাল পর্যন্ত ছিলাম। তখন বুঝিনি একটা আলাদা দেশ হয়েছে। এর ফলে আমার মধ্যে একটা ক্ষতের সৃষ্টি হলো। চিরকালের যে বাংলা, তা একেবারে ভেঙে ভাগ হয়ে গেলো।

এখানে আসার পরে আমি তো এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলাম। স্বভাবতই এই সমাজ, এই দেশ নিয়েই ভাববো।

ইতিহাসে যা কিছু হয়েছে তা মেনে নিতে হয়। চিরকাল বলে যাবো, যে বাংলাদেশ দেখছি তা আমার মন-প্রাণ অধিকার করে আছে। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ