চিন্তার চর্চাকে শিকল পরানো যায় না : পারভেজ হোসেন

Send
.
প্রকাশিত : ১৬:৩০, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৯

[আশির দশকের ছোটোকাগজ সংবেদ-এর সম্পাদক পারভেজ হোসেন বর্তমানে মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত। ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১০’ পেয়েছেন যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের গল্পগ্রন্থের জন্য। ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১৯’ পেয়েছেন ডুবোচর গল্পগ্রন্থের জন্য।]

প্রশ্ন : মেলায় প্রকাশিত বই মার্চ মাসেই খুঁজে পাওয়া যায় না, এত বই কোথায় যায়? মানে একদিকে প্রচুর  বই ছাপা হচ্ছে অন্যদিকে বই পাওয়া যাচ্ছে না, বা বইয়ের দোকান কমে আসছে—এই স্ববিরোধ কেনো?

পারভেজ হোসেন : ভালো কাগজে চোখ ধাঁধানো ছাপা নিয়ে, উন্নতমানের বাঁধাইসমৃদ্ধ বই প্রচুর প্রকাশ পাচ্ছে একথা ঠিক, কিন্তু তার মধ্যে ভালো বই, মানসম্পন্ন বই, নির্ভুল বই, সুসম্পাদিত বই কয়টি? এটা এ সময়ের একটা বড় সঙ্কট। মেলায় প্রকাশ পেয়ে মেলাতেই প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় যে বইয়ের, তা আর পরে খুঁজে পাওয়া যাবে না এটাই তো স্বাভাবিক। মানসম্পন্ন বই কিন্তু আপনি সারা বছর জুড়েই পাবেন।

তীব্র গতির যুগে বই পড়ার প্রতি পাঠকের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে আসছে। দুনিয়া জুড়েই বইয়ের দোকানও কমে যাচ্ছে সে কারণেই। পাঠে যতখানি মনোযোগ দরকার, যতটা সময় দরকার, জীবনের দুর্ণিবার চাঞ্চল্য থেকে সেই মনোযোগ, সেই সময় এখন আর বের করতে পারছে না মানুষ। এটা কালেরই চেহারা। খুব অল্প দিনের মধ্যেই আরও কত কী যে দেখতে পাবো! একেবারে ভেল্কি লেগে যাবার সময় ঘনিয়ে আসছে। তারপর যদি আবার সব কিছু থিতু হয়।

প্রশ্ন : বইমেলা কি বাংলা একাডেমির করা উচিৎ নাকি প্রকাশক সমিতির?

পারভেজ হোসেন : আমাদের অমর একুশের বইমেলা কিন্তু অন্যান্য বই মেলার মতো নয়। যেদিন থেকে যেভাবেই এর সূচনা হোক না কেন, এই মেলাকে কেন্দ্র করে কিন্তু এখন আমরা মাতৃভাষার জন্যে আমাদের লড়াই, আমাদের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা, আমাদের স্বাধীন স্বার্বভৌমত্বের যে ইতিহাস তাকে সম্মান করছি, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। না হলে এক মাস ধরে এত মানুষের সমাগম শুধু বই দেখা, বই ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র করে সম্ভব হত না। এসব নিয়ে মানুষের চেতনায় যে আবেগ জমে আছে এই মেলার আয়োজনের মধ্যে দিয়ে তার প্রস্ফুটন ঘটছে। দিনে দিনে কিন্তু মেলার আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, গণমাধ্যমের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বইমেলা। এটা জাতীয় একটা ইভেন্টে রূপ নিয়েছে। আইকন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বইমেলা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানেই থাকা উচিৎ বলে মনে হয়। অন্যেরা একে সহযোগিতা করবে।

প্রশ্ন : শোনা যায়, বেশির ভাগ প্রকাশক বই বিক্রি করে বইমেলার আনুষ্ঠানিক খরচই তুলতে পারেন না। বইমেলা বছর বছর এই আর্থিক ক্ষতিকে সম্প্রসারিত করছে কিনা? বইমেলা কি শুধু ‘উৎসব’ই থেকে যাচ্ছে?

পারভেজ হোসেন : ছোট বড় সব প্রকাশকদের মেলায় অংশগ্রহণে যে আগ্রহ দেখি, তাতে কী মনে হয়? প্রতি বছরই তো সংখ্যা বাড়ছে। প্যাভেলিয়ন বাড়ছে। স্টল তৈরির নান্দনিকতার পেছনে নির্দ্বিধায় খরচ করছে মালিকরা। এটা প্রতিযোগিতা নয়, এটা ইনভল্ভমেন্ট। আগেই বলেছি, আমাদের এই মেলা শুধুই বই বিক্রির মেলা নয়। অবশ্যই ‘উৎসব’। এমন এক উৎসব যেখানে গোটা জাতির সংস্কৃতির, চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটছে। এখানে অংশগ্রহণ করা, এক মাস এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারাটাই মুখ্য। এটা প্রাণের টান। ভবিষ্যতে এই মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারাটাকে প্রকাশকরা তার কর্মের স্বার্থকতা হিসেবে দেখবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

প্রশ্ন : মেলার স্টল বিন্যাস কেমন হওয়া উচিৎ? যাতে পাঠক খুব সহজেই তার কাঙ্ক্ষিত স্টলগুলো খুঁজে পেতে পারেন?

পারভেজ হোসেন : নানা রকম প্রতিকূলতা আছে। এর মধ্যেও এবারের মেলার চেহারা কিন্তু যথেষ্টই পাল্টে ফেলা হয়েছে। আর্কিটেক্ট এনামুল করিম নির্ঝর একটা খোলামেলা পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছেন। মেলার পেছনের দিকটাকে আর পেছন বলে দেখবেন না কেউ। স্বাধীনতা স্তম্ভ, লেকের জলসহ পুরো এলাকাটিকে মেলার অংশ করে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। শিশু কর্নার নিয়ে কাজ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। সবেমাত্র পরিবর্তনের শুরু। আগামিতে এসবের আরও উন্নতি ঘটতেই থাকবে। আমি খুবই আশাবাদী মানুষ। তাই অতীতের ক্রম পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে সেই দিন খুব বেশী দূরে নয় যেদিন আমাদের এই মেলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা উদাহরণ হয়ে উঠবে।

প্রশ্ন : ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলসহ সারাদেশে কীভাবে সৃজনশীল বইয়ের দোকান গড়ে তোলা যায়?

পারভেজ হোসেন : এটা নির্ভর করে চাহিদার ওপর। বই কেনার প্রতি, পাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ যদি বাড়তে থাকে আপনা থেকেই বাড়তে থাকবে বইয়ের দোকান। প্রতিটি বড় বড় মার্কেটে গড়ে উঠবে বুক কর্নার।

প্রশ্ন : বাজার কাটতি লেখকের প্রভাব ও প্রচারে বই সম্পর্কে পাঠক ভুল বার্তা পায় কিনা?

পারভেজ হোসেন : জনপ্রিয় লেখক তো থাকবেনই। তাদের বইয়ের ব্যাপক প্রচার প্রপাগাণ্ডা চলবে। তাই বলে ওই প্রচারের আড়ালে সিরিয়াস বইয়ের মর্যাদা চাপা পড়ে যাবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। একখানা জনপ্রিয় বইয়ের যতোই প্রচার চলুক কখনোই সিরিয়াস বই হয়ে উঠতে পারে না, কিন্তু একখানা মানসম্পন্ন বই প্রচারের কারণে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেতে পারে।

প্রশ্ন : আপনার বই কত কপি ছাপা হয়, কত কপি বিক্রি হয়—তা জানেন কিনা?

পারভেজ হোসেন : আমাদের প্রকাশনা জগতে এখনও এসব নিয়ে যথেষ্ট অনিয়ম আছে। বাজারের বাস্তবতার কারণেই আমাদের অভ্যেস যথেষ্ট প্রফেশনাল হয়ে উঠতে পারছে না। কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে যারা এটাকে সিরিয়াসলি মেইনটেইন করেন। করতে পারেন বলেই করেন। সেই ক্যাপাসিটি তাদের আছে। বাজার অনুযায়ী সবার এটা পারার সময় এখনও আসেনি। আমার বইয়ের খবরই রাখি না। কারণ প্রকাশক আমার বই প্রকাশ করে যে লাভবান হতে পারছেন না, তা আমি নিশ্চিত।

প্রশ্ন : গত বছর বইমেলায় পুলিশকে দেখা গেছে বইয়ের উপর নজরদারি করতে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

পারভেজ হোসেন : লেখকের কলম কিন্তু স্বাধীন। আবার এই স্বাধীনতার অপব্যাবহার যে নেই তাও কিন্তু নয়। এরকম নজরদারি চিরকাল ছিল অনন্তকাল হয়ত থাকবে। ভয়ের কিছু নেই, চিন্তার চর্চাকে শিকল পড়ানো যায় না।  

//জেডএস//

লাইভ

টপ