‘ভালো বই’ কম বিক্রি হয় : সাদাত হোসাইন

Send
.
প্রকাশিত : ১৫:০৯, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৮, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৯

লেখক, উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।আরশিনগর’ 'অন্দরমহলস্থান করে নিয়েছে বেস্ট সেলার উপন্যাসের তালিকায়। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছে তার নির্বাক চলচ্চিত্র বোধদ্য শ্যুজ। পেয়েছেন ‘জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যশনাল অ্যাওয়ার্ড’।

 

প্রশ্ন : মেলায় প্রকাশিত বই মার্চ মাসেই খুঁজে পাওয়া যায় না, এত বই কোথায় যায়? মানে একদিকে প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে অন্যদিকে বই পাওয়া যাচ্ছে না, বা বইয়ের দোকান কমে আসছে—এই স্ববিরোধ কেনো?

সাদাত হোসাইন : দেশে এক শ্রেণির সাহিত্যবিশারদ বা বোদ্ধা রয়েছেন, যারা নিজেরাই নিজেদের বিশুদ্ধ সাহিত্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভেবে নিয়ে ক্রমাগত একধরণের ‘নির্মাণ প্রক্রিয়া’র মধ্য দিয়ে যান। ওনারা ভাবেন বা বলেন, বই বিক্রি হওয়াটা একধরনের অপরাধ। তাদের বক্তব্য অনেকটা এমন যে, বই বিক্রি না হওয়া, বা কম বিক্রি হওয়া মানে সেই বই ‘কালজয়ী’ হয়ে যাওয়া। শুধু তাই না, তারা এটিও মনে করেন, যাদের বই পাঠক কিনছেন, আগ্রহ নিয়ে পড়ছেন, তাদের লেখা ‘মানসম্মত’ নয়। সমস্যাটি হচ্ছে, তারা যে শুধু ওই নির্দিষ্ট লেখক বা লেখাকেই ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বা ‘হেয়’ করছেন তাও নয়। তারা বিশাল একটি পাঠক শ্রেণির ভাবনা, রুচি, অনুভূতিকেও ক্রমাগত আঘাত করতে থাকেন যে, তারা আদতেই পাঠক কিনা। এতে একটা দীর্ঘমেয়াদী সংকট তৈরি হয়। যাদের ‘সাধারণ’ পাঠক বলা হচ্ছে, তারা বই কিনতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন।

কী দরকার এই ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্সের যুগে এতো ঝামেলা সহ্য করে বই কেনার? এমনিতেই এই সময়টা হচ্ছে বিনোদন বা জ্ঞান বা চর্চার অসংখ্য বিকল্প উৎসের সময়। এই ডিজিটালাইজেশন মানুষকে অস্থির করে তুলছে।

এতো বাধা বিপত্তি, ‘নয়েজ’ পেড়িয়ে বই কিনতে আসা পাঠকটিকেও যখন আবার নতুন করে তার পরিচয় সংকটে পড়তে হয় কিংবা কটাক্ষের মুখোমুখি হতে হয়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই সামগ্রীক আগ্রহের জায়গাটাতে ভাঁটা পড়ে। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামগ্রীক প্রকাশনা শিল্প।

ম্যাসিভ টেকনোলজিক্যাল ডেভালপমেন্ট আমাদের এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, এটিকে ফেস করতে হবে এই সময়ের বাস্তবতায়ই।

আমার মনে হয়, সবার আগে বইয়ের প্রতি মানুষকে আগ্রহী করতে হবে, বই কেনায় আগ্রহ তৈরি করতে হবে। একটা অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।

লেখককে তার লেখা দিয়েই প্রমাণ করতে হবে সে পাঠকের কাছে যাবে, না দূরে থাকবে। সে কোন পাঠকের কাছে যাবে।

দিন শেষে পাঠকই নির্ধারক। এই জায়গাটিতে সেন্সিবল আচরণ করা গেলে আক্ষেপ কমবে। বইমেলা শেষে অবিক্রিত বইয়ের বিশাল মজুদ ঘরে নিয়ে লুকিয়ে রাখতে হবে না।

প্রশ্ন : বইমেলা কি বাংলা একাডেমির করা উচিৎ নাকি প্রকাশক সমিতির?

সাদাত হোসাইন : এই বিষয়ে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই।

প্রশ্ন : শোনা যায়, বেশির ভাগ প্রকাশক বই বিক্রি করে বইমেলার আনুষ্ঠানিক খরচই তুলতে পারেন না। বইমেলা বছর বছর এই আর্থিক ক্ষতিকে সম্প্রসারিত করছে কিনা? বইমেলা কি শুধু ‘উৎসব’ই থেকে যাচ্ছে?

সাদাত হোসাইন : বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বোঝাতে হবে যে, বই পড়াও স্মার্টনেস। রিকশায় কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার মতো বই পড়াও হতে পারে আধুনিক সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। আমি আবারো বলছি, আমরা একটা যুগসন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একটা ম্যাসিভ টেকনোলোজিক্যাল ডেভালপমেন্ট, যা এনসিওর করছে ম্যাসিভ কালচারাল চেঞ্জ। যা আমাদের জীবনব্যবস্থার, ভাবনার, অনুশীলনের প্রত্যেটি ক্ষেত্রে অকল্পণীয় পরিবর্তন নিয়ে আসছে। তাই এই পরিবর্তনের সাথে অভিযোজনের উপায় আমাদের খুঁজতে হবে।

এজন্য বইকেন্দ্রিক ইতিবাচক প্রচারণায় মনোযোগী হতে হবে। বইমেলা উৎসব হলেও ক্ষতি নেই। ক্ষতি হচ্ছে শুধু উৎসব হলে। এটা বুঝতে হবে।

প্রশ্ন : মেলার স্টল বিন্যাস কেমন হওয়া উচিৎ? যাতে পাঠক খুব সহজেই তার কাঙ্ক্ষিত স্টলগুলো খুঁজে পেতে পারেন?

সাদাত হোসাইন : এ বিষয়টা ডিজাইনাররা ভালো বলতে পারবেন। আমার মনে হয় এটি লক্ষ্য রাখা উচিত যেন কোনো স্টলই একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায় মূল মেলা থেকে।

প্রশ্ন : ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলসহ সারাদেশে কীভাবে সৃজনশীল বইয়ের দোকান গড়ে তোলা যায়?

সাদাত হোসাইন : সব কিছু আপনা আপনিই হবে পাঠক থাকলে। পাঠকের আগ্রহ থাকলে। সবার আগে পাঠক তৈরি করতে হবে। পাঠকের আগ্রহ না থাকলে মার্কেট করে লাভ নেই।

প্রশ্ন : বাজার কাটতি লেখকের প্রভাব ও প্রচারে বই সম্পর্কে পাঠক ভুল বার্তা পায় কিনা?

সাদাত হোসাইন : এই প্রশ্নের উত্তর আমি উপরে দিয়েছি। এই ভাবনাটিকেই আমার সমস্যাজনক মনে হয়। আপনি জোর করে একটা শিশুকেও তার অপছন্দের খাবার খাওয়াতে পারবেন না। সে উগরে দেবে। বইতো অনেক পরের ব্যাপার।

প্রশ্ন : আপনার বই কত কপি ছাপা হয়, কত কপি বিক্রি হয়—তা জানেন কিনা?

সাদাত হোসাইন : একটা মৌখিক ধারণা দেন প্রকাশক। তবে এই বিষয়ে সামনে সুস্পষ্ট লিখিত ডকুমেন্ট থাকবে বলে আশা করছি।

প্রশ্ন : গত বছর বইমেলায় পুলিশকে দেখা গেছে বইয়ের উপর নজরদারি করতে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

সাদাত হোসাইন : এ বিষয়ে আমার কথা হচ্ছে, মানুষের চিন্তার জগত উন্মুক্ত। সেখানে কি কারো পক্ষে কোনো নজরদারি করা সম্ভব? সম্ভব না। আর বইতো সেই চিন্তারই প্রতিফলন।

//জেডএস//

লাইভ

টপ