অনুভাই

Send
শারমিনুর নাহার
প্রকাশিত : ১৫:৩৮, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪১, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৯

একটা যুথবদ্ধ সম্পর্ক থেকে একটা অনু ফসকে গেল...এত দ্রুত কেনো চলে গেল? এত তাড়া ছিল? নিশ্চুপ! একটাক্ষণ যেন ইথারে মিলিয়ে গেল

প্রাণহীন প্রকৃতিতে পরস্পরের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এমনকি কণ্ঠস্বরও আজকাল ভাসে না। কেবল ইনবক্স। কিছুদিন আগেও আমরা পরস্পরকে ফোন করে খবরাখবর নিতাম। এখন সম্বল ইনবক্স। যেনবা কোনো দূর কুহেলিকার দেশে আমাদের আলয়। কেবল নক্ষত্রই একমাত্র যোগাযোগের হেতু। এমন বিশুষ্ক দিনে এক বিকেলে ধূসর নগরে আমাদের দেখা। সঙ্গে অবশ্যই তোমার গার্লফ্রেন্ড। আড়াল করতে চেষ্টা করলে না। আমাদের যদিও প্রেম ছিল না, কিন্তু একটু বোঝাপড়া তো ছিল। পরস্পর ছুঁইনি কখনও, কিন্তু চোখের ভাষায় যোগ ছিল—এ অস্বীকার করবে কিভাবে? গার্লফ্রেন্ডের কাছে ধরাও পরে গেল। হয়ত এতটুকু তার কাছে ধরা পরুক—এতে তার সঙ্গে দেনাপাওনা সহজ হবে—এই প্রত্যাশাও চালিত করছে তোমাকে। পরিস্থিতি স্থির বুঝে যত দ্রুত না গেলেও চলত, তিনি ততদ্রুত প্রস্থান করলেন। আমরা স্মৃতিধূসর ক্যাম্পাসের শ্যাডোতে বসে চায়ের কাপ হাতে নিলাম। ‘চল সেলফি তুলি’কোনো? এতদিন পরে দেখা! নাকি অন্যদের জ্বলন তুলবি বলে—তোর কেবল সবটাতেই বেশি বেশি। এতে বেশির কী হল বল, মনে তো তাই, বলেছে তোকে। আমি জানি... যেমনটা হয়...শুরু হল তুমুল ঝগড়া।

ক্রিং ক্রিং ক্রিং হাতব্যাগে মোবাইলটা খুঁজে দেখি, অনুভাই—কী হল আবার (স্বগত)। শারমিন! তুমি কি ক্যাম্পাসে? জ্বী অনুভাই। ও পাশ থেকে হো হো শব্দের হাসি। আমি ততধিক জোরে কী হয়েছে, কী হয়েছে অনুভাই বলতে লাগলাম। ধরা পরে গেছ, কে আমি না আপনি? আবার তুমুল হাসি। সঙ্গী চাবন্ধু ততধিক রাগ—বিরক্ত-মুখাভঙ্গি। অনুভাই বলছেন, শোন হয়েছে কী, জিপিআরএসে (তখন সবে আমরা ফোনে জিপিআরএস ব্যবহার করছি) নিয়ারবাই ফ্রেন্ড লিস্টে তোমাকে দেখাচ্ছে। জাস্ট সেভেন মিনিট দূরত্ব। আপনি কোথায়, আমি তো রিকশায় বাংলা একাডেমি থেকে বেরোলাম। আমিনকে (সরকার আমিন) দেখাচ্ছিলাম। দেখো আশেপাশে শারমিন আছে। এজন্য কল করে নিশ্চিত হলাম। রিকশা থেকে নেমে পড়েন অনুভাই, এককাপ চা খাই। আমার চাসঙ্গিও ততক্ষণে তুমুল হুল্লোর...। অপর পাশ থেকে অনুভাই বললেন, না এখন অন্য একটা কাজে যাচ্ছি আমরা। তুমি সময় করে এসো একাডেমিতে, কথা আছে। আচ্ছা আসবনে।।

কত কত্তদিন পরে আজ একাডেমিতে এলাম মনেই করতে পারছি না। সেই ফোনের পরে নানা কারণে- অকারণে অনুভাইয়ের সঙ্গে দেখা-কথা হয়েছে। হবে এটাই স্বাভাবিক। এই শুষ্ক শহরে প্রাণের মানুষের অভাব বড়। অনুভাই আমাকে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দিয়েছেন। কত কত কথা সেই শুরু থেকে, অনুভাই আজ জীবনের দাঁড়ি টেনে দিলেন—ফ্লাশব্যাকের মতো আমাদের গল্প ভেসে উঠতে থাকে। কোনোটা শেখার, কোনোটা অভিমানের, কোনোটা বেদনার। অনুভাইয়ের তত্ত্বাবধায়নের কাজ করেছি প্রায় আড়াই বছর। কাজের সম্পর্ক শেষ হাবার পরে নতুন সম্পর্ক শুরু হয়েছে। সেটা অনেক পরিণত এবং বোঝাপড়ার, অনেকটা নির্ভরতারও। কত প্রয়োজনে যে তার কাছে যেতাম! বানান তার মধ্যে অন্যতম। ফিটফাট, পারফেকশনিস্ট অনুভাই সব সময় নতুন প্রযুক্তির খবর রাখতেন, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, ঘড়ি কোন ব্রাণ্ড নুতন এলো কোনটা কার চেয়ে ভালো—এ খবর অনুভাই ছাড়া এ শহরে আমায় কে দেবে। একবার ছুটিতে কোথায় বেড়াতে গেলাম, ছবিগুলো এখনো তাকে পাঠালাম না কেনো—অভিযোগও আসত নিয়ম মেনে। দূরত্ব তৈরি হয়নি কখনও। নিজের খবরাখবরও জানাতাম। কোনোটা জানাতে অস্বস্তি হলে—নিজে যদি কোনোভাবে জেনে যেতেন, ফোন করতেন। এটা সেটা বলে মনোভাব বোঝার চেষ্টা করতেন। একটা স্নেহের পরশ লেগে থাকত কথায়। আড়াই বছর ডেসটিনিতে কাজের সময় আমাদের সবচেয়ে ভালো সময় কাটত আকরম স্যার (সৈয়দ আকরম হোসেন) এলে, কী তুমুল আড্ডা হতো সেইসব সন্ধ্যায়, ঘরে ফিরতে মন চাইত না। একটা যুথবদ্ধ সম্পর্ক থেকে একটা অনু ফসকে গেল...এত দ্রুত কেনো চলে গেল? এত তাড়া ছিল? নিশ্চুপ! একটাক্ষণ যেন ইথারে মিলিয়ে গেল।

৩১ জানুয়ারি ডেলটা হাসপাতালে তাকে দেখতে গেলাম—না দেখিনি—বাংলা একাডেমিতেও দেখিনি। কেনো দেখব? দেখার প্রয়োজন কী? সব তো ভেতরেই আছে। কফিন নিয়ে এম্বুলেন্সটা বিনা শব্দে চলে যাচ্ছে। ভেতরের মানুষটাকে ভেতরে বন্দি করে। 

 

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ