ক্রুশবিদ্ধ প্রেমিক প্রেমিকেরা

Send
তানজিনা সুলতানা সেজুঁতি
প্রকাশিত : ১৫:০০, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৩, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৯

চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চলমান সময়ের বাইরে গিয়েও অন্য কোনো সময় বা স্থান সম্পর্কে দর্শককে ভাবাতে পারার ক্ষমতা। কেনজি মিজোগুচি নির্মিত অ্য স্টোরি ফ্রম চিকামাতসু (১৯৫৪) এরকমই একটি চলচ্চিত্র যা একইসাথে এদো যুগের জাপান সমাজের শ্রেণি বৈষম্য এবং সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে দর্শককে ধারণা দেয়। চলচ্চিত্রটির নামের ইংরেজি অংশ দ্য ক্রুসিফাইড লাভারস থেকে জানা যায় যে, চলচ্চিত্রটি ১৭১৫ সালে চিকামাতসু মোনজ্যামন নির্মিত মঞ্চনাটক দা ইকোজিমুকাশি গোয়োমি থেকে অনুপ্রাণিত। সেই সময়ের সমাজের রক্ষণশীল আদর্শ এবং অবিচারকে দুজন হতভাগ্য প্রেমিক প্রেমিকার কাহিনীর মাধ্যমে তুলে ধরে মিজোগুচি নাটকটির উদ্দেশ্যটিকেই আরো জোরদার করেছেন।

১৯৫০ দশকের প্রথমার্ধে এবং মিজোগুচির কর্মজীবনের শেষের দিকে নির্মিত অ্য স্টোরি ফর্ম চিকামাতসু তার শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি । চলচ্চিত্রটি তথাকথিত নিষিদ্ধ প্রেম এবং কঠোর সামাজিক রীতিনীতি বিরুদ্ধে গিয়ে টিকে থাকার মর্মস্পর্শী গল্প যা একইসাথে প্রচণ্ড স্পর্ধারও।

চিকামাতসু নির্মিত আঠারো শতকের একটি নাটকের সংস্করণ আ স্টোরি ফ্রম চিকামাতসু সাজানো হয়েছে ধনসম্পদ ও সামাজিক অবস্থা বিশেষ করে তৎকালীন পুরুষদের সামাজিক পদমর্যাদার উপর থিতু এক দুনিয়ার আদলে। অতিলোভী এক কাগজ ব্যবসায়ী মন্দার মধ্যেও ভালো ব্যবসা করে, যেহেতু সে সম্রাটের জন্য বাৎসরিক দিনপঞ্জিকা বানায়। সে তার সম্পদ থেকে এক কপর্দকও ধারও দেয় না। এমনকি রক্তের সম্পর্কের কাউকেও। কর্মীদের সামান্য বেতনের ব্যয় বাদে তিনি জমিয়ে রাখেন বাকি সম্পদ। ঘটনার টানপোড়নে স্ত্রী ও তাঁর বিশ্বস্ত কর্মীকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করায় তাদের উপর যে অবিচার নেমে আসে সেটিই মূলত এই ছবিতে চিত্রিত হয়েছে। ভাগ্যের ফেরে তারা তাদের উপর নির্দেশিত হয় শাস্তি। মৃত্যুদণ্ড থেকে পালিয়ে যায় আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু তাদের পোড়া কপালে নেমে আসে একের পর এক করুণ পরিণতি।

সিনেমাটিতে সুনিপুণ সিনেমাটোগ্রাফার কাজুও মিয়াগাওয়া’র চমৎকার কাজ সূক্ষ্মভাবে যে সামাজিক নিপীড়নের অভিযোগ ফুটে উঠেছে তাকে আকিরা কুরোসাওয়া ব্যক্ত করেছেন একটি অসাধারণ শিল্পকর্ম হিসেবে “যা শুধু মিজোগুচি দ্বারাই নির্মাণ সম্ভব।”

দুইটি শিরোনাম চলচ্চিত্রটির দুইটি দিকের কথা বলে।  স্টোরি ফ্রম চিকামাতসু পরিস্থিতিগত বৈশিষ্ট্য, সম্প্রদায়ের ভেতরকার সম্পর্ক এবং অসংখ্য নিমজ্জিত গল্পের কথা তুলে ধরে অপরদিকে দ্বিতীয় শিরোনামটি, দ্য ক্রুসিফাইড লাভারস গল্পটির আরো গুরুতর প্রকৃতি তুলে ধরে, সামাজিক প্রত্যাশা ও নিয়মনীতি কিংবা সেই নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে স্বীকৃত গণ্ডী পেরোলে বা নিয়ম ভঙ্গ করলে তার কী পরিণাম হতে পারে ইত্যাদি। চলচ্চিত্রটির শুরুতে ব্যভিচারীদের শাস্তি হিসেবে ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ছায়ামূর্তি এক ঝলক দেখা হলেও পুরো চলচ্চিত্র জুড়েই তার ছাপ থেকে যায়।

প্রেমিক প্রেমিকার প্রণয় পরিণয় নিয়ে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কল্পকাহিনী গল্প-উপন্যাস। কিন্তু চিকামাতসু প্রেমের চেয়ে দুঃখ নিয়ে গল্প করেছে বেশি। এখানেই এটি নিজেকে আলাদা হিসেবে প্রমাণিত করে। শ্রেণীবিভাজনের সমাজে ওসান আর মোহেই এর মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক। মজার ব্যাপার হল ঘটনার উথালপাথালে তারা হয়ে যায় একই নৌকার যাত্রী।

দমনমূলক ও স্বৈরাচারী শক্তি দিয়ে সবাইকে জবাবদিহিতার সম্মুখে ফেলার এই রীতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে; যদিও এটি সামঞ্জস্যহীন। এই চলচ্চিত্রের মূলেই রয়েছে সমাজের এসব অসামঞ্জস্য এবং ওসান ও মোহেই এই সমাজেরই শিকার।গল্পটি মূলত বিচারহীনতারই প্রমাণ এবং দুঃখজনকভাবে সত্য আজকের দুনিয়ায়ও এই গল্প খুব একটা বিরল নয়।

মিজোগুচি আমাদের নানা ছকে বাঁধা নানা চরিত্রের এই প্রাত্যহিক জীবনকে তুলে ধরেছেন অসামান্য আবহসংগীত আর ফ্রেমের মিথস্ক্রিয়ায়। উৎকণ্ঠাময় গল্পের বুননে তুলে এনেছেন তৎকালীন সমাজব্যবস্থার একটি বিস্তৃত দৃশ্য, আঘাত করেছেন তার মূলে এবং ভাবিয়ে তুলেছেন দর্শকদের। মিজোগুচি অসাধারণ দক্ষতা ও ধৈর্যের মাধ্যমে গল্পটি বলেন, যা কোনোভাবে রাগ বা ঘৃণা প্রচার না করে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে আবেগ।

তাই দ্য ক্রুসিফাইড লাভারস চলচ্চিত্রটি দেখে আপনি ভাববেন, হয়তোবা রাগান্বিত হবেন, কিন্তু তার আগে এটি আপনার হৃদয় ছুয়ে যাবে। পুরুষতান্ত্রিকতা আর সমাজের সার্থন্বেষী আচরণে আপনি ক্রুশবিদ্ধ হবেন মুহুর্মুহু। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ