এক আকাশ শূন্যতা কেনজি মিজোগুচির চলচ্চিত্র-পাঠ: মিস ওয়াইউ

Send
অভী চৌধুরী পার্থ
প্রকাশিত : ১৪:১৮, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের মধ্যে এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এই প্রভেদের প্রাচীর অতিক্রম করতে চাওয়া আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। আর সেখানেই এই দ্বন্দ্বের মূলসূত্র। মনের প্রকোষ্ঠে জমানো আশা-আকাঙ্ক্ষা সমাজের তীব্র বিরোধিতার বিপরীতে কখনো কখনো অধরাই থেকে যায়। নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয় প্রচলিত ধারার সাথে। তখন আমার আমি মুখ লুকায় নিজের সৃষ্ট মুখোশের আড়ালে।

জাপানের চলচ্চিত্রের আকাশে অন্যতম নক্ষত্র কেনজি মিজোগুচি। ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের দশকে জাপানের চলচ্চিত্রের হাল শক্তহাতে ধরেছিলেন যে কজন চলচ্চিত্রকার তিনি তাদেরই প্রতিনিধি। নিজের জীবনের বাস্তব উপলব্ধির আলোকে অসামান্য জীবনবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তার সৃজনশৈলীর মাঝে। যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর রক্তক্ষরণের চেয়ে ব্যক্তিমনের রক্তক্ষরণ তার এই চলচ্চিত্রের অন্যতম দিক বললেও অত্যুক্তি হবে না। বরঞ্চ নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের আপাত সাধারণ ঘটনাপ্রবাহের ভেতরেই মিজোগুচি তুলে এনেছেন বৃহৎ সমাজের শঙ্কট।

তানিজাকি জুনিচিরো’র The Reed Cutter  উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ওয়াইউ সামা  বা মিস ওয়াইউ (১৯৫১) তার অন্যতম সৃষ্টি। ব্যক্তিজীবনের সম্পর্কের টানাপোড়ন মূখ্য বিষয়বস্তু হলেও পারিবারিক তথা সামাজিক পরিমণ্ডলের বিধি-নিষেধ, সংস্কার, গোড়ামী এখানে উঠে এসেছে প্রবলভাবে। ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীক্ষেত্র থেকে রুক্ষ বাস্তবতার ভার প্রতিফলিত হয়েছে। মূখ্য চরিত্রগুলির মাঝে না পাওয়ার এক তীব্র যন্ত্রণা, এক চরম শূন্যতা প্রতীয়মান হয়। সংলাপ নির্ভর এ ছবিতে অভিনয় করেছেন কিনিউ তানাকো, নবুকো ওতোয়া, ইউজি হোরি, কিওকো হিরাই, রেইকো কঙ্গো, এইজিরো ইয়ানাগি প্রমুখ।

শৈশবে পিতৃমাতৃহীন শিনোশুকে (ইউজি হোরি) ও একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে শিজুর (নবুকো ওতোয়া) বিবাহপূর্ব সাক্ষাতের সময় ভুলক্রমে শিজুর বড়বোন ওয়াইউ (কিনিউ তানাকো) কে ভালো লেগে যায় শিনোশুকের। ওয়াইউ সদ্য বিধবা এবং তার একটি পুত্রসন্তান আছে। কিন্তু শিনোশুকের কাছে ওয়াইউ স্বপ্নে পাওয়া একটি মুখ, যার ছবি শিনোশুকের মনজুড়ে জেগে থাকে অহর্নিশ। অন্যদিকে পুরুষ শাসিত সমাজের নিয়মে ওয়াইউ বাধা। কারণ নিজের ইচ্ছা থাকলেও ওয়াইউ তার শ্বশুর আলয়ের মতামতের অধীনস্ত। আর যখন ওয়াইউ ঐ বংশের সন্তানের জন্মদাত্রী। লোকচক্ষুকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়া সত্যিই দুরূহ । এমন অবস্থায় সব বুঝেই এগিয়ে আসে শিজু। শিনোশুকের সাথে তার বিয়েই হতে পারে ওয়াইউ- শিনোশুকে মিলনের একমাত্র পথ। এই ত্রিভূজের প্রতিটি প্রান্তেই রয়েছে একাকীত্বের এক বিশাল ক্ষেত্র যাকে প্রচলিত কোনো এককে ফেলে পরিমাপ করা যায় না। আর তাই তো এক মুখোশের আড়ালে সকলেই যেন সুখী হতে চায়!

বুদ্ধিমতী ওয়াইউ সরে যেতে চাইলেও কি সরে যেতে পারে? নাহ বৃত্তের আবর্তনে সেও যে সমান অংশীদার। মনোজগতের খিলটি যে সবসময় উন্মুক্ত শিনোশুকের জন্য। অন্যদিকে শিজু আর শিনোশুকে পরিবার গড়ে তুললেও এক আকাশ শূন্যতায় ভরে থাকে মনের প্রতিটি কোণ। এ যেন এক “ঘর ভরা মোর শূন্যতা”।

১৯৫১ সালে মিজোগুচি ‘দায়েই’ স্টুডিওর জন্য নির্মাণ করেন ছবিটি। অপেক্ষাকৃত শ্লথ গতির মনে হলেও অনেক ক্ষুদ্র বিষয়ের সংমিশ্রণ ছবিটিকে গতিময়তা দিয়েছে। এছাড়া প্রতিটি দৃশ্যই যেন ভেতরকার গল্পকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ইয়াগাওয়া কাজুওর অনবদ্য সিনেম্যাটোগ্রাফি ও ওতানি আইওয়া’র শব্দ সংযোজন ছবিটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

পারিবারিক গল্পনির্ভর ছবি হলেও তৎকালীন জাপানের সামাজিক অবস্থার আভাস মেলে এই ছবিতে। মিজোগুচির জীবনের ছাপ পরিলক্ষিত হয় ওয়াইউর প্রতি শিজুর বলিদানের ভেতর দিয়ে। জাপানের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, রীতি-নীতির পরিচয় পাওয়া যায় এখানে। আর সেই ‘রীতি-নীতি’ই আটকে দেয় সময়ের চাহিদা। এই দ্বান্দ্বিক অবস্থার ভেতরেই ঘুরতে থাকে ঘড়ির কাঁটা। কিন্তু তিনটি প্রাণের মনজগত সময়ের হিসেব মানে না, হয় না মনের গ্রন্থিমোচন। ছবির শেষের দিকে শিজুর কাছে ওয়াইউ’র উপহার কিমোনোর ভার বহনের শক্তি থাকে না। আর তাই তো ওয়াইউর কাছেই শিনোশুকে তার সবচেয়ে বড় উপহার রেখে যায় লুকিয়ে। কিন্তু এক আকাশ শূন্যতার ভীড়ে ওয়াইউ কি খুঁজে পায় বাঁচার অবলম্বন? উত্তর মিলবে মিজোগুচির ছবিটিতে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ