অনবদ্য নৈবেদ্যের কাব্য : সিস্টারস অফ দ্য গিয়ন

Send
নিকিতা রুবাইয়াত
প্রকাশিত : ১৬:২৫, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৫, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

জাপানের চলচ্চিত্র সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা অর্জনের জন্য যাদের চলচ্চিত্র না দেখলেই নয়, কেনজি মিজোগুচি তাদের মধ্যে অন্যতম। বিশের দশকের শুরুর দিক থেকেই ছবি বানানো শুরু করলেও মিজোগুচি স্বয়ং স্বীকার করেন ১৯৩৬ সালে নির্মিত ওসাকা এলেজি এবং সিস্টারস অফ দ্য গিয়ন  ছবির মাধ্যমেই একজন পূর্ণ নির্মাতার মর্যাদা লাভ করেন তিনি। সিস্টারস অফ দ্য গিয়নকে প্রায়ই ওসাকা এলেজির কাছাকাছি পর্যায়ের সিনেমা হিসেবে ধরে নেয়া হয়—কেননা মিজোগুচি এই দুই ছবিতেই সব ব্যবহার করেছেনে একই আর্টিস্ট, আবার দুটি ছবিতেই ফুটে উঠেছে তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর অবস্থান ও সংগ্রাম। বোদ্ধাদের মতে ওসাকা এলেজির পরেই বারবার উঠে এসেছে এই ছবিটির নাম, যদিও অনেকে সিনেমাটোগ্রাফীর দিক থেকে সিস্টারসঅফদ্যগিয়নককে দাবি করেছেন উৎকৃষ্টতর হিসেবে।

সিস্টার অফ দ্য গিয়ন  ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে জাপানের কিয়োটো প্রদেশের গিয়ন শহরবাসী দুই বোনকে ঘিরে। গিয়ন শহরটি আদিকাল থেকেই পতিতা এবং গেইশাদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। ছবির দুই প্রধান চরিত্র উমেকিচি এবং ওমুচা—পেশায় তারা গেইশা এবং সম্পর্কে বোন। ছবির পটভূমি বোঝার খাতিরে জাপানিজ গেইশা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা প্রয়োজন। জাপানি শিল্প ও বিনোদনের অন্যতম ধারক ও বাহক গেইশাদের ভুলবশত অনেকে যৌনকর্মী মনে করে থাকেন, কিন্তু গেইশাদের উদ্দেশ্য মূলত মানুষকে প্রমোদিত করা। পড়ন্ত যৌবনের উমেকিচি একজন আদর্শ গেইশা, সে নাচে-গানে আপ্যায়নে পটু এবং তার পেইট্রন অর্থাৎ খরিদ্দারের প্রতি অনুগত। তার ছোট বোন ওমুচা-কে অবশ্য মিজোগুচি এই নির্দোষ অবয়ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। ছবির শুরু থেকেই ওমুচাকে নানান ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে তাঁর খরিদ্দারদের অর্থসম্পদ আদায় করে নিতে দেখা যায়। নিজের রূপকে পুঁজি করে বিভিন্ন বিপদ থেকে ছাড়াও পেয়ে যায় সে। তার তুখোড় কলাকৌশল দর্শকদের বিনোদনের খোরাক যোগালেও শেষে তার জন্য ডেকে আনে এক দুঃখজনক পরিণতি। অবশ্য মিজোগুচি কিন্তু ভালোর জয় আর মন্দের পরাজয় দেখাতেও চাননি এখানে, কেননা নিষ্ঠাবান উমেকিচির জীবনেও অন্তে নেমে আসে দুর্দশা।

মিজোগুচির জীবন নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র কেনজি মিজোগুচি: দা লাইফ অফ অ্যডিরেক্টর থেকে জানা যায় গিয়ন সম্পর্কে আরো তথ্য। ওমুচা চরিত্রের অভিনেত্রী ইসুজু ইয়ামাদা বলেন, অভিনয়ে মিজোগুচিকে সন্তুষ্ট করা ছিল ভারি কঠিন। ছবি তৈরির আগে সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট হাতে পাননি তিনি, তবে ওসাকা এলেজিতে অভিনয়ের সুবাদে মিজোগুচির সাথে কাজের অভিজ্ঞতা ছিলো আগেই। তার অনুরোধেই একরকম নাম লেখান এই ছবিতে। ছবির চিত্রনাট্যে রাতারাতি বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসা, এমনকি শুটিং চলাকালেও ছবির কাহিনী বদলানো ছিল মিজোগুচির নিত্যকার অভ্যাস। ছবিটির শেষাংশ কি আদৌ পূর্বপরিকল্পিত ছিল নাকি শেষমুহূর্তের ঝোঁক ছিলো, তাও জানা নেই কারো।

ছবিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এর দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি। ছবিতে ব্যবহৃত আড়াই থেকে তিন মিনিট দীর্ঘ শটগুলোই পরবর্তীতে মিজোগুচির সিগনেচার স্টাইল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সিনেমাটি বানানোর পিছনে তার মূল প্রয়াস ছিল গিয়ন শহর—যা অনেকের কাছেই প্রমোদনগরী হিসেবে পরিচিত— তার অন্ধকার দিক তুলে ধরা। ছবিটির চিত্রনাট্যকার ইয়োশিকাতা ইয়োডাকে প্রথমে দুই ভাইয়ের কাহিনী লিখতে বলেছিলেন মিজোগুচি, এরপর শেষমুহূর্তে মত পাল্টে জানান ছবিটি নির্মিত হবে দুই বোনকে নিয়ে। এর সুস্পষ্ট কারণ জানা যায়নি কখনো, কিন্তু ছবির প্রযোজক গোরো কোন্তাইবো জানান তিনি এককালে ওমুচা নামের একজন গেইশার প্রেমে পড়েছিলেন। তিনি মিজোগুচিকে বলেছিলেন, এইসব গল্পগুলো কেউ দেখে না, বা দেখলেও অন্যদের দেখার সুযোগ করে দেয় না। হয়ত তার কথায়ই প্রভাবিত হয়েছিলেন মিজোগুচি।

সিস্টারস অফ দা গিয়ন ছবিতে ফুটে উঠেছে সুস্পষ্ট নারীবাদী চিন্তাও। ছবির শেষ দৃশ্যে ওমুচার আহাজারিতে ফুটে ওঠে তৎকালীন এবং বর্তমান সমাজের নারীর অবস্থান। দিন শেষে নারীকে কেন প্রমোদিনী রূপেই দেখতে চায় সমাজ, এই জিজ্ঞাসার মাধ্যমে শেষ হয় ছবিটি। ছবিটির আরেক চমকপ্রদ দিক হচ্ছে এর নির্ভেজাল সেটিং, যা আসলেই শুট করা হয়েছিলো গিয়নের নিচুশ্রেণির একটি চা ঘরে (টি হাউজ)। এই ঐতিহ্যবাহী চা ঘরগুলোই ছিল গেইশা এবং তাদের খদ্দেরদের মিলিত হওয়ার স্থান। ছবির নেপথ্য চরিত্রে কাজ করেছেন কয়েকজন পেশাদার গেইশাও।  

//জেডএস//

লাইভ

টপ