সাঁশোঁ দ্য বেইলিফ : মিজোগুচির রূপকথা নয়

Send
মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশিত : ১৭:০৬, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৮, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

ঈশ্বরের চোখের মতো মিজোগুচির ক্যামেরা পাহাড়ের খাঁজ কেটে-কেটে জাপানি স্কল পেইন্টিং হয়ে নেমে আসে ট্যাঙ্গো উপত্যকায়, তারপর নীল-রশ্মি আর জাপানি বাঁশি-বীণার মোহন সংরাগে গড়ে তোলে এক আশ্চর্য রূপকথা—যেই রূপকথার কুশীলবেরা এগারো শতকের জাপানি দাসজীবনের গল্প করতে করতে পাহাড়ের গিরি-খাদ বেয়ে নেমে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বারুদ-আতপ্ত গন্ধের ভেতর। রঙমিস্ত্রী পিতা—রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় রেইনকোর্ট বিক্রেতা পিতার দারিদ্র‌্য-জর্জর পরিবারে জাপানি চলচ্চিত্রের ধ্রুব এই নির্মাতা—কেনজি মিজোগুচির শৈশব আক্রান্ত হয় দারিদ্র্যের কষাঘাতে বড় বোনের নির্দয় গমন যখন বাজারি নাট্যমঞ্চে এবং যৌনপল্লীতে। ১৯১২-তে চাচার পৃষ্ঠপোষকতায় থাকার সময় টোকিওর একটি আর্ট স্কুলে শেখা চিত্রসৃষ্টির কৌশল পরবর্তীকালে ভীষণ কাজে লেগে যায়, জাপানি আর এক মহিমান্বিত কথাকার মোরি ওগাইয়ের সাঁশোঁ দ্য বেইলিফকে যখন সেলুলোয়েডে বিনির্মাণ করলেন। নীল-রশ্মি আর জাপানি বাঁশি-বীণার সাথে একাকার হয়ে মিশে যায় বড়বোন ও মায়ের সেই পতিত জীবন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আশ্রয়হীন মানুষেরাও এসে রূপকথার মতো মিশে যেতে থাকে  সাঁশোঁ দ্য বেইলিফএর সাঁশোঁর দাস-খামারের আধ-ঝলসানো মানুষগুলোর সাথে। মিজোগুচির ক্যামেরা বিশাল বিস্তার নিয়ে লোকেশানের বাইরে ক্রীড়া করতে করতে ধরে ফেলে চিরকালের সাঁশোঁর রাজ্য—যেখানে মানুষের দাসজীবন ভ্যাঁবসা হয়ে ওঠে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে একজন জুশিও-আদর্শ গভর্নরের ছেলে, একজন মাতসু ওয়াকা হয়, দাস; আবার সে-ই হয়ে ওঠে তাইরা মাসামিসি—মানবতার দূত, ট্যাঙ্গোর নতুন গভর্নর—এ সত্যিই রূপকথা—তবু রূপকথা নয়।

যুদ্ধকালীন সময়ে নিপীরিত কৃষকের আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠার জন্যে সামন্ততান্ত্রিক ধর্মশাষকের খড়্গ উঠে আসে জুশিওর আদর্শবাদী পিতা, তাইরা মাসিউসির উপর—যিনি মনে করতেন সকল মানুষ পৃথিবীতে সমান, সকলের সুখী হওয়ার অধিকার আছে; তাকে দেওয়া হলো স্বপরিবারে নির্বাসনে। জুশিওর বাবা ছোট বোন, মা আর একজন নারী ভৃত্যসহ তার কাকার কাছে চলে যাওয়ার আদেশ দিয়ে নিজে নির্বাসনে যান। যাওয়ার সময়—একটা ছোট স্মারকভাস্কর্য জুশিওর হাতে দিয়ে কিছু ব্রতবাণী শিখিয়ে দিয়ে যান। পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে, ঝরনার বিহ্বল ধারার পাশ দিয়ে মায়ের সাথে চলতে চলতে এক নির্জন জঙ্গলের ভেতরে রাত হলে, সেখানেই রাতের ক্যাম্প। নেকড়ের ভয়ে ছোটবোন মাকে জড়িয়ে যখন ঘুমাচ্ছে, সেই জঙ্গলে এলেন প্রতারক পুরোহিত; মিথ্যে প্রলুব্ধ করে পুরোহিত ডেরায় নিয়ে গেলেন তাদের। সকাল হলে, জলপথে নিরাপদে তাদের পৌঁছানোর ব্যবস্থ্যা করে দেবেন বলে—সেই পুরোহিত হয়ে উঠলেন খলনায়ক—মাকে বেঁচে দিলেন বেশ্যার দালারের কাছে, আর জুশিও ও বোন আনজুকে করলেন সাঁশোঁর দাসখামারে নিক্ষেপ। পুতুলের মতো আনজুকে কোলে জড়িয়ে নিলো মাতৃরূপা দাসী—নামিজি। 

মিজোগুচির আশ্চর্য ক্যামেরা ঘুরতে থাকলো সাঁশোঁর পরগণার ভেতরে। সাঁশোঁর পরগণা ফুলে উঠছে। সন্তোষজনক কর আদায়, সম্পদের সঠিক সুরক্ষায় রাজ্যপ্রধানের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন সাঁশোঁ। চিরকালই মানবতার দূতেরা এসে দাঁড়ায় নিপীড়িতের কাছে, স্বয়ং সাঁশোঁর সন্তানই ভেতরে ভেতরে জুশিও ও আনজুর পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে; কিন্তু পিতার এই নির্দয় বৃত্ত থেকে সে নিজেই একদিন পাহাড়ের নির্জন ঢাল বেয়ে চলে যায় মিজোগুচির ক্যামেরার সাথে সাথে—উদরতা ও মানবতার মগ্নধ্যানে।

সাাঁশোঁর সুতাবোনার কারখানায় আনজু হঠাৎ বিহ্বল হয়ে ওঠে পাশের কর্মীর কণ্ঠ হতে ভেসে আসা এক আশ্চর্য সংগীতে,

জুশিও, তোমার থেকে আমি কতদূরে

আনজু, তোমার থেকে আমি কতদূরে

কী নির্দয় দুর্বিপাক

আমি বিক্রি হয়ে গেছি, আমি বিক্রি হয়ে গেছি যৌনদাসীরূপে

যেই সংগীত সাডো দ্বীপের মানুষের কাছে অতিপরিচিত। আনজু কান্নাপ্লুত হয়ে ওঠে—গানের চরিত্র তো ওরাই, দুই ভাইবোন। ওর মায়ের ছবি ভেসে ওঠে মিজোগুচির ক্যামেরায়। সেই সাডো দ্বীপে তাদের মা কী আজো বেঁচে আছে—অস্থির হয়ে ওঠে।

সামন্ততান্ত্রিক খোঁয়াড়ে মানুষের প্রতিনিধি হয়ে আটকা পরে জুশিও, আনজু, নামিজির মতো হাজারো। ৫০ বছর ধরেও দাসবৃত্তিকরা অশীতিপর বৃদ্ধকেও সাঁশোঁর বেড়া থেকে পালাতে গিয়ে নির্মম শাস্তি পেতে হয়। কেবল মৃত্যুর পরে রেহাই। নামিজি পেলো সেই পথ। আনজু ও জুশিও টের পেয়েছিলো—এখনো প্রাণ আছে নামিজির। পতিতভূমিতে নামিজিকে ফেলে দিতে যাওয়ার সুযোগে ভাইবোন পালিয়ে যেতে চায়, কিন্তু সাাঁশোঁর প্রহরী থাকে সাথেই। দুজন একসাথে পালিয়ে না গিয়ে আনজু জুশিওকে পালাতে সাহায্য করে। আনজু পালাতে পারে না। বাঁশপাতার ঝিরিঝিরি ছায়া পড়া জলাশয়ের জলে নিজেকে ডুবিয়ে দেয় আনজু।

শুরু হয় সত্যিকথার রূপকথা—সাঁশোঁর বাহিনী বৌদ্ধমন্দির তছনছ করেও খুজে পায় না জুশিওকে। এক নির্জন প্রকোষ্ঠে এক ভিক্ষু জুশিও আর নামিজিকে আশ্রয় দেয়। নামিজিকে সুস্থ করে তুলতে চেষ্টা করে। জুশিওর পারিবারিক পরিচয় জানার পর ভিক্ষু একটি চিঠি লিখে জুশিওকে পাঠায় রাজ্যপালের কাছে। রাজ্যপালের লোকেরা তাকে গুপ্তচর ভেবে গরাদে আটকায়, জুশিওর পোশাকের ভেতর থেকে উদ্ধার করে তার বাবার দেওয়া সেই স্বারক ভাস্কর্য। রাজ্যপালের লোকেরা রাজ্যপালের হাতে দিলে, রাজ্যপাল চমকিত হয়। এই স্বারক ভাস্কর্যটি রাজ্যপালের পূর্বপূরুষের, জুশিওর বাবা—তাইরা মাসাউজি মহৎকাজের জন্যে এই ভাস্কর্য উপহার রূপে পেয়েছিলেন। জুশিওকে ডেকে পাঠানো হলো—ট্যাঙ্গোর শূন্য গভর্নরের পদে স্থলাভিষিক্ত হলো জুশিও।

সাঁশোঁর কাছে পুরো গল্পটাই হয়ে উঠলো রূপকথা, আর বন্দী সকল দাসেদের জন্যে হলো মুক্তির গান। ট্যাঙ্গোতে নিষিদ্ধ হলো দাসব্যবসা। শ্রমিকেরা কাজ করে পাবে পারিশ্রমিক। ফিরে যেতে পারবে পরিবারের কাছে, আপন ঘর-গৃহস্থালিতে।

কিন্তু আনজু; বোন-কোথায়? কেউ খোঁজ দিতে চায় না, বৃদ্ধা এক দাসী জানায়—আনজুর আত্মহত্যার কথা। আর মা—চিরব্যথিত মা...

স্যাডো দ্বীপের যৌনদাসীদের ছোট ছোট কামরা ঘুরে ফিরে আসে মিজোগুচির ক্যামেরা। জুশিও মায়ের খোঁজ পায় না।  মিজোগুচির ক্যামেরা চলে যায় এক বিশাল নির্জন সমুদ্রের পাড়ে, কিছুকাল আগের সুনামিতে হারিয়ে গেছে এখানকার দশজন মানুষ। সেই মানুষের ভেতরে কী তার মা-ও হারিয়ে গেছে। বিশাল সমুদ্রের পাড়ে একজন জুশিও, একজন দাস, একজন গভর্নর আর কেবলি পৃথিবীর সমস্ত মানুষ যেনো একজন মানুষ হয়ে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে মাতৃছায়ায় নিজেকে বিছিয়ে দেওয়ার জন্যে। তখন ভেসে আসে সেই গান, সেই পরিচিত গান, সাডো দ্বীপের; গানের প্রবাহ ধরে হেঁটে যায় জুশিও। মা কিছুতেই আস্বস্ত হয় না, আবারো কেউ যেনো তাকে মিথ্যে প্রলুব্ধ করছে সন্তানের কথা বলে। তখন সেই স্বারক ভাস্কর্য হয়ে ওঠে সত্য-মিথ্যার যোগমাধ্যম। ততক্ষণে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যাওয়া মায়ের চোখ আর সন্তানকে দেখে না। হাতের স্পর্শই হয়ে ওঠে দৃশ্য। আনজুর জন্যে বিলাপ করে আবারো মুর্ছা যায় তামাকি—মা।

বাঁশির মোলায়েম সুরকে আবহ করে সমস্ত গল্পটা বলে চললেন—কেনজি মিজোগুচি। আশ্চর্য এই চলচ্চিত্রকারের ৮০টার মতো চলচ্চিত্র, সেসবের ৫০টিই সংরক্ষিত হয়নি। বাকি টিকে যাওয়া ৩০টি চলচ্চিত্রের ভেতরে সাঁশোঁ দ্য বেইলিফ মিজোগুচির ন্যারেটিভ নির্দেশনার ভেতরে অনন্য। নিজের পারিবারিক জীবনের যন্ত্রণার সাথে মিশে যাওয়া ধনতান্ত্রিক ও পোষাকিধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রবেত্তাদের কুৎসিত-কদাকার কুকাণ্ড চিরকালই মানুষকে দাস করে তোলার কুশীলবদের জন্যে মিজোগুচির এই দৃশ্যায়ন এমন এক হাতিয়ায়—যার সম্মুখে এসে মুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে সাঁশোঁর রাজ্য। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ