আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ১২

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৬:০০, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯

আন্দামান জনজাতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ এই সকল ব্যক্তিত্ব যেমন ডা. রতনচন্দ্র কর, ভক্তোয়ার সিং, এ্যানথ্রোপলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রধান টি. এন. পন্ডিত, এ. জাস্টিন প্রমুখের কথা ভাবতে ভাবতেই হোটেল গুরু ইন্টারন্যাশনালের আলুভর্তা-ভাত-ডিম-ডালের বাঙালি খাবার খেয়ে ঘুমুতে গেলাম ২৯ আগস্টের রাতে। এ রাতেও পুরো আন্দামানী বৃষ্টি, রাত দুটোর দিকে একবার ঘুম থেকে জেগে বৃষ্টির অবস্থা দেখে মনে হলো জারোয়া রিজার্ভ যাওয়ার সৌভাগ্য এ যাত্রায় আর হচ্ছে না। ভাগ্য প্রসন্ন হলো। রাত তিনটার দিকে বৃষ্টি মুষলধারা রূপ থেকে ইলশেগুঁড়িতে পৌঁছলো। তড়িঘড়ি জোগাড় হয়ে নিলাম। তিনটা পঞ্চাশের মধ্যে হেঁটে হেঁটে বাসস্ট্যান্ড পৌঁছলাম। তখনো কদমতলার বাসটি টার্মিনালে লাগানো হয়নি। দিঘলিপুরের একটি বাস রওনা হলো। এর পরই কদমতলার বাসটি টার্মিনালে লাগলো। বাসের চেহারা-সুরত খুব আপন মনে হলো। একেবারে আমাদের বরিশালের রূপাতলী থেকে যে-সকল লোকাল বাস পিরোজপুর বাগেরহাট, পাথরঘাটা, লেবুখালী, পটুয়াখালি, আমতলীর উদ্দ্যেশ্যে ছাড়ে—সব বাস ঠিক সেই চেহারার। একখানা ছবি তুলে দেশে বন্ধুবান্ধবদের যদি দেখাতে চাই যে আমি আন্দামান গিয়েছিলাম—এই দেখ, পোর্টব্লেয়ারের সেন্ট্রাল বাস টার্মিনালে আমার ছবি। তো সাথে হি-হি হাসির হররা উঠবে আর বলবে—মিয়া, টুপি মাথায় দিয়া গুল মারার আর জায়গা পাওনা; ও তো সবই আমাগো রূপাতলী টার্মিনালের বাস আর মিনিবাস; খালি কতগুলো হিন্দি অক্ষর পাশে থাকলেই কি আমাগো রূপাতলীর বাসটার্মিনালখানা পোর্টব্লেয়ার হইয়া যাইবে নাকি? এই ভয়ে আর ছবি টবি না তুলে বাসে উঠে বসলাম। বাসে উঠে তো আরো ভিরমি খেলাম। পোর্টব্লেয়ার রাস্তাঘাটে লোকজন কী সব হিন্দি তামিল ইত্যাদি বলে বুঝি না। আর বাসে ওঠামাত্রই দেখলাম সবগুলো মানুষের জবান মাশাল্লা বাংলায় খুলে গেছে। ডাইনে কথা বাংলা, বামে কথা বাংলা, পিছনে কথা বাংলা। খালি কন্ডাকটর লোকটিই বেহুদা কতখানি হিন্দি কইলো। আবার মানুষগুলো কে কোথায় যাবে শুনে, আর পাশে দাঁড়ানো বিভিন্ন বাসে খালি খালি ইংরেজিতে লেখা বাংলা নামগুলো দেখে তো আরো তাজ্জব। কোনোটা যাবে দিঘলিপুর, কোনোটা আমকুন্ড, কোনোটা জয়পুর, কোনোটা সুবাসগ্রাম, কোনোটা বেতাপুর। সব দেখি আমাদের বাকরগঞ্জ, বরগুনার চির চেনা সব আপন নাম। খটকাই লাগছিল-  আমি কি সত্যিই আন্দামান এসেছি, নাকি আলেকান্দা থেকে এই ভোররাতে আলেখারচর বা হোগলাবুনিয়ার কোনো ঠিকানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছি।

এই সন্দেহ বাস ছেড়ে দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কাটলো। ভোররাতের নিরিবিলি নিয়ন আলোতে রাস্তার পাশের সাইনবোর্ডগুলোয়  যে লেখা চোখে পড়ছিল সে-গুলোতে দেখছিলাম সড়কের নাম। কোথাও আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড, পুরোটাই লেখা। কোথাও সংক্ষেপে লেখা এ.টি.আর. অর্থাৎ আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড। এই সেই কুখ্যাত ট্রাঙ্ক রোড যা-ই মূলত হাজার হাজার বছরের প্রস্তরযুগীয় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। গ্রেট আন্দামানিজ, ওঙ্গি ইত্যাদি আদিম জনজাতি নিশ্চিহ্নকরণ শেষে জারোয়াদের জীবনও বিপন্ন করে তোলার ব্রত পালন করে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালে দক্ষিণ আন্দামানের সাথে মধ্য ও উত্তর আন্দামানের উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের গ্রামগুলোকে সংযুক্ত করার লক্ষে এই ট্রাঙ্ক রোডের নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে রাস্তাটি ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়।  পোর্টব্লেয়ার থেকে দিঘলিপুর পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ২৩০ কি.মি.। ভারতীয় জাতীয় সড়ক ব্যবস্থায় এই সড়ক এন. এইচ. ৪ নামে পরিচিত। এই রাস্তা ধরে ১৯৯৭ সালে ও ২০০৬ সালে দুই বার জারোয়াদের মাঝে পৌঁছেছে কঠিন হাম রোগ। এই রাস্তা ধরে আগত ট্যুরিস্টদের দেয়া খাবার খেয়ে জারোয়াদের মাঝে প্রাদুর্ভাব ঘটেছে ব্যাপক পেটের পীড়ার।

জারোয়া জনজীবনের উপর এই সড়কের এমন প্রভাব আদিম জনজাতির শুভানুধ্যায়ীদের অনুভবে আসার পর এই রাস্তা বন্ধের পক্ষে কোলকাতা হাইকোর্ট একটি মামলা উঠেছিল। পরবর্তীতে মামলাটি ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। এই রাস্তা বন্ধের পক্ষে লড়েছিল ‘দি সোসাইটি ফর আন্দামান এন্ড নিকোবর ইকোলজি’ এবং  সাথে আরো কিছু সংগঠন। এই মামলায় ২০০১ সালে সুপ্রিমকোর্ট আদেশ দেয়—

ক) এই রাস্তার মাধ্যমে জারোয়া জনজাতির সাথে সভ্য জনগণের সংস্পর্শ যাতে সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।

খ) জারোয়াদের জন্য মধ্য আন্দামান ও অন্যান্য যে-সব জায়গায় রিজার্ভ ফরেস্ট রয়েছে সে-সকল স্থান থেকে জারোয়াদেরকে অন্যত্র সরানো যাবে না।

গ) এই রাস্তার আর সম্প্রসারণ করা যাবে না এবং জারোয়া রিজার্ভ এলাকায় এর কোনো প্রশাখাকরণ করা যাবেনা।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ দশকে আন্দামান নিকোবর প্রশাসন জারোয়াদেরকে ধরে এনে দুটি গ্রামে আটকে দিয়ে একটি নতুন জীবনের পত্তনের কথা ভেবেছিল। পরিকল্পনা ছিল সেখানে মাছের চাষের ব্যাপক প্রকল্প হবে, যেখানে মাছ ধরে জারোয়ারা মজা পাবে। সেখানে জারোয়াদের পোশাক কী হবে তাও তারা পরিকল্পনা করেছিল। ২০০১ সালের এই রায়ের আলোকে ২০০৪ সালে এই প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়।

এই রায়ের আলোকে ২০০৮ সালে আন্দামান ও নিকোবরের প্রশাসনের পর্যটন দপ্তর কড়াভাবে নিন্মোক্ত নির্দেশনাসমূহ প্রদান করেছে—

ক) কোন ট্যুর অপারেটর তাদের গাড়ী জারোয়া রিজার্ভ এরিয়ায় থামতে পারবে না এবং ট্যুরিস্টদেরকে রাস্তায় নামাতে বা রাস্তার পাশের কোন জায়গার সাথে সংস্পর্শের ব্যবস্থা করতে পারবে না।

খ)  জারোয়া রিজার্ভ এরিয়ায় কোনো ট্যুরিস্ট কোনো ছবি তুলতে পারবেনা।

গ) জারোয়াদেরকে সাধারণ কেউ কোনো খাবার বা কাপড় চোপড় প্রদান করতে পারবে না।

এতসব বিধির দ্বারাও কাজ হচ্ছে না। ট্যুরিস্টরা ঠিকই জারোয়া এলাকায় গাড়ি থেকে খাবার-দাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে জারোয়াদের উদ্দেশ্যে। জারোয়ারাও বিনাশ্রমে খাবার পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন তাদের রিজার্ভের ওপর দিয়ে বয়ে চলা রাস্তার ধারে জড়ো হচ্ছে এবং খাদ্য চেয়ে অনেকটা ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেছে। এমন অবস্থায় ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারী বিচারপতি সিংভি ও গোখলের বেঞ্চ এ মর্মে এক অন্তর্বর্তী আদেশ দিলো যে,  ট্রাঙ্ক রোডে ধরে কোনো ট্যুরিস্ট জারোয়া রিজার্ভ এরিয়া পার হতে পারবে না, অর্থাৎ ট্যুরিস্টবাহী যানবাহন জারোয়া এলাকার মধ্য দিয়ে ট্রাঙ্ক রোড ধরে যেতে পারবে না। পুনর্বাসনপ্রাপ্ত মধ্য ও উত্তর আন্দামানের জনগণ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলো। আপিলে সুপ্রিম কোর্ট জারোয়া রিজার্ভের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া ট্রাঙ্ক রোড আবার খুলে দিলো, তবে সাথে নির্দেশনা দিলো—

ক) জারোয়া রিজার্ভের মধ্য দিয়ে শুধু দিবাভাগে চারটি নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহন চলতে পারবে।

খ) প্রতিবার যানবাহনের সারি প্রহরার জন্য সারির সামনে পুলিশি এসকর্টের গাড়ি থাকতে হবে যারা প্রহরায় থাকবে যাতে সামনে পিছনে কোনো গাড়ি থেকে এমন কিছু করা না হয় যা নিষিদ্ধ।

গ) জারোয়া রিজার্ভের মধ্য দিয়ে যাওয়ার রাস্তার দুই মাথায় চেকপোস্ট বসাতে হবে যাতে নির্দিষ্ট চার সময়ের বাইরে কোনো গাড়ি জারোয়া রিজার্ভে ঢুকতে না পারে।

এ কারণেই দিঘলিপুর, কদমতলা, মায়াবন্দর, রঙ্গত ইত্যাদি এলাকর গাড়িগুলো পোর্টব্লেয়ার থেকে অনেকটা একই সময় ছাড়ে যাতে জারোয়া রিজার্ভ এলাকার গেট খোলার নির্দিষ্ট সময়ে তারা চেকপোস্টে একত্রে পৌঁছতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা  এবং আন্দামান জনজাতির পক্ষে কর্মরত সংগঠনসমূহের প্রয়াসে জারোয়াদেরকে সভ্যতার মূল্য রাতে তুলে আনার রাজনৈতিক বাতিক অনেকখানি দূর হয়েছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত শোনা গেছে স্থানীয় লোকসভার সদস্য পর্যন্ত বলেছেন যে, জারোয়াদেরকে কাপড় পরানো হোক। তাদের বাচ্চাদেরকে ধরে এনে স্কুলে ভর্তি করা হোক, কারণ তারা সভ্যতার আলো থেকে দূরে অমানবিক অন্ধকারে আছে। কিন্তু সভ্যকরণের এই প্রচেষ্টা ওঙ্গি ও গ্রেট আন্দামানিজদের যে কীভাবে ধ্বংস করেছে তা রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে ধীরে ধীরে হলেও বোঝানো গেছে। আসলে সভ্য কারা- ঐ উলঙ্গ প্রকৃতির সন্তানগণ, না কি কাপড়-পরা ও মুখোশ-পরা নগরের জনগণ? এ প্রশ্নও তাদের বিবেচনায় আনা সম্ভব হয়েছে। 

২০১১ সালে আদিবাসী কল্যাণ মন্ত্রী কান্তিলাল ভূরিষা বলেছেন—আদিবাসীদেরকে সমাজের মূল্য রাতে শামিল করার প্রয়াস ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। এতদপ্রেক্ষিতে এখন সরকার ঘোষণা করেছে জারোয়াদের মাঝে কোনো ধর্ম প্রচার করা যাবে না। তাদেরকে পোশাক দেয়া যাবে না যদি তারা না চায়। তাদের রিজার্ভ ফরেস্টে কোনো স্কুল করা যাবে না। তাদের রিজার্ভে  খাবার উৎপাদন পর্যাপ্ত আছে কিনা সেটা খেয়াল রাখতে হবে, কিন্তু তাদেরকে লোকালয়ের রান্না করা বা ফ্যাক্টরিতে তৈরী কোনো খাবার দেয়া যাবে না কারন এ খাবার তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিলোপ করবে।

আন্দামান জনজাতির পক্ষের সংগঠনগুলো আন্দামান ট্রাংক রোডের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের অক্টোবরে সরকারকে রাজি করিয়েছে পোর্টব্লেয়ার থেকে উত্তর আন্দামানে যাওয়ার জন্য পূর্বের  সমুদ্রপথটি আবার  চালু করতে। কিন্তু সরকার এখোনো এই নৌপথকে বাধ্যতামূলক করতে পারেনি। বাধ্যতামূলক করতে পারেনি যে, ট্যুরিস্টরা ট্রাঙ্ক রোড ধরে জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্য দিয়ে যেতে পারবে না। ফলে বর্তমানে সংরক্ষিত দুটি জারোয়া রিজার্ভই ট্রাঙ্ক রোডের অত্যাচারের শিকার। মধ্য আন্দামান থেকে উত্তর আন্দামান পর্যন্ত বিশাল ভূখন্ডে জারোয়াদের জন্য সংরক্ষিত তিরু ও  হংসপুরীর দুটি রিজার্ভ ফরেস্টই আজ এক ধরনের হিউম্যান সাফারিতে পর্যবসিত হয়েছে। সভ্য জগতে মানুষ সাফারি পার্কে যায় মুক্ত বাঘ সিংহ জাতীয় বন্য প্রাণী দেখতে।  আর এখানে ট্যুরিস্টরা যায় মুক্ত বন্য মানুষ জারোয়া দেখতে। সভ্যরা এখনো মানুষকে মানুষ ভাবার মতো সভ্য হয়নি। ব্যাপারটি সভ্যজগতের জন্য অনেক লজ্জাকর।

এই লজ্জাই অনুভব করছিলাম মনে মনে, কারণ আমরাও তো এই রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছি যাতে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো দু’চারজন জারোয়া দেখতে পাই। এভাবে ভাবতে ভাবতেই সকাল ৮টা ৯টার দিকে বাস এসে দাঁড়ালো বারাটাঙে প্রথম জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্টের সামনে। চেক পোস্টে। সবাইকে নামতে হলো। কারো কোনো ক্যামরা বা ভিডিও নেয়া চলবে না। সবার র‍্যাপ (RAP = Restricted Area Permit) চেক করা হলো। আমাদের র‍্যাপের ফটোকপি না থাকায় প্রথমে তো মনে হলো আমরা ঢুকতেই পারবো না । পরে অবশ্য ঢুকতে দিলো আর বললো আমরা যেন রিজার্ভ ফরেস্টের ওপারে বারাটাং জেটির পাশে র‍্যাপ ফটোকপি করিয়ে, পরে যাওয়ার পথে দিয়ে যাই। বলা মাত্র রাজি হয়ে গেলাম। সময় হয়ে গেল সবগুলো বাহন একত্রে রিজার্ভ ফরেস্টে ঢোকার।

ফরেষ্টে ঢোকার পর থেকেই ঘাড়খানে ৯০ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে বাকা করে বাসের বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি জারোয়া দেখবো। জীবনের জন্য একখানা বিশাল গল্প তৈরী হবে যে, আমি আন্দামানে গিয়ে জারোয়া দেখেছি। আর সেই দেখা যদি হয়ে যায়  তাওলের মতো বাংলা বলতে পারা কোনো জারোয়ার সাথে তাহলে তো আর কথাই নেই। তাওলে ২০০১ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে পোর্টব্লেয়ারের কোর্টে এসে হিন্দিতে সাক্ষ্য দিয়েছিল। ড. রতনচন্দ্র কর তাকে কিছু বাংলাও শিখিয়েছিলেন বলে লিখেছেন।  সেই তাওলের সাথে আন্দামান ট্রাঙ্ক রোডে দেখা হয়ে যায় বরিশালের খাঁটি বাঙ্গাল মুহম্মদ মুহসিন আর শামীম রেজার সাথে—তাহলে  তো  কম্ম সাবাড়। এমন ঘটনা মাথায় নিয়ে বাঙাল মুলুকে ফিরতে পারলে শেষে আবার আমাকেই দর্শনের জন্য বাঙাল মুলুকে মানুষের লাইন না পড়ে যায়। এমনটা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ কম্ম ফতে হয়ে গেল। ২ জন প্রমাণ সাইজের জারোয়া নারী ও পুরুষ এবং হয়তো তাদের একটি ন’দশ বছরের সন্তান আমাদের গাড়ীর পাশ দিয়ে উল্টো দিকে হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষটির পরনে একেবারে সভ্যজগতের  সেলাইকৃত থ্রি-কোয়াটার্র প্যান্ট। শরীরের উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। মহিলাটিরও নিন্মাঙ্গে কাপড়ের মতো কিছু পেঁচানো তবে উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। ছেলেটি সম্পূর্ণ উলঙ্গ। তাদের হেঁটে যাওয়ার মধ্যে বিশেষ করে স্ত্রী লোকটির মুখমন্ডলে এক কঠিন গাম্ভীর্য লক্ষ্য করলাম। পাশ দিয়ে কী যাচ্ছে কারা যাচ্ছে এ নিয়ে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে বলে মনে হলো না। নির্মেদ শক্তিমান শরীর। কারো হাতে তীর ধনুক কিছু নেই।

এই জারোয়া যে আমি দেখেছি তা আমার বন্ধু শামীম রেজাকে না দেখাতে পারলে তো দেশে গিয়ে বলা যাবে না যে , আমি জারোয়া দেখেছি,  কারণ শামীম তো উল্টো সাক্ষী দেবে। এই কথা মাথায় ঢুকতেই শামীমের পুরো ঘাড় ধরে টান মারলাম। কিন্তু কাজ হলো না । জারোয়া দৃশ্য ততক্ষণে রাস্তার বাঁকে হারিয়ে গেছে। তবে বাসের অনেকে যাত্রীই ততক্ষণে  যেভাবে  সেই বাঁকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে তা দেখিয়ে শামীম রেজাকে আমি অন্তত বারো আনা বিশ্বাস করাতে পারলাম যে, আমি জারোয়া  দেখেছি।

বাস বিরতীহিন চলছে। আমি আমার দেখা জারোয়ার  সাথে মিলাতে চেষ্টা করছি এদের বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় পড়া বর্ণনা। এদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-খৃস্টান জাতীয় বিশ্বাসের বিভেদ নেই। ধর্মকর্ম বিষয়ে খুব একটা কোনো ভাবনা এদের নেই। মুহম্মদ জাফর থানেশ্বরির  বর্ননা মতে জারোয়ারা মনে করে স্রষ্টা আকাশে থাকে, তার নিকট থেকে বজ্র ও বৃষ্টি আসে, তার হুকুমে মানুষের মৃত্যু হয়; তার একজন স্ত্রী থাকে, নাম ‘চানাপালক’। আর তারা বিশ্বাস করে শয়তান থাকে এই মর্ত্যে। শয়তান দু’জন একজন স্থলভাগের, নাম ‘আরাম চৌগলা’; অন্যজন সমুদ্রের শয়তান, নাম ‘জরুডান্ডা’। তবে রতনচন্দ্র কর জারোয়াদের বিশ্বাসের এমন কিছু বর্ণনা করেননি।

রতনচন্দ্র করের বর্ণনামতে জারোয়ারা মৃত ব্যক্তিকে বড় গাছের কোটরে লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দেয়। এটাই তাদের লাশের সৎকার। যে কুটিরে কেউ মারা যায় সেখান থেকে তারা তিন-চার মাসের জন্য অন্যত্র চলে যায়। পরে মৃতের কঙ্কাল থেকে বিশেষ করে থুতনির হাড় (mandible) এনে তারা গলায় পরে। এই হাড় তাদেরকে অসুখ বিসুখ ও ভূতের আছর থেকে তাদেরকে রক্ষা করবে বলে তারা মনে করে। নিকটাত্মীয় কেউ মারা গেলে তার হাড় দিয়ে গয়নাপরা এক সময় জারোয়াদের গৌরবের বিষয় ছিল।

জারোয়াদের বিবাহ বেশ জৌলুসহীন। তাদের  বিয়ের আগে সাধারণত বাগদান হয়। তারা বাগদানকে বলে  ‘আটিয়াপিছে’ এবং বিয়েকে বলে ‘ওয়াঙ্গে’। বিয়েতে পিতামাতার তেমন কোনো ভূমিকা নেই। ছেলে মেয়ে বিয়েতে রাজি হলে গোষ্ঠির সকলকে জানিয়ে এক সন্ধ্যায় মেয়ে গিয়ে ছেলের কোলে বসে। এটাই বাগদান। বাগদানের এক বছর পরে আবার একদিন মেয়ে গিয়ে ছেলের কোলে বসে বা মেয়েকে কেউ নিয়ে গিয়ে ছেলের কোলে বসিয়ে দেয়। দ্বিতীয় বারের এই বসাটাই বিয়ে। বাগদানের পর থেকেই যৌনসংযোগ সামাজিক ভাবে স্বীকৃত।

তবে বিয়ে বা বাগদান ছাাড়া যৌনসংযোগ হলেও সমাজ ছেলে বা মেয়েকে কোনো শাস্তি দেয় না।  এ ক্ষেত্রে অবৈধ যৌন সংযোগে সন্তান হলে সন্তানটির জন্য চিরকালীন বিপদ। গোষ্ঠিপতি এই সন্তানটিকে শিশুকালেই হত্যা করে । হত্যা না করলেও চিরকাল এই সন্তান সমাজের সকলের কাছে  ধিকৃত থাকে। বিষয়টি আমাদের নিকট অতি অসামাজিক।

জারোয়াদের সমাজে শাসন নেই, তবে আত্মস্বীকৃত গোষ্ঠীপতি আছে। সাধারণত গোষ্ঠীপতি অত্যন্ত সুঠাম দেহের অধিকারী সু-পুরুষ হয়। তার আদেশ মান্যকারীদের জন্য সে অনেক উপকারের চেষ্টা করে। তবে গোষ্ঠীপতিদের মাঝে তেমন কোনো পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নেই। তারা সম্পদের ব্যক্তি মালিকনায় বিশ্বাস করে না। প্রকৃতির সম্পদ যে আহরণ করবে সেই ভোগ করতে পারবে।  তবে  সম্পত্তি বা এলাকার এক ধরনের গোষ্ঠী মালিকানা আছে।  এক গোষ্ঠীর লোক অন্য গোষ্ঠীর এলাকায় সাধারণত শিকারে যায় না।চলবে

আরো পড়ুন : কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ১১

//জেডএস//

লাইভ

টপ