আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। শেষ পর্ব

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৯:০০, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯

জারোয়াদের জীবনধারার বিষয়ে এসব ভাবনার মধ্যেই বাসের মধ্যে আবার এক হুলুস্থুল টের পাওয়া গেল। বাসের ডানে পাশের জানালা দিয়ে আবার এক দল জারোয়া নারী-পুরুষ দেখা গিয়েছে। আমরা বাসের বামপাশে বসেছি বিধায় দেখতে পাইনি। তবে দাঁড়িয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন অর্ধ-উলঙ্গ নারী পুরুষের জটলা। কোনো একটা বাস বা ট্যুরিস্ট গাড়ী থেকে কিছু কাপড় বা খাবার ফেলা হয়েছে। সেগুলো তারা ভাগ করছে। দৃশ্যটা দেখে খুব কষ্ট লাগলো। যে জাতির একটি শিশু জন্মগ্রহণের সাথে সাথে অন্তত আড়াই বর্গ কিলোমিটার ভূ-সম্পত্তির মালিক তারা সভ্য মানুষের এই রাস্তার অভিশাপে আজ কিছু নোংরা কাপড় আর রোগজীবাণুর আধার খাবারাদি ভিক্ষার দ্রব্যের মতো ঘাঁটছে। দৃশ্যটি দেখে একজন অবৈধ ট্যুরিস্ট হিসেবে নিজেকেও বেশ অপরাধী মনে হলো। পুলিশ এই দৃশ্য দেখেও, দেখলো না কেন বুঝলাম না। এই অপরাধবোধ নিয়ে একদম নিরব হয়ে গেলাম।

কিছুক্ষণে বাস জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্ট পার হলো। বারাটাং বাজার নদী পার হয়ে আরো দূরে। আমাদের টিকেট সে অবধি হলেও আামাদের দেখাদেখির জায়গা তো বাজার না। আমরা দেখতে যাবো লাইমস্টোন কেভ ও মাড ভলকানো। সেজন্য কোথায় নামা দরকার জানতে গিয়ে দেখি চতুর্দিক পুরো বাঙালি-ঝামেলা। এ বলেছে এখানে, তো আরেকজন বলছে একেবারে উল্টো আরেক জায়গার কথা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো আমাদের বারাটাঙ ফেরিতে ওঠার আগেই নামা ভালো। সুতরাং নেমে পড়লাম।

বাইরে বৃষ্টি। মাড ভলকানো ও লাইম স্টোন কেভ যেতে হবে নৌকায়। আবার সেই রস আইল্যান্ড ঝামেলায় পড়লাম। বৃষ্টিতে নৌকা ছাড়ছে না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে বৃষ্টির কর্তৃপক্ষও কুপিত হয়ে আছে, সহজে থামতে বলবে না। সুতারং ঠিক করলাম কেভ না দেখেই পোর্টব্লেয়ার মুখো হই। কিন্তু এখান থেকে কি ফিরতি বাসে ওঠা যাবে?  একজনের কাছে জানতে চাইলে তার চেহারা আর হাসির দিকে তাকিয়ে মনে হলো সে খাস বরিশাইল্যা ভাষায় বলে উঠবে—‘কোনো সোমেস্যা নাই’। সেই কথাই বললো, তবে বরিশাইল্যা-কলিকাইত্যার মিশেল এক বাংলায়। বোঝা গেল আদিপুরুষ বরিশালেই কোথাও ছিল। যে বাস ফেরিতে ওপার থেকে আসবে সেটায় উঠলেই হলো। এ বেলায় পোর্টব্লেয়ারমুখো যে কোনো বাসেই সিট পাওয়া যাবে।

ফেরার টিকেটের কায়দা তো হলো। কিন্তু র‌্যাপের ফটোকপি কীভাবে হবে? এখানে তো বিদ্যুৎ নেই। আমার মনে হলো যাওয়ার পথে চেকপোস্টে একটা ঝামেলাই হবে শেষ পর্যন্ত। শামীমকে মোটেও চিন্তিত মনে হলো না। আসলে ও যে-সব ঝামেলা বছরের ৩৬৫ দিন সামলায় তাতে একখানা র‌্যাপের ফটোকপির ঝামেলা ওর কাছে নস্যি। ফলে ওর সাহসেই উঠলাম বাসে। রঙ্গত থেকে আসা পোর্টব্লেয়ারমুখো এক বাসে। ফিরতি পথে জারোয়া দেখার কোনো রকম অশোভন উৎসাহ নিয়ে রাস্তায় আর তাকাচ্ছি না । জারোয়া ফরেস্টকে হিউম্যান সাফারি বানানোর লজ্জাকর বাস্তবতায় আমি আর শামিল হতে চাই না।

বাস রিজার্ভ ফরেস্ট অতিক্রম করলো। সামনেই সেই চোকপোস্ট যেখানে র‌্যাপের ফটোকপি জমা দিয়ে যেতে হবে। এখানে সবাইকে নামতে হয়। নেমে ওয়াশরুমে গেলাম। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম শামীম রেজার খবর নেই। দূরে তাকিয়ে দেখছি সে ভিড়ের মধ্যে চেকপোস্ট পেরিয়ে চলে গেছে। এবার দেখলাম সামনে ঝামেলা আছে অথচ সামলানোর লোক সাথে নেই। কী আর করা। আলিফ-লাম-মীম তিনবার পড়ে বুকে ‘থুত্থুড়ি’ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম চেকপোস্টের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে চেকপোস্ট পার হয়ে যাওয়ার পরে পিছন থেকে পেলাম পুলিশের ডাক। পুলিশরা শামীমকে মনে রাখতে না পারলেও দাঁড়িওয়ালাকে ঠিক মনে রেখেছে। পরিস্কার বাংলায় চার্জ করলো—র‌্যাপের ফটোকপি জমা না দিয়ে সুড়সুড় করে আপনি কেন চলে যাচ্ছেন।বললাম—বিদ্যুৎ ছিল না, ফটোকপি করাতে পারিনি। ‘সেটা বলবেন তো’। বাহ এত ভদ্র আচরণ! সত্যিকার অর্থে এর চেয়ে জঘন্য আচরন আমার পাওনা ছিল।কারণ, আমি না বলে চোরের মতো হেঁটে আসছিলাম। চেকপোস্টের কাছে একটি ছাপড়াঘর জাতীয় গ্রাম্য রেস্টুরেন্ট থেকে আমার বন্ধু শামীম রেজা কিছু তেলেভাজা খাবার দ্রব্য নিয়ে উঠলো। আমার তখন অনেক অভিমান— ‘তুমি আমাকে ঝামেলার মুখে রেখে চলে এসেছ’। কিন্তু তেলেভাজার তেলে কয়েক মুহূর্তেই আমার সকল অভিমান পিছলে গেল। আমার অভিমানের দিকে তাকিয়েই শামীম এবার কথাবার্তা না লাগলেও দুটো জেয়াদা করে বলছে। সেই জেয়াদা কথার একটির প্রসঙ্গে চলে আসলো আন্দামানের অপর এক আদিম জনজাতি সেন্টিনেলিজদের কথা।

সেন্টিনেলিজরাই এখন আন্দামানে একমাত্র আদিম জনজাতি যারা এখনো সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করে সভ্যতার সাথে কোনো সংস্পর্শ না রেখে প্রস্তরযুগীয় নিজ সত্তাকে সাকুল্যে ধরে রেখেছে। পোর্টব্লেয়ার থেকে পশ্চিম দিকে ৫৪ কিলোমিটার সমুদ্র পার হলে সেন্টিনেলিজদের দ্বীপ নর্থ সেটিনেল আইল্যান্ড। এর আয়তন ৬০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৫৬ সালের আদিবাসি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এই দ্বীপে কোনো পর্যটক বা সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রেস্ট্রিকটেড এরিয়া পারমিট অর্থাৎ র‌্যাপ সাথে থাকলেও আন্দামানের যে ২৯ টি দ্বীপে যাতায়াত করা যাবে না মর্মে ২০১৮ সালে বলা হয়েছে, সেই ২৯ দ্বীপের মধ্যে নর্থ সেটিনেল আইল্যান্ড একটি।

এই আইল্যান্ডে শুধু সাধারণ নয়, অসাধারণও কেউ যেতে পারেনা। পারে না বলেই এই দ্বীপে কতজন সেন্টিনেলিজ আছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব সরকারি দপ্তরেও নেই। একাদশ শতাব্দীতে মার্কো পোলোও এই দ্বীপের অধিবাসীদেরকে সবচেয়ে হিংস্র ও ভয়ঙ্কর হিসেবে বর্ণনা দিয়ে গেছেন। ১৮৮০ সালে এম. ভি. পোর্টম্যান আন্দামান হোমের মাধ্যমে সভ্যকরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই দ্বীপেও গিয়েছিলেন। সেখান থেকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে এক সেন্টিনেলিজ দম্পতি ও তাদের ৪ সন্তানকে তিনি ধরে এনে আন্দামান হোমে তুলেছিলেন। অতি দ্রুত উক্ত দম্পতি এই সভ্যজগতের স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থার মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মারা যায়। এই অবস্থা দেখে পোর্টম্যান তাদের চারটি বাচ্চাকে তড়িঘড়ি করে তাদের বাসভূমি সেন্টিনেলিজ দ্বীপে পাঠিয়ে দেন।

সেন্টিনোলিজরা সভ্যতা থেকে এত দূরের যে অনেক নৃতত্ত্ববিদ বলেছেন, সেনিনোলিজরা আগুন জ্বালাতে পর্যন্ত জানে না। কাপড় পরার তো প্রশ্নই ওঠে না। তারা প্রথম ধাতব জিনিস দেখেছে তাদের উপকূলে বিধ্বস্ত জাহাজ দেখার মধ্য দিয়ে। বিধ্বস্ত জাহাজের লোহা ও অন্যন্যা ধাতু নিজস্ব প্রযুক্তিতে তারা কিছুটা ব্যবহার করতেও শিখেছে। ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল ‘ম্যান সার্চ ফর ম্যান‘ নামে একটি ডকুমেন্টারি বানাতে এখানে এসেছিল। তাদের রেখে যাওয়া এ্যালুমিনিয়াম ক্রোকারিজ সেন্টিনেলিজদের জীবন যাত্রায় প্রথম ব্যবহৃত ধাতুর তৈরী পাত্র। এদের প্রধান খাদ্য  কাঁকড়া ও মাছ। এদের জীবনধারা সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিককরা এখনো তেমন কিছু জানে না। কারণ এদের কাছে কেউ ঘেঁষতেই পারে না। ডকুমেন্টারি বানাতে ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের যে লোকেরা এদের জন্য অনেক দ্রব্য সামগ্রী উপহার নিয়ে গিয়েছিল তাদের ডিরেক্টরকে সেন্টিনেলিজরা তীরবিদ্ধ করেছিল। উরুতে তীরের আঘাত নিয়ে ডকুমেন্টারি না বানিয়েই ডিরেক্টর তার জনবল নিয়ে ফেরত এসেছিলেন। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সরকারের তরফ থেকে এদের সাথে সম্পর্ক তৈরীর অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়। সকল উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় ২০০০ সালে এই প্রকল্পটিই পরিত্যক্ত হয়।

২০০৬ সালে একটি হেলিকপ্টার বাহিনীও এই সেন্টিনোলিজদের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল দুই জেলেকে ঘিরে। সুন্দর রাজ ও পন্ডিত তেওয়ারি নামে দুই জেলে কাঁকড়া ও মাছ ধরতে অন্যান্য জেলেদের বারণ উপেক্ষা করেই নর্থসেন্টিনেলিজের তীরে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দুর্ঘটনাক্রমে তাদের নৌকার এ্যংকর কাজ না করায় পানির তোড়ে তারা নর্থ সেন্টিনেলের তীরের অগভীর খাঁড়িতে ঢুকে যায়। তাদের দ্বীপের কাঁকড়া শিকার করতে দেখে সেন্টিনেলিজরা তীরের আঘাতে জেলেদ্বয়কে হত্যা করে। তারপর লাশ সূঁচালো বাশের টুকরায় বিঁধে নিয়ে বাঁশের টুকরা দুটো তীরের কাছে মাটিতে পুঁতে রাখে। দূর থেকে বেঁধা লাশ দুটোকে অনেকটা কাকতাড়ুয়ার মতো দেখাচ্ছিল। তিন দিন পরে ভারতীয় কোস্টগার্ড সদস্যরা এখানে লাশ দুটোর সন্ধান পায়। লাশ উদ্ধারের জন্য একটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়। কিন্তু হেলিকপ্টার নামতে গেলে সেন্টিনেলিজরা হেলিকপ্টারের দিকেই তীর ছুঁড়তে থাকে। সে তীর ১০০ ফুটেরও উপরে উঠতে দেখা যায়। এই অবস্থায় হেলিকপ্টারটি ধীরে ধীরে একটু সরতে থাকে আর নিচের তীর ধনুকওয়ালা মানুষগুলোও হেলিকপ্টারটির পেছন পেছন তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে আগাতে থাকে। এভাবে তীর-ধনুকওয়ালা মানুষগুলোকে লাশের জায়গা থেকে দেড় কিলোমিটারের মতো সরিয়ে নিয়ে এক ঝটকায় হেলিকপ্টারটি লাশের কাছে চলে আসে এবং নিচে নেমে একটি লাশ উদ্ধার করে হেলিকপ্টারে নিয়ে আসে। এরই মধ্যে সেন্টিনেলিজরা আবার চলে আসে লাশের কাছে। এবার হেলিকপ্টারটি উড়ে গিয়ে আবার ওভাবে সেন্টিনেলিজদেরকে তার পিছনে প্রলুদ্ধ করে টেনে নিতে চাইলে সেন্টিনেলিজরা এবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে এক ভাগ তীর ছুঁড়ে হেলিকপ্টারটি তাড়ানোর উদ্দেশ্যে আগায় আর অন্যভাগ লাশের পাহারায় থেকে যায়। ফলে হেলিকপ্টার বাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে বাকি লাশটি ফেলে রেখেই চলে আসতে বাধ্য হয়।

সেন্টিনেলিজদের এই দ্বীপে সবচেয়ে করুণ মৃত্যুটি ঘটেছিল জন এ্যালেন চাউ’র (John Allen Cha) জীবনে। আমি আর শামীম যেদিন জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে সেন্টিনেলিজদের বিষয়ে এই সব কথাবার্তা বলতে বলতে পোর্টব্লেয়ারে আসছিলাম সেই ৩০ আগস্ট ২০১৮ তারিখেরও পরে এই করুণ মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে। সেদিন থেকে আড়াই মাস পরে ১৫ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে এই ঘটনার সূত্রপাত। ২৬ বছর বয়সের এক মিশনারি জন এ্যালেন চাউ পোর্টব্লেয়ারের মৎস্যজীবীদেরকে লোভনীয় পরিমাণ অর্থে প্রলুব্ধ করে তাদের নৌকায় করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে নর্থ সেন্টিনেলিজ দ্বীপে পৌঁছান। তার উদ্দ্যেশ্য হলো নর্থ সেন্টিনেলিজদেরকে খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত করে তুলবেন যাতে এই মানুষগুলো খ্রিস্টীয় ঈশ্বরের সন্ধান পায় এবং মৃত্যুর পরে নরক গমন থেকে বাঁচতে পারে। যখন জেলেদের নৌকায় তিনি নর্থ সেন্টিনেলের তীর থেকে মাত্র ৫০০/৭০০ মিটারের দূরত্বে, তখন জেলেরা তাকে বলে যে, তীরের দিকে আর যাওয়া  যাবেনা। কিন্তু এ্যালেন চাউ তাদের কথায় কর্ণপাত না করে একটি ছোট নৌকায় একখানা বাইবেল সাথে নিয়ে একাই তীরের দিকে রওয়ানা হন। তীরে নামার সাথে সাথে সেন্টিনেলিজরা তার দিকে তীর ছুঁড়তে শুরু করে। চাউ তখন তাদরকে বাইবেলখানা দেখায়, অনেক উপহার সামগ্রী দেখায় এবং ইংরেজিতে তাদের কাছে ঈশ্বরের নাম করে। তারপরও তীর ছুটে আসতে থাকলে অগত্যা তিনি ডোঙ্গা নৌকায় করে সরে আসেন। ঐ ডোঙ্গায় করে এরপর তিনি কয়েকবার তীরে আসার ও নামার চেষ্টা করেন। তিনি সেন্টিনেলিজদের উদ্দেশ্য করে প্রার্থনা গীতি পরিবেশন করেন। ঝোসা ভাষায় তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। তার মৃত্যুর পরে পাওয়া ডায়েরীর বর্ণনা থেকে দেখা যায় ধীরে ধীরে তার প্রতি সেন্টিনেলিজদের প্রতিক্রিয়া কিছুটা নমনীয় হতেও শুরু করেছিল। এক পর্যায়ে তিনি সেন্টিনেলিজদের হাতে কিছু মাছ ও একটি  বাইবেল তুলে দিতে প্রয়াস পান। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বাচ্চা ছেলে তার দিকে একটি তীর ছুঁড়ে মারে যা তার বুকের উপর ঝুলতে থাকা বাইবেলটি বিদ্ধ করে। ভয় পেয়ে আবার তিনি ডোঙ্গায় করে সরে আসেন। এ্যালেন চাউ শেষ বার সেন্টিনেল আইল্যান্ডের তীরে নামলেন ১৭ নভেম্বর ২০১৮ তারিখ। এবার চাউ তার জেলে সাথীদেরকে বলেই গেলেন যে তারা যেন চাউকে ছাড়াই পোর্টব্লেয়ার চলে যায়। এ দিন সেন্টিনেলিজরা চাউকে হত্যা করে। ফলে এ দিনের ঘটনার কিছুই চাউ তার ডায়রিতে লিখে যেতে পারেননি বলে এ দিনের অন্যান্য ঘটনাসহ তার হত্যার ঘটনার বিবরণ দুনিয়াবাসীর পক্ষে আর জানা সম্ভব হয়নি। শুধু পরদিন জেলেরা দেখলো এ্যালেন চাউয়ের মৃতদেহ সমুদ্রের তীরে পড়ে আছে।

তার মৃত্যুর পরে ‘দি ওয়াশিংটন পোস্ট’ চাউ এর ইংরেজিতে লেখা ডায়রিটি খুঁজে পায়। ডায়রিতে চাউ এক জায়গায় লিখেছেন—‘ঈশ্বর এটাই কি শয়তানের শেষ দুর্গ যেখানে তোমার নাম প্রবেশের এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি?’ আরেক জায়গায় লিখেছেন— ‘আমি মনে করি ঈশ্বরের নাম এই দ্বীপে পৌঁছানোয় আর দেরি করা নয়। আমি যদি এখানে নিহত হই কেউ দয়া করে এই মানুষদের প্রতি ক্ষুব্ধ হবেন না এবং ঈশ্বরের প্রতিও ক্ষুদ্ধ হবেন না।’

চাউয়ের ঈশ্বর চাউকে পুরস্কৃত করুন। সেন্টিনেলিজদের ঈশ্বর সেন্টিনেলিজদেরকে রক্ষা করুন। আমার ঈশ্বরের কাছে আমি এমন প্রার্থনাই করি। এ রকম কিছু দোয়া মোনাজাতের জন্যই হয়তো ৩০ আগস্ট সন্ধ্যাটা সেলুলার জেলের কাছে পোর্টব্লেয়ারের জামা মসজিদে কাটালাম। উল্লেখ্য, আমরা যাকে বলি জামে মসজিদ সারা ভারত তাকে বলে জামা মসজিদ। পোর্টব্লেয়ারের জামা মসজিদটির গায়ে প্রতিষ্ঠা সালের কোনো উল্লেখ নেই। মুসল্লিরাও কেউ বলতে পারলো না। তবে জাফর থানেশ্বরি তার বইয়ে লিখেছেন ১৮৮৩ সালে তাদের মুক্তির সময়েও পোর্টব্লেয়ারে কোনো মসজিদ ছিল না। এই কথা থেকে বোঝা যায় মসজিদটি বড়জোর বিংশ শতকের গোড়ার দিকের হবে। তার চেয়ে পুরনো নয়। সমজিদে পরিচয় হলো পশ্চিম মেদিনীপুরের বাঙ্গালি মুসলমান আলিমুদ্দিন ভাইয়ের সাথে। আলিমুদ্দিন ভাই এখানে নব্যযুগীয় দ্বীপান্তর খাটছেন। এই দ্বীপান্তর কোনো জজকোর্টের রায়ের মাধ্যমে অর্জিত কালাপানি নয়। এ হলো দারিদ্র্যের দুষ্টুচক্রে অর্জিত অন্যরকম এক দ্বীপান্তর বা কারাবাস।

আলিমুদ্দিন ভাই এক মহাজনের ঘর থেকে নিয়ে এ্যালুমিনিয়ামের ক্রোকারিজ বিভিন্ন বস্তিতে ফেরি করেন। তিনি কোনো দ্রব্য ১০০ টাকায় বিক্রি করে যদি ৩০ টাকা লাভ পান তাহলে সেই লাভের ১৫ টাকা মহাজনকে দিতে হয় আর ১৫ টাকা থাকে আলিমুদ্দিন ভাইয়ের। কিন্তু এই লাভে আলিমুদ্দিন ভাইয়ের মেদিনীপুরে থাকা সংসারের সব খরচ মেটে না। ফলে বিভিন্ন সময়  মহাজনের কাছ থেকে তাকে স্বল্প স্বল্প করে কর্জ নিতে হয়। সেই কর্জ শোধ না করতে পারা পর্যন্ত  সংশ্লিষ্ট মহাজেনের ব্যবসার ফেরিওয়ালার কাজ  থেকে তার মুক্তি পাওয়ার উপায় থাকে না।  ফলে বছরের পর বছর কোনো আদালতের রায় ছাড়াই দ্বীপান্তর খাটতে হচ্ছে তার মহাজনের ঘরে।

পোর্টব্লেয়ার জামা মসজিদে দোয়া করলাম এই আলিমুদ্দিন ভাইয়ের মুক্তির জন্যও। তবে আমার দোয়ায় আর কী হবে? আলিমুদ্দিন ভাই আমার চেয়ে চৌদ্দগুণ মুসল্লি, তার দোয়ায় তার নিজের  কাজই যখন হচ্ছে না। তারপরও দোয়া করছি। শুকরিয়াও জানাচ্ছি  খোদাপাকের কাছে। বিশেষ করে এই কারণে যে, আমি আন্দামান এসে মাত্র ৭ দিনেরে মাথায় কাল চলে যেতে পারবো। অথচ আমার গ্রামের বা থানার কত মানুষ এক সময় এই আন্দামানে শুধু আসতেই পারতো আর যেতে পারতো না।

পরের দিন ৩১শে আগস্ট ফেরার পথে বীর সাভারকার বিমান বন্দরের লাউঞ্জে বসে আমার আত্মীয় সম্পর্কীয় একজন কয়েদির কথা ভাবছিলাম যার এই আন্দামানে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। কিন্তু ১৬ বছর দ্বীপান্তর বাসের পরে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন এবং অনুমতি পেয়েছিলেন দেশে ফেরার। তিনি ছিলেন আমার এক খালুর বাবা। তার নতুন রোপন করা ধান ক্ষেতে অপর এক জোতদার গায়ের জোরে গরু ছেড়ে দিয়েছে শুনে ঘর থেকে লেজাটা নিয়ে লাফ দিয়ে পড়েছিলেন। ক্ষেতে গিয়ে দেখেন জোতদার ধানক্ষেতের পাশে আলের উপর দাঁড়ানো এবং জোতদারের গরু সুন্দর করে নতুন রোপন করার ধানক্ষেত সাবাড় করছে। তিনিও তখন লেজার এক কোপে মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়ে জোতাদারকে সাবাড় করলেন। বিচারে আমার খালুর দাদার (পিতামহ) যাবজ্জীবন হয়েছিল আন্দামানে। ১৮৮৭ সালের জুনে রানী ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণ জয়ন্তীতে রানী মাফ করে দিয়েছিলেন হাজার হাজার যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্তদেরকে। মাফ পেলেন আমার খালুর বাবাও।

যিনি জানেন যে, জীবদ্দশায় আর কখনো দেশে ফেরা সম্ভব নয়, কোনো স্বজনকে জীবনে আর একবার দেখার সুযোগ নেই, তিনি ১৬ বছর কারাবাসের পর হঠাৎ মুক্তির সনদ পেয়ে যেদিন এমন করে যাত্রী অপেক্ষাগারে অপেক্ষা করছিলেন জাহাজে ওঠার জন্য সেদিন তার আবেগ, অনুভব ও চেতনায় যে আলোড়ন চলছিল, সে আলোড়ন আমার পক্ষে কি কল্পনায় জাগিয়ে তোলাও সম্ভব? ৭ দিনের আন্দামান সফর শেষে ফিরতি বিমানে ওঠার জন্য সাভারকার বিমান বন্দরের যাত্রী লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলাম আর এই বিষয়টিই শুধু ভাবছিলাম।সমাপ্ত

আরো পড়ুন : কালাপানির কেচ্ছা ।।পর্ব ১২

//জেডএস//

লাইভ

টপ