মুহম্মদ খসরু || আলো জ্বালিয়ে রাখার সলতে

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৪:৫৫, মার্চ ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০২, মার্চ ০৪, ২০১৯

মুহম্মদ খসরু, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দালনের এক মুকুটহীন সম্রাট। আজীবন অন্যের জন্যই আলো জ্বালানোর সলতে ছিলেন। আমরা জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে আমাদের প্রজন্ম আহমদ ছফা, মুহম্মদ খসরুর মতো সোনার মানুষদের দেখেছিল, কাছে পেয়েছিল।

আজ খসরু ভাই নেই। খসরু ভাইয়ের ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার খবরটি অল্প কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এর কারণ হয়তো এই প্রজন্মের অনেকেই মুহম্মদ খসরুকে চেনে না। জীবিত খসরু মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়ে কখনও নিজেকে চেনাতে চেষ্টা করেননি। তিনি অন্যের মুখে আলো ফেলেছেন, কিন্তু নিজের মুখে পড়া আলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন অত্যন্ত সুচিন্তিত সিদ্ধান্তেই।

তিনি আলাদা। আলাদা মেজাজে, ক্ষ্যাপা স্বভাবের। তিনি সমাজের কাছে ‘অরুচিশীল’ খিস্তি-খেউর করেই অন্যের রুচিবোধ তৈরিতে রেখেছেন সবচেয়ে বড় অবদান। তিনি পদ, পদবী কিংবা খ্যাতির জন্য মাতাল হননি। অর্থ, বিত্ত, সামাজিক অবস্থানের জন্য কোনো ছড়ি ঘোরাননি। কাপড়-চোপড় বেশ-ভুষায় কখনও ‘বনিয়াদি’ ভাব আনার চেষ্টা করেননি। তিনি জানতেন যারা সত্যিকারের চলচ্চিত্রের মানুষ তারা তাকে খুঁজে নেবেন। হ্যাঁ, মুহম্মদ খসরু এদেশে সেই মানুষ যার হাতেই তৈরি হয়েছেন এদেশের অনেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার। তারেক মাসুদ একবার বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই খসরু ভাইয়ের পকেট থেকে বের হয়েছি।’ মনে পড়ে ২০১১ সালে তারেক মাসুদের স্মরণ সভায় এক চলচ্চিত্রকার বলেছিলেন যে খসরু ভাই তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হাত ধরে নিয়ে যেতেন চলচ্চিত্র দেখাতে। জার্মান কালচারাল সেন্টারে শুধু তাঁদের নিয়ে ক্ষান্ত হতেন না, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের পাহারা দিতেন, যেন তারা সিনেমা শেষ হবার আগে বের না হতে পারে। এই রকম করেই খসরু ভাই বড় করেছেন আজকের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেককেই।

আমার পনের/ষোল বছর বয়স থেকেই খসরু ভাইকে দেখেছি, আজিজ সুপার মার্কেটে। কলেজে পড়া আমি যখন আজিজে উঁকি-ঝুকি দিতাম, তখন দেখতাম খানিকটা কুঁজো হয়ে থাকা একজন মানুষকে ঘিরে জটলা। যারা তাকে ঘিরে থাকতো তারাও তখন অল্প বয়সী। আস্তে আস্তে আমি জটলার দিকে এগিয়ে যাই। পরিচিত হই ক্ষ্যাপাটে, মেজাজী আর বাহ্যিক খিস্তি খেউড় সর্বস্ব এক সোনার মানুষের সাথে। আমি চলচ্চিত্রের মানুষ না, তবুও খসরু ভাই স্নেহ করতেন। যারা তার খিস্তি খেউড় উপড়ে ফেলে, তার কাছাকাছি গিয়েছেন, তারা পেয়েছেন তার পরিমাপহীন স্নেহ, ভালোবাসা।

খসরু ভাই নেই আজ। কুঁজো হয়ে, কাঁধে কাপড়ের ঝোলাটি নিয়ে আর কখনও আসবেন না আজিজ সুপার মার্কটে। তবে অনেকদিন ধরেই তিনি আজিজে অনিয়মিত ছিলেন। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। নিজের মতো করে ছিলেন কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে। একমাত্র চলচ্চিত্র ছাড়া কোনো জিনিস তাকে যে আকর্ষণ করনি তা ২০০৮ সালে তার রোহিতপুরের বাড়িতে গিয়েই বুঝেছিলাম। এক শীতের বিকেল আমরা হাজির হয়েছিলাম তার বাড়ি। আর সেখানে গিয়েই আবিষ্কার করেছিলাম খসরু ভাইয়ের যক্ষের মতো লালন করা গুপ্তধন। এই গুপ্তধনের খবর তিনি কাউকে দিতেন না। দুইদিন তার বাড়িতে থাকার সময় দেখেছিলাম তার সেই গুপ্তধন, হাজার হাজার বই। উনি আলমারি খুলছেন, আর আমি চোখ মেলে দেখছি, বই আর বই। এ যেন বইয়ের  যাদুঘর। যেমন আছে অনেক দামি বই, তেমনি আছে বিভিন্ন সময়ের চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা। কোনোটা নিউজপ্রিন্টের, কোনোটি আবার অফসেট পেপারে ছাপানো। জীবন যাপনে এলোমেলো, বেহিসেবী এবং আপাদমস্তক বোহেমিয়ান খসরু ভাই বইয়ের বিষয়ে মারাত্মক হিসেবী, অত্যন্ত গোছালো এবং অতিরিক্ত যত্নবান। বইগুলোকে তিনি এমনি করে আগলে রেখেছিলেন যে বইগুলো সবই ঝকঝকে, উজ্জ্বল, সেখানে কোনো ময়লা পড়তে দেননি। অনেক পরে শুনেছিলাম তিনি তার কিছু বই ফিল্ম আর্কাইভে দান করেছেন।

সেবার খসরু ভাইয়ের বাড়ি থেকে ফেরার কিছুদিন পর তিনি অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। ফোন করেছিলেন হাসপাতাল থেকেই। ফোন পেয়ে আমরা গেলাম হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দেখি, তিনি খুব অসুস্থই, তবু তিনি হাসছেন, স্বভাবসুলভভাবে খিস্তি খেউড় করেই যাচ্ছেন।

১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে খসরু ভাই অন্যতম। ১৯৬৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’ সম্পাদনা করা শুরু করেন যার সর্বশেষ সংকলনটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। খসরু ভাই বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ ও জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষক হিসাবেও কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে তৈরি হওয়া ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ‘পালঙ্ক’ ছবিতে খসরু ভাই ভারতীয় চলচ্চিত্রকার শ্রী রাজেন তরফদারের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

বাংলাদেশে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরুর পেছেনেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এছাড়া তিনি ১৯৭০-এর দশকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তার ‘ধ্রুপদী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন, যা সে সময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরে উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এই সাক্ষাৎকারটির পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল।

অনেকেই বলছেন খসরু ভাই শিল্পী ছিলেন না। কারণ তিনি কোনো ছবি নির্মাণ করেননি। খসরু ভাই  আপাদমস্তক ছিলেন চলচ্চিত্র সংগঠক। তিনি ছবি বানানোর জন্য দুইবার আবেদন করেছিলেন সরকারি অনুদানের, কিন্তু পাননি। যারা খসরু ভাইকে চেনেন তারা ভালোভাবেই জানেন খসরু ভাই অনুদান বা ছবি বানানোর টাকার জন্য, ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা সরকারের কাছে ধর্ণা দেয়া মানুষ নয়। তার নৈতিক মরুদণ্ড অত্যন্ত শক্ত ছিল। ভালোবাসার মানুষদের ছাড়া তাই তিনি খুব একটা কাউকে পরোয়া করতেন না। তিনি চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেছেন, বেঁচে ছিলেন এই চলচ্চিত্রের জন্যই।

মুহম্মদ খসরু, আমার স্বপ্নের মানুষ, এক দাপুটে চরিত্র। খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত-বৈভব, জীবনের ঝলকানী , রাষ্ট্রীয় পদক, পদ, কোনো কিছুরই দ্বারস্ত তিনি হননি। অমরত্বের লোভ তাকে কখনও ছোঁয়নি। এতো সব বাদ দিই, কোনোদিন পত্রিকায় তাকে নিয়ে কোনো ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হোক তাও তিনি চাননি। পত্রিকায় প্রকাশের জন্য কাউকে সম্ভবত সাক্ষাৎকারও দেননি। বরং অসম্ভব এক নিজস্ব জীবন দেমাগে সব চুরমার করে নিজের মতো করে জীবনকে বেছে নিয়েছেন। নিজের মতো করে জীবনকে ভালোবাসার এই তুমুল স্পর্ধার জন্য আমি ভালোবাসতাম, ঈর্ষা করতাম খসরু ভাইকে, ভীষণভাবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ