ওয়ালীউল্লাহর ‘স্তন’ গল্পে স্তনিত মন ও প্রকৃতি

Send
আনিফ রুবেদ
প্রকাশিত : ১৬:১২, মার্চ ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৮, মার্চ ০৬, ২০১৯

এ গল্পে নায়ক কে? খল কে? কেউ না। এ গল্পে চরিত্রদের ভেতর বিমূর্ত হয়ে বিরাজ করছে খল বা নায়ক। মূর্তদের ভেতর বিমূর্তরা প্রকট হয়ে হেসে বেড়াচ্ছে, খেলে বেড়াচ্ছে, মিলে বেড়াচ্ছে। যে মূর্তের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিমূর্ত সে মূর্তও বুঝতে পারছে না পুরোপুরি

স্তন’ গল্প শুরু হয়েছে আবু তালেব মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন সাহেব নামের এক বৃদ্ধপ্রায় লোকের কথা দিয়ে। তিনি বেশ সচ্ছল মানুষ। সকল আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবর করা এবং তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা করা সালাহ্উদ্দিন সাহেবের ফরজ কাজের মতো মনে হয়।

এরপরেই আমরা তাকে দেখতে পাই এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় কাদেরের বাড়িতে। কাদের একজন কেরানি। গরীবী অবস্থা তার। এখানে তিনি এসেছেন একটা কাজে। এই কাজই গল্পের ভ্রুণ, গল্পের বৃক্ষ, গল্পের ফল। তার ছোট মেয়ে মারা গেছে তিনদিনের বাচ্চা রেখে। সেই বাচ্চাকে কাদেরের বউ মাজেদা যেন দুগ্ধ দান করে তার অনুরোধ নিয়ে এসেছেন। কারণ, মাজেদা তিন দিন আগে একটা বাচ্চা প্রসব করেছিল এবং সাথে সাথে মারা গেছিল। মাজেদা বাচ্চাকে দুধ দিতে রাজি হয়। কিন্তু কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও বাচ্চাকে দুধ দিতে সে ব্যর্থ হয়। কারণ, তার স্তন থেকে দুগ্ধ নিঃসৃত হয় না। শেষে সে তার স্তনকে কাঁটা দিয়ে ফুটো করে। স্তন থেকে কিছু একটা বের হয়। বলা বাহুল্য সেটার রঙ লাল। বলা বাহুল্য সেটা রক্ত। এভাবেই গল্প শেষ হয়েছে।

এ গল্পে নায়ক কে? খল কে? কেউ না। এ গল্পে চরিত্রদের ভেতর বিমূর্ত হয়ে বিরাজ করছে খল বা নায়ক। মূর্তদের ভেতর বিমূর্তরা প্রকট হয়ে হেসে বেড়াচ্ছে, খেলে বেড়াচ্ছে, মিলে বেড়াচ্ছে। যে মূর্তের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিমূর্ত সে মূর্তও বুঝতে পারছে না পুরোপুরি।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যত গল্প লিখেছেন সেগুলোর বেশিরভাগে উঠে এসেছে সমাজ সচেতেনতা, জীবনযন্ত্রণা, দেশ বিভাগ, দুর্ভিক্ষ, ধর্মীয় ভণ্ডামী, কখনো মরমীবাদ। খেয়াল করলে দেখা যায় এগুলো সবই নিরেট বাস্তবতা। এসকল ক্ষেত্রে ঘটনার ঘনঘটা দিয়েই গল্প পরিবেশন করা যায়। কিন্তু এগুলোতে নতুন মাত্রা তখনই যুক্ত হয় যখন এগুলোর মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্ব এসে হাজির হয়।

তা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ গল্পে ব্যাপকভাবে মানসিক টানাপোড়েনও লক্ষ্য করা যায়। মনঃসমীক্ষণ তার গল্পে এক চমৎকার উজ্জ্বল প্রদীপ হয়ে জ্বলজ্বল করে। কিন্তু ‘স্তন’ গল্পটি এগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

জীবন যুদ্ধের জন্যে। যুদ্ধ ছাড়া কোনো গত্যন্তর নাই প্রাণধারীর। কিন্তু শুধু এটুকু বললেই খালাস পাওয়া যায় না। কারণ, এ কথা এত বেশি সত্য, প্রচলিত আর ব্যবহৃত যে মানুষ ভালো করে শোনেই না, কথার ভেতর ডুবে দেখে না। যুদ্ধ যখন অপরের সাথে তখন সেটা একটা ঘটনা বটে। সে ঘটনাকে বিভিন্ন রকমভাবে, বিভিন্ন রঙে প্রকাশ করা সহজ এবং বুঝে ওঠাও খুব কঠিন নয়। কিন্তু ‘স্তন’ গল্পে যে যুদ্ধ দেখানে হয়েছে তা অভূতপূর্ব। এ যুদ্ধের ছবি আঁকা খুব কঠিন। ছবি আঁকা পরের কথা আভাস দেয়াও আয়াসসাধ্য।

যুদ্ধ পরের সাথে। যুদ্ধ প্রকৃতির সাথে। যুদ্ধ মনের সাথে। এভাবে বলাটাও বেশ সহজ। বোঝাটাও সহজ। কিন্তু যখন আমরা দেখি মনের স্তর এবং এসব স্তরের রূপ অজস্র তখন অবাক হবার, স্তব্ধ হবার এবং মুগ্ধ হবার ব্যাপারটি আসে। এক স্তরে এক, আরেক স্তরে আরেক। তারপরে আরো আরো স্তর। প্রত্যেক স্তরে আলাদা মান আর মানে, ভাব আর ভাবনা, ক্রিয়া আর কলাপ। এর সাথে প্রকৃতির জটিল খেয়াল মিলেমিশে এক গোলকধাঁধা, ঝলকধাঁধা তৈরি করে, দারুণ বাধা তৈরি করে। এর বাখান করা, এর বয়ান করা অসহজ, প্রায় অসম্ভব।

‘স্তন’ গল্পে এক অসম্ভবকে প্রায় সম্ভব করে তুলেছেন ওয়ালীউল্লাহ্। গল্পে, সালাহ্উদ্দিন নিজে শোকগ্রস্ত, তার আদরের মেয়ে তিনদিনের বাচ্চা রেখে মারা গেছে। বাচ্চাটি খেতে পারছে না, এ এক বেদনা তার। কাদেরের পরিবারের অপরিচ্ছন্নতা তাকে বিরক্ত করলেও তিনি বাচ্চাটিকে সেখানেই দেন। বাচ্চাটির একটা ব্যবস্থা করতে পেরে তিনি আনন্দিত হয়ে ওঠেন। এ এক অদ্ভুত মনের আর প্রকৃতির ব্যবস্থা। কিন্তু এর চেয়েও বড় যুদ্ধ ছিল কাদেরের বউয়ের যুদ্ধ। এখানে, তার মনের কত যে স্তর দেখানো হয়েছে তার ইয়াত্তা নাই। তার বাচ্চা মরেছে। এখানে তার শোক। সালাহ্উদ্দিনের নাতিকে যখন পায় তখন তার মনের আরেক স্তর অন্যভাবে কাজ করে ওঠে। মাতৃত্ব জেগে ওঠে। যখন বাচ্চাটি দুধ পায় না তখন তার মনের আরেক স্তর ঠিকই খুশি হয়ে ওঠে। তার মনে হয়, তার নিজের বাচ্চা মরেছে তার স্তন কেন দুধ দেবে! মনের গভীরের কোনো এক স্তর বলে ওঠে, ঠিকই আছে। কিন্তু মনের আরেক স্তর যখন দেখে এ এক মাসুম বাচ্চা তখন তার মনের অন্য একটি স্তরে বেদনা উপস্থিত হয়। তার মনের একটা স্তর বলে উঠে দুধ আসবে স্তনে। একটা স্তর বলে দুধ আছে স্তনে। কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও এবং বাচ্চাকে দুধ দিতে না পারলে, তার মনে হয়, বুঝি দুধ জমাট বেধে আছে। একবার তার মনে হয় যে প্রকৃতি বাচ্চাটিকে মেরে ফেলেছে সে প্রকৃতি তার স্তনের দুধকেও মেরে ফেলেছে। আবার মনে হয় এ শিশুটির বাঁচার জন্য তার দুধকে বের হতেই হবে। এক সময় পোষ্য হয়ে আসা শিশু, তার মৃত শিশু কারো জন্যেই কোনো বেদনা থাকে না। তার শুধু মনে হয় সালাহ্উদ্দিনকে খুশি করার জন্য হলেও তার বুকের দুধকে বের হতে হবে। কিন্তু কিছুতেই দুধ বের হয় না। শেষে ডাক্তার আসে। ডাক্তার বলে, তার স্তনে দুধই তৈরি হয়নি। শেষে সে প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে, ডাক্তারের কথার বিরুদ্ধে গিয়ে বুকে তীক্ষ্ণ কাঁটা বিঁধিয়ে দেয়। কিন্তু রক্ত ছাড়া আর কিছুই বের হয় না।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ গল্পকার হিসেবে পূর্ণ বিকশিত হন চল্লিশের দশকে। পূর্বেই বলা হয়েছে তার গল্পে সমাজবাস্তবতা, দারিদ্র্য, নিম্নশ্রেণির জীবন, মহামারী বা দুর্ভিক্ষ ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে। চল্লিশের দশক তার জ্যোতি ছড়ানোর কাল হলেও এখনো তার প্রভাব, অবদান আর দীপ্তি সমান স্বীকার্য। বাংলা গল্পের জগতে তার আসনটি পাকা। আর তার গল্পসমস্তের মধ্যে ‘স্তন’ গল্পটির শিখা বেশ উজ্জ্বল। ‘স্তন’ গল্পের এত উজ্জ্বলতার কারণ দারুণ এক ব্যক্তিক, মৌনিক, প্রাকৃতিক দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্ব।

//জেডএস//

লাইভ

টপ