একটি অতি ক্ষুদ্র গল্প || আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

Send
ভাষান্তর: ফজল হাসান
প্রকাশিত : ০৭:০০, মার্চ ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, মার্চ ১৫, ২০১৯

পাডুয়ায় কোন এক গরম দিনের সন্ধ্যায় লোকগুলো তাকে ছাদে নিয়ে যায় এবং শহরের সব কিছুই তার দৃষ্টিগোচর হয়। সেই সময় আকাশে চিমনির ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকারে চারপাশ ঢেকে যায় এবং অতি উজ্জ্বল বাতি জ্বলে ওঠে। অন্য লোকজন নিচে নেমে যায় এবং তারা হাতে বোতল তুলে নেয়। বারান্দায় তাদের আলাপচারিতার শব্দ সে এবং ল্যুজ শুনতে পায়। ল্যুজ বিছানায় বসেছিল। রাতের উষ্ণ আবহাওয়ায় সে সংযত এবং বেশ ঝরঝরে ছিল।

ল্যুজ তিন মাস রাতের শিফটে কাজ করেছে। লোকগুলো খুশি মনে তাকে কাজে যেতে অনুমতি দিয়েছে। তারা যখন লোকটিকে অস্ত্রোপচার করে, তখন ল্যুজ তাকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে তুলে দেয় এবং লোকগুলো তার বন্ধু কিংবা মলদ্বারে ঢুকানো তরল ঔষধ নিয়ে হাসি-তামাশা করে। নির্জীব করার ঔষধ দিয়ে লোকটিকে ঘুম পাড়ানো হয়, যেন সে অস্ত্রোপচারের সময়ে কোন ব্যথা না পায় বা কোন স্মৃতি মনে করতে না পারে। অস্ত্রোপচারের পরে লোকটি ক্রাচে ভর করে উঠে দাঁড়িয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপে। ল্যুজকে বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে হয় না। সেখানে কয়েকজন রোগী ছিল এবং তারা সবাই এ বিষয়টি জানে। তারা ল্যুজকে পছন্দ করে। একসময় লোকটি বারান্দা পেরিয়ে ফিরে এসে নিজের বিছানায় শুয়ে ল্যুজের কথা ভাবে।

পুনরায় সামনের দিকে যাওয়ার আগে সে এবং ল্যুজ গির্জায় প্রবেশ করে এবং প্রার্থনা করে। জায়গাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং শান্ত। সেখানে অন্য লোকজনও প্রার্থনায় মশগুল। তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়, কিন্তু তাদের কাছে গির্জা থেকে প্রাপ্ত কোন বৈধ অনুমতি নেই, এমনকি তাদের কাছে জন্মের সনদপত্রও নেই। তাদের ভেতর একধরনের অনুভূতি কাজ করে যে, তারা বিবাহিতা। কিন্তু তারা চায় সবাই তাদের সম্পর্ক জানুক এবং তারা একে অপরকে হারাতে চায় না।

ল্যুজ তাকে অনেক চিঠি লিখেছে। কিন্তু চিঠিগুলো সে যুদ্ধবিরতির পরে পেয়েছে। তার সামনে বান্ডিল থেকে চিঠি বের করে লিফটেন তারিখ অনুযায়ী চিঠি সাজায় এবং সবগুলো পড়ে শোনায়। সব চিঠির মূল বিষয় হাসপাতাল এবং তার প্রতি ল্যুজের অপরিসীম ভালোবাসা, একাকিত্বের দূর্বিসহ জীবন এবং তার অনুপস্থিতিতে কষ্টকর রাত কাটানোর করুণ অভিজ্ঞতা।

যুদ্ধবিরতির পরে তারা সমঝোতায় পৌঁছে যে, সে বাড়ি ফিরে যাবে এবং একটা চাকুরি খুঁজে নিবে। তারপর তারা বিয়ে করবে। তার ভালো চাকুরী না হওয়া পর্যন্ত ল্যুজ বাড়ি যাবে না। বরং সে নিউ ইয়র্কে এসে তার সঙ্গে দেখা করবে। এটা সহজেই অনুমেয় যে, সে মদিরার রস আস্বাদন করবে না এবং আমেরিকায় ফিরে কোন বন্ধু-বান্ধব কিংবা অন্য কারোর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে চাইবে না। শুধু একটা চাকুরী চাই এবং তারপর বিয়ে। ল্যুজের বাড়ি না ফেরার জন্য পাডুয়া থেকে মিলানে ট্রেনে যাওয়ার পথে তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। মিলান স্টেশনে পরস্পরকে বিদায় জানানোর সময় তারা একে অপরকে চুমু খায় এবং ঝগড়ার মধ্যে তারা বিদায় জানায়নি। তবে এ রকম করে বিদায় জানাতে সে রীতিমতো বিরক্ত।

সে জাহাজে করে জেনোয়া থেকে আমেরিকা যায়। ল্যুজ পরডোনানে ফিরে গিয়ে হাসপাতাল খোলে। সেখানে সে ছিল নিঃসঙ্গ এবং ছিল বৃষ্টিমুখর সময়। এছাড়া শহরে যুদ্ধ ফেরত সৈনিকদের বসতি ছিল। শীতে কর্দমাক্ত জায়গায় বসবাস করার সময় মেজর তার সঙ্গে মিলিত হয়। আগে ইতালিয়ান সৈন্যদের সঙ্গে তার কখনই কোন পরিচয় ছিল না। অবশেষে একদিন সে আমেরিকায় চিঠি লিখে যে একটা ছেলে এবং একটা মেয়ের সম্পর্কের মতোই তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। এজন্য সে খুবই দুঃখিত। তার বিশ্বাস আমেরিকায় বসে হয়তো সে পরিস্থিতি বুঝবে না, কিন্তু একসময় তাকে ক্ষমা করে দিবে এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। অপ্রত্যাশিত হলেও সে আশা করে যে, আগামি বসন্তেই তারা সাত পাকে বাঁধা পড়বে। আগের মতোই সে তাকে গভীরভাবে ভালোবাসে। কিন্তু ল্যুজ এখন বুঝতে পারে তাদের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল নেহাত বালক-বালিকা সুলভ সম্পর্ক। সে আশা করে আমেরিকায় লোকটির জীবন ধন্যাঢ্য হবে এবং এটাই ল্যুজের পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস। সে জানতো আসলে এটা ভালোর জন্যই হয়েছে।     

বসন্তকালে কিংবা অন্য কোন সময়ে মেজর তাকে বিয়ে করেনি। এ সম্পর্কে শিকাগোতে লেখা চিঠিতে ল্যুজ কখনই কারণ জানায়নি। তার কিছুদিন পরেই ট্যাক্সিক্যাবে চড়ে লোকটি লিঙ্কন পার্কের মাঝ দিয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে সে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের একজন সেলস্ গার্লের মাধ্যমে গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়।


গল্পসূত্র: ‘একটি অতি ক্ষুদ্র গল্প’ নোবেল বিজয়ী মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের ‘এ ভেরি শর্ট স্টোরি’ গল্পের অনুবাদ । গল্পটি ১৯২৫ সালে প্রকাশিত লেখকের ‘ইন আওয়ার টাইম’ ছোটগল্প সংকলনে প্রকাশিত হয় । পরবর্তীতে গল্পটি লেখকের ‘দ্য এসেন্সিয়াল হেমিংওয়ে’ গল্প গ্রন্থে সন্নিবেশিত করা হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে ।

লেখক পরিচিতি: আমেরিকার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক এবং নোবেল বিজয়ী লেখক আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের (পুরো নাম আর্নেষ্ট মিলার হেমিংওয়ে) জন্ম ইলিনয় রাজ্যের ওক পার্ক এলাকায়, ১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই। তাঁর পিতা ছিলেন চিকিৎসক এবং মা ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী। স্কুল জীবন শেষ করে তিনি কিছুদিন সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির সেনাবাহিনীর অ্যাম্বুলেন্সের চালক ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হয়ে তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে যান। পরবর্তীতে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে যুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েস্ টু আর্মস্’ লেখেন, যা ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় । তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সান অলো রাইজেস’ প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে ‘ইন্ডিয়ান ক্যাম্প’, ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস্’, ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ এবং ‘ট্রু অ্যাট ফার্স্ট লাইট’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৫৩ সালে তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। তিনি আইডাহোর এক হোটেলে ১৯৬১ সালের ২ জুলাই আত্মঘাতী হন।

//জেডএস//

লাইভ

টপ