সংক্রমিত বর্ণবাদ

Send
ইরা সামন্ত
প্রকাশিত : ০৭:০০, মার্চ ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, মার্চ ২৯, ২০১৯

‘ক্লাশ অফ টাইটানস’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮১ সালে। আমেরিকা-ইংল্যান্ডের যৌথ প্রযোজনার এই সিনেমাটি সে সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয়তার তকমা গায়ে লাগাতে বেশি দেরি করেনি। সমুদ্র-দৈত্যকে হত্যা করে অ্যান্ড্রোমেডা দেবীকে উদ্ধার করার কাহিনি এতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, পরবর্তীকালে ২০১০ সালে সিনেমাটি পুনঃনির্মিত হয়।

সৌন্দর্যের জন্য গ্রিক পুরাণের দেবী অ্যান্ড্রোমেডার খ্যাতি জগতজোড়া। যে কারণে শুধু সিনেমা নয়, কালে কালে চিত্রশিল্পীরাও তাকে এঁকেছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে তাকে নিয়ে সময়ে সময়ে যুক্তিতর্কও কম হয়নি—ব্রিটিশ শিল্পী ও ইতিহাসবিদ এলিজাবেথ ম্যাকগ্রাথ ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধে দেখিয়েছিলেন, এই অ্যান্ড্রোমিডা দেবীকে যতই গ্রিক পুরাণের দেবী বলে আখ্যা দেওয়া হোক না কেনো, তার উৎস কখনই গ্রীস নয়, তিনি হলেন ইথিওপিয়ান রাজা সেফিউস এবং রানি ক্যাসিওপিয়ার কন্যা। ম্যাকগ্রাথ তার ওই নিবন্ধে এও দেখিয়েছেন যে, অ্যান্ড্রোমিডার সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে অনেক চিত্রকর্ম আঁকা হলেও পাশ্চাত্যের অধিকাংশ চিত্রকর্মে তাকে দেখানো হয়েছে শ্বেতাঙ্গ হিসবে, কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে নয়। এমনকি রেনেসাঁর সময়কার শিল্পকর্মে বারবার শ্বেতাঙ্গ হিসেবেই অ্যান্ড্রোমেডা চিত্রায়িত হয়েছে।

 ১৫১০ সালে আঁকা ইতালিয়ান শিল্পী পিয়ারো ডি কসিমোর ‘ইন পারসয়েস লিবারেটিং অ্যান্ড্রোমেডা’ চিত্রকর্মে আমরা যে অ্যান্ড্রোমেডাকে পাই তাতে তিনি শ্বেতাঙ্গ, যদিও একই চিত্রকর্মে অ্যান্ড্রোমেডার পাশে কৃষ্ণাঙ্গ একজন সঙ্গীতশিল্পী এবং তাদের কৃষ্ণাঙ্গ মাতাপিতাকে দেখা যায়। কিন্তু তাহলে অ্যান্ড্রোমিডার ব্যাপারে এই বর্ণবাদ কেনো? সহজ কথায় এটাকে নিছক বর্ণবাদ ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না।পিয়ারো ডি কসিমোর ‘ইন পারসয়েস লিবারেটিং অ্যান্ড্রোমেডা’

স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী ফ্রান্সিসকো প্যাসেকোর রেফারেন্স দিয়ে ম্যাকগ্রাথ দেখান যে, প্যাসেকোর ‘আর্তে দে লা পিনতুরা’ গ্রন্থে অ্যান্ড্রোমেডা কেন্দ্র করে যতগুলো চিত্রকর্ম রয়েছে তার অধিকাংশই অ্যান্ড্রোমেডাকে দেখানো হয়েছে শ্বেতাঙ্গদের অগ্রদূত হিসেবে। তবে সব শিল্পীই যে অ্যান্ড্রোমেডাকে শ্বেতাঙ্গ হিসেবে এঁকেছেন তা নয়। ১৭৩১ সালে প্রকাশিত ফ্রেন্স চিত্রশিল্পী বার্নার্ড পিকার্টের ‘পার্সিয়াস’ এবং ১৬৫৫ সালে প্রকাশিত ডাচ শিল্পী আব্রাহাম ভ্যান ডাইয়েনবিবেকের ‘অ্যান্ড্রোমেডা’ শিরোনামের সাদাকালো চিত্রকর্মে কৃষ্ণাঙ্গ অ্যান্ড্রোমেডাকে খুঁজে পাওয়া যায়।

এবার একই প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক—কুইন অফ সেবার নাম শোনেনি এমন লোক নেহায়েৎ কম। মাইকেল ওহাজুরু নামের একজন ইতিহাসবিদ লন্ডনের বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে এই রানিকে নিয়ে আঁকা চিত্রকর্মের উপর পর্যালোচনা করে দেখলেন—বিখ্যাত যেসব চিত্রশিল্পী এই রানিকে এঁকেছেন তাদের অধিকাংশই তাকে দেখিয়েছেন শ্বেতাঙ্গ রূপে। ইংরেজি চিত্রশিল্পী এডওয়ার্ড পোয়েনটারের ১৮৯০ সালে আঁকা ‘দ্য ভিজিট অফ দ্য কুইন অফ সেবা টু কিং সলোমন’, ১৬৪৮ সালে আঁকা ক্লোড লরেনের চিত্রকর্ম ‘সি পোর্ট উইথ দ্য এমবারকেশন অফ দ্য কুইন সেবা’তে আমরা দেখি একজন শ্বেতাঙ্গ কুইন অফ সেবাকে।এডওয়ার্ড পোয়েনটারের ‘দ্য ভিজিট অফ দ্য কুইন অফ সেবা টু কিং সলোমন’

অথচ ওল্ড টেস্টামেন্টে সেবা বলে যে স্থানকে নির্দেশ করা হয়েছে সেটি আজকে ইথিওপিয়া, কিংডম অফ ইথিওপিয়া। তবে সব শিল্পীর তুলিতেই যে এই রানিকে শ্বেতাঙ্গ রূপে দেখানো হয়েছে তা নয়, ১২শ শতকে নিকোলাস অব ভেরদুন সলোমন রাজার সাথে সেবার রানিকে আঁকেন যেখানে তাকে দেখানো হয় একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে। এদিকে অনেক আরব ঐতিহাসিকের দাবি সেবা রাজ্যের অবস্থান ছিলো আজকের ইয়েমেনে, অনেকে আবার বলেন ইথিওপিয়ানদের সাথে গ্রীকদের অনেক আগে থেকেই যোগাযোগ ছিলো, সে কারণে ইথিওপিয়ার কেউ সাদা হতে পারবে না সেটা খুব বেশি যৌক্তিক কথা নয়।নিকোলাস অব ভেরদুনের কৃষ্ণাঙ্গ কুইন অফ সেবা

এসব যৌক্তিকতা পেরিয়ে সরাসরি ওল্ড টেস্টামেন্টের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক—আসল হিব্রু বাইবেলের ১:৫-৭ অধ্যায়ে সং অফ সলোমন অংশে সেবার রানি খুব স্পষ্টভাবেই বলছেন, ‘আমি কালো এবং সুন্দর’। পরবর্তীকালে ল্যাটিন অনুবাদে দেখা যায় ‘এবং’ বদলে গিয়ে লাইনটা হয়েছে, ‘আমি কালো কিন্তু সুন্দর’। ১৬১১ সালের দিকে কিং জেমসের অনূদিত ইংরেজি অনুবাদে লাইনটা হয়ে যায়, ‘আমি কালো কিন্তু সুশ্রী’। ওল্ড টেস্টামেন্টে রানি নিজের যবানীতে যেখানে নিজেকে কালো বলছেন, সেখানে তাকে যুগে যুগে শ্বেতাঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন আমাদেরকে আসলেই ভাবাচ্ছে কিনা সেটা দেখার বিষয়।

সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে দুটি মসজিদে হামলা চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যা করা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীর মননে রোপিত বীজ হয়ত লুকিয়ে আছে এখানেও।

বিবিসিতে প্রকাশিত সোফিয়া স্মিথ গ্যালারের ফিচার অবলম্বনে

//জেডএস//

লাইভ

টপ