রোল নম্বর ৩৪ || আলেহান্দ্রো সাম্ব্রা

Send
তর্জমা : মো. ইমরান হোসেন
প্রকাশিত : ১৩:৩৮, এপ্রিল ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪১, এপ্রিল ০২, ২০১৯

আমরা তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। শিক্ষকরা আমাদের নাম না ধরে ডেকে বরং রোল নম্বরের তালিকা অনুসারে ডাকত। এ কারণে আমি সাধারণত খুব ঘনিষ্ঠ দুই-একজন সহপাঠী ছাড়া অন্যদের নাম জানতাম না। আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি কারণ এমনকি আজকের গল্পের মূল চরিত্রের নামও আমি জানি না। তবে আজো আমার স্পষ্ট মনে আছে তার রোল নম্বর ছিল ৩৪। আমার মনে হয় সেও আমার কথা একেবারে ভুলে যায়নি। ক্লাসে তখন মোট ৪৫ জন ছাত্র ছিল এবং আমি ছিলাম সর্বশেষ। ক্লাসে সর্বশেষ হওয়ার মধ্যে একটা ইতিবাচক ব্যাপার আছে। কারণ তা ১৫ বা ২৭-এর মতো মধ্যবর্তী কোনো রোল নম্বরের তুলনায় বরং অনেক ভালো একটি বিষয়।

৩৪ রোল নম্বরধারী সম্পর্কে আমার প্রথমেই যা মনে পড়ছে তা হলো সে স্কুলে মধ্যাহ্ন বিরতির সময় প্রায়ই গাজর খেত। তার মা গাজরগুলো ছুলে একটি বক্সে সুচারুভাবে সাজিয়ে দিত। সে উপরের অংশে চাপ দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বক্সটি খুলত। এ কাজে সে শক্তি প্রয়োগের মাত্রা এমন নিখুঁতভাবে পরিমাপ করত যেন সে কঠিন কোনো এক কলা অনুশীলন করছে। তবে ভক্তি করে গাজর খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সে ছিল বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করে সপ্তম শ্রেণিতে থেকে যাওয়া তথা পুনরাবৃত্তিকারী একমাত্র ছাত্র।

ফেল করে একই ক্লাসে থেকে যাওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর বিষয় ছিল। তখন আমাদের বয়স ছিল এগারো কি বারো। আমাদের তখনকার সেই সংক্ষিপ্ত জীবনকালে আমরা কখনোই ওই ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া তো দূরে থাক ওরকম অভিজ্ঞতার কাছাকাছিও যাইনি। চিলের সবচেয়ে নামকরা স্কুল ইন্সতিতুতো নাসিয়োনালে আমরা সবেমাত্র ভর্তি হয়েছিলাম। সুতরাং আমাদের মেধা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। কিন্তু আমাদের সামনে ছিল সেই ৩৪ রোল নম্বরধারী ছাত্রটি। আমাদের মাঝে তার বিচরণ আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দিত যে-কেউই ব্যর্থ হতে পারে। এমনকি সেই ব্যর্থতা সহ্য করে জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাও হয়তো তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার না। কারণ ৩৪ তার কলঙ্কের কালিমাকে অলঙ্কারের উজ্জ্বললতার মতো করে এমনভাবে তুলে ধরত যেন একই ক্লাসের বইগুলো আবারো পড়ার সুয়োগ পেয়ে সে বরং ভেতরে ভেতরে বেশ খুশিই ছিল। প্রায়ই কোনো কোনো শিক্ষককে তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে শোনা যেত, ‘আপনার মুখটা বেশ চেনা চেনা লাখছে।’ ৩৪ বিনম্রভাবে উত্তর দিত, ‘জি, স্যার। এ ক্লাসে ফেল করে থেকে যাওয়া আমিই একমাত্র ছাত্র। তবে এবার নিশ্চিত আগের বছরের তুলনায় ভালো ফল করব।’

ইন্সতিতুতো নাসিয়োনাল স্কুলে প্রথম মাসগুলোতে আমরা বলতে গেলে একরকম নরকের যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। শিক্ষকেরা তাদের কথাবার্তা ও কাজকর্ম সবকিছুর মধ্যদিয়ে আমাদেরকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিত মাধ্যমিক স্কুলে পড়ালেখা করাটা কতটা ভীষণ কঠিন ছিল। আমাদেরকে অনুশোচনা করে পাড়ার সাদামাটা স্কুলে ফিরে যেতে পরামর্শ দিত। কথাগুলো তাচ্ছিল্যভাবে ও কৌতুক-উদ্রেককারী সুরে বললেও তা আমাদের হাসির কারণ না হয়ে বরং ভীষণ ত্রাস সৃষ্টি করত।

বলাবাহুল্য যে তখনকার শিক্ষকেরা সত্যিকার অর্থে ছিল এক একটা আস্ত বেজন্মা। তাদের ঠিকই নাম ও বংশ পরিচয় ছিল। যেমন গণিতের শিক্ষক বেরনার্দ আগুয়াইয়ো ছিল সম্পূর্ণ একটা বেশ্যার বাচ্চা। বিশেষায়িত প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষক এদুয়ার্দ বেনেগাস ছিল একটা মাঙ্গের পুত। সেসব অনেক দিন আগের কথা এবং আজ ভৌগোলিক দূরত্বও হয়তো অনেক। তবে ওই শিক্ষকদের প্রতি প্রতিশোধ নেবার স্পৃহা এখনো আমার একটুও কমেনি। তারা ছিল নিষ্ঠুর ও সস্তা চরিত্রের, হতাশাগ্রস্ত, হাদারাম, গোবেচারা, স্বৈরশাসক পিনোচেতের দোসর, গোবর গণেশ, ভীতুর ডিম।

তবে আজকে আমি এইসব বেজন্মা শিক্ষকদের নিয়ে গল্প করতে বসিনি। আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি আমি ওদের সম্পর্কে আর কোনো কথা বলব না। বরং এখানে বিরতিতে গাজর খাওয়া এবং ফেল করে ক্লাসে থেকে যাওয়া আমাদের একমাত্র সহপাঠী ৩৪ রোল নম্বরধারীকে নিয়ে আলোচনা করব।

৩৪-এর আচরণ ক্লাসে পুনরাবৃত্তিকারী ছাত্রদের তুলনায় ভিন্ন ছিল। সাধারণত মনে করা হয় এধরনের ছাত্ররা তাদের সহপাঠীদের সাথে মেলামেশা করতে চায় না এবং লেখাপড়ায় তারা তেমন আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু ৩৪ আমাদের সাথে সবকিছু ভাগাভাগি করে নেবার জন্য সর্বদা উদগ্রিব থাকত। ফেল করে ক্লাসে থেকে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তাদের পূর্বের সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার কারণে একটা নিদারুণ মনোবেদনা কাজ করে। তাদের এই দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে তারা এক ধরনের বিরতিহীন সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। ক্লাসে পুনরাবৃত্তিকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অতীতে শিকড় গেড়ে পড়ে থাকার মতো কোনো অসুখী প্রবণতা আমরা ৩৪-এর মধ্যে লক্ষ করিনি।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল এই যে ৩৪ কখনো বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করত না। আমরা তার তেমন পরিচিত না হলেও মঝে-মধ্যে আমাদের সুবিধার্তে সে শিক্ষকদের সাথে কথাবার্তা বলত। সেসব কথাবার্তা ছিল যথেষ্ট উচ্ছল, সেখানে স্বভাবসিদ্ধ প্রাণোচ্ছল অঙ্গভঙ্গি এমনকি পিঠে দুষ্টুমির ছলে মৃদু চপেটাঘাতের উপস্থিতিও দেখা যেত। যেসব শিক্ষকেরা তাকে ফেল করিয়ে দিয়েছিল তাদের সাথেও সে ভদ্র সম্পর্ক বজায় রাখতে পছন্দ করত।

৩৪ যতবারই ক্লাসে তার অনস্বীকার্য বুদ্ধিমত্তার স্ফূরণ ঘটাত ততবারই আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠতাম। তবে সে কখনোই জ্ঞান জাহির করত না বরং ভিন্ন বা অভিনব কোনো দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত অথবা জটিল কোনো বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করত। সে এমন সব বিষয় তুলে ধরত যা আমাদের পাঠ্যবইয়ে পাওয়া যেত না। এ কারণে সে আমাদের অপরিসীম শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের পাত্রে পরিণত হয়েছিল। এই বিস্মিত হবার ব্যাপারটা আমাদের কাছে নিজেদের জন্য নিজেরা কবর খোড়ার মতো ছিল। কারণ যদি তার মতো এত বুদ্ধিমান একজন ছাত্র অকৃতকার্য হয়, তবে আমাদের মধ্যে যে-কেউ এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা আরো বেশি। অগোচরে আমরা তার ব্যর্থতার কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করতাম। আমরা বানিয়ে বানিয়ে বলতাম যে সে হয়তো পারিবারিক কলহ বা কোনো জটিল কষ্টদায়ক রোগের শিকার হয়ে এই ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ব্যর্থতা মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা সকলে জানতাম ৩৪-এর ব্যর্থতার কারণ অন্য কিছু নয় বরং সম্পূর্ণরূপে পড়ালেখা সংক্রান্ত। এটাও উপলব্ধি করতাম যে দুদিন বাদে আমরাও হয়তো তার মতো হতভাগ্য ও ব্যর্থ ছাত্রে পরিণত হব।

একদিন সে আকস্মিকভাবে আমার কাছে এসে হাজির হলো। তাকে একই সঙ্গে কিছুটা বিচলিত এবং সুখী দেখাচ্ছিল। তার মুখ দিয়ে কথা বের হতে কিছুটা সময় লাগল যেন সে আমাকে বলা কথাগুলো নিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাবছিল। শেষমেশ বলে উঠল, ‘তুই দুশ্চিন্তা করিস না। বেশ কিছু দিন থেকে আমি তোকে লক্ষ করছি। আমি নিশ্চিত যে তুই পাস করবি।’

এই কথাগুলো শোনাটা আমার জন্য অনেক স্বস্তিদায়ক ছিল। আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম; আমার খুশির মাত্রা বলতে গেলে কিছুটা অযৌক্তিক পর্যায়েই পৌঁছেছিল। ৩৪ ছিল একজন অভিজ্ঞ দিকদর্শী এবং এরকম একজনের মুখে আমার ভবিষ্যৎ ভাগ্যযোগের খবর পেয়ে আমি বরং অনেকটা আশ্বস্ত হলাম।

অল্প কিছু দিনের মধ্যে জানতে পেলাম ক্লাসের অন্যান্য সহপাঠীরাও আমার মতো একই দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছিল। এক সময় এই গুঞ্জনও শোনা গেল যে ৩৪ আসলে আমাদের সকলের সাথে মশকরা করে। তবে আরো পরে আমাদের মনে হলো আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস সঞ্চারের উদ্দেশ্যে সে এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করত। নিঃসন্দেহে তখন আমাদের সকলের জন্য ওই আত্মবিশ্বাসটুকুর ভীষণ দরকার ছিল। কারণ আমরা সকলেই কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। শিক্ষকেরা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে নিদারুণ মানসিক নির্যাতনের মধ্যে রাখত। আমাদের সকলের সাময়িক পরীক্ষার ফলাফল ছিল ভীষণ খারাপ। আমরা সকলেই একটা করুণ অবস্থার মধ্যে ছিলাম, কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। সকলে মিলে যেন কোনো এক অজানা মৃত্যুপুরীর দিকে ধাবিত হচ্ছিলাম।

ক্লাসের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে খোঁজখবর নেয়া শুরু হলো : ৩৪ কি সকলকেই তার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে নাকি বিশেষভাবে নির্বাচিত গুটিকয়েক সহপাঠীকে তার নসিহত শুনিয়েছে? যারা তখন অব্দি ৩৪-এর বার্তা পায়নি, তারা বেশ ভড়কে গেল। সবচেয়ে উদ্বিগ্নদের মধ্যে অন্যতম ছিল ৩৭ বা ৩৮ রোল নম্বরধারী (তার রোল নম্বরটা আমার ঠিকমতো মনে নেই)। যাই হোক, অনিশ্চয়তা ভরা সেই পরিস্থিতি আর সহ্য না করতে পেরে নিয়মের তোয়াক্কা না করে সে পাস করতে পারবে কিনা তা সরাসরি ৩৪-এর কাছে জিজ্ঞাসা করল। এ প্রশ্নে ৩৪ কিছুটা বিব্রত বোধ করল এবং বলল, ‘ক্লাসে তোরা সংখ্যায় অনেক। আমি সবার দিকে খেয়াল রাখতে পারিনি। সত্য কথা বলতে কি আমি তোর দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দিস। আর তোকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাকে কিছুটা সময় দে।’

কারো এটা ধারণা করা ঠিক হবে না যে ৩৪ একটা ভাওতাবাজ ছেলে ছিল। তার আচরণ কখনোই সেরকম ছিল না বরং তার কথাবার্তায় সর্বদা সততার ছাপ স্পষ্ট ছিল। তার বক্তব্য নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ ছিল না। সে স্বভাবসুলভ সরলতা নিয়ে চোখে চোখ রেখে কথাবার্তা বলত। প্রতিটি বাক্যের মধ্যে নতুন কিছু তত্ত্ব বা তথ্যের আভাস থাকত। তার কথাতে যেন কোনো এক পরিপক্ব ও শ্লথ সময়ের ঘণ্টা টিকটিক করে প্রতিধ্বনিত হতো। এই তো কেবলমাত্র ৩৭ বা (৩৮)-কে সে বলল, ‘ক্লাসে তোরা সংখ্যায় অনেক। আমি সবার দিকে খেয়াল রাখতে পারিনি।’ এরকম কথা শোনার পর কেউই আর তার সততা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেনি। ৩৪-এর কথাবার্তা ছিল সবসময় বস্তুনিষ্ঠ তবে কথা বলার ঢং ছিল বেশ অদ্ভুত। মজার ব্যাপার হলো তখন আমরা ভাবতে শুরু করলাম যে অদ্ভুত ঢং ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথা বস্তুনিষ্ঠ কথা বলা যায় না।

৩৮ (বা ৩৭) পরের দিন ৩৪-এর কাছে তার পর্যবেক্ষণের ফল জানতে চাইলে সে উত্তর এড়িয়ে গেল। আমাদের মনে হলো সে হয়তো কষ্টদায়ক কোনো সত্য লুকানোর চেষ্টা করছে। সে ৩৮ (বা ৩৭)-কে বলল, ‘আমাকে আর একটু সময় দে। কারণ আমি এখন নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি।’ আমরা সকলে ধরে নিলাম এই গোবেচারা ফেল করবে। তবে এক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ পর্ব শেষে আমাদের গণক সাহেব সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৩৭-৩৮ রোল নম্বরধারীর কাছে গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তুই পাস করবি। আমি নিশ্চিত যে তুই পাস করবি।’

আমাদের সকলের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে গেল। তবে তখনও একটা বিষয় সমাধান করা বাকি ছিল। ততদিনে ক্লাসের সকলে আমাদের মহামান্য গণক ৩৪ দ্বারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিল। কিন্তু ক্লাসের সকলেই একযোগে পাস করে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। আমরা নিবিড় অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম স্কুলের শত বছরের ইতিহাসে সপ্তম শ্রেণির ৪৫ জন ছাত্রের সকলেই পাস করার মতো কোনো ঘটনা কখনো ঘটেনি। পরবর্তী মাসগুলো আমাদের জন্য অনেকটা বাঁচা-মরার লড়াইয়ের মতো ছিল। আমরা ৩৪-এর ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে কিছুটা সন্দহ পোষণ করতাম। সে বিষয়টি লক্ষ করেছিল তবে তেমন কোনো গুরুত্ব দিত না। বরং সে মধ্যাহ্ন বিরতিতে আত্মতৃপ্তির সঙ্গে গাজর খেয়ে যেতে লাগল এবং ক্লাসে তার সাহসী ও আকর্ষণীয় তাত্ত্বিক ভাবনা-চিন্তা প্রকাশের মাধ্যমে নিয়মিত অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে লাগল। আমাদের শ্রেণিকক্ষের সামাজিক পরিমণ্ডলে তার বিচরণের মাত্রা হয়তো একটু সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। কারণ সে জানত আমরা সকলে তাকে চোখে চোখে রাখতাম এবং বলতে গেলে আমাদের নজর এড়াবার তার কোনো সুযোগ ছিল না। তবে সে সর্বদা উষ্ণতার সঙ্গে আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করত।

দিন গুনতে গুনতে বাৎসরিক পরীক্ষা এসে হাজির হলো। ফলাফলে দেখা গেল ৩৪-এর ভবিষ্যদ্বাণী যথেষ্ট সঠিক ছিল। আমাদের মধ্যে চারজন সহপাঠী কূলে ভেঁড়ার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই জাহাজ পরিত্যাগ করেছিল এবং তাদের মধ্যে ৩৭ (বা ৩৮) রোল নম্বরধারীও ছিল। বাকি ৪১ জনের মধ্যে ৪০ জন পাস করেছিল। ফেল করে ক্লাসে থেকে যাওয়া একমাত্র ছাত্রটি আর কেউ নয় বরং সেই ৩৪।

শেষ দিনের ক্লাসে আমরা তার কাছে গেলাম, তাকে সান্ত্বনা দিলাম। তার মুখে দুঃখের ছাপ স্পষ্ট ছিল তবে তাকে আমরা কোনো আহাজারি করতে দেখিনি। সে বলল, ‘আমি ভিন্ন কিছু আশা করিনি। লেখাপড়া ব্যাপারটা আমার কাছে বড্ড কঠিন লাগে। বোধহয় অন্য কোনো স্কুলে গিয়ে পড়লে আমার জন্য ভালো হবে। লোকে বলে কোনো কোনো সময় সোজা পথ দিয়ে যাওয়ার চেয়ে একটু বাঁকানো বা ঘোরা পথ দিয়ে যাওয়া উত্তম। বোধহয় ভিন্ন পথে পা বাড়ানোর সময় আমার এসে গেছে।’

৩৪-কে হারিয়ে আমরা সকলেই কষ্ট পেয়েছিলাম। ওই আকস্মিক সমাপ্তিটি আমাদের কাছে একটা চরম অবিচার ও অন্যায্য মনে হয়েছিল। নতুন বছরের প্রথম স্কুল দিবসে আমরা পুনরায় তাকে দেখতে পেলাম, তবে আমাদের সঙ্গে নয় বরং সে ছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রদের সারিতে। আমাদের স্কুলে ফেল করে একই শ্রেণিতে দুইবার থেকে আদুভাই বনে যাবার কোনো নিয়ম ছিল না। এসব ক্ষেত্রে ছাত্রদেরকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু ৩৪-এর ক্ষেত্রে আমরা সেই নিয়মের ব্যত্যয় হতে দেখলাম। ন্যাড়া বারবার বেলতলায় যায় না। তবে আমাদের সকলকে অবাক করে দিয়ে ৩৪ আবারো একই অভিজ্ঞতা যাপনে নিজেকে সপে দিল।

দু-একদিন পর আমি তার কাছে গেলাম। বন্ধুত্বমূলক সহানুভূতি নিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করলাম। সেও যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখাল। তাকে আগের তুলনায় রুগ্ন দেখাচ্ছিল এবং কিছুটা পাতলা মনে হচ্ছিল। নতুন সহপাঠীদের সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্যটা নজর এড়ানোর মতো ছিল না। অবশেষে সে তার সেই পরিচিত ভাবগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আমি এখন আর ৩৪ নই। আমার প্রতি আগ্রহের জন্য তোকে ধন্যবাদ। তবে তোদের সেই পরিচিত ৩৪ রোল নম্বর বলে আর কেউ নেই। আমি এখন ২৯ এবং নতুন এই বাস্তবতার সাথে আমাকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। সত্য কথা বলতে গেলে, ক্লাসে নিজেকে মানিয়ে নেয়া এবং নতুন বন্ধু তৈরি করা আমার কাছে এখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অতীত নিয়ে পড়ে থাকা স্বাস্থ্যপ্রদ নয়।’

আমার বিশ্বাস তার কথায় যথেষ্ট যুক্তি ছিল। মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখতাম সে তার নতুন সহপাঠীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা আগের বছরের যেসব শিক্ষকেরা তাকে ফেল করিয়ে দিয়েছিল তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। আমার যতদূর মনে পড়ে সেবার সে পাস করেছিল। কিন্তু আমাদের স্কুলে পড়ালেখা চালিয়ে গিয়েছিল কিনা তা ঠিক বলতে পারব না। সময়ের পরিক্রমায় আমরা তার হদিস হারিয়ে ফেলেছিলাম। আশা করি সে সৌভাগ্যের দেখা পেয়েছে, কারণ সত্যিকার অর্থে সে সফল হওয়ার মতো একজন যোগ্য ছাত্র ছিল।

সান্তিয়াগো, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

//জেডএস//

লাইভ

টপ