যেভাবে লেখা হলো ‘শস্য ও পশুপালনের স্মৃতি’

Send
বিজয় আহমেদ
প্রকাশিত : ১৭:৫৬, এপ্রিল ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩২, এপ্রিল ০৭, ২০১৯

এক ঘোরগ্রস্ত ৫-৬ মাসের জার্নি। ঘুমাতে যাবার আগে, অফিসে, রাস্তায়—কোথায় লিখিনি! এক তরতর সাবলীল গল্পের ভিতর ডুবে থাকা। গল্পটা যেন প্রস্তুত হয়েই ছিলো। আমি শুধু লিপিকারের ভূমিকা পালন করেছি। অথবা ‘শস্য ও পশুপালনের স্মৃতি’ লেখার সময় আমি যেনবা কোনো নিঃসঙ্গ টাইপ রাইটারের ভূমিকায় কাজ করেছি। যেন অনেক আগে থেকেই আমি প্রস্তুত ছিলাম প্রতিটি পঙক্তির জন্য। চরাচর ভেদ করে আসতে থাকা প্রতিটি দৃশ্যের জন্য।

দীর্ঘদিন আমি জেলা উপজেলা শহরে থেকেছি। টানা শেষ ১০ বছর। জন্মেছি গ্রামে। টুনটুনি পাখির বাসার খোঁজে দুপুর পার করা হাফপ্যান্ট-বালক ছিলাম আমি। পুঁটি মাছের পুচ্ছে ঝিলিক লাগা সূর্যের আলো কাঁধে ধারণ করা তরুণ আমি। করিমগঞ্জ অঞ্চল থেকে বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে জিয়ারতে যাওয়া মানুষজনের আত্মীয় আমি। নিজের গ্রাম থেকে ট্রাক ভর্তি করে ধানকাটা মৌসুমে কাজের জন্য আড়াইহাজারের দিকে যেতে থাকা শ্রমিকদের সন্তান আমি।

বেশ কয়েকটি জেলায় থাকা হয়েছে আমার। জামালপুর শেরপুর অঞ্চল দেখেছি। নরসিংদি নারায়ণগঞ্জ দেখেছি। তারপর টানা ৪ বছরের যাপন আমার এক ইউনিয়নে, যমুনা নদী বিধৌত চরাঞ্চলের প্রতিবেশী হিসাবে। এ এক অদ্ভুত স্মৃতি আমার। অতিকায় সব চর। নদীর পেট ফেরে উঠে আসা নতুন চর। বালির দুনিয়া এক। আর কিছু অনেক পুরানো চর। পুরানো কিছু চর এতই বড়ো যে, নিজেই একটা পুরো ইউনিয়ন বা ইউনিয়নের সমান। নির্বাচিত চেয়ারম্যান আছে সেখানে। ইউনিয়ন পরিষদের অফিস আছে। দুইতলা প্রাইমারি স্কুল আছে। এইসব চর দিয়ে ভাড়ার মোটরবাইক ছুটে যায়। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ছুটে যায়। আর বাড়ি লাগোয়া আঙিনার পাশে ঘাস খেতে থাকে প্রলম্বিত সময় নিয়ে আনমনে ঘোড়াগুলো তাদের। আর জোছনায় যখন উদ্বেল হয়ে ওঠে পৃথিবী, তখন শাদা শাদা পরীরা আসে এইসব অতিকায় চরে, চরাঞ্চলে। তাদের ডানায় ভর করে, ইউএফও’র (অজানা উড়ন্ত বস্তু) মতোন চরগুলো মহাশূন্যের দিকে ভেসে যেতে থাকে।

নতুন জেগে ওঠা চরগুলোতে মৌজা দাগ ধরে নিজের ভূমি বুঝে নেয় পূর্বে ভাঙনে সর্বশান্ত হওয়া মানুষ। ভূমি ফিরে পাবার পর, ঘোরলাগা দিন যায়, রাত যায় তাদের। ফসল ফলানোর জন্য মেতে ওঠে যুদ্ধে, চাষবাসে। আর সে নতুন বা পুরানো চর, যাই হোক না কেন, সে এক অতিকায় ভূমি— একরের পর একর। বিঘার পর বিঘা। সে কী সবুজ তাদের বরণ। চরে কোনো আইল থাকে না দৃশ্যত। তারপরেও পাশাপাশি আলাদা আলাদা ভূমি, পৃথক মালিকের সন্তানের মতো মিলেমিশে থাকে। কত না জাতের ফসল। গম, যব, ধান, কাউন। তিসি, তিল, অপরূপ বাদামের মায়া। আর যেখানে ফসল থাকে না সেখানটা চরাচরব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এক জিওমেট্রির মতো উদার পরে থাকে বালির কসমিক পৃথিবী। তাকালেই চিক চিক করে বালি আর বালি। অবিরাম বালি। রোদ পড়লে ঝলসে ঝলসে ওঠে। নৌকা করে চাষীরা আসে। রাখালেরা আসে। এইসব চরে। আর মাস ছয়ের জন্য আসে শয়ে শয়ে গরু, মহিষ। বাথান।  

আর দিগন্ত বিস্তৃত চরের চারপাশে পিতার মতো জড়িয়ে থাকা সাবলীল নদী। সারাবছরই যমুনা সুন্দরী। ব্রহ্মপুত্রের শাখা হলেও, এ নদী মহামায়ার। কত না শাখা প্রশাখা ইরল-বিরল-চিরল পাতার মতন আশপাশের জেলা উপজেলার বুক ভেদ করে পানি বয়ে নিয়ে যায়। এ নদীতে চাঁদ নামে পূর্ণিমায়। আরো নামে জেলে নৌকা। ঘাই মেরে নিজের হাজিরা জানান দেয় বাঘাআইড়। ইলিশের মৌসুমে ইলিশও আসে। আর নামে বলগ্রেড, ড্রেজার।

এই নদী, নদীকেন্দ্রিক এক অপরূপ চরাঞ্চল, চরে জিয়ারতে আসা এক অজানা কৌমের কোনো  সাহসী পুরুষ, পুরুষের স্বপ্ন আর ফসলক্ষুধাই—শস্য ও পশুপালনের স্মৃতির মূলকাহিনী।

আর্টকে তার জনমানুষ, ভূমি ও সময়ের সাথে বোঝাপড়া করে নিতে হয়। ‘শস্য ও পশুপালনের স্মৃতি’র আকাঙ্ক্ষাও তাই। নিজের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়া। নিজের বহতা রক্তে ডুব মেরে আত্মীয়তা খুঁজে আনা। আর কবি হিসেবে বলতে পারি, এটা আমার কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের দিকে যাত্রা। নিজের মাটি ও মানুষের দিকে যাত্রা। রক্ত সম্পর্কীয় বংশের মানুষদের কাছে পৌঁছাবার চেষ্টামাত্র।

বংশের মানুষ মানে তারা, যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্যার বাঁধ তৈরি করে। যেখানে ফসলের উপর নির্ভর করে মানুষের ভাগ্য তৈরি হয়। যেখানে উদার নদী ছলছল কেঁপে ওঠে ফেরেশতার মতো পলি বয়ে আনে। যেখানে দুধেল গরু ও মহিষের বাথানের সহাবস্থানে থেকে শস্য ফলাতে ফলাতে, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে করতে কৌমের মৃদু মানুষগুলোই একদিন অতিমানব হয়ে ওঠে।

আর এই আখ্যানের যে তরুণ কৃষক, সে হয়ত দৃশ্যত মেরেকেটে পাঁচ ফিট চার ইঞ্চির, কিন্তু খর্বকায় এই তরুণ তার ওই ছোট্ট আকারে বন্দি থাকে না কখনো। মানুষকে তার আকারের চেয়েও অনেক বড়ো বলেই বিশ্বাস করি। আর সেই বড়র পরিমাপ কী করে হবে? সে বড়ত্বের পরিমাপ হলো তার অভিঘাত। আর তাই আখ্যানের নায়কের আকারও তার দৈহিক মাপজোকে আটকে থাকে না। আখ্যানজুড়ে সে প্রবল আকারে হাজির হয়। সে বাথান সামলায়। সে লক্ষকোটি একর ভূমির বুক চিড়ে ফসল ফলায়। সে তার পোষা মহিষদল সাথে নিয়ে ঝড় রুখে দেয়। পাখি ও পতঙ্গের বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখে বীজ বা ফসল। 

আর এইসব অভিঘাত আর সংগ্রামের কথা আখ্যানে লিখতে গিয়ে, নানান আয়োজনের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। আশ্রয় নিতে হয়েছে নানান সংকেত ও সূত্রের। নানান দৃশ্য ও দৃশ্যাবলীর ঝকমারীর ঘোরে আমি নিজেও ঘোরগ্রস্ত হয়েছি। আর যে ঘোড়ার পিঠে চড়ে, বাড়ি ফেরে আখ্যানের তরুণ কৃষক—প্রকৃতি ও পতঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে—সে ঘোড়া কৃশকায় ও ক্ষুধার্ত হতে পারে না। সে চরাঞ্চল বা প্রত্যন্ত গ্রামের গরীব সন্তান হলেও, তার শরীরের ভিতর থেকে, পাকানো পেশি ফেড়ে যে অসীম শক্তি আগ্নেয়গিরির মতো প্রবল চাপ ও তাপসহ বের হয়ে আসে, আখ্যানে তাই বিবৃত হয়েছে।  

আখ্যানের নায়কের ঘাড়ে যে ট্যাটু তা জ্বালালী কবুতরের। পূর্বতন বংশধররা তার ঘাড়ে সুনিপুন হাতে তা এঁকে দিয়েছে জন্মের পরেই। বাকি জীবন অবধারিতভাবে এই খোদাই করা ট্যাটু বয়ে বেড়ায় সে। এই ট্যাটুই তাকে ফসলের দিকে দাবড়ায়। এ্ই ট্যাটু তাকে মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক হতে বাঁধা দেয়।

ভাবি, এই ট্যাটুই কোনো সন্তানের ঘাড়ে আসা অর্পিত দায়িত্ব। পারিবারিক বা সাংসারিক দায়িত্ব। আর এই দায়িত্বকে পবিত্র জ্ঞান করে বলেই নিঃসঙ্গ চরাঞ্চলে তার চাষবাস। কৌমের জনমানুষকে ভালো রাখা বা সুখে রাখাই অভিপ্সা তার। আর এভাবেই ‘কৌম’ এ গ্রন্থের কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। 

খুবই পুরানো কথা যে, ব্যক্তি একক কোনো সত্তা নয়। সে অনেক কিছুর, অনেক সম্পর্ক, রক্ত ও ঘামের সমষ্টি। আবার সমষ্টির কাছে পৌঁছাতে হলে ব্যক্তির হাত ধরেই যেতে হয়। এ কারণেই, এ আখ্যান তরুণ ও বেপরোয়া এক কৃষকের হাত ধরে তার কৌমসমাজ ও সমষ্টির কাছে পৌঁছাতে চায়। তা পেরেছে কি না তা পাঠক বলতে পারবে। পাঠক সার্বভৌম ও স্বাধীন। আর কবিতার পাঠক—সে আরো পবিত্র, মনস্ক ও নির্জন কেউ। প্রতিটি গ্রন্থ এমন পবিত্র পাঠকের স্নেহ-স্পর্শের জন্যেই লিখিত হয় ভাবি।  

‘শস্য ও পশুপালনের স্মৃতি’ও তাই। সে তার কৌমের কথা, শস্য ও পশুর কথা, কোনো এক গভীর গোপন মানুষের বুকে বুনে দিতে চায়।

শস্য ও পশুপালনের স্মৃতি,  লেখক: বিজয় আহমেদ, প্রকাশক: চৈতন্য, দাম: ১৬০ টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ