যেভাবে লেখা হলো ‘পাখির ঠোঁটে দাগ’

Send
এমরান কবির
প্রকাশিত : ০৬:০০, এপ্রিল ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, এপ্রিল ০৯, ২০১৯

তবুও, এতসব নাগরিক ব্যস্ততার ভেতরেও, ভেতরের কোনো এক ‘আমি’ স্বচ্ছ-অস্বচ্ছ পথ পেরিয়ে মস্তিষ্কে উঠে আসে। রক্তে ঝড় তোলে, চেতনায় ভূমিকম্প ছড়িয়ে দেয়। তখন ওই ‘আমি’ নিয়ে বসে পড়ি। ছোট ছোট হরফে নিজের আত্মজসম কবিতাগুলোকে স্নেহসিক্ত কালিতে ভরিয়ে তুলবার চেষ্টা করি।

আমার প্রথম কবিতার বই ‘কী সুন্দর মিথ্যাগুলো’ বের হবার আগে বুঝতে পেরেছিলাম এটাই আমার শেষ গ্রন্থ হয়ে যেতে পারে। কারণ আমার ভেতরে কোনো কবিতা নেই, কোনো কাব্যান্মাদনা নেই। আমার বোধহয় দম শেষ। তাই অধিকাংশ সতীর্থদের পরিণতির মতো আমারও পরিণতি হতে যাচ্ছে ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেই। একসময় এরকমও মনে হয় দেই না একটা ঘোষণা যে, এটাই আমার শেষ কাব্যগ্রন্থ! কিন্তু তাতে কার কী। আমার মতো একজন না লিখলে বাংলা সাহিত্যের কিচ্ছুটি হবে না। মাঝখানে বিতর্ক হবে। যাক গে। বই বের হয় ফেব্রুয়ারিতে। এবং আমার ধারণা পাল্টাতে থাকে। নিজের ভেতরে কবিতার মেঘ জমতে থাকে। এবং বইমেলার মাস শেষ হতেই আমি ‘বনমানুষের মেঘ’ শিরোনামে লিখে ফেলি কয়েকটি কবিতা। কিন্তু ওই সিরিজ এগোলো না বেশি দূর। এর পরের মাসেই আমি এক নাগাড়ে অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেলি। এবং সেগুলো ঘষামাজার পর ‘পালকভরা সূর্যাস্ত’ নামে বের হয়ে যায় আমার দ্বিতীয় কবিতার বই। বইটিতে দুই তিনটা বাদে সবগুলো কবিতা গদ্যে লেখা। গদ্য-গীতিলতা থাকলেও সেখানে কবিতার প্রচলিত ছন্দ নেই। এবার আমি ছন্দ-সমৃদ্ধ কবিতা লেখার জন্য প্রবল তৃষ্ণা অনুভব করতে থাকি। এবং লিখতে থাকি। ছন্দ, ছন্দহীনতা, ভাংচুর, নিরীক্ষা সবকিছুই করতে থাকি। মূলত, অক্ষরবৃত্তকে নিয়েই আমার কায়-কারবার হতে থাকে। এভাবে লেখা হয়ে যায় ‘পাখির ঠোঁটে দাগ’-এর অধিকাংশ কবিতা।

এখানেই শেষ নয়। শুধুই প্রেমের কবিতা থাকবে এরকম একটা গ্রন্থের জন্য আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি অনুভব করতে থাকি কবিতাগুলোতে যদি কোনো এক ঋতুর প্রবল উপস্থিতি থাকে তাহলে আরো ভালো হয়। কারণ আমাদের দেশে ঋতুভিত্তিক অনেক কিছুই হয় কিন্তু ঋতুভিত্তিক প্রকাশনা কিংবা ঋতুর প্রবল উপস্থিতিময় কবিতা নিয়ে কোনো কিছু হয় না। মাথায় ঢুকে যায় বসন্তের কথা। আরে! বসন্ত তো প্রেমেরই ঋতু! নাকি!

কী সর্বব্যাপী বসন্তের প্রবাহ! আমাদের চোখ এড়ায় না। কত না উন্মীলিত এই ধরা! আমাদের চোখ এড়ায় না। কত না উজ্জীবিত এই মন! আমাদের চোখ এড়ায় না। কী মনোরম তার দীপ্তি। আমাদের চোখ এড়ায় না। কী মনোহর তার ব্যপ্তী! আমাদের চোখ এড়ায় না। স্বয়ং রবি ঠাকুরও সম্পর্কিত হয়ে যান। ‘প্রহর শেষের রাঙা আলোয়/ সেদিন চৈত্র মাস!/ তোমার চোখে দেখেছিলাম/ আমার সর্বনাশ!’। এই সর্বনাশ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কারণ এই সর্বনাশ খুবই মিষ্টি। তরুণ তরুণী তো এই মিষ্টি সর্বনাশের জন্যই প্রতীক্ষা করে। ফুলের হাতে ফুলের আদর, মিষ্টি ভরা ভুল নিয়ে আসে।

শুরু হলো আমার মিষ্টি ভরা ভুলের সর্বনাশ। বসন্ত থাকল। ছন্দ থাকলো। অক্ষরবৃত্ত থাকলো। অক্ষরবৃত্তের ভাঙচুর থাকলো। প্রেম থাকলো। থাকল যৌনতা। পাখি এলো। বসন্তের কুহরণকালে তার ঠোঁটে লেগে গেলো দাগ।

পাখির ঠোঁটে দাগ/ লেখক: এমরান কবির/ প্রকাশক: বেহুলাবাংলা/ দাম: ১৭৫ টাকা

//জেডএস//

লাইভ

টপ