‘মনের ভেতর যে ছবি আসে সেইটা থেকেই আঁকি’

Send
.
প্রকাশিত : ০৬:০০, এপ্রিল ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২১, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

[বৈশাখী মেলা উপলক্ষ্যে কুমারদের পুতুল বানানোর বড় রকমের প্রস্তুতির ফটো ফিচার করতে পারবো এই আশা নিয়ে আমরা বিশ্বনাথ পালের বাড়িতে হাজির হই। টিকে থাকা কয়েক ঘরের মধ্যে তার উঠানে কাজ তেমন চোখে পড়েনি। আমাদের খবর পেয়ে তিনি বাড়িতে এলেন। উঠানেই দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা হলো। নতুন যা বানিয়েছেন তা পুনে ( পোড়ানোর চুলা)-তে দিয়েছেন। বানানো কিছু সামনে এনে রাখলেন। একইসঙ্গে তার প্রতিবেশী নীপেন্দ্র পালের উঠানে দেখলাম, মাটির হাড়ি-পাতিল ও প্রতিমা বানানোর কাজ চলছে। তিনিও অল্পকিছু হাতি-ঘোড়া বানিয়েছেন। পুতুল বানানো, সংসারের অবস্থা, পেশার পরম্পরা এবং কৃষিজমি না থাকার ব্যাপারে দুজনের বক্তব্য অভিন্ন। মাটির কাজ করার তারাই শেষ বংশধর।   

মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ির কাছে এই পাল পাড়ার সন্ধান দিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধি মতিউর রহমান, সঙ্গে ছিলেন সমকালের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম, ছবি তুলেছেন সৌম্য সরকার, সঙ্গে আরো ছিলেন মোস্তাফিজ কারিগর এবং অহ নওরোজ। আমাদের প্রত্যেকের আলাপচারিতার নির্বাচিত অংশ বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। —জাহিদ সোহাগ।]



প্রশ্ন: এখন তো কয়েকটা পরিবার টিকে আছে। আগে কতগুলো ছিলো?

উত্তর: এইগুলা (মাটির পুতুল) বানানোর জন্য সবসময়ই ৫-৬ ঘর ছিলো। আর হাড়ি-পাতিল বানানোর জন্য ছিলো ২০-২৫ ঘর।

 

প্রশ্ন: আপনার বাবা-ঠাকুরদারা পুতুল বানাতেন?

উত্তর: না, আমার বাবা-ঠাকুরদারা এইসব বানাইতো না। তারা মাটির কাজ করতো ঠিকই, কিন্তু হাড়ি-পাতিল বানাইতো। মাটির পুতুল কন আর ঘোড়া, বাঘ বা হাতি বানাইতো না।

 

প্রশ্ন: তাহলে আপনি শুরু করলেন কেন?

উত্তর: মেলায় হাড়ি-পাতিল বেচতে গিয়া দেখতাম অন্য যারা এইগুলা বেচে তাদের কদর আছে। তখন থেকাই নিজে নিজে বানাই।

 

প্রশ্ন: কত বছর ধরে বানান?

উত্তর: তা মনে করেন ২০-২৫ বছরের বেশি।

 ছবি-সৌম্য সরকার

প্রশ্ন: তখন কেমন চাহিদা ছিলো?

উত্তর: ছিলো, মোটামুটি ছিলো।

 

প্রশ্ন: এক সিজনে কেমন বানাতেন?

উত্তর: বহু। বহু। আর এইগুলা তো বিভিন্ন উপলক্ষে বানাইতাম। বহু মেলা আছিলো। যেমন ধরেন, বাংলা ২৯ তারিখ থেকে শুরু করে তিনটা-চারটা মেলা, জন্মাষ্টমীর স্নান আছে, পয়লা বৈশাখের মেলা আছে। আবার মনে করেন, সামনে আষাঢ় মাসে রথের মেলা আছে, আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজা আছে, দশমীর মেলা আছে।

 ছবি-সৌম্য সরকার

প্রশ্ন: আপনি কি টেপা পুতুলও বানান?

উত্তর: এখন বানাই না। আগে বানাইতাম। এখন এইগুলাই (হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ) বানাই। আগে মনে করেন পুতুলই বানাইতাম ৮-১০ রকমের।

 

প্রশ্ন: আর পশুপাখি?

উত্তর: আগে পশুপাখির চাহিদা এতো ছিলো না। সবথেকে বেশি চলতো পুতুল। মানুষ হরেক রকমের পুতুল কিনতে পছন্দ করতো। এইজন্য পশুপাখি বেশি একটা বানাইতাম না। মাটির বাটি-ঘটিও বানাইতাম, এইগুলাও বেশ কিনত। আর এখন পুতুলের চেয়ে হাতি ঘোড়া বেশি বিক্রি হয়।

 ছবি-সৌম্য সরকার

প্রশ্ন: আপনার ক্রেতা কারা? ছোটরা বেশি কেনে নাকি বড়রাও কেনে? হিন্দু মুসলমান কোনো ভেদ আছে?

উত্তর: ছোট-বড় সবাই কেনে। ছোটরা কেনে খেলার জন্য। আবার বড়রা শোকেসে সাজানোর জন্য নেয়। আর হিন্দু মুসলমান কোনো ভেদাভেদ নাই। সবাই কেনে। আগে দেখতাম মেলায় সবাই আসতো, হিন্দুদের মেলায় মুসলমানরা আসতো।—মুসলমানরাই বেশি কেনে।—তারা যদি না কিনত তাইলে আমাদের সংসার আর চলত না।

 

প্রশ্ন: শহর বা ঢাকার কোনো বড় দোকান থেকে আপনারা পাইকারি অর্ডার পান?

উত্তর: না, এরকম অর্ডার আসে না।

 ছবি-সৌম্য সরকার

প্রশ্ন: বাড়ি থেকে বিক্রি হয়?

উত্তর: বাড়ি থেকে বিক্রি হয়, আবার মেলায়ও নিয়ে যাই।

 

প্রশ্ন: আপনি তো বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে শুধুমাত্র হাড়ি-পাতিল বানানো শিখেছেন, আবার পরে এসে পুতুল বা বিভিন্ন প্রাণী বানানো শুরু করলেন। এটা শিখলেন কিভাবে?

উত্তর: বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শিখছি। এগুলা ছাঁচেও বানানো যায়। আপনি যদি এই ছাঁচের (ছাঁচ দেখিয়ে) মধ্যে দেন তাহলে বানাই ফেলতে পারবেন। প্লাস্টার দিয়েও বানানো যায়।

 

প্রশ্ন: নকশা করেন কিভাবে?

উত্তর: হাতে করতে হয়। এইটা আমরা আমাদের মনের মতো করে করি।

 ছবি-সৌম্য সরকার

প্রশ্ন: কারো কাছে শিখেছেন?

উত্তর: এই ধরেন টুকটাক তো আগে দেখছি, কিন্তু আসল কাহিনি হইলো নিজের মনের ভেতর যে ছবি আসে সেইটা থেকেই আঁকি।

 

প্রশ্ন: কেমন দামে বিক্রি করেন?

উত্তর: ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা, সাইজের হিসাবে দাম।

 

প্রশ্ন: সব রকমের মাটি দিয়ে তো আর হাড়ি-পাতিল কিংবা পুতুল বানানো যায় না। আপনারা মাটি সংগ্রহ করেন কিভাবে?

উত্তর: মাটি আনতে হয় বহু দূর থেকে। ট্রাকে করে মাটি দিয়ে যায়। আমরা এখানে যত ঘর কুমার আছি সবাই মিলে টাকা দিয়ে চুক্তি করি একসাথে। তারপর মাটি দিয়ে যায়।

 

প্রশ্ন: আপনি কি শুধু এই পুতুল বানানোর উপর নির্ভরশীল? নাকি কৃষিকাজও করেন? নাকি অন্য কোনো কাজ?

উত্তর: আমাদের কোনো জমিজমা নাই। মাঠের কাজও করতে পারি না। আমরা এইটার উপরেই নির্ভর। তবে আজকের দিনে শুধু পুতুল দিয়া বাঁচা যায় না, হাড়ি-পাতিলও বানানো লাগে। বলতে গেলে আমরা হাড়ি-পাতিলের উপরেই নির্ভরশীল।

 

প্রশ্ন: এখন পুতুল কম বিক্রি হওয়ার কারণ কি?

উত্তর: প্লাস্টিকের জিনিসপত্রে বাজার ভইরা গেছে। প্লাস্টিকের দামও কম। এখন পেট চালানোই কষ্টকর।

 

প্রশ্ন: প্লাস্টিকে তো পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।

উত্তর: আমি একটা জিনিস ভালো জানি, সেইটা হলো যদি কোনো মাটির জিনিস আর ব্যবহার করা না যায় আর আপনি ওইটা ফেলে দেন সেটা একদিন মাটি হয়ে যাবে। কিন্তু প্লাস্টিক কখনই মাটি হইবে না।

 

প্রশ্ন: আপনার ছেলেমেয়ে কেউ এই পেশায় আছে?

উত্তর: নাহ্ আসে নাই। একজন স্বর্ণকারের দোকানে কাজ করে, আরেকজন ঘরামী। আমার নাতি-নাতনীরা স্কুলে যায়। ওরা কেউ কুমার হইবে না।

 ছবি-সৌম্য সরকার

প্রশ্ন: তার মানে আপনার পূর্বপুরুষের পেশা আপনার পর্যন্ত এসে শেষ?

উত্তর: তাছাড়া কি! এইটা করে পেটের ভাত জোটানোই তো কঠিন। আর কোনো উপায় তো নাই।

 

প্রশ্ন: মাটির জিনিসের চাহিদা বাড়ানোর জন্য কি করা যায় বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: পুতুল আর খেলনার জিনিসের চাহিদা বাড়াতে গেলে প্লাস্টিকের জিনিস বন্ধ করতে হবে। তাইলে চাহিদা বাড়বে। এইটা খুব কঠিন। এইগুলার (মাটির পুতুল) চাহিদা বাড়লে আমাদের রোজগারটা থাকতো।

//জেডএস//

লাইভ

টপ