মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরুর কথা

Send
রাসেল পারভেজ
প্রকাশিত : ০৬:০০, এপ্রিল ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

বাংলা নববর্ষ বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন মহোৎসব। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ বাংলার সব মানুষের মহামিলন ক্ষেত্র পয়লা বৈশাখ। জরাজীর্ণ, পুরনোকে ভুলে সাজ-বাজনায়, খাবারে, নতুন দিনের মঙ্গল বন্দনার মধ্য দিয়ে বাংলার চিরায়ত রূপ ফুটে ওঠে দেশজুড়ে—ঘরে ও বাইরে সবার মাঝে। এই উৎসব এখন বাঙালির আত্মপরিচয়। বহু সম্প্রদায়, বর্ণ, গোত্রের বাঙালির ভাষিক ও আত্মিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে যাপিত জীবনের উজ্জ্বল প্রকাশে এই যে পরিচয় দাঁড় হয়েছে, তার পেছনের গল্পে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত হয়েছে নানা অনুষঙ্গ ও উপাদান। এক সময়ের শান্তির আহ্বানে উদযাপিত লোক উৎসব বদলে গেছে আলোর পথে হাঁটার প্রত্যয়ে। এই পথে মুক্তি পেয়েছে প্রতিবাদ। প্রচণ্ড গোয়ার শক্তি—ধর্মান্ধতা ও সামরিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যেখানে প্রাণসংশয়ের কারণ ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে গেছে চেতনার প্রতিবাদী শিল্প। প্রতিবাদ করেছে রং-তুলি, গান ও কবিতা। চেতনার সেই শাণিত শক্তির বাংলাময় রূপ হলো বর্ষবরণ উৎসব। নগর জীবনে আজ যার দীপ্তিময় প্রসার দেখা যায়। আর নববর্ষের এই যে নাগরিক উৎসব হয়ে ওঠা তার অনিবার্য রূপ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। বেশি দিন আগের কথা নয়, হাতের মুঠোয় থাকা এই ইতিহাসের জন্ম ১৩৯২ সালে। নগরজীবনে নববর্ষের উৎসবকে মেলা ও মঞ্চের বাইরে রাজপথে চালিত করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। শিল্প-সংস্কৃতির উর্বর জনপদ যশোর শহরে যার শুভ সূচনা হয়। আজ সেই মঙ্গলালোক ছড়িয়ে গেছে ভুবনজুড়ে। জাতিসংঘ দিয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। তবে অনুচ্চারিত আক্ষেপটুকু থেকেই গেছে।

বাংলা নববর্ষ এখন শুধু উৎসবই নয়, আত্মিক শক্তি। বাঙালি জাতিসত্তার রক্ষার ডাক দিয়ে যায় এই উৎসব। প্রবল পশ্চিমা ধারা, মৌলবাদ-উগ্রবাদের ভয়ানক ছোবল এবং আর যা কিছু বাঙালি সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করার হাওয়া জোগায়, তার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে অভয় দেয় সর্বজনীন এ উৎসব। কারণ মানুষের অন্তর্গত চেতনায় এ উৎসব স্থান করে নিয়েছে। তবে ঘাত-প্রতিঘাতে এগিয়ে চলা সময় সরলরেখায় এগোয় না। নববর্ষের উৎসব উদযাপনও বাধাহীন ছিল না, এখনও নেই। তখন ছিল পশ্চিম পাকিস্তান, এখন আছে জামায়াতে ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম এবং আরও কত ফতোয়াবাজ গোষ্ঠী যারা মূলধারা থেকে সরে যায়নি।

একটু আগের কথা বলা যাক। ১৩৬৮ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তার সূত্র ধরেই ১৩৭০ সালে জন্ম নেয় ছায়ানট। স্বাধীনতাপূর্ব উত্তাল সময়ে সাংস্কৃতিক জাগরণে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা বিরাট। তারপর ১৩৭১ সালে ঢাকা শহরে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয় ব্যাপক সমারোহে। তবে তখন মঙ্গল শোভাযাত্রা হতো। তারপরও বাঙালির বাধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখে ক্ষেপে যায় কায়েমি শোষক সরকার। শুরু হয় রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের চক্রান্ত। ১৩৭৮ (ইংরেজি ১৯৭১) সালে নববর্ষ উদযাপন নিষিদ্ধ করে তারা। তবে তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ আরও প্রাণ পায়। মুক্তিযুদ্ধে যার প্রভাব পড়ে। এরপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর পরাজিত পাকিস্তানি প্রেতাত্মা আবার ভর করে বাংলা সংস্কৃতিতে। মাথা চাড়া দিতে থাকে মৌলবাদী শক্তি। সেই সঙ্গে আসে স্বৈরাচার এরশাদের দুঃশাসন। রাজনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি দেশজুড়ে ঘটে যায় এক প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক বিপ্লব। তখন বিপ্লবে তীব্রতা বাড়ায় যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা।       

সংকটে উত্তরণের পথ ঠিকই খুঁজে নেয় বাঙালি। পয়লা বৈশাখে যখন একেকটি মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, সেগুলোর রূপ যিনি দেখেছেন, তার জানার কথা এই চেতনা কতটা মজবুত। আর এ জন্যই যশোরের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। ইটকাঠের নগরে নগরে বেজে ওঠে বাঙালিয়ানার যত রূপমাধুর্য। বাঘ, হাতি, ঘোড়ার প্রকৃতি নামানো হয় রাজপথে। লোক মানসে জীবন্ত এসব উপাদানের মধ্য দিয়েই প্রতিবাদ উঠে আসে কণ্ঠের নিচ থেকে ঠোঁটে। তবে ঢাকায় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা হয় ১৩৯৬ সালে—‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে। পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামটিই স্থায়ী রূপ নেয়। এরপর বিরাট আয়োজনে বছর বছর তার প্রকাশ ঘটছে। এখন এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আমাদের গর্ব ও অহংকার।

তবে যে আক্ষেপ কণ্ঠের নিচে অনুচ্চারিত, আজ তা উচ্চারণ করার প্রয়াস রাখছি। কারণ সে উচ্চারণের শিক্ষায়ই পাই মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে। জাতিসংঘের ইউনেসকো বাংলা ১৪২৩ সালের ১৬ অগ্রহায়ণ (৩০ নভেম্বর ২০১৬) মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়। সেই ঘোষণাপত্রের কোথাও এর উৎস অর্থাৎ যশোরের নামটুকু ঠাঁই পায়নি। না আছে সেখানকার কারও উদ্যোগ-অবদানের কথা। এ নিয়ে এক অতৃপ্তি তাড়া করে। নববর্ষ এলে কিছুটা গুঞ্জনও শোনা যায়। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হলো— বিষয়টি আজও কোনো বরেণ্য ব্যক্তিদের মুখে শোনা যায়নি। রাজধানীর প্রবল প্রতাপে চাপা পড়ে গেছে এক জেলা শহরের স্বপ্নীল উদ্যোগ—মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনার কথা। বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হয়ে ওঠার যে গল্প, তার পুরোটাই জুড়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ও এখানকার উদ্যোক্ততাদের নাম-ধাম। আর প্রান্তের যশোরের সেই উদ্যমী মানুষগুলো এখন অনুক্ত। বলতে হবে, মঙ্গল শোভাযাত্রার বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জনে চারুকলার অবদান অনেক বড়। তবে যেখান থেকে এর যাত্রা শুরু, সেই উৎসকে যুক্ত করে নিলে স্বীকৃতির মাধ্যমে যে মার্যদা এসেছে, তাতে নতুন পালক অবশ্যই যুক্ত হতো। কারণ, তাতে প্রমাণিত হতো বাংলাদেশের জেলা শহরেও বিশ্বমানের মানুষ আছে। তা হয়নি—এই যা আক্ষেপ। জানি না, এর সংশোধনের কোনো সুযোগ আছে কিনা। যদি থাকে, এখনও আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরুর মানুষগুলোকে স্বীকৃতি পাতায় যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তাদের সম্মান জানাতে পারি। 

এই যে অনুচ্চারিত আক্ষেপ, তা কি শুধুই কথার কথা? না। আলো ফেলা যাক উৎসে। যশোরের চারুপীঠ নামে শিশু-কিশোরদের আর্টস্কুল বাংলা ১৩৯২ সালে (ইংরেজি ১৯৮৫) প্রথমবারের মতো নববর্ষ উদযাপনের স্বপ্নীল সূচনা করে। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের নামও জড়িয়ে আছে যার সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে তখন সদ্য পাস করা মাহবুব জামাল শামীম চারুপীঠের উদ্যোক্তাদের একজন। তার নেতৃত্বে একদল তরুণ চারুশিল্পী বর্ষবরণ উৎসব উদযাপনে শোভাযাত্রা বের করার পরিকল্পনা করেন। তাদের পরিকল্পনার নেপথ্যে খুঁটি হয়ে দাঁড়ায় ঐতিহ্যবাহী যশোর ইনস্টিটিউট। সাংস্কৃতিক নানা সংকটে প্রগতির পথ হারায়নি এই প্রতিষ্ঠানটি।

মাহবুব জামিল শামীমরা পরিকল্পনা করেন নববর্ষের প্রথম প্রহরে লোকজ ঐতিহ্যের সম্মিলনে হবে মহোৎসব। বয়স, শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণে সর্বপ্রাণ মিলে হবে একাকার। এই আয়োজনে মাহবুব জামিলের বন্ধু হিরন্ময় চন্দ্র বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সেই শুরুর কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনেকবার বলতে শুনেছি মাহবুব জামিলকে। চারুপীঠের ৩০০ শিক্ষার্থী ও যশোর সাহিত্য পরিষদের ৫০ জন সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মঙ্গল শোভাযাত্রার উপকরণ বানাতে কাজে লাগানো হয়। তারপর আসে মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৩৯২ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রহরে যখন ঢোলে বাড়ি পড়ে তখন এক নতুন ইতিহাসে হাঁটা শুরু করে যশোরের সংস্কৃতি।

মাহবুব জামিলের মুখে সেদিনের বর্ণনা পাওয়া যায়—ঢাকের তরঙ্গায়িত শব্দের মাধ্যমে যেন প্রবাহিত হতে থাকে আনন্দের ফল্গুধারা। পাখি, ফুল, হাতি, ঘোড়া ও প্রজাপতিসহ লোকজ ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। দারুণ সাড়া ফেলে দেশজুড়ে। পরের বছর এর বহর আরও বড় হয়। শহরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নেমে আসে মঙ্গলময় এই শোভাযাত্রায়। সে ছিল সাংস্কৃতিক জাগরণের নতুন অধ্যায়। বলতে হবে—উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যশোর থেকে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে মাহবুব জামাল শামীম ও হিরন্ময় চন্দ্র চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করার পরিকল্পনা করেন। তখন এর সঙ্গে যুক্ত হন চারুকলা অনুষদের প্রখ্যাত ও গুণী শিক্ষকরা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৩৯৬ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৯৮৯) ঢাকার চারুকলা থেকে বের হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। দুই-তিন বছর এই নামে চলার পর স্থায়ী হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা নামটি। কয়েক বছরের মধ্যে সারাদেশে বর্ষবরণ উৎসবে যুক্ত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এখন বাঘ, শিয়াল, হাতি, ঘোড়ার বিরাট প্রকৃতিতে গ্রাম-শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায় এই বর্ণিল আয়োজন।

নববর্ষ উদযাপনে নবতর সৌন্দর্যের যোগ করতে অনেক ত্যাগ আর পরিশ্রম রয়েছে মাহবুব জামিল, তার সহপাঠী ও অগ্রজ-অনুজদের। মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়ে একবার গণমাধ্যমে দেওয়া তার মন্তব্যে ছিল আক্ষেপের সুর। তিনি বলেছিলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরুর ব্যাপারটা যে যশোরের সে কথা বলা হচ্ছে না দেখে মনটা ব্যথাতুর।

মাহবুব জামিলের বন্ধু ও মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনাকারীদের আগ্রভাগের আরেক শিল্পী হিরন্ময় চন্দ্র। তারও রয়েছে আক্ষেপ। গণমাধ্যমে দেওয়া তার বক্তব্যের কিছু অংশ ছিল এমন—‘মঙ্গল  শোভাযাত্রার শুরু যশোরে—এটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এখন যারা একে ঢাকার কৃতিত্ব বলে দাবি করেন, তারা মিথ্যাচার করেন। ইতিহাস নিয়ে এই মিথ্যাচারটা বন্ধ হওয়া দরকার। যশোর থেকে বড় ধরনের প্রতিবাদ হওয়া দরকার।’ তবে সেই প্রতিবাদ আর হয়নি। হয়তো হবেও না অথবা তা জানি না। শুধু আক্ষেপ থেকে গেল।

হয়তো এই আক্ষেপও চাপা পড়ে যায়, যখন নতুন বছরকে বরণ করে নিতে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যুক্ত হই। উৎসবে মিশে যাই দশের সঙ্গে। সর্বোপরি উৎসব তো আমাদের; এর আহবানে সাড়া না দিয়ে থাকা যায়! শেষ করব কবিগুরুর ‘উৎসব’ প্রবন্ধের কিছু অংশ দিয়ে—‘উৎসবের দিনে আমরা যে সত্যের নামে বৃহত্তর লোকে সম্মিলিত হই, তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম।... উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুলপাতার দ্বারা সাজাই, দীপমালার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সঙ্গীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি। এইরূপে মিলনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎসবের দিনকে বৎসরের সাধারণ দিনগুলির মুকুটমণি স্বরূপ করিয়া তুলি।’

শ্বাশত ও চিরন্তন হোক বাংলা, বাঙালি ও বাংলা নববর্ষ। নতুন বছরে নবদীপে জাগুক সবার জীবন।

লেখক: সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী ও সাংবাদিক 

//জেডএস//

লাইভ

টপ