যেভাবে লেখা হলো ‘পুরুষপাঠ’

Send
নাহিদা নাহিদ
প্রকাশিত : ০৬:০০, এপ্রিল ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১২, এপ্রিল ২১, ২০১৯

প্রশ্ন উঠতে পারে যেখানে মানুষ পাঠই সহজ বিষয় নয় সেখানে ‘পুরুষ’কে আবার আলাদা করে পাঠ্য তালিকায় আনার কী প্রয়োজন! আর তাছাড়া নারীর বোধে পুরুষপাঠ এ আবার কেমন! এ কী শুধু শারীরিক গঠনগত ব্যাপার-স্যাপার; না অন্যকিছু?

তদন্তে পুরুষ—পুরুষপাঠে নয়টি গল্পের প্রথম আটটি গল্পে বৃহৎ বা স্বল্প পরিসরে যে পুরুষদের আনাগোনা, শেষ একটা গল্পের কাঠগড়ায় তারা অন্যরকম। ভীষণ রকম অন্যরকম। পরপর আটটি গল্পের বিপরীতে মাত্র একটি গল্প। নারীপাঠে আমাদের প্রথাগত পদচারণায় নারীর সৌন্দর্যবর্ণন, প্রণয়, সংগ্রাম, দীর্ঘশ্বাসের যাত্রাপথে পুরুষের সহযাত্রা নানামুখি। প্রেম, সংসার, গার্হ্যস্থ, আবেগ অথবা সমতা, সাম্য, অধিকার, বিভাজন—এর বাইরেও কিছু একটা রয়ে যায়। পুরুষের একার যাপিত জীবনের সেসব গল্প গেঁথে আছে কোথাও না কোথাও। শরীর ও মনে পুরুষের পুরুষ হয়ে ওঠা না-ওঠার ক্রাইসিসে নারীও জড়িত। আলো বনাম অন্ধকার; কে আলো কে অন্ধকার এ প্রশ্নের উত্তর থাকবে পাঠকের কাছেই একথা নিশ্চিত।

গল্পগুলোতে নারীই বলেছে বেশি, দেখছে বেশি। পুরুষ ক্ষণিক আভাসিত হয়েও জানান দিয়ে যাচ্ছে জুড়ে থাকা মানেই মর্মে থাকা নয়। ক্ষণিকেও উদ্ভাসিত হয় সমস্তটা। অপেক্ষার ‘শ্বাস বিরতি’ গল্পে দ্বৈরথে বহমান শোক। সন্তান হারানোর বিদগ্ধ যন্ত্রণায় নারী পুরুষের প্রতিযোগিতা হয় না। তবু উন্মাদিনী মায়ের শোকের তীব্রতার কাছে ঈর্ষান্বিত বাবা নামক পুরুষ মানুষের ক্ষণিক উপস্থিতি হাঁ করে দেখিয়ে দেয় মাতম করা মা হওয়ার কমফোর্ট জোন, কঠিন রূঢ় স্বাভাববিক বাবা হওয়ার জান্তব ব্যর্থতার অসুখের চেয়ে শ্রেয়। রক্তজবার মতো মৃত সন্তানের লাল শরীর লেপ্টে থাকা দৃশ্যপট ভুলে বাবা নামক পুরুষটার স্বাভাবিক থাকতে হয়। বন্ধুকে বলতে হয়, শত হলেও মা তো, "হতো বাবা পাঠিয়ে দিতাম গারদে" পাঠশেষে জেনে যাই গারদে থাকার জন্য হলেও “একটা পুরুষ শরীর চাই" উন্মাদ না হওয়ার জন্যও একধরণের উন্মাদীয় আবেগ চাই। সাহস চাই।

আঁধারের অলিতে গলিতে হেঁটে আসা মানুষের ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত থাকে সূর্য ছোঁয়ার প্রতীক্ষা। যে রাস্তায় মৃত কুকুর পড়ে থাকে বিভৎস মগজ সমেত সে রাস্তা ধরে হেঁটে যায় এক পুরুষ সে কারো ভাই অথবা প্রথম প্রেমিক হওয়ার যোগ্য ছিল কিন্তু হয়ে ওঠে বয়স্য কোনো প্রেমিকার হন্তারক। পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখেছি কিছু পুরুষ সংশয়ের মাঝেও জেগে ওঠে হঠাৎ হঠাৎ। কোনো নতুন সাহস তাদের তাড়িত করে খুব করে। ‘দায়ক’ গল্পের মানিকের কেরোসিন কেনার কথা থাকে অনেক, পুড়িয়ে দেবে সব। রাত ভোর হয়ে আসা গল্পকথক যে নারীকে সে মায়ের প্রতিরূপে জানে তার বিপরীত যে স্বামী নামক পুরুষ অথবা মায়ের যোনীতে বীর্য ফেলা মানুষটিকে সে পিতা বা পরম পুরুষ হিসেবে চেনে না, চেনে না মানুষ হিসেবে। পুরুষের মনোসাইকোলজিতে পুরুষের এই যে নাই হয়ে যাওয়া সে গল্প আমি লিখতে চেয়েছি, দেখা মানুষগুলোর অবয়বেই লাগিয়েছি আপন রংয়ের তুলি।

বিবর্ণ শুষ্ক লতাগুল্মের মতো মৃত প্রেম বাসন্তি সুর। এ এক কান্না। শালুকের ধ্যান নৈঋত সুখে যাকে খোঁজে সে হারায় তাকে, যাকে চায় পায় না তাকে। অধরা সুর আর অধরা প্রেম তাকে অপুরুষ করে অপ্রেমী করে। শালুকের মানসিক উত্তরণ, চড়াই-উৎরাই প্রণয়ের পুনঃ সন্তরণ ‘মাধু বাসন্তি’। আলতা পরানি অথবা নয়ন 'কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগায়'; বাসন্তি বাজায়। শালুকের রাগ ভূ-পালি,শিবমঞ্জুরি আর হংসধ্বনির সুরে সে গল্প কথা কয় পুরুষপাঠের মলাটে—চাইছি সে গল্প পাঠক পড়ুক।

পুরুষ নিঃসঙ্গ এ কথা পুরোনো, বহুল চর্চিত প্রসঙ্গ। কিন্তু নিঃসঙ্গতার চাষবাসে নারীকে নিয়ামক ভেবে কেউ যদি স্বেচ্ছানির্বাসিত হয় তবে সে কি নিঃসঙ্গ পুরুষ না আপাত বিচ্ছিন্ন কেউ। অস্বাভাবিক শিল্পতাত্ত্বিক প্রেষণা কাউকে পুরুষ করে না করে অস্বাভাবিক। পুরুষপাঠের আয়োজনে যিশু নামের এক পুরুষকে এঁকেছি যে স্বর্গীয় ফুল জন্মের দায়ও মিথ্যে করে দেয় সঙ্গহীনতার কৃত্রিম বিলাসে। সেখানে তিতলি নামক প্রণয়ী ঢুকতে চায়, ছটফটায় হাহাকার করে তিতলির আত্মকথনে শুনতে পাই সে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ—"পুরুষ, তুমি এমন কেন? কেন তুমি তোমার কবিতা রেখে আমার গল্প হয়ে ওঠো না। হয়ে ওঠো না আমার কৃষ্ণা নদীর গল্প আমার তৃষ্ণা নদীর গল্প—তোমাকে ভোলাতে জাদুর ঝাঁপির গল্প ফুরিয়েছি কত, কাঞ্চনমালা, কাঁকনমালায় বেঁধেছি আঁতুরি সিদ্ধাচার। আমার অষ্টকমনে তুমিই তো এক গল্পপুরুষ—তুমি ঋষি হও আমি সিদ্ধি! 
সময় পাল্টে দেয় পুরুষেকে নতুন পুরুষে। 'যদিও সন্ধ্যায়' দেখেছি এক পৌঢ়পুরুষ; মনোয়ার। এক সফল রাজনীতিবিদ। হতে চাওয়া প্রণয়ীর হতে না পারা প্রণয় সে। গল্পটা কিন্তু মোটেও প্রণয়জাত নয়। দেশ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বদলে যাওয়া নব্য এলিটদের স্বার্থান্ধ জীবনের মাঝেও কিছু ব্যর্থতার গল্প রয়ে যায়। 'যদিও সন্ধ্যা' গল্পে বলেছি সেসব। সাবি আর মনোয়ার একটা অতীত ইতিহাস একটা প্রায় অতীত হয়ে যাওয়া অথচ বহমান আদর্শিক দ্বন্দ্ব।

শরীর, সঙ্গমের প্রত্যয় নয় আত্ম-অস্তিত্বের রক্ষক। দৈহিক অবয়বের অক্ষমতার, গ্লানির গল্প ‘কালপুরুষ’। হঠাৎ পুরুষ থেকে নারী হয়ে ওঠা অথবা নারী থেকে পুরুষ হয়ে ওঠা এক বিপর্যস্ত ট্রান্স সেক্সুয়াল ট্রমা জন্ম দেয় একধরনের সামাজিক বিপর্যয়। সে গল্পই এটা। ‘দুলাল’ গল্পটিও তদ্রুপ অক্ষমের গল্প, দুলাল সে পুরুষ হয়ে ওঠেনি এখনো কিন্তু তাকে ঘিরে তার পিতার যে আত্মসমর্পণের গল্প সেসব গল্পও অপুরুষেরই।

‘পুরুষপাঠ’ এ গ্রন্থের শেষ গল্প। আমাদের বোধে ঘৃণিত যে জন আইডলজির সংঘর্ষে বিধি যাকে নিয়ত, তাকে নিয়েই শেষটায় করেছি কাটাছেঁড়া। ময়নাতদন্ত করেছি ল্যাবে। প্রতীক সংলাপের রঙ্গমঞ্চে এ ঘরটা কোনো পক্ষের মনে হবে প্রার্থনাগৃহ, কোনো পক্ষের মনে হবে প্রাপ্ত বয়স্ককের প্লে জোন। গার্গী, বিশাখা, কঙ্কা শবনমের চোখে রমণীয় যে জিজ্ঞাসা তার নাম বিষ। এ অধ্যায়ে পূর্বাপর অসহায় বিপর্যস্ত পরাজিত পুরুষ নয় হিংস্রদানবদের আসার কথা। পৃথিবী নামক নরকে পতন্মোখ ইভের দল আলো জ্বেলে বসে আছে পতঙ্গের মতো। ল্যাবে তাদের হাতে হাতে তাস, মৃতদের জন্য করুণা, কুৎসিত হাসি। কেইসহিস্ট্রির পাতা খুলেই উদ্যাম উল্লাস let us play at triumph.

পুরুষপাঠের সিলেবাসের সমন্বিত অধ্যায়ে যে সকল পুরুষ পাঠ্য হয়েছে তারা কতটা হার্দ, কতটা মমতার অথবা কতটা জিঘাংসার দাবীদার এ প্রশ্ন থেকে গেলো। সে অমীমাংসিত প্রশ্নের সাথে বৃত্তাবদ্ধ পৌরষ-অপৌরষেয় আবর্ত থেকে ফিরে এসে পাঠকে মানুষপাঠের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রেখে শেষ করেছি আয়োজন। পাঠক সবিনয়ে গ্রহণ করুক সে পাঠ।

//জেডএস//
 
 
 
 

লাইভ

টপ