শুকশারি গল্পেরা নাগালে

Send
সৈয়দ আনোয়ার তপু
প্রকাশিত : ০৫:০০, এপ্রিল ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:০০, এপ্রিল ২৮, ২০১৯

আমি সব সময়ই কোনো নতুন বই হাতে পেলে ফ্ল্যাপের মুখবন্ধ এবং লেখক পরিচিতির অংশটা প্রথমে পড়ে নিই। তারপর মনোযোগ দিয়ে প্রকাশক, কপিরাইট, প্রচ্ছদ শিল্পী, সংস্করণ থেকে শুরু করে খুচরা মূল্য, আইএসবিএন নাম্বার পর্যন্ত বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভার্সনেই চোখ বুলাই। বইয়ের যেহেতু মোড়ক নেই, তাই এটাই আমার মোড়ক খুলে নতুন উপহার পাওয়ার আনন্দের বিকল্প! আমি পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার, এক সময় ডেক্সটপ পাবলিকেশনের কাজ করেছি, তাই ঢেকির স্বর্গে গিয়ে ধান ভানার মতো এই উদ্ভট শুচিবায়ুগ্রস্ত আচরণ স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু আসল কারণটি অন্য। মূল বইয়ে প্রবেশ করাটা যত বিলম্বিত করা যায়, প্রত্যাশার চমক, অপেক্ষার আনন্দ তত বেশি বাড়ে। এ যেন প্লাস্টিকের কাপে ইয়োগার্ট খাবার আগে কাভারটি চেটে নেয়া! সবাই নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছেন এই লোক বই-টই বেশি পড়ে না—ঘটনা সত্য! যদিও লেখকের পরিচয় আমার জানা, তারপরও পরিচিতির অংশে পড়ে দেখলাম ‘শুকশারি গল্পেরা নাগালে’ লেখকের দ্বিতীয় ছোট গল্পগ্রন্থ। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, এটি মনে হয় গত ২ বছরে আমারও পড়া দ্বিতীয় বাংলা গল্পগ্রন্থ! আমি ননফিকশনও যে অনেক পড়ি তা নয়, কিন্তু সাহিত্য যে একেবারেই বুঝি না, আমার দৌড় যে থ্রিলার পর্যন্ত সেটা এখনো বুঝে না থাকলে সাবধান করে দিতে চাই (সাথে নিজের কথাই যে বেশি বলছি সেটাও এলার্মিং)।

তারপরও প্রবাস জীবনে বইমেলায় সদ্য প্রকাশ পাওয়া একটা বাংলা বই হাতে পেলে অন্যরকম অনুভূতি হয়। এর আগে ব্লগে ও ফেসবুকে তানবীরা তালুকদারের অনেক লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন ঘটনার উপর ভিত্তি করে এক যুগ ধরে লেখা সেই গল্পের সংকলন একটা বইয়ে পাওয়া যাচ্ছে শুনে আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করি। কিন্তু 'পড়ে কেমন লাগলো জানাবেন' অনুরোধ শুনেই অর্ধেক পড়ার পর আমার পড়ার আনন্দ আতঙ্কে রূপ নিল! রিভিউ লেখা দূরের কথা আমি এ পর্যন্ত কী পড়েছি সেটাই ভুলে বসে আছি! সমালোচকের দৃষ্টি নিয়ে সাহিত্যের রস আস্বাদন করা যে কত কঠিন তা যদি আগে জানতাম! যুক্তিবাদী মানুষেরও তো মাঝে মধ্যে ভাব জগতে হারিয়ে যাবার জন্য ছুটি দরকার হয়!

যা হোক, ভুলে গেছি মানে যে গল্পগুলো 'মেমোরেবল' নয় তা মোটেও নয়। আসলে প্রতিটি গল্পের পরিপ্রেক্ষিত আমাদের এতই চেনা যে আলাদা করে মনে রাখার দরকার হয় না। স্বাধীনতা যুদ্ধের করুণ ইতিহাস, সাম্প্রতিক ব্লগার হত্যার বিভীষিকাময় অধ্যায়, স্বদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন থেকে শুরু করে এই প্রজন্মের নর-নারীর সম্পর্কের জটিলতা, লৈঙ্গিক রাজনীতি, প্রেমিক-প্রেমিকার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে প্রেম-প্রত্যাশা, নার্সিসিজমের সীমানা, ডায়াস্পোরা, আত্মপরিচয়ের সংকট এসব চেনা বিষয়ই বৈচিত্রময় বিভিন্ন গল্পে নিত্য নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উঠে এসেছে।

'বৃষ্টি ভেজা পুরনো শহরে একদিন' পড়ে একটা বড় ধাক্কা খেয়েছি। মগজের লিম্বিক সিস্টেমে প্রোথিত আদিম ভীতি এবং মানব বিবর্তনের সর্বশেষ ধাপ এমপ্যাথি—এই সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি অনুভূতি লেখক এখানে অসামান্য দক্ষতায় একই বিন্দুতে মিশিয়ে দিয়েছেন অঝোর বৃষ্টির করুণাধারায়। এটাও লুকোবো না যে স্বাধীনতা এবং সমকালীন ঘটনা নিয়ে লেখা কতগুলো গল্প পড়ে লন্ড্রি লিস্ট পূরণ করার তাগিদটাই বেশি চোখে পড়েছে। একটা গল্পে ইতিহাসের সবগুলো গুরুত্বপূর্ন বাকের সন্নিবেশন করলে তা গল্প না হয়ে অনেকট জার্নাল বা মেনিফেস্টোর মতো শোনায়। বিশেষ করে ছোটগল্পে ডায়ালগ দিয়ে ফ্যাক্টের ঘনত্ব কমানোর স্কোপ না থাকায় এটা আরো বেশি চোখে পড়ে। তবে এটা সম্ভবত আমার জেনারেশনের সমস্যা যারা পুরো ইতিহাসটা জানি। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গল্পে পুরো প্রেক্ষাপটটি জানাতে পারা নিঃসন্দেহে দক্ষতার বিষয়।

'অন্তহীন গন্তব্য' ব্লগার হত্যাযজ্ঞের অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক ইতিহাস হলেও খুব কাছে থেকে এইসব ঘটনার সাক্ষী থাকায় এটিও গল্প হিসাবে উপভোগে হোচট খেতে হয়েছে! আপনি যখন ক্লাইম্যাক্সটা কী হবে আগেই থেকেই জানেন, তখন কি আর কোনো রহস্য থাকে? থ্রিলার পড়ুয়াকে স্পয়লার দেওয়ার মতো পাপ আর হয় না! তবে সব ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিকে গল্পেই যে এই মধুর সমস্যাটির মুখোমুখি হয়েছি তা নয়। 'সব কটা জানালা খুলে দাও না' গল্পে (এটি ঠিক ৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় পড়েছে, কাকতালীয়?) খুব চেনা পরিস্থিতিও একটা সুররিয়াল মাত্রা পায় শেষের দিকে, যেরকমটি আমি আর কোনো মুক্তিযুদ্ধের গল্পে পাইনি কখনো। 'শিকড় যেখানে' যেন আমাদের সবার চেনা একটি হতভাগ্য যুদ্ধশিশুর চরিত্রই বাস্তব জীবন থেকে মলাট টপকে বইয়ের পাতায় ঢুকে পড়েছে, তারপরও সেখানে ইতিহাসের চেয়ে সূক্ষ্ম অনুভূতি, দেশের প্রতি একটা অদৃশ্য টান বেশি আবেদন সৃষ্টি করে যা আমি মূল চরিত্রটির সাথে সোশাল নেটওয়ার্কের যোগাযোগেও কখনো সেভাবে অনুভব করিনি।

সায়ান আর তিতিল দুটি প্রেমিক প্রেমিকা জুটির উপর দুটি গল্প আছে দুজনের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। আমার কাছে মনে হয়েছে তানবীরা তালুকদার অভিজিৎ রায়ের 'ভালবাসা কারে কয়' বইটি থেকে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের কতগুলো ফ্যাক্ট হুবহু চুরি করে বসিয়ে দিয়েছেন—তবে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো অসামান্য দক্ষতায় সাহিত্যের ভাষায় অনুবাদ করে! পুরুষ এবং মহিলারা কেন ভালবাসার সম্পর্ককে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে সেই অধরা রহস্য এখানে ছোট ছোট কাফ লাভ বা বাছুর প্রেমের মুহূর্তের মায়াবী জাল বুনে ধাপে ধাপে ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে। মনোবিজ্ঞানের উৎসাহী পাঠকেরা এখানে দ্বিগুণ রস আস্বাদন করতে পারবেন যদি ক্লুগুলো ধরতে পারেন। না হলে দীর্ঘশ্বাসের সাথে 'নারীর মন, সহস্র বছরের সাধনার ধন' বলে বিড়বিড় করে মাথা নেড়েই পাতা উল্টাতে হবে!

আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে 'নরম রোদের উদাস দুপুর' (পুরো নামটি দিলাম না, গল্পের মতো নামটির ও একট নিজস্ব ক্লাইম্যাক্স আছে, থাক না সেটা গোপন) গল্পটি। গল্প না বলে প্যারাগ্রাফসমূহ বলাই ভাল। নিজের সাথে নিউরনের গতিতে নিজের সাথে বোঝাপড়ার মতোই ছোট্ট একটু পরিসরে যেন 'চার-পাঁচ ফোটা জলে, চার সেকেন্ডে চড়ুইপাখির স্নান'! পুরো বইট শেষ করেও আমার একই অনুভূতি হয়েছে, নিজেকে একটা ট্রিট দেয়ার আনন্দময় সতেজ অনুভূতি! গল্পটি সবার শেষে দিলেই ভালো হতো! যাহোক, বুক রিভিউ হিসাবে যেন এই লেখা ছাপানোর যোগ্য না হয় তার সব রকম আয়োজনই সম্পন্ন করেছি সাফল্যের সাথে। একই সাথে 'পড়ে কেমন লাগলো' জানানোটাও হল।

শুকশারি গল্পেরা নাগালে/লেখক : তানবীরা তালুকদার/প্রকাশক: সিঁড়ি প্রকাশন/দাম: ২০০ টাকা

//জেডএস//

লাইভ

টপ