প্রেম ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইয়োসা এবং তার কিংবদন্তি হয়ে ওঠা

Send
ডেভিড স্ট্রেইটফেল্ড
প্রকাশিত : ০০:০৫, মে ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৫, মে ০৩, ২০১৯

দ্য ডিসক্রিট হিরো উপন্যাসে মারিও বার্গাস ইয়োসা লিখেছেন, পৃথিবীটা নরকে পরিণত হতে চলেছে। সাংবাদিকরা বিসর্জন দিচ্ছেন নীতি, রাজনীতিবিদরা আশাহত, চোখের পলকেই যেন সভ্যতা ধসে পড়তে চলেছে।

পরবর্তীকালে এমনই এক পতন তার জীবনে ঘটেছে—অন্য এক নারীর প্ররোচনায় দ্বিতীয় স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার সাথে ৫০ বছরের বৈবাহিক জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে তিনি বাধ্য হন—মনে হয় তিনি যেন নিজেই এই ঘটনার শিকার। সম্ভবত তার এই ব্যাপারটায় কেউ আশ্চর্য হয়নি।

২০১০ সালে নোবেল ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “যে নারীকে আপনি ভালোবাসেন, তাকে ভালোবাসুন দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস, থামবেন না।”

যেন তার ব্যক্তিগত জীবন রোমান্স আর প্রেমে ভরপুর। গণমাধ্যম তার এই নতুন রোমান্সের বাণী শুনে কিছুটা থ মেরে গিয়েছিল।

“আমি একটি বই লিখেছি—গত গ্রীষ্মে (২০১৫ সালে) সেটি ইংরেজিতে নোটস অন দ্য ডেথ অফ কালচার নামে প্রকাশিত হয়েছে। যেটা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই ভুগতে শুরু করলাম। আমার ব্যক্তিগত জীবন এরপর আর ব্যক্তিগত থাকলো না। পত্রিকা, ম্যাগাজিন সবখানে অর্থহীন গসিপে পরিণত হলো। আমি কিছুই করতে পারলাম না, অসহায় হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমি এর জ্বলন্ত সাক্ষী—আমি যা লিখেছি তা সত্য।” ইয়োসা তার এক সাক্ষাৎকারে হেসে হেসে গর্জন করে এসব কথা বলেন।

মারিও বার্গাস ইয়োসা—যিনি ইতোমধ্যেই ৮০ পেরিয়ে গেছেন—লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের লিভিং লিজেন্ড এওয়ার্ড গ্রহণ করে বলেন, “জীবিত? হ্যাঁ, আমি মনে করি আমি জীবিত। কিন্তু কিংবদন্তি নই।”

আলেন্সো কুয়েতো—পেরুর আরেক বিখ্যাত লেখক—ইয়োসা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “আমি যখন তরুণ ছিলাম, তখন ভাবতাম প্যারিস, লন্ডন কিংবা সেন্ট  পিটার্সবার্গেই শুধু বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর জন্ম হয়। কিন্তু ১৯৬৯ সালে ইয়োসার কনভারসেশন ইন ক্যাথিড্রাল প্রকাশ হওয়ার পর আমার সে ধারণা ভেঙে যায়—মাস্টারপিস লিমাতেও (পেরুর রাজধানী) লেখা হতে পারে”

কুয়েতো পেরুর ১৯ শতকের লেখক আব্রাহাম ভালদেলোমারের একটি উক্তি উল্লেখ করে বলেন, “ভালদেলোমার বলতেন, যদি জিজ্ঞেস করা হয়, লেখক হিসেবে পেরুর লেখকদের প্রথম করণীয় কোনটি, তার উত্তর হচ্ছে—নিজেকে ধ্বংস করে না ফেলা। আমার মনে হয়, আব্রাহামের এই উক্তিটি যথাযথভাবে ধারণ করেছেন ইয়োসা। যিনি আমাদের এই সময়ের লাতিন আমেরিকার লেখকদের জন্য শৃঙ্খলা আর টেকসই আবেগের মডেল।”

২০১৬ সালে ইয়োসা একটি উপন্যাস লেখেন সিনকো এসকিনাস নামে, ২০১৮ সালে ইংরেজিতে যেটা দ্য নেইবারহুড শিরোনামে অনূদিত হয়। ওই উপন্যাসে সাংবাদিকতাকে একটি ফিকশনাল ফর্ম দিয়ে দেখিয়েছেন, স্বৈরশাসিত পেরুতে সাংবাদিকরা কীভাবে অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। প্রেম এবং রাজনীতি নিয়ে লেখা একটি প্রতিবেদন তিনি অনুসন্ধান করেছেন এই উপন্যাসে।

ইয়োসা স্বতস্ফূর্ত সরল ইংরেজিতে বলেন, “সমালোচকদের অসম্মানিত করার জন্য সাংবাদিকদের ব্যবহার করা হয়েছিলো, যারা তোমাকে সমকামী, বিকৃত, যৌন নিপীড়নকারী বলে অভিযুক্ত করবে এবং যেগুলো খুব কার্যকরী ছিল। কারণ এগুলো সহজেই যে কোনো মানুষকে ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারে। কারণ কেউ কেলেঙ্কারির কেন্দ্র হতে চায় না। তাহলে এর বিপরীতে তুমি কী করবে?

শয়নকক্ষকে বিপজ্জনক ভাবতে গেলে এটা ভাবাও উচিত যে, এটা আশ্রয়স্থলও ছিলো।”

তিনি আরো বলেন “যৌনতা মানুষের জীবনে অনেক বড় ক্ষত বয়ে আনতে পারে, যার আর নিরোধ সম্ভব নয়। সবাই চায় পুরোনো দিনের ব্যথা ভুলে যেতে, কিন্তু তারপরও তুমি মরে গেলেও জানতে পারবে না তোমাকে কে মারলো—সন্ত্রাসী, সরকার, পুলিশ নাকি সাধারণ অপরাধী?”

সিনকো এসকিনাসের প্রচ্ছদে দেখা যায়, একটি কুঁচকানো চাদর পাতা বিছানায় দুজন নারী শুয়ে আছেন। তাদের মধ্যে একজন পত্রিকা পড়ছেন—পত্রিকার শিরোনামে লেখা ‘দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে।’ ইয়োসার লিটারারি এজেন্ট—কারমেন বালকেলর্স, যাকে লাতিন আমেরিকার লিটারারি লায়ন বলা হয়—তিনি যখন প্রথমবার ইয়োসার সিনকো এসকিনাসের পাণ্ডুলিপি পড়েন, তখন খুবই অবাক হন। বইটি যেন ইয়োসার নতুন প্রেমের রসে ভরপুর। ইয়োসার নতুন প্রেমিকা ইসাবেল প্রেসলার, ৬৫ বছর বয়সী স্প্যানিশ মডেল।

“এটা আপনার কারবার না” কারমেনকে একথা বলেন ইয়োসা। তিনি উৎসুক ও আগ্রহী ছিলেন যে, সাধারণ মানুষ বইটি প্রকাশ হওয়ার পর কী বলে। তার চোখে বইয়ের বিষয়টি এরকম ছিলো যে, জনসাধারণ ক্ষুধা নিয়ে উদ্বিগ্ন চোখে অপেক্ষা করছে।

“যে প্রেম সবচেয়ে অপরিহার্য তাকে ফরাসিরা বলে, ‘আমোয়ার ফো’। ইংরেজিতে কী? ক্রেজি লাভ? না, এটা এতোটা সুন্দর শোনায় না। অপরিহার্য ভালোবাসা তাকেই বলে, যা দুজনের অনুভূতিকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে। দুজনের বোঝাপড়ার মধ্যে দারুণ এক রসায়ন তৈরি করে। যেন এটা একটা পাহাড়কে সহজেই সরাতে পারে। এটি অবিশ্বাস্য উপায়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করে, বিভ্রান্ত দেয়, ক্ষুধার্ত করে তোলে জীবন।”

২০১৪ সালে মার্কেসের মৃত্যুর পর বলা হয়, ইয়োসাই সাহিত্যের মানচিত্রে লাতিন আমেরিকার জৌলুস বাড়িয়েছেন। “আমার পুরোনো বন্ধুদের অধিকাংশই, শুধুমাত্র লেখকরা নয়...”। এক সাক্ষাৎকারে এই কথার সাথে ক্লান্তি মিশিয়ে আরো একটি শব্দ উচ্চারণ করেন—“মৃত”।

বেশ কয়েক বছর আগে ইয়োসা ডোমিনিকান রিপাবলিক, চিলি, আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলে একমাসব্যাপী বক্তৃতা সফরে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, “আমি প্রায় প্লেনেই বসবাস করি।” তিনি আরো বলেন “আমি এর বিপরীতে প্রতিবাদ করি, কিন্তু আমি মনে করি আমি এটা উপভোগও করি।”

কয়েক বছর আগে পানামা পেপারস্ আয়কর ফাঁকির সংবাদ প্রকাশ করলে তিনি বলেন, “এগুলো আমলাতান্ত্রিক মিথ্যাচার। আমার কোনো একাউন্ট নেই যে, সেখানে টাকা রাখার প্রশ্নই ওঠে।”

এভাবেই চোখের পলকে সভ্যতা আমাদের প্রহৃত করে।

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস, ভাষান্তর : ইরা সামন্ত

//জেডএস//

লাইভ

টপ