জগতে এত কাজ আছে, এটাই রীতিমতো লজ্জার : উইলিয়াম ফকনার

Send
অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ০৮:০০, মে ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১১, মে ০৭, ২০১৯

[উইলিয়াম ফকনারের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন জাঁ স্টাইন। আমেরিকার সাহিত্য পত্রিকা দ্য প্যারিস রিভিউয়ের দ্য আর্ট অব ফিকশন সিরিজের ১২তম সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয় ১৯৫৬ সালে।]

জাঁ স্টাইন: মি. ফকনার, আপনি একটু আগে বলছিলেন যে, আপনি সাক্ষাৎকার দিতে পছন্দ করেন না।

ফকনার: কারণ হলো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে প্রচণ্ড রকমের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় আমার মধ্যে। কাজ নিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রশ্ন আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে হয়ে থাকলে আমি উত্তর দিতেও পারি, না-ও পারি। আবার উত্তর দিয়ে থাকলেও একই প্রশ্নের উত্তর আগামীকাল হয়তো আলাদা হয়ে যেতে পারে।

 

জাঁ স্টাইন : লেখক হিসেবে নিজেকে কীভাবে দেখেন?

ফকনার : আমার অস্তিত্ব না থাকলে অন্য কেউ আমার লেখাগুলো লিখতেন। হেমিংওয়ে, দস্তয়েভস্কি—আমাদের সবার ক্ষেত্রে একই কথা। প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, শেক্সপিয়ারের নাটকেরই তো তিনজন লেখক দাবিদার পাওয়া গেছে। কিন্তু ‘হ্যামলেট’ কিংবা ‘মিডসামার নাইটস ড্রিম’-ই বড় কথা। কে লিখেছেন’ সেটা বড় কথা নয়। কেউ একজন লিখেছেন—ব্যস। শিল্পী বড় কথা নয়; তিনি যা সৃষ্টি করেন সেটাই বড় কথা। নতুন করে কিছু বলার নেই। শেক্সপিয়ার, বালজাক, হোমার—সবাই একই রকম বিষয় নিয়ে লিখেছেন। তাঁরা যদি এক হাজার বছর কিংবা দুহাজার বছর বেঁচে থাকতেন তাহলে প্রকাশকদের আর কোনো লেখকের দরকার হতো না।

 

জাঁ স্টাইন : কিন্তু যদি আর কিছু বলার নেই মনে হয়েও থাকে, তবু লেখকের নিজস্বতার কি কোনো গুরুত্ব নেই?

ফকনার : হ্যাঁ, লেখকের নিজস্বতা তার নিজের কাছে তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্য সবাই পড়ার সময় যার যার মতো শুধু লেখাটি নিয়েই মগ্ন থাকবেন। লেখকের নিজস্বতা নিয়ে তাদের ভাবার অবকাশ কই?

 

জাঁ স্টাইন : আর আপনার সমসাময়িকদের ব্যাপারে?

ফকনার : আমরা সবাই আমাদের উৎকর্ষের স্বপ্নের সাথে আমাদের সৃষ্টিকে মেলাতে ব্যর্থ হয়েছি। কাজেই অসম্ভব কাজটি করার ক্ষেত্রে আমাদের যে চমৎকার ব্যর্থতা, সে ব্যর্থতার নিরিখেই আমি আমাদের সবাইকে বিচার করি। আমার মতে, আমি যদি আমার আগের লেখাগুলো আবার লিখতে পারতাম, তাহলে আগের চেয়ে ভালো মানে পৌঁছে দিতে পারতাম। এ রকম অবস্থানে থাকতে পারাটাই শিল্পীর জন্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর অবস্থা। সে জন্যই তিনি কাজ করে যান, বারবার চেষ্টা করে যান। প্রতিবারই তার দৃঢ়ভাবে মনে হয়, এবার তিনি সফল হবেনই, উৎকর্ষকে বের করে আনবেনই। অবশ্য, তিনি নিজের ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন না। আর এ না পারার কারণে তার মনের ভেতর যে বোধটা থাকবে সেটাই স্বাস্থ্যকর। একবার যদি তিনি নিজের উৎকর্ষের স্বপ্ন কিংবা চিত্রকল্পের সাথে নিজের সৃষ্টিকে মিলিয়ে দিতে পারতেন, তাহলে আর তার করার কিছু বাকি থাকত না। নিজের গলা নিজেই কাটা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? তখন তিনি উৎকর্ষের চূড়া থেকে লাফিয়ে আত্মহননের খাদে পড়তেন। আমি একজন ব্যর্থ কবি। মনে হয় প্রত্যেক ঔপন্যাসিকই প্রথমে কবিতা লিখতে চান। যখন দেখেন তিনি কবিতা লিখতে পারছেন না, তখন ছোটগল্পের দিকে ছোটেন; কবিতার পরে সেটাই সবচেয়ে বেশি কাঙ্খিত। সেখানেও ব্যর্থ হয়ে গেলে শেষে তিনি উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেন।

 

জাঁ স্টাইন : ভালো ঔপন্যাসিক হওয়ার জন্য অনুসরণ করার মতো কোনো পদ্ধতি আছে কি?

ফকনার : শতকরা নিরানব্বই ভাগ মেধা, নিরানব্বই ভাগ নিয়মানুবর্তিতা, নিরানব্বই ভাগ কাজ। নিজের কাজ নিয়ে ঔপন্যাসিক যেন কখনও আত্মতুষ্টিতে না ভোগেন। মনে করতে হবে, যত ভালো সৃষ্টি করার আশা থাকে তত ভালো কখনওই হওয়ার নয়। নিজের ক্ষমতার চেয়ে স্বপ্নের বিচরণ সব সময়ই বেশি উঁচুতে হতে হবে। সমসাময়িকদের কিংবা অগ্রজদের কাউকে উতরে যাওয়ার চেষ্টা করা মোটেও উচিত নয়। নিজের থেকে আরো ভালো করার চেষ্টা করতে হবে। শিল্পী নিজেও এক সৃষ্টি; তাকে চালিয়ে বেড়ায় কতিপয় অতিপ্রাকৃত শক্তি, শিল্পী নিজেও জানেন না তাড়িয়ে বেড়ানোর জন্য এই দানবেরা তাকেই কেনো বেছে নিয়েছে। তার অবশ্য জানার কিংবা কৌতুহল বোধ করার মতো আদৌ কোনো অবসরই থাকে না। নিজের কাজ ঠিক মতো করার জন্য তিনি অন্যের মূল্যবান রত্ন ছিনিয়ে নেবেন, চুরি করবেন, ধার করবেন কিংবা ভিক্ষা করে নেবেন—তাতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি নীতিহীন হতেই পারেন।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন লেখক পুরোপুরি নিষ্করুণ হবেন?

ফকনার : লেখকের দায়বদ্ধতা শুধু তার শিল্পের প্রতি। ভালো লেখক হলে তিনি অবশ্যই নিষ্করুণ হবেন। তার একটা স্বপ্ন থাকে। সে স্বপ্নটা তাকে নিরন্তর নিদারুণ যন্ত্রণা দিতে থাকে। সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতেই হয় তাকে। লিখে শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। মান-সম্মান, গর্ব, ভদ্রতা, নিরাপত্তা, সুখ-শান্তি—সবকিছুই জলাঞ্জলি দিতে হয় বইটা লিখে শেষ করার জন্য। লেখককে যদি নিজের মায়ের কাছ থেকেও কোনো জিনিস কেড়ে নেয়ার দরকার হয়ে থাকে তবু তিনি দ্বিধা করবেন না। ‘ওড অন আ গ্রেসান আর্ন’ কে বেশ কজন বয়স্কা মহিলার সমান গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়।

 

জাঁ স্টাইন : তাহলে মান-সম্মান, গর্ব, ভদ্রতা, নিরাপত্তা, সুখ-শান্তির ঘাটতি কি শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে?

ফকনার : না, এগুলো তার নিজের সুখ-শান্তি আর সন্তুষ্টির সাথে সংশ্লিষ্ট; সুখ-শান্তি আর সন্তুষ্টির সাথে শিল্পের কোনো সম্পর্ক নেই।

 

জাঁ স্টাইন : তাহলে লেখকের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবেশ হবে কোনটা?

ফকনার : শিল্প অবশ্য পরিবেশের সাথেও সংশ্লিষ্ট নয়; নিজের অবস্থান কোথায় তা নিয়ে শিল্পের কিছু যায় আসে না। আমার কথাই যদি ধরেন তাহলে বলি, আমাকে সবচেয়ে ভালো কাজের সুযোগ দেয়া হয়েছিল যেটা, সেটা হলো গণিকালয়ের তত্ত্বাবধায়কের কাজ। আমার মতে, এটাই কোনো শিল্পীর কাজের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা। এ জায়গা তাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে পারে; অন্য কোনো ভয়ভীতি কিংবা ক্ষুধা থেকে তিনি মুক্ত থাকতে পারেন। মাথার ওপরে একটা ছাদ থাকবে। সহজ সাধারণ কিছু হিসাবপাতি রাখা আর মাসে একদিন গিয়ে স্থানীয় পুলিশকে কিছু টাকা-পয়সা ধরিয়ে দিয়ে আসা ছাড়া আর তেমন কোনো কাজ করতেই হবে না। এরকম জায়গা সকালের দিকে একদমই চুপচাপ থাকে। আর কাজের জন্য তো সকালবেলাটাই দিনের সবচেয়ে ভালো সময়। সন্ধ্যার দিকে সামাজিক কাজকর্মের অনেক ব্যাপার-স্যাপার থাকে, সেগুলোতে অংশগ্রহণ করে শিল্পী নিজের একঘেয়েমি দূর করতে পারেন, অবশ্য যদি আদৌ তার একঘেয়েমি পেয়ে থাকে। ফলে সমাজে তার একটা পরিচয়ও থাকতে পারে। তার কাজকর্ম বলতে আসলে কিছুই থাকে না। কারণ হিসাবের খাতাটাতাও মাসীই দেখভাল করে থাকেন। আর ওখানকার বাসিন্দারা সবাই যেহেতু নারী, তারা শিল্পীকে সম্মান দেখাবে, ‘স্যার’ বলে ডাকবে। আশপাশের মদের কারবারীরাও তাকে ‘স্যার’ বলে ডাকবে। আর শিল্পীও পুলিশ সদস্যদের নাম ধরে ডাকতে পারেন। সুতরাং কাজ করার মতো শান্তিপূর্ণ, নির্জন এবং আনন্দদায়ক যে জায়গাটা শিল্পীর দরকার সেটা ব্যয়বহুল কোনো কিছু হতে হবে এমন নয়। খারাপ পরিবেশ তার রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে; হতাশ হয়ে কিংবা দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাকে বেশি সময় কাটাতে হতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আমার কাজের জন্য চাই কাগজ, তামাক, খাবার আর অল্প একটু হুইস্কি।

 

জাঁ স্টাইন : মানে বুরবন?

ফকনার: না, সে রকম বিশেষ নয়। স্কচ এবং অন্য কোনোটার মধ্যে বেছে নিতে হলে আমি স্কচই নেব।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা বললেন। লেখকের কি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দরকার?

ফকনার : না, সরাসরি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নয়; তার দরকার হলো পেন্সিল আর কাগজ। সরাসরি টাকা-পয়সা থেকে আসতে পারে এবং লেখার কাজে ভালো কিছু দিতে পারে এমন কিছু দেখিনি। ভালো লেখক কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিছু চান না। তার এতসব করার সময় থাকে না; তিনি ব্যস্ত থাকেন কোনো না কোনো লেখার কাজে। তিনি নিজে যদি উঁচু মানের না হন তাহলে নিজেকেই ধোকা দেয়ার জন্য বলে থাকেন, লেখার জন্য তার হাতে যথেষ্ট সময় নেই; কিংবা তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। চোর, মদের চোরাকারবারি কিংবা ঘোড়াচোরের কাছ থেকেও ভালো শিল্প বের হয়ে আসতে পারে। কতখানি কষ্ট আর দারিদ্র্য সহ্য করা যেতে পারে সেটা দেখতেই অনেকে ভয় পায়। নিজের ভেতরকার কাঠিন্য বের করে দেখার সাহসই অনেকের থাকে না। কোনো কিছুই ভালো লেখককে ধ্বংস করতে পারে না। ভালো লেখককে টলাতে পারে শুধু মৃত্যু। ভালো লেখক সফলতা কিংবা ধন-সম্পদ লাভের চিন্তা করেন না। সফলতার বৈশিষ্ট্য নারীর মতো : তার সামনে আপনি মাথা নুয়ে থাকলে সে আপনাকে পদদলিত করবেই। সুতরাং তাকে বশে রাখতে হলে অতটা গুরুত্ব না দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। দেখবেন সে নিজেই আপনার সামনে নত হয়েছে।

 

জাঁ স্টাইন : চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করলে কি আপনার লেখার ক্ষতি হয়?

ফকনার : প্রথম সারির লেখক হলে কোনো কিছুইতেই তার লেখার ক্ষতি করতে পারে না। যদি কেউ উঁচু মানের লেখক না হন তাহলে কোনো কিছু থেকেই তিনি সহায়তা পেতে পারেন না। উঁচু মানের না হলেও সমস্যা নেই তার; কারণ তিনি হয়তো ইতোমধ্যে নিজের আত্মা বিক্রি করে ফেলেছেন। 

 

জাঁ স্টাইন : চলচ্চিত্রের জন্য লিখতে গেলে কি কোনো লেখক নীতির প্রশ্নে আপোস করেন?

ফকনার : সব সময়ই করেন। কারণ চলচ্চিত্র স্বভাবগতভাবেই সহযোগিতামূলক কাজ। আর যে কোনো ধরণের সহযোগিতামূলক কাজেই আপোস করার প্রসঙ্গ থাকে। কেননা জগতের অর্থই তো এরকম—দেয়া নেয়া।

 

জাঁ স্টাইন : কোন অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করতে আপনার সবচেয়ে ভালো লাগে?

ফকনার : হামফ্রে বোগার্টের কথা বলা যায়; তাঁর সাথে কাজ করে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। ‘টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট’ এবং ‘দ্য বিগ স্লিপ’-এ আমরা এক সাথে কাজ করেছি।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি কি আরো চলচ্চিত্র তৈরি করতে চান?

ফকনার : হ্যাঁ, জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে চাই। সেখানে আমি চলচ্চিত্রটির শেষ এমনভাবে দেখাতে চাই যাতে আমার বহু দিনের ইপ্সিত বিষয়টি দেখাতে পারি; সেটা হলো—মানুষকে কখনও ধ্বংস করা যায় না। স্বাধীনতার জন্য তার যে সহজ সরল ইচ্ছেশক্তি আছে সেটার কারণেই তাকে ধ্বংস করা যায় না।

 

জাঁ স্টাইন : চলচ্চিত্রে কাজের সময় সবচেয়ে ভালো ফলাফলটা পেতে পারেন কীভাবে?

ফকনার : আমার চলচ্চিত্রের মধ্যে যেটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে বলে মনে হয় সেখানে লেখক এবং অভিনেতা উভয়ই পাণ্ডুলিপি ফেলে দিয়ে সরাসরি মহড়ায় দৃশ্য তৈরি করেছেন এবং সেটাও করা হয়েছে ক্যামেরা চালু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে। চলচ্চিত্র তৈরি করার কাজ যদি শুরু না করতাম, কিংবা যদি এ কাজ গ্রহণ করার ক্ষমতা আমার আছে—এমন অনুভূতি বা মনের জোর না থাকত তাহলে মনে হয় না আমি ওদিকটায় যেতাম। চলচ্চিত্রকে আমি সহজ সততার সাথেই গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারি আমি কখনওই ভালো চলচ্চিত্র লেখক হতে পারব না। সুতরাং আমার নিজের জগতের কাজ আমার মধ্যে যতখানি তাড়না তৈরি করতে পারে চলচ্চিত্রের কাজ ততখানি তাড়না তৈরি করতে পারবে না।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি যে কিংবদন্তিতুল্য হলিউড অভিজ্ঞতার সাথে জড়িয়েছিলেন সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন?

ফকনার : এমজিএম স্টুডিওর সাথে চুক্তি শেষ করে বাড়ি ফিরে আসব এমন সময় যে পরিচালকের সাথে কাজ করলাম, তিনি বললেন, আপনি এখানে আরো কাজ করতে চাইলে আমাকে জানাবেন শুধু। আমি আপনার নতুন চুক্তির বিষয়ে স্টুডিওর সাথে কথা বলব। আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিলাম এবং বাড়ি ফিরে এলাম। প্রায় ছমাস পরে পরিচালককে জানালাম, আমি আরেকটা কাজ করতে চাই। আমার হলিউড এজেন্টের কাছ থেকে খুব শীঘ্রই একটা চিঠি পেলাম। চিঠির সাথে প্রথম সপ্তাহের বিল বাবদ একটা চেক পাঠানো হয়েছে। আমি তো বিস্মিত। আমি আশা করেছিলাম, স্টুডিও থেকে আমাকে একটা অফিসিয়াল নোটিস দেয়া হবে, পুনরায় ডাকা হবে, কিংবা চুক্তি করা হবে। ভাবলাম, চুক্তি এসে পৌঁছতে দেরি হচ্ছে; পরের সপ্তাহেই হয়তো পেয়ে যাব। কিন্তু না, কোনো চুক্তির কাগজপত্র নয়, পরের সপ্তাহে আমার এজেন্টের কাছ থেকে আরেকটা চিঠি পেলাম এবং সেটার সাথে পেলাম দ্বিতীয় সপ্তাহের বিলের চেক। এরকম চেক পাওয়া শুরু হলো ১৯৩২ সালের নভেম্বরে, চলল ১৯৩৩ সালের মে মাস পর্যন্ত। তারপর স্টুডিও থেকে একটা টেলিগ্রাম পেলাম। টেলিগ্রামে লেখা ছিল ‘উইলিয়াম ফকনার, অক্সফোর্ড, মিসি, আপনি কোথায়? এমজিএম স্টুডিও।’

উত্তরে আমি লিখলাম, ‘এমজিএম স্টুডিও, কালভার সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া। উইলিয়ম ফকনার।’

টেলিগ্রাম পাঠাতে গেলাম। অফিসের এক অল্পবয়সী মহিলা বললেন, মি. ফকনার, আপনার টেলিগ্রামের বার্তা কই? কিছু তো লেখেননি। আমি বললাম, বার্তা বলতে যা লিখেছি ওই সব। তিনি বললেন, আমাদের রুল বুকের নিয়ম অনুসারে কোনো বার্তা ছাড়া আমি আপনার এটা পাঠাতে পারি না। আপনাকে তো কিছু বলতে হবে। তার কাছে পুরনো কিছু বার্তার নমুনা ছিল। সেগুলো দেখে ঝুড়িতে ফেলে দেয়া কার যেন একটা বার্ষিকী গ্রিটিং মেসেজ বাছাই করে পাঠিয়ে দিলাম। কোনটা যে বাছাই করেছিলাম আজ আর মনে নেই। এরপর আমাকে টেলিফোনে জানানো হলো আমি যেন অক্সফোর্ডের প্রথম বিমানটি ধরে সরাসরি নিউ অরলিন্সে চলে যাই। তারপর যেন উপস্থিত হয়ে যাই পরিচালক ব্রাউনিংয়ের সামনে। অক্সফোর্ড থেকে আমি চড়ে বসলাম এক ট্রেনে, আর নিউ অরলিন্সে পৌঁছলাম আট ঘণ্টা দেরিতে। স্টুডিওর কথামতো আমি মেমফিসে পৌঁছাই। মেমফিস আর নিউ অরলিন্সের মাঝে বিমান মাঝে মধ্যে চলে। তিন দিন পর সত্যিই একটা পাওয়া গিয়েছিল।

সন্ধ্যা ছটার দিকে আমি ব্রাউনিংয়ের হোটেলে গিয়ে দেখা করলাম। তখন ওখানে একটা পার্টি চলছিল। তিনি আমাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, আপনার আপাতত রাতে ভালো করে ঘুমানো দরকার যাতে সকালবেলা উঠতে পারেন; বেশ আগে আগেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। কাহিনী সম্পর্কে আমি জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ওহ, হ্যাঁ। তাই তো। ওই যে অমুক তমুক রুমে যান। ওখানেই পাবেন কনটিনিউইটি লেখককে। তিনিই আপনাকে কাহিনী সম্পর্কে সবকিছু বুঝিয়ে দেবেন।

 

তাঁর কথা অনুযায়ী চলে গেলাম এক রুমে। দেখলাম কনটিনিউইটি লেখক বসে আছেন একা একা। আমি নিজের পরিচয় দিলাম, তারপর কাহিনী সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আপনার সংলাপ লেখা শেষ হলে আমি আপনাকে গল্প দেখতে দেব। আমি আবার ছুটলাম ব্রাউনিংয়ের রুমের দিকে। কী ঘটেছে তাও বললাম তাঁকে। তিনি বললেন, আবার যান; এই এই বলেন। আর এসব নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। মনে রাখবেন, আগে আপনার রাতে ভালো ঘুম হওয়া দরকার। কাজ তো বেশ সকাল সকাল শুরু হবে।

সুতরাং পরের দিন সকালে শুধু কনটিনিউইটি লেখক ছাড়া আমরা সবাই একটা ভাড়া করা বেশ সুদর্শন লঞ্চে যাত্রা শুরু করলাম একশো মাইল দূরে গ্র্যান্ড আইলের দিকে। ছবির শুটিং ওখানেই হওয়ার কথা। আমাদের পরিকল্পনা ছিল ওখানে সময় মতো পৌঁছতে হবে। দুপুরের খাবার ওখানেই খাওয়া হবে এবং সময় হাতে নিয়ে ফিরতি পথে রওনা দিতে হবে যাতে সন্ধ্যা নামার আগেই আমরা আবার নিউ অরলিন্সে ফিরতে পারি।

ওই চলল এক টানা তিন সপ্তাহ ধরে। মাঝে মধ্যে কাহিনী নিয়ে আমার একটু আধটু চিন্তা হতো। কিন্তু ব্রাউনিংয়ের সেই এক কথাই : চিন্তা বাদ দিন তো। আপনার দরকার আগে রাতে ভালো ঘুমানো যাতে সকালবেলা আমরা আগে আগে কাজ শুরু করতে পারি।

একদিন সন্ধ্যায় আমার রুমে কেবলই ঢুকেছি; তখনই একটা ফোন এল। ফোন করেছেন ব্রাউনিং। তিনি দ্রুত তাঁর রুমে যেতে বললেন আমাকে। যথারীতি তাঁর রুমে পৌঁছে দেখলাম তাঁর কাছে টেলিগ্রাম এসেছে। টেলিগ্রামের ভাষ্য হলো : ‘ফকনারকে বরখাস্ত করা হলো। এমজিএম স্টুডিও।’ ব্রাউনিং বললেন, মোটেও ঘাবড়াবেন না। আমি এই এক মিনিটের মধ্যে অমুক অমুককে ফোন দিচ্ছি। আপনাকে তো পে-রোলে নিতেই হবে। বাড়তি লিখিত ক্ষমাও চাইবে আপনার কাছে।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা। আরেকটা টেলিগ্রাম নিয়ে ঢুকল এক পিয়ন। এটাতে লেখা : ‘ব্রাউনিংকে বরখাস্ত করা হলো। এমজিএম স্টুডিও।’

সুতরাং আমি বাড়ি ফিরে এলাম। ব্রাউনিংও নিশ্চয় অন্য কোনোখানে চলে গেছেন। আমি কল্পনায় দেখতাম, কনটিনিউইটি লেখক এক রুমে একা একা বসে আছেন। তার শক্ত হাতে ধরা আছে সাপ্তাহিক কাজের চেক। এমজিএম স্টুডিও সে ছবিটি আর শেষ করেনি। তবে সেখানে এক চিংড়ি ভিলেজ বানিয়ে ছেড়েছে। পানির গভীর থেকে উঠে আসা পাইলের ওপরে লম্বা প্ল্যাটফর্মের মতো মঞ্চ তৈরি করে তারা; তার ওপরে ছাউনি; কিছুটা ছোটখাটো ফেরিঘাটার মতো। এমজিএম স্টুডিও এরকম মঞ্চ অনেকগুলোই কিনতে পারত। একেকটার পেছনে খরচ হতো বড় জোর চল্লিশ পঞ্চাশ ডলার। কিন্তু কী কারণে যেন নিজেদের মতো করে ওই মঞ্চটা তৈরি করে; বলা বাহল্য, তাদের মঞ্চটা ছিল নকল। কারণ মঞ্চের শুধু একপাশে ছিল একটা দেয়াল। তার মানে মঞ্চের দরজা খুলে সামনের দিকে পা বাড়ালে একেবারে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। তাদের মঞ্চ তৈরির প্রথম দিনেই কোনো এক কাজুন জেলে গাছের গুড়ি থেকে বানানো তার ছোট সরু নৌকো নিয়ে এসে হাজির হয়। সারাদিন ঝলসানো রোদের নিচে মঞ্চের ওপর বসে থেকে অদ্ভূত শ্বেতাঙ্গদের সেই অদ্ভূত তবে নকল মঞ্চ তৈরি করা দেখে যায়। পরের দিন সে আবার আসে। সাথে পুরো পরিবার। ছোট ছোট কয়েকটা ছেলেমেয়ে, বউ, বউয়ের কোলে একটা শিশু আর তার শাশুড়ি। সারা দিন তারা প্রখর রোদের নিচে বসে শ্বেতাঙ্গ বেকুবদের কাণ্ডকারখানা দেখে। পরে আমি দুতিন বছর ছিলাম নিউ অরলিন্সে। শুনেছি মাইল মাইল দূর থেকে কাজুন লোকেরা দেখতে এসেছে শ্বেতাঙ্গদের সেই নকল চিংড়ি-মঞ্চ। দূর থেকে ছুটে গিয়ে অনেকগুলো শ্বেতাঙ্গ লোক সে মঞ্চ বানিয়েছিল। কিন্তু এক সময় সেটা ফেলে চলে আসে তারা।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি বললেন, চলচ্চিত্রের কাজ করতে গেলে লেখককে অবশ্যই আপোস করতে হয়। লেখার কাজেও সে রকমই করতে হয় নাকি? লেখক কি পাঠকের কাছেও দায়বদ্ধ থাকেন?

ফকনার : লেখকের বড় দায়বদ্ধতা হলো তার লেখাটা সর্বোত্তম উপায়ে শেষ করা। এই একটা ছাড়া আর যে সব দায়বদ্ধতা তার থাকে সেগুলো তিনি যেভাবে খুশি পূরণ করতে পারেন। আমার নিজের প্রসঙ্গে বলতে পারি, জনতার কথা ভাবার সময় আমার নেই। কে আমার লেখা পড়ছেন না-পড়ছেন সেটা দেখার অবসর আমার নেই। আমার কিংবা অন্য কারো লেখা সম্পর্কে জন ডো কী মন্তব্য করলেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার নিজের একটা মানদণ্ড আছে, সেটা অনুযায়ী কাজ করতেই হবে। লা টেনটেশন পি সেইন্ট অ্যাস্টইন কিংবা ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়ার সময় যেমন আনন্দ পাই তেমনটা পেয়ে থাকি মনের মতো কাজ করার সময়। এ টেক্সটগুলো পড়লে ভালো লাগে। একটা পাখি দেখেও আমি একই রকম আনন্দ অনুভব করি। আমাকে পুনরায় জন্ম নিতে বলা হলে আমি বাজপাখি হয়ে আসতাম। কেউ তাকে ঘৃণা করে না, ঈর্ষা করে না; কেউ তাকে চায় না, কারো কাছে তার প্রয়োজনীয়তা নেই। কোনো কিছু নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। কোনো বিপদেরও ভয় নেই। সে সবকিছু খেতে পারে।

 

জাঁ স্টাইন : আপনার নিজের মানদণ্ড পর্যন্ত পৌঁছতে কী কৌশল অবলম্বন করে থাকেন?

ফকনার : লেখক যদি কৌশলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই থাকেন তাহলে তাকেই শল্যবিদের কাজ কিংবা রাজমিস্ত্রির কাজ বেছে নিতে দেয়া উচিত। লেখা শেষ করার জন্য কোনো কৌশলের দরকার নেই। সংক্ষেপে চলার কোনো পথও নেই। কোনো অল্পবয়সী লেখক কোনো তত্ত্ব অনুসরণ করলে তিনি বোকামিই করবেন। নিজেকে পরিপক্ক করতে হলে নিজের ত্রুটির ভেতর দিয়েই করতে হবে। মানুষ তো ভুলের মধ্য দিয়ে শেখে। ভালো শিল্পী মনে করেন, তাকে উপদেশ দেয়ার মতো এত বেশি জানা-শোনা লোক কেউ নেই। তার সর্বোচ্চ অহংকার থাকে। আগের লেখককে তিনি যত প্রশংসাই করুন না কেনো আসলে তো তিনি তাকে উতরে যেতেই চান।

 

জাঁ স্টাইন : তাহলে আপনি কি কৌশলের স্থায়িত্বকে অস্বীকার করবেন? 

ফকনার : না, অস্বীকার করছি না। কখনও ককনও কৌশল নিজেই ঢুকে পড়ে লেখকের স্বপ্নের ভেতর; লেখক হাত দিয়ে স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে ফেলার আগেই কৌশল খানিকটা কর্তৃত্ব নিয়ে নেয় নিজের দিকে। সেটা হলো পুরোপুরি একটা দক্ষতাসম্পন্ন কর্ম, আর কাজের সর্বশেষ অবস্থাটা হলো লেখকের হাতে শেষ ইটটি স্থাপনের মতো, কেননা তিনিই শেষ পর্যন্ত জানেন প্রতিটি শব্দ কোথায় কেমন অবস্থায় থাকে। একেবারে শুরুতে যে শব্দটি তিনি ব্যবহার করবেন সেটির ক্ষেত্রেও একই কথা। ‘অ্যাজ আই লে ডাইং’-এর বেলায় এমনটিই হয়েছিল। খুব সহজ কথা নয়। অবশ্য কোনো সৎ পরিশ্রমের কাজই সহজ হয় না। আমার জন্য সুবিধার ব্যাপারটা ছিল, লেখার আগেই এর সব উপাদান আমার কাছে তৈরি ছিল। তখন আমার পেশাটা ছিল বারো ঘণ্টার কায়িক শ্রমের কাজ। কাজ শেষ করে এসে যে অবসর পেতাম সে সময়েই লিখে বইটা শেষ করতে ছ’সপ্তাহ লেগেছিল। কল্পনায় রেখেছিলাম একদল লোককে; তাদের সামনে এগুনোর পথে দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য তাদেরকে সহজ সাধারণ বিশ্বজনীন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখিন করেছিলাম। কিন্তু যদি কৌশল এসে মাঝখানে না দাঁড়ায় তাহলে কাজ করাটা এক দিক থেকে সহজ হয়ে যায়। কারণ আমার ক্ষেত্রে এমন বেশ দেখা গেছে—কিছু দূর লিখে যাওয়ার পর চরিত্ররা নিজেরাই এসে দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং কাহিনীকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। ঘটনাটা ঘটে ধরুন ২৭৫ পৃষ্ঠা বা তার কাছাকাছি এসে। অবশ্য বইটা ২৭৪ পৃষ্ঠায় শেষ করলে কী ঘটতে পারত সে বিষয়ে কিছু জানা নেই। শিল্পীর যে গুণগুলো অবশ্য থাকা প্রায়েজন সেগুলো হলো : নিজের কাজের মূল্যায়ন করার জন্য নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা এবং নিজেই নিজেকে যেন না ঠকান তার প্রতিরোধক হিসেবে সততা এবং সাহস থাকা দরকার। আমার কাজগুলোর কোনোটাই আমার কাঙ্খিত মানে পৌঁছতে পারেনি বলেই আমাকে অবশ্যই নিজের কাজের বিচার করতে হয় আমার সর্বোচ্চ মর্মযাতনাদায়ী কাজের নিরিখে। একটা তুলনা দিলে আরো পরিষ্কার হয়—একজন মা তার যে ছেলে পাদ্রী হয়েছে তার চেয়ে যে ছেলে চোর কিংবা খুনি হয়েছে তাকে বেশি ভালোবাসেন।

 

জাঁ স্টাইন : কোন কাজটার কথা ইঙ্গিত করছেন?

ফকনার : ‘দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি’। এখানকার গল্পটা ভালো করে বলার জন্য এটা আমি আলাদাভাবে পাঁচবার লিখেছি। ভেতরের স্বপ্নটা বারবার যাতনায় ফেলে দিত। লিখে শেষ করা না হলে সে স্বপ্নের হাত থেকে রেহাই ছিল না। এখানকার গল্প তৈরি হয়েছে পরাজিত দুই নারীকে নিয়ে। ক্যাডি এবং তার মেয়ে। আমার প্রিয় চরিত্রদের অন্যতম হলো ডিলসে। কারণ সে সাহসী, উদার ও শান্ত।

 

জাঁ স্টাইন : ‘দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি’র শুরু কেমন?

ফকনার : একটা মানসিক ছবি দিয়ে শুরু হয়েছে। তখন আমি নিজেও খেয়াল করিনি, এটার প্রতীকী গুরুত্ব আছে। একটি নাশপাতি গাছে একটা ছোট মেয়ের কাদা মাখানো চেয়ার। সেখানে বসে সে একটা জানালা দিয়ে দেখতে পায়, তার দাদীর দাফনক্রিয়া চলছে। সে যা যা দেখে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তার ভাইদের জানিয়ে দেয়। ইতোমধ্যে অবশ্য আমি জানিয়ে দিই তারা কারা, কী করছে তারা আর মেয়েটার প্যান্টে কাদা জড়াল কোথা থেকে ইত্যাদি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এদের এত সব ঘটনাবলী একটা ছোটগল্পের পরিসরে ধরা কঠিন হয়ে যাবে; নিশ্চয়ই একটা পুরো বই হতে হবে। আর তখনই আমি কাদামাখা প্যান্টের প্রতীক ধরতে পারি। আর সে চিত্রকল্পটাকে প্রতিস্থাপন করেছি পিতৃমাতৃহীন মেয়েটার ড্রেনপাইপ বেয়ে নেমে আসার চিত্রকল্প দিয়ে; সে নেমে আসছে মানে সে বাড়ি থেকে পালাচ্ছে। এটাই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল, তবে সেখানে কেউ কখনও তাকে ভালোবাসা, স্নেহমমতা দেয়নি; তার কথা কেউ বোঝার চেষ্টাই করেনি।

এই বোকা শিশুটার চোখ দিয়ে কাহিনী বলা শুরু করে দিই; কারণ আমার মনে হয়েছে এরকম একজনকে দিয়ে শুরু করলে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে; কেননা সে শুধু জানে কী ঘটছে; কেন ঘটছে তা জানে না। তারপর দেখলাম, সেবার সে গল্পটা তো বলা হয়নি। আবার বলার চেষ্টা করলাম : এবার তার এক ভাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে। তারপরও মনে হলো, যে গল্প চাচ্ছি হচ্ছে না। এরপর তার আরেক ভাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করলাম। তারপরও মনে হলো, ফাঁক ফোকর রয়ে গেছে। টুকরো টুকরো উপাদানগুলো জোড়া লাগিয়ে নিজে ফাঁক ফোকর বন্ধ করার চেষ্টা করলাম এবং এবারের মুখপাত্রের দায়িত্ব নিজে নিলাম। সেটাতেও মন ভরল না। বই প্রকাশের পনের বছর পরে আরেকটা বইয়ের পরিশিষ্টের মতো আরেকবার লিখলাম। তারপর মনের ভেতরকার বোঝাটা থেকে রেহাই পেলাম। একটু শান্তি পেলাম। এই বইটার প্রতিই আমার সবচেয়ে বেশি মমতা। বইটার কাজ ফেলে রাখতে পারতাম না। আবার কোনো বারই মনের মতো করে শেষ করতে পারতাম না যদিও কঠিনভাবে চেষ্টা করতাম এবং আবারও ব্যর্থই হতাম।    

 

জাঁ স্টাইন : বেনজি আপনার মধ্যে কোনো আবেগের সঞ্চার করে?

ফকনার: সকল মানবের জন্য দুঃখ এবং করুণা। বেনজির জন্য কোনো আবেগ অনুভব করা যায় না। কারণ সে নিজে কোনো কিছু অনুভব করে না। তার সম্পর্কে আমার অনুভূতি হলো তাকে সত্যি সত্যি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় কি না। তাকে তো আমিই সৃষ্টি করেছি। এলিজাবেথীয় যুগের গোরখোদকদের মতো সে হলো নান্দী। তার কাজ সে শেষ করার পর আর থাকে না, চলে যায়। বেনজির ভালো মন্দ কিছুই করার ক্ষমতা নেই; শুভ অশুভ সম্পর্কে তার জ্ঞান নেই।

 

জাঁ স্টাইন : বেনজির মধ্যে কি ভালোবাসা বোধ আছে?

ফকনার : বেনজির তো স্বার্থপর হওয়ার মতোও যৌক্তিক বোধ নেই। তাকে বলা যায় পশু। সে কোমলতা আর ভালোবাসা চিনতে পারে; কিন্তু এসব অনুভূতির নাম সে জানে না। সে ক্যাডির মধ্যে পরিবর্তন দেখে বিলাপ করে ওঠে; কারণ সে ক্যাডির এই পরিবর্তনকে ভালোবাসা আর কোমলতার প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য করে। ক্যাডি তার কাছে যখন নেই তখনও সে বুঝতে পারে না ক্যাডিকে পাওয়া যাচ্ছে না। বোকা হওয়ার কারণেই তার এমন অবস্থা। সে শুধু বুঝতে পারে কোথাও একটা গোলমাল হয়ে গেছে। সেটাই একটা শূন্যতার সৃষ্টি করে গেছে; সে শূন্যতার মধ্যেই সে দুঃখ পেতে থাকে। সে শূন্যতাকে ভরানোর চেষ্টাও সে করে। তার কাছে থাকে শুধু ক্যাডির ফেলে যাওয়া স্যান্ডেল জোড়া। স্যান্ডেলই তার কাছে ভালোবাসা আর কোমলতা যদিও সে এই অনুভূতির নাম জানে না, জানে শুধু সে বোধটা নেই। সমন্বয় জানে না বলেই সে নোংরা; ময়লা তার কাছে তেমন কোনো নজর দেয়ার মতো বিষয়ই নয়। শুভ আর অশুভর মধ্যে পার্থক্য ধরতে জানে না সে; পরিচ্ছন্নতা আর ময়লার মধ্যে পার্থক্য সে আরো ধরতে পারে না। স্যান্ডেল দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলেও সে আর বুঝতে পারে না, এক সময় এ স্যান্ডেল কার ছিল। তার দুঃখের কারণ যৎসামান্য বুঝতে পারলেও এটা আর বুঝতেই পারে না সে। ক্যাডি ফিরে এলে সম্ভবত তাকে চিনতে পারত না বেনজি।

 

জাঁ স্টাইন : বেনজিকে যে নার্সিসাসের বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে সেটার কি বিশেষ তাৎপর্য আছে?

ফকনার : বেনজিকে নার্সিসাসের বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টি সরানোর জন্য। এপ্রিলের ৭ তারিখে সামান্য একটা ফুলই যথেষ্ট কাজে দিয়েছে। খুব ভেবেচিন্তে করা হয়নি।

 

জাঁ স্টাইন : ‘আ ফেবল’-এর খ্রিষ্টীয় রূপককাহিনীর মতো এখানে যে রূপককাহিনী ব্যবহার করেছেন, এর কি কোনো শৈল্পিক মূল্য আছে?

ফকনার : গোলাকার বাড়ি তৈরি করতে মিস্ত্রিরা চার কোণাকার কাঠামো তৈরি করেও একই ধরণের সুবিধা পেয়ে থাকেন। ‘আ ফিবল’-এ খ্রিষ্টীয় রূপককাহিনীর ব্যবহার ওরকম একটা গল্পে ব্যবহার করাটা আসলেই সঠিক ছিল। অর্থাৎ আয়তাকার গোলাকার বাড়ি তৈরির জন্য আয়তাকার গোলাকার কোণ।

 

জাঁ স্টাইন : তার মানে কি দাঁড়াল—কোনো শিল্পী খ্রিষ্টীয় চারিত্রকে অন্য সব হাতিয়ারের মতো ব্যবহার করতে পারেন? যেমন বলা যায় কোনো কাঠমিস্ত্রি হাতুড়ি যেভাবে ধার করতে পারেন।

ফকনার : আমরা যে কাঠমিস্ত্রির কথা বলছি তার হাতুড়ির অভাব থাকে না। খ্রিষ্টীয় চারিত্র বলতে আমরা যা বুঝাচ্ছি তাতে আমাদের যদি এক মত থাকে তাহলে তো বলতে হয়, খ্রিষ্টীয় চারিত্র সবার মধ্যেই থাকে। এটা ব্যক্তিরও একেবারে ব্যক্তিগত আচরণের সংকেত। শুধু নিজের প্রকৃতিকে অনুসরণ করলে মানুষের নিজস্ব প্রকৃতি তাকে যেভাবে চালাতে চায় এই চারিত্রকে ব্যবহার করে মানুষ নিজেকে তার চেয়ে অধিকতর ভালো অবস্থায় উন্নীত করতে পারে। এই চারিত্রের প্রতীক মানুষের কাছে যেটা-ই হোক না কেনো, মানে ক্রুশ কিংবা চাঁদ যা-ই হোক না কেনো, সেটা তাকে মানবজাতির মাঝে তার কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এই চারিত্রে রূপককাহিনীগুলো হলো বিভিন্ন রেখাচিত্রের মতো; সেগুলোর বিপরীতে নিজেকে স্থাপন করে মানুষ নিজেকে জানতে পারে, নিজের পরিচয় বুঝতে পারে। টেক্সট বই তাকে যেভাবে গণিত শেখায় এ চারিত্র তাকে সেভাবে ভালো মানুষে পরিণত করতে পারে না। যন্ত্রণা, ত্যাগ এবং সুখের প্রতিজ্ঞার জুড়িহীন উদাহরণের মাধ্যমে এ চারিত্র মানুষকে নিজেকে আবিষ্কার করতে শেখায় এবং তার নিজের ক্ষমতা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী তাকে ধীরে ধীরে একটা নৈতিক সংকেত ও মানের দিকে পরিবর্তন করতে থাকে। নৈতিক সচেতনতার রূপককাহিনীর ওপর লেখকেরা আগেও নির্ভর করেছেন, ভবিষ্যতেও করবেন। কারণ রূপককাহিনীগুলোর কোনো সমকক্ষ তুলনা হয় না। ‘মবি ডিক’-এর মধ্যে তিনজন মানুষ বিবেকের ত্রয়ীর প্রতিনিধিত্ব করে : একজন কিছুই জানে না; আরেকজন জানে, তবে গুরুত্ব অনুভব করে না; আরেকজন জানে এবং গুরুত্বও দেয়। ‘আ ফেবল’-এর মধ্যে সে রকম ত্রয়ীর প্রতিনিধিত্ব আছে : একজন হলো অল্পবয়সী ইহুদি পাইলট—সে বলে, এটা তো ভয়ঙ্কর, আমি এটা গ্রহণ করব না। জীবন গেলেও না; আরেকজন হলো ফরাসি কোর্টারমাস্টার জেনারেল—সে বলে, এটা ভয়ঙ্কর, তবে আমরা কান্নার ভেতর দিয়ে এটাকে আপাতত সহ্য করতে পারি; আরেকজন হলো ইংরেজ ব্যাটালিয়ন চালক—সে বলে, এটা ভয়ঙ্কর এবং এর থেকে আমি কিছু একটা করতে পারি।  

 

জাঁ স্টাইন : ‘দ্য ওয়াইল্ড পাম’-এ দুটো সম্পর্কহীন বিষয়বস্তুকে এক বইয়ের মধে নিয়ে আসার মধ্যে কি কোনো নন্দনতাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল? কতক সমালোচক যেমন বলেছেন, এ হলো শ্রুতিমধুর সুরের সঙ্গে আরেক শ্রুতিমধুর সুরের মিশ্রণ, নাকি এটা কোনো বিশৃঙ্খল কিছু? 

ফকনার : না, না। এটা একটাই গল্প, শার্লট রিটনমেয়ার এবং হ্যারি উইলবোর্নের গল্প; তারা প্রেমের জন্য সবকিছু ত্যাগ করে। কিন্তু শেষে প্রেমই থাকে না। বইটা শুরুর আগে বুঝতে পারিনি এখানে দুটো আলাদা গল্প দাঁড়িয়ে যাবে। ‘দ্য ওয়াইল্ড পাম’-এর প্রথম ভাগের শেষে পৌঁছনোর পর হঠাৎ উপলব্ধি করলাম কী যেন নেই; সেটার ওপরে গুরুত্বারোপ করার দরকার ছিল; সংগীতের মিশ্রণের মতো কাজ এখানে দরকার। সুতরাং ‘দ্য ওয়াইল্ড পাম’ উচ্চগ্রামে না পৌঁছনো পযন্ত আমি ‘ওল্ড ম্যান’ গল্প লিখেই চললাম। তারপর ‘ওল্ড ম্যান’ গল্প থামিয়ে দিলাম প্রথম ভাগ শেষ করার সাথে সাথে এবং ‘দ্য ওয়াইল্ড পাম’ আবার শুরু করলাম, চালিয়ে গেলাম এটার কাহিনী নিজে থেকে বসে পড়া পর্যন্ত। বিপরীত বিষয়ের আরেক সেকশন পর্যন্ত এটাকে উচ্চগ্রামে তুলে আনা শুরু করলাম। পরের সেকশনটা তৈরি হয়েছে প্রেম পেয়েছে এমন একজনকে নিয়ে। তারপর বইয়ের বাকি অংশ এখান থেকে অন্য দিকে ছুটে চলে, স্বেচ্ছায় চলে যাওয়া এমনকি জেলখানা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া, সেখানে সে নিরাপদ। যদি বলি এগুলো দুটো গল্প তাহলে বুঝতে হবে কাকতালীয়ভাবে কিংবা প্রয়োজনের কারণে। তবে মুলকথা হলো, এখানে গল্প একটাই—শার্লট রিটনমেয়ার এবং হ্যারি উইলবোর্নের গল্প।

   

জাঁ স্টাইন : অপানার লেখালেখির কতখানি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপরে তৈরি?

ফকনার : আমি বলতে পারি না। আমি সেভাবে গুণে কিংবা মেপে দেখিনি। কারণ ‘কতখানি’ কথাটা গুরুত্বের নয়। লেখকের মূলত তিনটে জিনিসের প্রয়োজন : অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনা। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটো থাকলে বাকিটার কাজ চলে যেতে পারে। আবার কখনও কখনও একটা থাকলেও অন্য দুটোর কাজ চালিয়ে নেয়া যেতে পারে। আমার বেলায় সাধারণত এরকম ঘটেছে—গল্প শুরু হয়েছে কোনো একক ধারণা, স্মৃতি কিংবা মানস-ছবি থেকে। গল্প লেখার কাজ হলো কোনো ঘটনা যখন ঘটে সে সময় পর্যন্ত কাজ করা; তার সাথে থাকে কেন ঘটল, পরে কী হতে পারে—এসব। লেখকের চেষ্টা থাকে তার সাধ্যমতো সর্বোত্তম উপায়ে বিশ্বাসযোগ্য চলমান পরিস্থিতিতে বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র করা। তার ব্যবহারের হাতিয়ারের অন্যতম হিসেবে অবশ্যই তার পরিচিত প্রতিবেশকেই ব্যবহার করে থাকেন লেখক। আমি বলব, কোনো কিছু প্রকাশ করার সবচেয়ে সোজা মাধ্যম হলো সংগীত। কারণ মানুষের ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতায় সংগীতই আগে এসেছে। কিন্তু আমার মেধা যেহেতু কথা, আমি কথাই ব্যবহার করব। তবে কথা অনেকটা ধীর গতির বলে একই বিষয় সংগীতে তার চেয়ে অনেক ভালো করে প্রকাশ করা যায়। তার মানে সংগীতে সহজভাবে এবং সুন্দরভাবে প্রকাশ করা গেলেও আমি কথা ব্যবহার করি; কেননা আমি শোনার চেয়ে পড়তেই বেশি পছন্দ করি। আমি শব্দের চেয়ে নীরবতা বেশি পছন্দ করি। আর কথার চিত্রকল্প তৈরি হয় নীরবতার ভেতরেই। তার মানে গদ্যের বজ্র ও সংগীত নীরবতার ভেতরেই তৈরি হয়।  

 

জাঁ স্টাইন : কোনো কোনো পাঠক বলেন তারা আপনার লেখা পড়ে বুঝতে পারেন না। এমনকি দু’তিন বার পড়ার পরেও না। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ফকনার : চার বার পড়ুন।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনার কথা বললেন, এগুলো লেখকের জন্য দরকার। এগুলোর সঙ্গে কি অনুপ্রেরণার কথাও যোগ করবেন?

ফকনার : আমি অনুপ্রেরণার কথা কিছু জানি না। কারণ আমি অনুপ্রেরণার কথা শুনেছি, কিন্তু দেখিনি।

 

জাঁ স্টাইন : বলা হয়ে থাকে, লেখক হিসেবে আপনি নাকি সহিংসতায় আচ্ছন্ন?

ফকনার : যদি বলা যায় কাঠমিস্ত্রি হাতুড়ির প্রতি আচ্ছন্ন তাহলে এ কথাটাও তেমনই। সহিংসতা কাঠমিস্ত্রিরও একটা হাতিয়ার। একজন কাঠমিস্ত্রি যতগুলো হাতিয়ার তৈরি করতে পারেন একজন লেখক তার চেয়ে বেশি হাতিয়ার তৈরি করতে পারেন না।    

 

জাঁ স্টাইন : লেখক হিসেবে শুরু করেছিলেন কীভাবে বলবেন?

ফকনার : আমি তখন নিউ অরলিন্সে থাকতাম। সামান্য কিছু টাকা-পয়সা উপার্জনের জন্য মাঝে মধ্যে কাজ করতাম। তা সে যেমন কাজই হোক না কেন কিছু যেত আসত না আমার। সে রকম একটা সময়ে দেখা হলো শেরউড এন্ডারসনের সঙ্গে। পরিচিতি থেকে জানাশোনা আরো পরিষ্কার হওয়ার পরে আমরা এক সঙ্গে বিকেলবেলা শহরের রাস্তায় হাঁটতাম, লোকজনের সাথে কথা বলাতাম। সন্ধ্যায় আমাদের আবার দেখা হতো। আমরা একটা দুটো বোতল নিয়ে বসতাম। তখন তিনি কথা বলতেন; আমি শুধু শুনে যেতাম। দুপুরের আগে তাঁকে কোনো দিন বাইরে দেখিনি। সে সময়টাতে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে বাড়িতে বসে লেখালেখি করতেন। বিকেলে দেখা, সন্ধ্যায় দেখা চলতেই লাগল বেশ। তাঁর জীবন যাপন দেখে আমার মনে হলো, লেখকের জীবন যদি এমনই হয় তাহলে তো আমিও এ জীবন বেছে নিতে পারি। সুতরাং আমার প্রথম বই লেখার কাজ শুরু করে দিলাম। প্রথম দিকে দেখলাম লেখালেখি তো বেশ মজার কাজ। মি. এন্ডারসনের সঙ্গে যে আমার তিন সপ্তাহ দেখা হয় না সে কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। শেষে তিনি নিজেই একদিন চলে এলেন আমার দরজায়। বললেন, ব্যাপার কী? তুমি কি আমার ওপর খেপে আছ? আমি বললাম, আমি একটা বই লেখার কাজ শুরু করেছি। তিনি শুধু বললেন, মাই গড! এ বলেই হাঁটা দিলেন বাইরের দিকে। আমার সে বইটার নাম ‘সোলজার্স পে’। বইটা শেষ করার পর রাস্তায় একদিন মিসেস এন্ডারসনের সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বই লেখার কাজ কেমন চলছে? আমি বললাম, লেখা তো শেষ। মিসেস শেরউড আরো বললো, শেরউড বলেছে তোমার সাথে তার কাজ আছে। তোমার পাণ্ডুলিপি যদি তাকে পড়তে না হয় তাহলে সে তার প্রকাশকের সাথে কথা বলবে তোমার পাণ্ডুলিপি যাতে তিনি গ্রহণ করেন। আমি বললাম, লেখা শেষ। ব্যস, এভাবেই লেখক হয়ে গেলাম।

 

জাঁ স্টাইন : আপনার ‘মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু টাকা পয়সা’ উপার্জনের জন্য কী ধরণের কাজ করতেন?

ফকনার : যা পেতাম তাই। প্রায় সব কাজই একটু না একটু করতে পারতাম। নৌকা চালানো, বাড়িঘরে রং করা, বিমান চালানো—সব। আমার তখন অনেক টাকার দরকার হতো না; কারণ তখনকার দিনে নিউ অরলিন্সে জীবন যাপনের খরচ বেশ সস্তাই ছিল। আর আমার প্রয়োজনও ছিল খুব কমই—ঘুমানোর একটা ছোটখাটো জায়গা, সামান্য কিছু খাবার, তামাক আর অল্প একটু হুইস্কি। এমন অনেক কাজ ছিল যেগুলো আমি একটানা দু’তিন দিন করতাম। যা উপার্জন হতো সেটা দিয়ে মাসের বাকি দিনগুলো পার করে দিতাম। স্বভাবগতভাবেই আমি ভবঘুরে। অনেক টাকা উপার্জনের জন্য কাজ করতে হবে—এমন চিন্তা আমার ছিল না। আমার মতে, জগতে যে এত কাজ আছে এটা তো রীতিমতো একটা লজ্জার বিষয়। মানুষের জীবনে অন্যতম দুঃখের বিষয় হলো এই একটা জিনিসই মানুষ করে থাকে একটানা আটঘণ্টা। দিনের পর দিন মানুষ শুধু কাজই করে যায়। আপনি দিনে একটানা আটঘণ্টা খেতে পারবেন না, একটানা আটঘণ্টা কোনো পানীয় পান করতে পারবেন না, একটানা আটঘণ্টা যৌনক্রিয়াও করতে পারবেন না। একটানা আটঘণ্টা পারবেন শুধু কাজ করতে। এ কারণেই মানুষ নিজেকে এবং অন্যদেরকেও এত শোচনীয়, এত দুঃখি করে তোলে।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি নিশ্চয় শেরউড এন্ডারসনের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ। তবে লেখক হিসেবে তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ফকনার : তিনি আমাদের প্রজন্মের আমেরিকান লেখকদের কাছে পিতৃতুল্য। আমেরিকান লেখনীর যে ঐতিহ্যকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বয়ে নিয়ে যাবে সে ঐতিহ্যের পথ প্রদর্শকও তিনিই। তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন তিনি পাননি। ড্রেইজারকে বলা যায় তাঁর বড় ভাই এবং মার্ক টোয়েন হলেন তাঁদের বাবা। 

 

জাঁ স্টাইন : সে সময়ের ইউরোপীয় লেখকদের সম্পর্কে কিছু বলবেন?

ফকনার : আমার সময়ের দুজন মহান লেখক ছিলেন মান এবং জয়েস। কোনো নিরক্ষর পাদ্রী ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রতি যেমন বিশ্বাস আর ভক্তি নিয়ে এগোয় জয়েসের ‘ইউলিসিস’কেও তেমন ভক্তি নিয়ে দেখা দরকার।

 

জাঁ স্টাইন : আপনার বাইবেলের পটভূমি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

ফকনার : আমার প্রপিতামহ মুরে ছিলেন বেশ ভদ্র এবং নরম মনের মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের প্রতি। যদিও তিনি স্কট ছিলেন তবু তিনি আমাদের কাছে অতিরিক্ত ধার্মিক কিংবা কঠিন ছিলেন না। সোজা কথায়, তিনি ছিলেন নীতিতে অটল একজন মানুষ। আমরা যখন সকালবেলার নাস্তা খেতে টেবিলে বসতাম তখন ছোট-বড় সবার সামনে আমাদের, মানে বাচ্চাদের একটা বিশেষ কাজ করতে হতো: বাইবেলের দু’চার লাইন আমাদের জিবের ডগায় রেডি রাখতে হতো। তিনি শুনতে চাওয়ার সাথে সাথে গড়গড় করে বলে যেতে হতো। সে কাজে কেউ ব্যর্থ হলে তার আর সকালের নাস্তা জুটত না। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের বাইবেলবিদ্যা ঝালিয়ে নেয়ার জন্য তাকে নাস্তার টেবিলের বাইরে যেতে হতো। আর এ কাজে তদারকি করার জন্য ছিলেন আমাদের এক অবিবাহিত ফুফু, কিছুটা মেজর সার্জেন্টের মতো তার স্বভাব। তিনি আসামীকে নাস্তার টেবিল থেকে নিয়ে গিয়ে এবং এমন চিকিৎসা দিতেন, পরের দিন তার আর কোনো সমস্যাই হতো না।

তবে আমাদের বলার মধ্যে কোনো রকম ভুলত্রুটি থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। আমরা ছোট থাকতে দিনের পর দিন সকালবেলা এরকম পরীক্ষা দিতে দিতে বাইবেলের ওই বিষয়গুলো রপ্ত করে ফেলেছিলাম। তারপর আরেকটু বড় হলে গড়গড় করে বলে যাওয়ার ক্ষমতা আরো বেড়ে যেত; মাঝে মধ্যে খুব দ্রুত বলতে বলতে খাওয়া শুরু করে পাঁচ দশ মিনিট এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করে যদি দেখা যেত তার চোখ পড়েছে তাহলে পরিষ্কার বোঝা যেত তিনি অভিজাত, দয়াদ্র এবং শান্ত চোখে তাকিয়ে আছেন। ততক্ষণে হয়তো আমাদের সেই খাদকের গলা দিয়ে হ্যাম, স্টিক, ফ্রায়েড চিকেন, জই, মিষ্টি আলু কিংবা তিন পদের গরম রুটি নেমে গেছে। তখনও তাকে খুব বেশি কড়া মনে হতো না, তবে নীতির প্রশ্নে অটল আছেন, তা বোঝা যেত। এরকম অবস্থায় আমাদের কাউকে দেখলে পরের দিনই তার জন্য নতুন কয়েক লাইন বরাদ্দ হয়ে যেত। এরকম চলতে চলতেই এক সময় বোঝা গেল, শৈশব শেষ হয়ে গেছে; আমি সে সীমানা পার হয়ে গেছি এবং বাইরের জগতে প্রবেশ শুরু হয়ে গেল।

  

জাঁ স্টাইন : আপনার সমসাময়িকদের লেখা পড়েন?

ফকনার : না, যে  সব বই ছেলেবেলায় নাম শুনেছি এবং পছন্দ করতাম সেগুলোই পড়া হয়। আপনারা পুরনো বন্ধুকে যেভাবে গ্রহণ করেন আমিও সেভাবে গ্রহণ করি ওইসব বই। ওল্ড টেস্টামেন্ট, ডিকেন্স, কনরাড, সারভান্তেস, দোন কিহোতে—এগুলো প্রতি বছরই পড়ি, অনেকে যেমন করে বাইবেল পড়েন আমি এসব বই এবং লেখকের লেখা পড়ি। ফ্লবেয়ার পড়ি, বালজাক পড়ি। বালজাক নিজের অকৃত্রিম অক্ষত এক জগত তৈরি করেছেন। বিশখানা বই থেকে যেন রক্তের ধারা বইছে। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, শেক্সপিয়ার পড়ি। মাঝে মধ্যে মেলভিলের লেখাও পড়ি। আর কবিদের মধ্যে মার্লো, ক্যামপিওন, জনসন, হেরিক, ডান, কিটস, শেলির কবিতা পড়ি। হুজম্যানের কবিতা আমি এখনও পড়ি। এদের লেখা এতবার হয়েছে, এখন আর প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে একটানা শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ি না। একটা দৃশ্য কিংবা একজন চরিত্র সম্পর্কে পড়ি। আপনারা কোনো বন্ধুর সাথে যেমন কয়েক মিনিট কথা বলেন সে রকম।

 

জাঁ স্টাইন : ফ্রয়েড পড়েননি?

ফকনার : আমি যখন নিউ অরলিন্সে থাকতাম সবাইকে ফ্রয়েড নিয়ে কথা বলতে শুনেছি। তবে আমি কখনও তাঁর লেখা পড়িনি। সে সময় হয়তো আমি শেক্সপিয়ার কিংবা মেলভিল পড়িনি। আমি নিশ্চিত ‘মবি ডিক’ তখনও পড়িনি।

 

জাঁ স্টাইন : আপনি কখনও রহস্যগল্প পড়েছেন?

ফকনার : আমি সেমেননের লেখা পড়েছি। তাঁর লেখা ভালো লাগার কারণ হচ্ছে, তাঁর লেখা পড়লে চেখভের কথা মনে পড়ে যায়। 

 

জাঁ স্টাইন : আপনার প্রিয় চরিত্র কোনগুলো?

ফকনার : আমার প্রিয় চরিত্রদের অন্যতম হলো সারা গাম্প, নিষ্ঠুর, নির্মম এক নারী। মাতাল, সুযোগসন্ধানী, অনির্ভরযোগ্য; তার চরিত্রের বেশিরভাগ অংশই খারাপ; তবে সে তো চরিত্র মাত্র। মিসেস হ্যারিস, ফলস্টাফ, প্রিন্স হল, দোন কিহোতে এবং অবশ্যই সাংকো। লেডি ম্যাকবেথকে আমি সব সময়ই প্রশংসার চোখে দেখি। বোটম, ওফেলিয়া, মারকিউশিয়ো—এরা এবং সারা গাম্প, জীবনের সঙ্গেই তাদের চলাচল। তারা কোনো করুণা চায় না, তাদের মধ্যে হাহুতাশের বিলাপ দেখিনি। হাক ফিন এবং জিম তো অবশ্যই প্রিয়। টম সয়ারকে খুব একটা পছন্দ হয়নি কখনও, সব সময় ভয়াবহ দাম্ভিক। টেনেছি মাউন্টেন এলাকায় ১৮৪০ কিংবা ১৮৫০-এর দিকে জর্জ হ্যারিসের লেখা সুট লাভিংগুডও আমার পছন্দ। তার নিজের সম্পর্কে একটা মরীচিকাময় ধারণা ছিল তার মনে। নিজের মতো চেষ্টা করলেও মাঝে মধ্যে কাপুরুষতা দেখা গেছে তার মধ্যে। তবে সেটা সে জানত এবং সে বিষয়ে তার লজ্জার কিছু ছিল না। নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য অন্য কাউকে দায়ী করত না; ঈশ্বরকে কখনও গালমন্দও করত না সে।

 

জাঁ স্টাইন : উপন্যাসের ভবিষ্যত সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করবেন?

ফকনার : আমি কল্পনায় দেখতে পাই, মানুষ যত দিন উপন্যাস পড়বে ততদিন উপন্যাস লেখা হবে। কিংবা উল্টোটা : উপন্যাস যত দিন লেখা চলবে পাঠকেরা ততদিন পড়বেন। অবশ্য ছবির ম্যাগজিন এবং চটুল রসের হালকা বইপত্র যদি মানুষের পড়ার অভ্যাসকে ক্ষয় করে ফেলে এবং সাহিত্য নিজেই যদি নিয়ান্ডারথাল যুগের গুহায় ছবি আঁকার পর্যায়ে ফিরে যায় তাহলে আলাদা কথা। 

 

জাঁ স্টাইন : সমালোচকদের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

ফকনার : সমালোচকের কথা শোনার মতো সময় তো শিল্পী লেখকের নেই। যারা লেখক হতে চান তারা আলোচনা পড়েন; যারা লিখতে চান তাদের আলোচনা সমালোচনা পড়ার সময় নেই। সমালোচক বলার চেষ্টা করেন, ‘কিলরয় এখানে আগেই এসেছিল।’ তার ভূমিকা শিল্পীর দিকে নয়, শিল্পীকে সংশ্লিষ্ট করে নয়। শিল্পী তার অনেক ওপরে। কারণ শিল্পীর লেখা সমালোচককে নাড়া দেয়; আর সমালোচকের লেখা নাড়া দেয় অন্য সবাইকে, শিল্পীকে নয়।

 

জাঁ স্টাইন : সুতরাং আপনার নিজের লেখা সম্পর্কে অন্যের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না?

ফকনার : না, লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে কথা বলা যায় না। আর লেখার দায়বদ্ধতা হলো আমাকে তুষ্ট করা। লেখা যদি আমাকে খুশি করতে পারে, তাহলে অন্যের সাথে আমার কথা বলার দরকার কী? আর লেখা যদি আমাকে খুশি করতে না পারে তাহলে সেটা সম্পর্কে কারো সাথে আলাপে জড়িয়ে লাভ কী? তাতে তো লেখার মান বাড়বে না। তখন কাজ হলো ওই লেখাটাকে আবার ঝালিয়ে নেয়া। আমি তো কোনো পণ্ডিত নই, আমি লেখক মাত্র। কাজ ছাড়া শুধু কথা বলে কোনো আনন্দ পাই না আমি।

  

জাঁ স্টাইন : সামালোচকদের দাবি, আপনার উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে রক্তের সম্পর্ক।

ফকনার: সেটা তাদের কারো মন্তব্য মাত্র। আর আমি তো একটু আগে বলেছি, আমি সমালোচকদের লেখা পড়ি না। যে ব্যক্তি অন্যদের কথা লেখার চেষ্টা করেন তিনি কাহিনীকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সহায়ক হলে লোকজনের নাকের গঠন নিয়ে কথা বলতে পারেন হয়তো; তবে অপ্রয়োজনে তিনি রক্তের সম্পর্কের প্রতি বেশি উৎসাহী হবেন—সে কথায় আমার সন্দেহ আছে। সত্য ও মানব হৃদয়ের মতো যে বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হতে হবে সে বিষয়ের প্রতি লেখক যদি মনোযোগ দেন তাহলে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার মতো সময় তার থাকার কথা নয়। মানুষের নাকের গঠন কিংবা রক্তের সম্পর্কের মতো ধারণা ও বাস্তবতা নিয়ে সময় ব্যয় করার সুযোগ তো লেখকের থাকে না। আমার মতে, সত্যের সাথে ধারণা ও বাস্তবতার সম্পর্ক খুব নিবিড় নয়।

 

জাঁ স্টাইন : সমালোচকরা বলেন, আপনার চরিত্ররা সচেতনে শুভ অশুভর মধ্য থেকে যে কোনো একটাকে বেছে নিতে পারে না।

ফকনার : জীবন শুভ অশুভর প্রতি উৎসহী নয়। দোন কিহোতে সব সময় শুভ অশুভর মধ্যে একটাকে বাছাই করার চেষ্টা করত এবং তারপর সে স্বপ্নের মধ্যেও এরকম বাছাই করা শুরু করল। সে তো পাগল ছিল। সে বাস্তবে প্রবেশ করত যখন তাকে অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হতো; খুব বেশি ব্যস্ততার কারণে সে শুভ অশুভর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারত না। মানুষের অস্তিত্ব যেহেতু জীবনের মধ্যে, মানুষকে সময় দিতে হয় জীবিত থাকার জন্যই। জীবন হলো চলমানতা; আর যে শক্তি মানুষকে চালিয়ে বেড়ায় চলমানতা সে শক্তির সাথেই সংশ্লিষ্ট। সে শক্তির নাম উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতা, আনন্দ। নৈতিকতাকে যদি মানুষ সময় দিতে চায় তাহলে চলমানতার কাছ থেকে সে সময়টুকু ছিনিয়ে নিতে হয় মানুষকে। আবার সে চলমানতার একটা অংশ মানুষ নিজেও। আগে হোক পরে হোক শুভ অশুভর মাঝ থেকে একটাকে বেছে নিতে হয় তাকে; কারণ নৈতিক বিবেক তার কাছে সেটাই দাবি করে যাতে মানুষ নিজের সাথে আগামিকালও বেঁচে থাকতে পারে। দেবতাদের কাছ থেকে স্বপ্ন দেখার অধিকার পাওয়ার জন্য মানুষ তাদের কাছ থেকে নৈতিক বিবেককে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। দেবতারা মানুষকে এই বিবেক দিয়েছে অভিশাপ হিসেবে।

 

জাঁ স্টাইন : চলমানতার সাথে শিল্পীর সংশ্লিষ্টিতা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলবেন?

ফকনার : চলমানতাই তো জীবন; সব শিল্পীরই উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম উপায়ে চলমানতাকে স্থির অবস্থায় ধরে রাখা যাতে একশো বছর পরে যখন অপরিচিত কেউ এসে এই চলমানতার দিকে তাকাবে তখন সেটা চলা শুরু করে দিবে। কারণ সেটাই তো জীবন। যেহেতু মানুষ মরণশীল, তার পক্ষে একমাত্র অমরত্ব হলো পেছনে কিছু রেখে যাওয়া যেটা সব সময় চলতে থাকবে। লেখকের জন্য এটাই হলো ‘এই তো এখানে আগেই কিলরয় এসেছিল’। এ কথাটা তিনি লিখে যাবেন বিস্মৃতির চুড়ান্ত ও অমোচনীয় দেয়ালের গায়ে; কেননা কোনো এক সময় তাকে এ দেয়ালের ভেতর দিয়েই পার হতে হয়।

 

জাঁ স্টাইন : ম্যালকম কাউলে বলেছেন, আপনার চরিত্ররা তাদের নিয়তির কাছে নত হওয়ার মানসিকতা বয়ে চলে।

ফকনার : এটা তাঁর মতামত। আমি বরং বলব, তাদের কেউ কেউ এমন কথার প্রমাণ হতে পারে; আবার অন্যরা হবে না। অন্য লেখকদের চরিত্রের মতোই তারাও। আমি বলব, ‘লাইট ইন অগাস্ট’-এ লেনা গ্রোভ তো তার নিয়তির সাথে বেশ ভালোই তাল মিলিয়ে চলে। তার অদৃষ্ট অনুযায়ী লুকাস বার্স তার নিজের পুরুষ কি না তাতে তার কিছু যায় আসে না। তার নিয়তি হলো স্বামী সন্তান পাওয়া এবং সে সেটা জানে; আর জানে বলেই সে বাইরে যায় এবং নিয়তির ইচ্ছে মেনে চলে, অন্য কারো সাহায্যও সে চায় না। তার নিজের আত্মার ক্যাপটেন সে নিজেই। তার সবচেয়ে প্রশান্ত এবং সুচিন্তিত কথা শুনতে পাই যখন সে বায়রন বাসকে তাকে ধর্ষণের বেপরোয়া মুহূর্তে নিরত করতেই বলে, তোমার লজ্জা করে না? তুমি তো বাচ্চাটাকে জাগিয়ে ফেলেছিলে! এক মুহূর্তের জন্যও সে দ্বিধান্বিত, ভীত কিংবা সঙ্কিত নয়। সে এমনকি জানেই না, তার করুণা দরকার নেই। তার কথাটা যেমন, এখানে আমি মাসখানেক হলো ঘুরে বেড়াচ্ছি; আমি তো টেনেসিতে পৌঁছেই গেছি; আমার, আমার শরীরটা মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারে।

‘অ্যাজ আই লে ডাইং’-এর বানড্রেন পরিবার তাদের নিয়তির সাথে তাল মিলিয়ে চলে। বাবা তার স্ত্রীকে হারায়; স্বাভাবিকভাবেই তার আরেক স্ত্রী দরকার, পেয়েও যায়। সে পরিবারের রান্নার ভার প্রতিস্থাপন করতে পারে, তাদের বিশ্রামের সময় সবাইকে আনন্দ দেয়ার জন্য একটা গ্রামোফোনও জোগাড় করে। পেটে বাচ্চাধারণকারী মেয়েটা এবারের মতো নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। তবে সে দমে যায় না। আবারো চেষ্টার ইচ্ছে তার, আর এমনকি যদি তারা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ও তবু সেটা আরেকটা শিশু বই আর কিছু তো নয়।  

 

জাঁ স্টাইন : মি. কাউলে বলেন, আপনি বিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সের চরিত্র তৈরি করাটাকে কঠিন মনে করেন। এরকম বয়সীরাই তো সহানুভূতিশীল।

ফকনার : বিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সীরা সহানুভূতিশীল—এ কথা ঠিক নয়। সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষমতা থাকে শিশুর; কিন্তু শিশু জানে না কী করে তেমন হতে হয়। আর যখন তার জানার বয়স হয়ে যায় তখন আর হওয়ার ক্ষমতা থাকে না। মানে চল্লিশের পরে। বিশ থেকে চল্লিশের মাঝে শিশুর কিছু করার বা হওয়ার ইচ্ছ থাকে সবচেয়ে শক্ত এবং বিপজ্জ্নকও। তবে সে জানতে শেখে না তখন। যেহেতু কোনো কিছু করার তার ক্ষমতা চালিত হয় অশুভর প্রণালীর মধ্য দিয়ে, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক চাপের ভেতর দিয়ে, সেহেতু মানুষ নৈতিক হওয়ার আগেই শক্ত থাকে। জগতের মর্মযাতনার কারণ হলো বিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সীরা। আমার বাড়ির আশপাশের লোকেরা যারা বর্ণবাদী দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, মালামসরা এবং ব্যায়ান্টসরা (এমেট টিল খুনের ঘটনায়), কৃষ্ণাঙ্গদের দল যারা একজন শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে প্রতিশোধ নেয়, হিটলাররা, নেপলিয়নরা, লেনিনরা—এরা সবাই মানুষের দুর্ভোগ আর মর্মযাতনার প্রতীক; তাদের সবার বয়স বিশ থেকে চল্লিশ।

 

জাঁ স্টাইন : এমেট টিল খুনের ঘটনার সময় আপনি পত্রিকায় একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন। আপনি কি এখানে আরো কিছু যোগ করতে চান?

ফকনার : না, আর বেশি কিছু বলতে চাই না। আগে যা বলেছি তার খানিকটা পুনরাবৃত্তি করে বলতে চাই, আমরা আমেরিকানরা যদি টিকে থাকতে চাই তাহলে প্রথমত আমাদের আমেরিকান হিসেবে বেঁচে থাকার বিষয়টাকেই বেছে নিতে হবে, নির্বাচন করতে হবে এবং লালন করতে হবে। জগতকে দেখাতে হবে আমাদের সমজাতিক অটুট সম্মুখভাগ; তার মধ্যে থাকতে পারে সাদা, কালো, বেগুনি, নীল সবুজ সব জাতের মিশ্রণ। আমার নিজের এলকা মিসিসিপিতে দুজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গের দ্বারা সংঘটিত একটা কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর ওপরে চাপানো এই দুঃখজনক এবং বিয়োগান্তক ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল হয়তো আমাদেরকে দেখানো, আমরা টিকে থাকতে পারি কি না। কারণ যে কারণে, যে বর্ণের জন্যই হোক না কেনো, যদি আমরা শিশুহত্যার মতো বেপরোয়া সংস্কৃতিতে পৌঁছে গিয়ে থাকি তাহলে আমাদের টিকে থাকার ক্ষমতা নেই; সম্ভবত এক সময় আমাদের ধ্বংস অনিবার্য।

 

জাঁ স্টাইন : আপনার ‘সোলজার্স পে’ এবং ‘সার্টোরিস’-এর মাঝে আপনার কী হয়েছিল? ইয়কনাপাতাওফা গাথা শুরু করতে হলো কেনো?

ফকনার : ‘সোলজার্স পে’ লিখতে গিয়ে দেখলাম, লেখালেখি তো মজার একটা কাজ। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখতে পেলাম, শুধু যে প্রত্যেকটা বইয়ের আলাদা পরিকল্পনা থাকে তা নয়, বরং কোনো শিল্পীর কাজের সমষ্টি বা অর্জনের মধ্যেও ছক বা পরিকল্পনা থাকে। ‘সোলজার্স পে’ এবং ‘মসকিটো’ লেখার সময় শুধু লেখার খাতিরেই লিখেছি; কারণ লেখার কাজ হলো একটা মজার বিষয়। ‘সার্টোরিস’ শুরু করতে গিয়ে দেখলাম, আমার জন্মভূমির ছোট ডাকটিকিটও তো লেখার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে। আরো বুঝতে পারলাম, আমার জন্মভূমিকে ফুরিয়ে যেতে দেয়ার জন্য তো আমি অনেক দিন বেঁচে থাকব না। বুঝলাম, সত্যিটাকে উদ্গতির মাধ্যমে প্রশ্নসাপেক্ষ করে তুলে আমার মেধাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যবহার করার স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণ করে তুলতে চাই আমি। তাতে অন্য লোকেদের স্বর্ণখনির দ্বার খুলে গেল; সুতরাং আমি নিজের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি করলাম। সৃষ্টিকর্তার মতো, আমি এই মানুষগুলোকে শুধু জায়গার পরিসরে নয়, সময়ের পরিসরের মধ্যেও চালাতে পারি। সময়ের মধ্যে আমার চরিত্রদের সফলতার সাথে চালিত করতে পেরেছি, নিদেনপক্ষে আমার অনুমানে—সে কথাটি আমার নিজের ধারণাকেই প্রমাণ করে, সময় হলো একটা তরল অবস্থা; ব্যক্তি মানুষের ক্ষণস্থায়ী অবতার ছাড়া এর কোনো অস্তিত্ব নেই। ‘ছিল’ বলে কোনো কথা নেই; শুধু ‘আছে’ কথার অস্তিত্ব আছে। ‘ছিল’ কথাটার অস্তিত্ব যদি থাকত তাহলে কোনো দুঃখ থাকত না। আমার সৃষ্ট জগত সম্পর্কে ভাবতে গেলে মনে হয়, এটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝে একটা কেন্দ্র। কেন্দ্র যতই ছোট হোক না কেনো, এটাকে সরিয়ে নিলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও ধ্বসে পড়বে। আমার শেষ বইটা হবে ইয়কনাপাতাওফা কাউন্টির কেয়ামতি কেতাব, দ্য গোল্ডেন বুক। তারপর আমি পেন্সিল ভেঙে ফেলব এবং আমাকে থামতে হবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ