খুঁজতে খুঁজতে এতদূর...|| জহর সেনমজুমদার

Send
.
প্রকাশিত : ০৮:০০, মে ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, মে ০৮, ২০১৯

বারবার

 

আজ একটা আশাগাছ চাই; তুমি দেবে? আজ একটা স্বপ্নগাছ চাই; তুমি দেবে?

বহু শতাব্দী আগে, বহু বহু শতাব্দী আগে, একবার আমাদের বৃদ্ধ পিতামহ

ধু-ধু ধানখেতে একটা আশ্চর্য আশাগাছ লাগিয়ে দিয়েছিল

কিন্তু একটাও ফুল আসেনি; একটাও না

বহু শতাব্দী পরে, বহু বহু শতাব্দী পরে, একবার আমাদের অফুরন্ত বাবা

উঠোনের একপাশে একটা আশ্চর্য স্বপ্নগাছ নিঃশব্দে পুঁতে দিয়েছিল

কিন্তু তাতেও কোনোদিন ফল ধরেনি; একটাও ফল ধরেনি

আমরা এখনও বিমূঢ়; আমরা এখনও বিভ্রান্ত

বারবার উঠোন থেকে ধানখেতে যাই; ধানখেত থেকে পুনরায় উঠোনে ফিরে আসি

কুঁড়েঘরের ভেতর হাজার হাজার বছর মায়ের শবদেহ চুপচাপ পড়ে থাকে

আশাগাছ পেলেই মা আবার উঠে দাঁড়াবে; স্বপ্নগাছ পেলেই মা আবার

রান্না করতে করতে শাপলা-শালুকের চুমু আমাদের ভেতর ভাগ করে দেবে

আজ একটা আশাগাছ চাই; তুমি দেবে? আজ একটা স্বপ্নগাছ চাই; তুমি দেবে?

 

খুঁজতে খুঁজতে এতদূর...

অরুণ মিত্রের একটা কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল—খুঁজতে খুঁজতে এতদূর; আজ এতদিন পর, লিখতে লিখতে এতদূর এসে, দিন যায় সন্ধ্যা হয়, পেছনের দিকে বারবার ফিরে ফিরে দেখি—কত স্মৃতি কত স্বপ্ন, যেন ধুলোচাপা খড়কুটোর মতো, নীরব নিঃশব্দ, পড়ে আছে; একটু ঝুঁকে ধুলোর আস্তরণ সরালেই, একটা দুটো স্মৃতি একটা দুটো স্বপ্ন, বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো যেন চমকে চমকে ওঠে; সেই বৈদ্যুতিক চমকে ছিঁড়ে খুঁড়ে যায় ভেতরের জগৎ; এই গদ্য হয়তো সেই বৈদ্যুতিক চমকের, হয়তো সেই স্মৃতির, হয়তো সেই স্বপ্নের, হয়তো কিছুই নয়, এই গদ্য শুধু ধুলোচাপা দু-একটা খড়কুটোর চকিত মোচড়...

 

এক

আজ মনে পড়ে যায় সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামটির কথা, বাদুড়িয়া থানার অন্তর্গত আমাদের সেই রাস্তার ধারের বাড়িটির কথা, বাড়ি বাড়ি, বরিশাল থেকে চলে আসবার পর বাবার তৈরি বাড়ি, আমাদের শান্তশিষ্ট বাড়ি; আর বাড়ির সঙ্গেই লাগোয়া আমাদের পুকুর, আমাদের নানাবিধ গাছপালা সমাহিত চারপাশের বাগান; ছোটোবেলা থেকেই দেখতাম বাবার দুটো নেশা—মাছধরা আর বাগান করা; রোগীর বাড়ি গিয়ে রোগী দেখতে দেখতে বাবা নানা সময় তাদের কাছ থেকেই নানাধরনের ছোটো ছোটো চারাগাছ নিয়ে আসত; তারপর কাউকে না কাউকে ডেকে বাবা সেইসব শিশুদের নিজের মনোমত জায়গা বেছে প্রবল উৎসাহে বসিয়ে দিত; অল্প জমি, কিন্তু প্রচুর গাছ, এভাবেই বাগানে আম জাম কাঁঠালগাছ এলো; এভাবেই বাগানে নারকেল সুপারি পেয়ারাগাছ এলো; এভাবেই লেবুগাছ ডালিমগাছ সজনেগাছ এখানে ওখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল; এলো না শুধু শুধু লিচুগাছ; বাবা অবশ্য অনেক চেষ্টা করেছিল; বেশ মনে আছে, একবার দু’বার নয়, অন্তত আট ন’বার তো হবেই, বাবা লিচুগাছের চারা প্রায় বুকে চেপে বাড়ি এনে প্রথমেই মা-কে ডাক দিত:

—ওগো শুনছো

—একটু এসো

—এই দ্যাখো, একটা চারা এনেছি

—লিচুগাছের চারা

—এবার ঠিক হবেই

এখনও যেন, সম্মোহিত, স্তরীভূত, ভিতর বাহিরের নীরব গোধূলির ভেতর, প্রায় স্পষ্ট শুনতে পাই বাবার সেই আকুলব্যাকুল গলা—ওগো শুনছো ওগো শুনছো ওগো শুনছো; এখনও, এখনও, এই অন্ধকার আবহমানে, একার নির্জনতায় দাঁড়িয়ে, মনে হয়, যেন শুনতে পাই মায়ের সেই অর্ধস্ফুট প্রত্যুত্তর;

—লিচুগাছের চারা?

—আবার আনলে?

—ও গাছ বাঁচবে না

—ও গাছ দাঁড়াবে না

বলার অপেক্ষা রাখে না—এত যত্ন, এত প্রেম, এত পরিচর্যা সত্ত্বেও আমাদের বাড়ির বাগানে লিচুগাছ কিন্তু সত্যিই একবারও বাঁচেনি; সত্যিই একবারও ঠিকমতো দাঁড়ায়নি; আমিও ঠিক বুঝতাম না কেন ও কী কারণে এমনটা হচ্ছে; সব গাছ হয়— তাহলে লিচু গাছই বা হবে না কেনো? এও মনে পড়ে, আমার খুব রাগ হত তখন; বাগানের মাটির ওপর আর লিচুচারার ওপর; যেখানে সেখানে হচ্ছে, যার তার বাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ছে—শুধু আমাদের বাড়িতে আসতেই ওর যত ওজর আপত্তি বায়নাক্কা; ও বোঝে না বাবা ওকে কী ব্যাকুলভাবেই না চায়! ও বোঝে না মা ওর মৃত্যু দেখলে ভীষণ ভীষণ দুঃখ পায়! গ্রামের অনেক বাড়িতেই, এখানে ওখানে, লিচুগাছ কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল; নীহার সান্ন্যালদের বাড়ির লিচুগাছটির দিকে মাঝে মধ্যেই সাইকেল চালিয়ে চলে যেতাম; সাইকেলটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে রেখে চুপচাপ চেয়ে দেখতাম গাছটাকে; ছোটো ছোটো লিচু ফলগুলো আস্তে আস্তে লালচে হয়ে ঝুলে থাকত চোখের সামনে; ভেতরে ভেতরে অভিমান মিশ্রিত কেমন যেন একটা হিংস্রভাব জেগে উঠত; ইচ্ছে হত দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে-চুরে দিই গাছটাকে; কিন্তু পারতাম না, ফিরে আসতাম, আস্তে আস্তে ফিরে আসতাম, কিন্তু ভেতরের ওই অভিমান, ভেতরের ওই হিংস্রভাব, ছাইচাপা আগুনের মতো থেকেই গিয়েছিল; মনে আছে একদিন বাবার এক রোগী বাবার জন্য আবার একটা লিচুগাছের চারা আমাদের বাড়ি নিয়ে এসেছিল; বাবা তখন বাড়ি ছিল না—মা যখন চারাগাছটা নিয়ে পুকুরঘাটের একপাশে খুব যত্ন করে রেখে দিচ্ছে, তখন হঠাৎ কী হল, ভেতরের সেই হিংস্রভাব, হুড়মুড় করে যেন বুক ফেটে বার হয়ে এলো; মা-র সামনেই রাগে ক্ষোভে দুঃখে তখন বকবক করতে শুরু করলাম গজগজ শুরু করলাম...কি দরকার লিচুগাছের? লিচুগাছ ছাড়া কি কোনো বাগান হয় না? যত্তসব...বাবার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই...বারবার মরে যাচ্ছে...তবু জোর করে মাটিতে বসাতেই হবে...একটা সামান্য লিচুগাছের জন্য বাবার যে কেনো এত মাথাব্যথা কেনো এত গরজ কে জানে...শুধু শুধু গাছটাকে নিয়ে অকারণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবার কী যে দরকার কে জানে...আমার এই হতাশা আর বিরক্তি মা কেবল চুপচাপ লক্ষ করত...খুব একটা কিছু বলত না...। সেইদিন, সেই প্রায় বৈকালিক আলোহীনতায়, চারাগাছটাকে পুকুরঘাটের পাশে রেখে, তার ওপর অল্প অল্প জল ছেটাতে ছেটাতে, সেইদিন, শুধু সেইদিন, আকস্মিক, মা কেমন যেন আত্মমগ্ন বিষাদগ্রস্ততার ভেতর থেকে আমার দিকে একসঙ্গে অনেকগুলো কথাসমবায় যেন ভাসিয়ে দিল; দূরাগত সেই ভাসমান শব্দতরঙ্গ আমার কাছেই দ্রুত চলে এলো আশ্চর্য প্রক্রিয়ায়; আমি শুনলাম মা বলছে:

—ওরে পাগলা ওরে হতচ্ছাড়া, ওটা লিচুগাছ নয়

—আশাগাছ

—আশাগাছ

—তোর বাবার আশাগাছ

—তোর মার আশাগাছ

—আমাদের সবাইয়ের আশাগাছ

শুনতে শুনতে, কেমন যেন আশ্চর্য শিহরণে, চমকে উঠলাম; এ কী বলছে মা? ওটা লিচুগাছ নয়? আশাগাছ? আজ পর্যন্ত কতরকমের গাছের কথাই তো শুনেছি...বাবলাগাছ, ছাতিমগাছ, আমগাছ, জামগাছ...কত কী; কিন্তু আশাগাছ? এমন কোনো গাছের কথা, কই, কোনোদিন তো শুনিনি; কেউ তো বলেওনি; কীরকম দেখতে সেই গাছ? কীরকম ফল ফুল হয় সেই গাছে? রঙটাই বা কেমন? ভেবেও কোনো কুলকিনারা পাচ্ছি না; এমনকি কল্পনাতেও তেমন কোনো গাছের ছবিপ্রতিচ্ছবি বিন্দুমাত্র দেখতে পাচ্ছি না; সত্যিই কি তাহলে এমন কোনো গাছ কোথাও হয়? হতে পারে? সেই উড়ন্ত বালকস্বভাবধর্মে, সেই অল্পবয়সের অবুঝ স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনায়, ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারিনি—এমন গাছও হয়, এমন গাছও কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই ঘনীভূত আছে; অন্যসব গাছের মতো শুধু একে চর্মচক্ষে হয়তো দেখা যায় না—কিন্তু আছে; অবশ্যই আছে; সেইসময় নয়, তার অনেক অনেক পরে বুঝেছি, আমাদের সকলেরই এই জীবন, নশ্বর ও ক্ষণিক জীবন, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, একটা না-দেখা আশাগাছেই চিরকাল ঝুলে আছে...মা শুধু বাবার সেই লিচু গাছের মধ্যে দিয়ে হয়তো তারই সামান্য ইঙ্গিত রেখে গিয়েছিল...তা নয়তো আজ এতদিনপরে এতকাল পরে আমিই বা কেন একটানা মনে মনে বিড়বিড় করে চলেছি...আশাগাছ আশাগাছ আশাগাছ...

 

দুই

আসলে চলমান জীবন মানেই তো একটা বৃহৎ ও সুপ্ত স্মৃতির ভাণ্ডার; স্মৃতি ছাড়া, স্মৃতির ভেতর অবগাহন ছাড়া, জীবনের আসল কোনো অর্থই হয় না; আশাগাছ তেমনই একটা স্মৃতি; অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সমন্বিত ভাবসংহত স্মৃতি; জীবন যত এগোয় আর এগোতে এগোতে পরিবর্ধিত হয়, এই স্মৃতি ততই ক্রমে ক্রমে অনতিক্রমণীয় হয়ে ওঠে; তাই নয় কি? তা নয়তো কেনো আমি ভেতরে ভেতরে একটা বাল্যবেলার আশাগাছ বহন করতে করতে হঠাৎ আরো একটা স্বপ্নগাছের কাছে এসে দাঁড়াব? এও তো সত্য—আশা গাছ আমি চোখে দেখিনি, স্বপ্নগাছও নয়; ঘটনাটা একটু খুলে বলা দরকার; তখন আমি গ্রাম ছেড়ে এই শুষ্ক শহরের নাগরিকতায় চলে এসেছি; গ্রামে থাকাকালীন মা-র কাছে থেকেই প্রথম আশাগাছের কথা শুনেছিলাম; আর এই শুষ্ক নাগরিকতায় আসবার পর প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর কাছ থেকে প্রথম জানলাম এক অফুরন্ত স্বপ্নগাছের কথা; সত্যি বলতে মা যে-সময় আশাগাছ বলেছিল, তখন হয়তো আমার ভালো করে চক্ষু ফোটেনি; কিন্তু প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কাছ থেকে যখন প্রথম স্বপ্নগাছের কথা শুনলাম—কেঁপে উঠেছিল স্নায়ুতন্ত্রী ভিতরবাহির; বুঝলাম, এইবার চক্ষু ফুটল...একুশ বাইশ বছরের আমি, সেই প্রথম জীবনের যাপনের ভয়াবহ ঘ্রাণ অনুভব করলাম...

 

তিন

এই একুশ বাইশ বছর বয়সেই প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ; খুব দ্রুত, অতি দ্রুত, তাঁর সঙ্গে আমার একটা নিবিড় আত্মিক বা মানসিক সংযোগ গড়ে উঠেছিল; প্রায়শ; ভোরের দিকে, রিকশা চেপে, প্রণবেন্দুদা আসতেন এবং দীর্ঘসময় থাকতেন; আমিও যেতাম, প্রথম প্রথম একটা নির্দিষ্ট সময়ে, পরে যে-কোনো সময়ে; হঠাৎ আকস্মিক; তার পর? শুধু গল্প আর গল্প; যেন—‘গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল’; মুগ্ধ, অভিভূত, শুনতাম দেশ বিদেশের কবিতার কথা, দেশ কাল সমাজের কথা, নদী আর বহুব্যাপ্ত সমুদ্রের কথা; বলতে বলতে নস্যলাঞ্ছিত প্রণবেন্দুদা আমার তখনকার মানসপরিক্রমায় একটু একটু করে যেন ধরিয়ে দিতেন লণ্ঠন প্রমাণ আলো; আর আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি, তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী; এমনই এক ভাবতন্ময়তা ছিল সেই গল্পের, সেই আলোচনার, আবার অনেক সময় এও হয়েছে—দুজনেই বসে আছি দীর্ঘসময়, কিন্তু একটাও কথা নেই, একটাও শব্দ নেই, দুজনেই যেন আত্মসমাহিত; মনে আছে একবার প্রায় বিকেলের দিকে, প্রণবেন্দুদার বাড়ি গেছি, ভেতরে ঢুকে দেখলাম, প্রণবেন্দুদা বাঁদিকের ছোটো ঘরটার জানলার সামনে দাঁড়িয়ে; আমি নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ালাম, প্রণবেন্দুদা বাইরের দিকে তাকিয়ে সামনের একটা গাছ দেখছেন তো দেখছেনই; আমি গিয়ে দাঁড়াবার পরেও তাঁর মধ্যে কোনো ভাব ভাবান্তর নেই—মনে হল, ওইখানে যেন আমিও নেই, প্রণবেন্দুদাও নেই; আমি কিছুসময় অপেক্ষা করে বসার ঘরে চলে এলাম, সামনের ছোটো টেবিলের ওপর রাখা পত্রপত্রিকা বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলাম, দু’বার চা খেলাম, কিন্তু প্রণবেন্দুদা ওইঘর থেকে একবারও এলেন না; প্রণবেন্দুদার প্রিয় অনুগত কুকুরটা বেশ কয়েকবার প্রণবেন্দুদার দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করল—শেষ পর্যন্ত প্রণবেন্দুদার মগ্নতার কাছে সেও হার মানল; একসময় আমি আবার উঠে গিয়ে প্রণবেন্দুদার নিকটস্থ হলাম; প্রণবেন্দুদা তখনও গাছটার দিকে তাকিয়ে নিষ্কম্প, নির্বাক; বাইরের গাছটা কিন্তু অপরিচিত কোনো গাছ ছিল না; তবুও প্রণবেন্দুদা এইভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছেন কেনো? কী দেখছেন তিনি? আর দেখবার মতো আছেই বা কি? শেষ পর্যন্ত প্রশ্নব্যাকুল ও প্রশ্নবিভ্রান্ত আমি আর চুপ থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম:

—গাছটার দিকে ওইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন প্রণবেন্দুদা?

—গাছটার মধ্যে কী দেখছেন আপনি?

—গাছটার মধ্যে কী আছে দেখবার মতো?

—আমিও একটু দেখতে চাই যে

সে এক দীর্ঘ স্তব্ধতা—অনন্ত অনন্তকালের স্তব্ধতা—পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে যেমন হয় আর কি; বহুক্ষণ বহুক্ষণ পর শুনলাম প্রণবেন্দুদার গলা; তিনি, খুব আস্তে খুব ধীরে বললেন—ওই গাছটা সাধারণ কোনো গাছ নয়রে, একটা বৃহৎ ও বিশাল স্বপ্নগাছ, একটা আমূল সমর্পিত স্বপ্নগাছ; আমিও যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ, স্তব্ধ, ঘোর লাগা আচ্ছন্নতায় অবশ; স্বপ্নগাছ? ভারি অদ্ভুত তো; শোনা যায় না, যেন ঠিক এমনই আত্মমগ্নতায় প্রণবেন্দুদা আবার বললেন, যেন গোপন কথা শোনাচ্ছেন, যেন ভেতরটা উজাড় হয়ে যাচ্ছে—এমনভাবেই বললেন—স্বপ্নগাছ দেখতে না পেলে কবিতা লেখা যায় না রে; আমরা তো স্বপ্নগাছ ধরবার জন্যই কবিতা লিখি... তাই না? তুইও একদিন দেখতে পাবি, ঠিক দেখতে পাবি...আমি শুনতে শুনতে প্রণবেন্দুদার দিকে তাকিয়ে ছিলাম...কিচ্ছু বলিনি...এর পর সত্যি কি কিছু বলা যায়? বলা সম্ভব? মনে আছে, প্রণবেন্দুদার এই আশ্চর্য স্বপ্নগাছের কথা আমি সে-সময় দুজনকে বলেওছিলাম—অভী সেনগুপ্ত ও শামসের আনোয়ার, প্রণবেন্দুদার সঙ্গে ষাটের এই দুই কবির একটা গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক ছিল; শুনেই অভীদা বলেছিল—প্রণবেন্দুদা খুব বড়ো কবি; ওর মতো স্বপ্নাচ্ছন্ন কবি ছাড়া একথা কে বলবে? আর শামসের বলেছিল—প্রণবেন্দুদার স্বপ্নগাছ হয়তো আছে... আমাদের কিছু নেইরে...তবুও একথা আনুপূর্বিক সত্য, সেদিন প্রণবেন্দুদার বাড়ি থেকে যখন ফিরছিলাম একা, হেঁটে, তখন বারবার চারপাশের গাছগুলোর দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল; দেখবার চেষ্টা করছিলাম ওর মধ্যে কোনটা স্বপ্নগাছ; বুঝবার চেষ্টা করছিলাম স্বপ্নগাছের বাস্তব রূপ স্বরূপ লৌকিক অলৌকিক; কিন্তু সেই যাই হোক—সেদিন কিন্তু সে যাই হোক—সেদিন কিন্তু বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমি নিজের ভেতরে ভেতরে একটা নীরব নিঃশব্দ স্বপ্নগাছ বহন করে এনেছিলাম...

 

চার

একটা আশাগাছ আর একটা স্বপ্নগাছ; একটা মা দিয়েছিল আর একটা প্রণবেন্দুদা; একটা গ্রামে, একটা শহরে; আজ এতদিন পরেও, জীবনেবাস্তবে, পারিপার্শ্বিক, বারবার চারিপাশে তাকাই আমি; কোথায় সেই আশাগাছ? কোথায় সেই স্বপ্নগাছ? গ্রামে মা-র কাছ থেকে আশাগাছের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা পাইনি; শহরে প্রণবেন্দুদার কাছ থেকেও স্বপ্নগাছের কোনো নির্ধারিত ঠিকানা পাইনি; আজ মা-ও নেই, প্রণবেন্দুদাও নেই; মাঝেমাঝেই মনে হয়, সন্দেহ জাগে, তাহলে কি পৃথিবীর কোথাও ওদেরই মতো এই গাছদুটোরও বাস্তবিক কোনো অস্তিত্ব নেই? আশাগাছ তাহলে একটা কল্পনা? স্বপ্নগাছ তাহলে একটা বায়বীয় রোমান্টিকতা? খুঁজতে খুঁজতে এতদূর এসে, লিখতে লিখতে এতদূর এসে, অন্ধকার আবছায়ায় নানাবিধ সন্দেহ আর দোলাচলতার ভেতর নিজস্ব আত্মপরিক্রমার যুদ্ধ অব্যাহত রেখে, আমি কিন্তু আশাগাছ আর স্বপ্নগাছ দেখবার জন্য ছটফট করি, ক্রমাগত ছটফট করি, আজও আজও আজও; আর সেই উন্মুখ ব্যাকুলতার অভ্যন্তরীণ কামড় থেকেই বারবার আমি আমার মনের ভেতর একটার পর একটা আশাগাছ আর স্বপ্নগাছের অদৃশ্য বীজ রোপণ করি; কারণ এতদিনে আমিও তো বুঝে গিয়েছি আশাগাছ আর স্বপ্নগাছ আসলে মানুষের মনের নিভৃত নীরবতার ভেতরেই জন্ম নেয়—জন্মায়; এভাবেই মনের ভেতরে আমিও একটার পর একটা প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় আশাগাছ আর স্বপ্নগাছের জন্ম দিতে দিতে, বারবার, জনচলাচলের ভেতর, জনচৈতন্যের ভেতর, তীব্র ও বেদনাধিক বিস্ফার নিয়ে পাগলের মতো এসে দাঁড়াই; মনে মনে জনচলাচল আর জনচৈতন্যের মানুষদের চুপিসারে হাত নেড়ে ডাকি, আস্তে আস্তে বলি:

—নষ্টভ্রষ্ট সময়ের ভেতর ক্লান্ত লাগছে?

—নষ্টভ্রষ্ট সমাজের ভেতর বিধ্বস্ত লাগছে?

—নষ্টভ্রষ্ট বাস্তবের ভেতর বিবমিষা লাগছে?

—আপোষ চাইছো না?

—বাঁচতে চাইছো না?

—এই নাও, আশাগাছ নাও

—এই নাও, স্বপ্নগাছ নাও

নীরবে, নিঃশব্দে, বহুবিধ অপচয়ের ভেতর, বহুবিধ রাজনৈতিক দূষণের ভেতর, লাঞ্ছনা আর অপমানের ভেতর, চারদিকে যখন শুধু কর্তৃত্ব আর আস্ফালন, চারদিকে যখন শুধু ক্ষমতা আর চূড়ান্ত চোরাগোপ্তা আধিপত্যবাদ, তখন তার ভেতরে দাঁড়িয়ে এইভাবে কাকে ডাকছি আমি? কাদের ডাকছি আমি! ক্রমে ক্রমে এও বুঝতে পারি—গোটা দেশ কাল সমাজই আক্রান্ত আখ্যানের আর্তনাদে ভরে গেছে; ক্রমে ক্রমে এও বুঝতে পারি—যাকে ডাকছি আমি, যাদের ডাকছি আমি—কে সে? সেও তো আমিই; এই যে দূষণ আর প্রহসনের ভেতর যে-সত্তা ক্লান্ত হয়ে গেছে, যে-সত্তা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, যে-সত্তা আপোশ আর পাপোশের পরিবর্তে আত্মহত্যা করতে উন্মুখ ও উদগ্রীব হয়ে উঠেছে—সে তো অন্য কেউ নয়—আমি আমি আমি; জীবনানন্দ সেই যে দুটো লাইন বলেছিলেন। ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ’ এবং ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’—সেই ভয়াবহ আঁধার আর ভয়ংকর অসুখ, আমারও মাথার ভেতর সংক্রমিত হয়; কী করে উদ্ধার পাব এই আঁধার থেকে? কী করে উদ্ধার পাব এই অসুখ থেকে? চারপাশের কোথাও এখনও স্পষ্টভাবে কোনো আশাগাছ দেখতে পাচ্ছি না, স্বপ্নগাছও অবলোকিত নয়; তবুও এই অন্ধকারে, এই অসুখে, এই ব্যর্থতায়, এই প্রহসনে, এই নিষ্ক্রিয় নিস্তেজ অবক্ষয়ে আমি শুধু আস্তে আস্তে নিজেকে ডাকি, তার পাশে বসি, মাথায় হৃদয়ে হাত বুলোই, তারপর চুপিসারে গভীর মগ্নতায় একই কথা একটানা বলি:

—আপোষ চাইছো না?

—বাঁচতে চাইছো না?

—এই নাও, আশাগাছ নাও

—এই নাও, স্বপ্নগাছ নাও

ক্রমে বুঝে যাই—এই কথা, এই বাক্য, শুধু আমি বলছি না; আমার পেছন থেকে মা বলছে; আমার পেছন থেকে প্রণবেন্দুদা বলছে; আমার পেছন থেকে হাজার হাজার কোটি কোটি ভ্রাম্যমাণ আবহমান মানবাত্মা বলছে; ক্রমে এও বুঝি—যতদিন মানুষের আশা থাকবে, জীবনসংক্রান্ত আশা—যতদিন মানুষের স্বপ্ন থাকবে, জীবনসংক্রান্ত স্বপ্ন—ততদিন প্রতিমুহূর্তে একটার পর একটা আশাগাছ একটার পর একটা স্বপ্নগাছ আমরা দেখতে না পেলেও আমাদের পেছনের অন্ধকারে ঠিক দাঁড়িয়ে থাকবে...

//জেডএস//

লাইভ

টপ