গলি || ইনতিযার হুসেইন

Send
মূল উর্দু থেকে অনুবাদ : জাভেদ হুসেন
প্রকাশিত : ০৮:০০, মে ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, মে ০৯, ২০১৯

ইনতিযার হুসেইন উর্দু ভাষার অন্যতম কথাসাহিত্যিক। তিনি ১৯২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের বুলন্দশহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে লাহোর চলে যেতে হয়। তিনি মিরাট কলেজ থেকে উর্দুতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। উর্দুতে লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা। ইংরেজিতে পত্রিকার কলামও লিখেছেন। ২০১৩ সালে ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। অনেকে তাকে মান্টোর পর প্রভাবশালী উর্দু ছোটগল্প লেখক বলে গণ্য করেন। তার পাঁচটি উপন্যাস হচ্ছে—চাঁদ গেহেন (১৯৫২), দিন অওর দাসতান (১৯৫৯), বসতি (১৯৮০), তাযকিরা (১৯৮৭), আগে সমন্দর হ্যায় (১৯৯৫)।

গলির মুখে পৌঁছে সে কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যেত। থেমে তার বিশেষ ভঙ্গিতে গেয়ে উঠতো:

মোহাম্মদের কলমা পড়ো

বেসন হালুয়া খরিদ করো

শোনো মুসলমান কোনো ভয় নাই

নবী শাফায়াতের কাণ্ডারি 

মোহাম্মদের কলমা পড়ো

বেসন হালুয়া খরিদ করো

ডাক্তার দিলো সার্টিফিকেট

এই হালুয়া বেসনের...  

তার এই আধ-খ্যাচরা গীতিকাব্যের শাব্দিক অর্থ আর কাব্যমূল্য নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু এর অর্থের প্রভাব ছিল অতুলনীয়। যদিও একেক বাচ্চা এই গান শুনে একেক রকম কাণ্ড ঘটাতো, কিন্তু লক্ষ্য তাদের এক। কোনো রকমে মায়ের কাছ থেকে এক পয়সা আদায় করে নিজের পরকালের নাজাতের বন্দোবস্ত করা। আর বিভিন্ন মা বাচ্চাদের বিভিন্ন কাণ্ড সামলানোর জন্য বিভিন্ন রকম কায়দা ব্যবহার করতো। তবে আগে পরে তাদের বাচ্চাদের দাবির কাছে হার মানতে হতো।

বুন্দার মা তো বুন্দাকে প্রথমে আদর করে বোঝানোর চেষ্টা করতেন—বুন্দা, আমার কথা শোন্, এ কি খাওয়ার জিনিষ হলো! আর পয়সা নষ্ট করতে হলে বল্, আমি পয়সা ফেলে দিয়ে আসি। কিন্তু বুন্দা তার দাবিতে অনড়। মা রেগে বুন্দার পিঠে দমাদম কয়েকটা থাপড় কসতেন। বুন্দার মনে হতো ওর মা যেন গোফওয়াল লম্বা কোনো দারোগা আর জীবন মানেই লাঠিচার্জ। এখন মায়ের দাবি পূরণে অস্বীকৃতি আর বুন্দার সংগ্রামের ফল শেষ পর্যন্ত একই হতো। দেখা যেত বুন্দা চোখ মুছতে মুছতে হাসিমুখে দৌড়ে বাড়ির বাইরে এসে চিৎকার করতো—এক পয়সার হালুয়া আমাকেও!

কুন্দনের মা অনেক মেধাবি আর দুরদর্শি। যেই কুন্দন ঘ্যানঘ্যান শুরু করলো, উনিও বলে উঠতেন—রাতদিন শুধু টইটই করে ঘুরে বেড়াস। আজ আসুক তোর বাপ, দেখিস তোর কী অবস্থা করি। নিজে তো বাইরে বাইরে কাটায় আর এই যন্ত্রণা আমার সামলাতে হয়। কত করে বলি এই হতভাগাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে এসো। কে শোনে আমার কথা! এই সমস্ত গভীর সমস্যা নিয়ে আলোচনা অসন্তোষ প্রকাশের পর, সাফল্য শেষপর্যন্ত কুন্দনের পদচুম্বন করতো।

মাসুদের মায়ের ব্যক্তিত্ব ছিলো গম্ভীর ধরনের। তার চলনে এক ধীরতা আর আচরণে আভিজাত্য ছিলো। এই মা ছেলের বুর্জোয়া মানসিকতা তো এই এক কথা থেকেও বোঝা যায় যে, মাসুদ তার মাকে 'আম্মিজি'র মতো কেতাদুরস্ত শব্দে ডাকতো। সারা গলিতে যখন হালুয়া নিয়ে কোলাহল, একেক বাড়ির দরজা খোলা আর বন্ধের শব্দ শোনা যাচ্ছে, তখন মাসুদের অতি সুশিক্ষিত আচরণের মধ্যেও এক অস্থিরতা তৈরি হতো। সে খুব হিসেব করে পা ফেলে কিছুটা দ্বিধা মেশানো গলায় বলতো—আম্মিজি, হালুয়া খাবো। সে কথা শুনে আম্মিজির মনে হতো কেউ তার সামনে কোনো ভয়ানক অসম্মানজনক কথা বলে ফেলেছে। তিনি তার স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর, অভিজাত ধীর লয়ে মাসুদের দিকে তাকিয়ে বলতেন— ভালো ছেলেরা কখনও এমন কথা বলে, তওবা করো! মাসুদ তার অপরাধে খুব লজ্জা পেতো। অন্তর থেকে তওবাও করতো। এতকিছুর পরেও যখন থালায় এক আনা ঝন করে পড়তো, সবাই বুঝে যেতো যে মাসুদও এসে পড়েছে। তবে এই কথাও ঠিক যে মাসুদ কখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে হালুয়ার পাতা চাটেনি। সে হালুয়া কিনে ঘরে ঢুকে যেত।  

সেই হিসেবে অবশ্য বাজ্জির আপার আচরণও ছিলো বুর্জোয়া ধরনের। কিন্তু বাজ্জি এমন বেয়াড়া! সে কখনো এর কেয়ার করতো না। বেসনের হালুয়ার শব্দ তার প্রাণে মনে এক অপ্রতিরোধ্য অস্থিরতা পয়দা করে দিতো—আপাজান হালুয়া, আপাজান হালুয়া! আর আপাজান তার এতো যত্নে দেয়া শিক্ষা এমন করে জলে ভাসতে দেখে ঝনঝন করে উঠতো। বকা দিয়ে বলে উঠতো—ভদ্রঘরের কেউ কখনো এসব বাজে জিনিস খায়! কিন্তু সুপরামর্শের সঙ্গে তো বাজ্জির চিরকালের শত্রুতা। সে কবে এসব শুনেছে? শেষপর্যন্ত বাজ্জির অটল মনোবলের কাছে আপাজান হাতিয়ার নামিয়ে রাখতে বাধ্য হতো।

চুন্নুকে নষ্ট করেছে তার দাদিমা। নয়তো ওর বোনের দাবি, সে তো চুন্নুকে দুই দিনে সোজা করতে পারে। কিন্তু চুন্নু তার আপাকে কবে পাত্তা দিয়েছে! সে সরাসরি তার দাদিমার কাছে আবেদন পেশ করতো। সামান্য আপত্তি করে নিজের থলে থেকে এক আনা বের করে নাতির হাতে দিতেন দাদিমা। চুন্নু তো এতো সহজে মানবার মতো ভালো মানুষ না। ও এক পয়সার হালুয়া কিনে নিমেষে সাবার করে আবার পয়সার জন্য দাদিমার পেছনে ঘ্যানঘ্যান শুরু করে দিতো। দাদিমা প্রথমে রাগের ভান করতেন। তারপর চুন্নুর চোখে মিছে জল দেখে তার মন খারাপ হয়ে যেত। আবার তার হাত চলে যেত থলের ভেতর। পয়সা বের হতো। এবার আপাজানের আর মেজাজ ঠিক থাকতো না। শেষে উনি বলে উঠতেন— ‘হায় খোদা! পয়সা দিয়ে দিয়ে এমনি করে বাচ্চাদের স্বভাব খারাপ করে কেউ! এ কোনো কথা হলো!’ এরপর আপাজান আর দাদিমার মধ্যে এমন যুদ্ধ শুরু যে, সারা ঘর মাথায় উঠতো। কিন্তু চুন্নু ততক্ষণে আবার হালুয়াওয়ালার কাছে!

এইসব অর্থনৈতিক আর সামাজিক বিপ্লব নিয়ে হালুয়াওয়ালা নির্বিকার। সে তার একঘেয়ে গলায় তখনো সুর তুলে যায়:

মোহাম্মদের কলমা পড়ো

বেসন হালুয়া খরিদ করো

কে হালুয়া কিনতে এলো কে এলো না—এসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। কোনো কোনো দিন তো মায়ের কাছ হতে পয়সা আদায় করতে বুন্দার সময় লেগে যেত। কিন্তু সে ভাবতোও না যে আজ বুন্দা কেনো এলো না? সে কারো আসার জন্য অপেক্ষা করতো না, কারো না আসাতেও দূর্ভাবনা করতো না। সে ঠিক সময় মতো আসতো, ঠিক সময় পর্যন্ত থাকতো আর ঠিক সময়ে চলে যেত। অনেকে তাকে নিয়ে ভালো-মন্দ বলতো। এ নিয়েও কোনো মাথাব্যথা ছিলো না তার।

এরপর সব দোষ গিয়ে পড়তো হালুয়াওয়ালার ওপর। মাঝে মাঝে বাজ্জির আপাজানও আলোচনায় শামিল হয়ে বলতো— ‘ভাই, এর এখানে ঢোকা বন্ধ করা উচিত। আর এখানের পুরুষগুলোও আশ্চর্য লোক! সব বাচ্চার অভ্যাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।’

কিন্তু সেই আল্লার বান্দা এসব কথায় রাগ করতো না, মনও খারাপ করতো না। তার সময়নিষ্ঠা খুব! নামাজির নামাজ কাযা হয় কিন্তু তার আসার মাফ নেই। ঝড় হোক বৃষ্টি হোক সে নিজ সময়ে আসবে। কিছুক্ষণ বসবে, তারপর চলে যাবে।

এই যে গত কয়েক দিন! কী সব বিপদ না হলো! দুনিয়া এক থেকে আরেক হয়ে গেল। কিন্তু হালুয়াওয়ালার রুটিনে কোনো ফারাক নেই। লোকজনের ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ। সবাই মহল্লার ভেতরেই চলাফেরা করে। কেউ যদি মহল্লার বাইরে কয়েক কদম গিয়ে টাউন হল পর্যন্ত যেত, তাহলে যেন বিশ্বজয়ের কাজ হয়ে যেত।

এরপর এক দিন চাচা-শেরু পাড়ার মুদি দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে বলা শুরু করলেন—‘নাও ভাই, দিল্লি তো শেষ!’

মোহাম্মদের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, ‘চাচা! কী হলো?’

‘আরে হওয়ার আর বাকি কী রইলো! যা হবার হয়ে গেছে। সবজি বাজার, পাহাড়গঞ্জ, কুচা তাহের খাঁ... সব ধুলোয় মিশে গেছে। কত লোক মরেছে, কী বলবো!’

এবার চাচা-শেরু তার গলা এমন নাটকীয় করে আনলেন যে, পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। সবাই চুপ। নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিলো। তিনি যা বলে গেলেন এর মোদ্দা কথা হচ্ছে—সব পরিবার তাদের পরিবারের লোকজনের হিসেবে গম কিনে ফেলুক। রেশন, ব্ল্যাক মার্কেট যেখান থেকে পাওয়া যায়, কিনে ফেলুক। দামের পরোয়া করলে চলবে না। কিনে ভেজে প্রত্যেক সদস্যের জন্য এক পোটলা করে গমের বন্দোবস্ত করে ফেলতে হবে। মোহাম্মদ সব শুনে থ হয়ে রইলো। বান্দা খানের মুখ খোলা রয়ে গেল। জাফরের হাত পানের ডিব্বার দিকে এগোতে গিয়ে মাঝ পথে থেমে গেল।

চাচা এবার গলার আওয়াজ একটু স্বাভাবিক করে বললেন—‘ভাই, ঘটনা হলো যে, কখন কী হয়ে যায় কিচ্ছু বলা যায় না।’

কিন্তু হালুয়াওয়ালা তখনো আগের মতোই আসে। আগের মতোই সুর তোলে—পড়ো কলমা মোহাম্মদের...। কে ভয় পেলো, কেনো ভয় পেলো এসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। কেনো মোহাম্মদের চেহারা ফ্যাকাশে, চাচা-শেরু কেনো ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করেন—এসব তাকে একটুও স্পর্শ করতো না। তবে এটা ঠিক যে, ওর থালায় পয়সা পড়ার মাত্রা অনেক কমে গেছে। দিন দিন সেটা আরো কমতে লাগলো।

বুন্দার সেই চিৎকার, ওর মায়ের বকাঝকা আর শোনা যায় না। ওদের দরজায় এক বিশাল তালা ঝুলছে। ওদের সদর দরজার ঠিক ওপরে ছাদে একটা চিল বসে বসে বিলাপ করে দিনদুপুরে।

মাসুদের সুন্দর তিনতলা বাড়ির রোয়াকে এক বাদর পরিবার স্থায়ী ঘাঁটি করেছে। এমন নিশ্চিন্তে তারা একে অপরের উকুন বাছে মনে হয় যেন বহুকাল থেকে ওরা এই বাড়ির মালিক।

কুন্দনদের সামনের দরজার সেই তাঁতের পর্দা কে জানে কোথায় গেছে! দরজার লাগানো পেতলের তালা দূর থেকে দেখা যায়, চকচক করছে।

পাড়ার অনেক দরজাতেই আর পর্দা দেখা যায় না। যারা দরজা বন্ধ করে যাওয়ারও সময় পায়নি, তাদের পর্দা ছাড়া খোলা দরজা কেমন উলঙ্গ দেখায়।

একদিন যখন সে প্রতিদিনের মতই—কলমা পড়ো মোহাম্মদের... ডাক দিয়ে গলিতে ঢুকছে, তখন বাজ্জিদের ঘরের সামনে মালপত্রে ভরা টাঙ্গা দাঁড়িয়ে ছিলো। আর বাজ্জির আপাজান—বাবা আর কে জানে কে কে টাঙ্গায় সওয়ার হচ্ছিলো। হালুয়াওয়ালা গলিতে তার আগের জায়গাতে বসে সেই পুরোনো সুরে গেয়ে যাচ্ছিলো:

মোহাম্মদের কলমা পড়ো

বেসন হালুয়া খরিদ করো

শোন মুসলমান কোনো ভয় নাই

নবী শাফায়াতের কাণ্ডারি 

টাঙ্গা সামনে যাচ্ছিলো। আর বাজ্জি সেই সুর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো। আজকে বাজ্জির এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। আগে সে নিজে গলির মধ্যে থাকতো। আর হালুয়াওয়ালার আওয়াজ দূর থেকে ধীরে ধীরে গলির মধ্যে এসে ঢুকতো। কিছুক্ষণ পরে সেই আওয়াজ গলির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বাইরে চলে যেত। বাজ্জি গলিতেই থেকে যেত। আজ সেই আওয়াজ গলির ভেতর এসে জমে স্থির হয়ে গেছে। আর বাজ্জি নিজে দূরে চলে যাচ্ছে, দূরে চলে যাচ্ছে। গলি পার হয়ে পার হয়ে কোথায় চলে যাচ্ছে, কে জানে! 

//জেডএস//

লাইভ

টপ