খারাপ পাড়ার মসজিদ || নাগিব মাহফুজ

Send
অনুবাদ : আলম খোরশেদ
প্রকাশিত : ০৮:০০, মে ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:১২, মে ১০, ২০১৯

১৯৮৮ সালের নোবেল সাহিত্যপুরস্কার বিজয়ী নাগিব মাহফুজের জন্ম ১৯১১ সালে কায়রোতে। দর্শনের স্নাতক নাগিবের লেখালেখির সূচনা ত্রিশের দশকেই। ঐতিহাসিক উপন্যাস দিয়ে হাতেখড়ি হলেও অচিরেই তিনি বাস্তব পৃথিবীর দিকে পা বাড়ান। রচিত হয় ‘কায়রো ট্রিলজি’র মতো অসাধারণ সমাজগাথা, কায়রোর নগর-জীবন যেখানে তার বিশাল প্রেক্ষাপট, বহুস্তর ও বর্ণবিভঙ্গ উঠে আসে। এরপর দায়িত্বপূর্ণ সরকারি চাকরির পাশাপাশি ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক এমনকি চিত্রনাট্যও দু’হাতে লিখে গেছেন তিনি। তার মোট গ্রন্থসংখ্যা ত্রিশের কাছাকাছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইংরেজি অনুবাদ—Begining and an End; The Beggar, The Search for Wedding Song; A Houseboat on the Nile ইত্যাদি। ইংরেজি, ফরাসি, হিব্রুসহ অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার গ্রন্থ। ২০০৬ সালে তার মৃত্যু হয়।

আসরের নামাজের সময় দেখা গেল মুসুল্লি মাত্র একজন। রসওয়ালা চাচা হাসনাইন। এই মসজিদের ইমাম হয়ে আসার পর থেকে শেখ রাব্বু তাকে একদিনও আসরের নামাজ কাজা করতে দেখেননি। ইমাম সাহেব ও তার ওয়াজ নসিহতের প্রতি ভক্তিবশত মসজিদের মুয়াজ্জিন ও খেদমদগার বালকটিও রোজ এই সময়ে হাজির থাকে। প্রথম প্রথম এতে শেখ আবদুরের দিলে যে লাগত না তা নয়, তবে ক্রমে তা সয়ে যায়। ঠিক বেশ্যাপাড়ার লাগোয়া এই মসজিদে ইমাম নিযুক্ত হবার পর তার ভয় হয়েছিল অবস্থা আরও গুরুতর হবে। বদলির হুকুমে তাই তিনি যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলেন; ঐ হুকুম বাতিলের জন্যও কম চেষ্টা করেননি, কিন্তু শেষমেষ বিফল হয়ে শত্রুকুলের উপহাস আর বন্ধুমহলের মশকরার মধ্যেই একান্ত ইচ্ছার বিরুদ্ধে তা মেনে নিয়েছিলেন।

তার ওয়াজ শুনতেই আসবেই বা কে? দুই গলির চৌমাথায় এই মসজিদ। এক গলিতে মশহুর বেশ্যাপট্টি। অন্যটাতে নেশাখোর দালাল ফড়েদের আখড়া। হাসনাইন চাচাই খুব সম্ভব গোটা তল্লাটের একমাত্র পরহেজগার বা নিদেনপক্ষে ভদ্র মানবসন্তান। গলির ভেতরে যতদিনই চোখ পড়েছে শেখ সাহেব ততদিনই থর থর করে কেঁপে উঠেছেন। জোরে শ্বাস নিলেই ওই নরকের জেনা আর গুনাহর বিষ শরীরে ঢুকে তার আত্মাকে নাপাক করে দেবে এই ভয় তাকে পেয়ে বসেছিল। এরপরও তিনি নিয়মিত ওয়াজ নসিহত করে গেছেন আর মানিকজোড়ের মতো চাচা হাসনাইনও নিয়ম করে তা শুনতে এসেছেন। একদিন তিনি রসওয়ালাকে বললেন, ‘সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আপনি নিজেও ইমাম হবেন আর তামাম দুনিয়া আপনাকে বুজুর্গ বলে মানবে।’ বৃদ্ধ লোকটি তখন আধখানা হেসে বলে ‘আমি আর হুজুর কী জানি?’

সেদিন ওয়াজের বিষয় ছিল ‘বিবেকের বিশুদ্ধতা’, যাকে সাধারণত নিজের ও অন্য মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সততা ও আন্তরিকতার ভিত্তি এবং রোজ সকালে খোদার কাছে চাওয়ার মতো একটা জিনিস বলে গণ্য করা যায়। হাসনাইন চাচা রোজকার মতো আজও মন দিয়ে ওয়াজ শুনলেন। তিনি বড় একটা প্রশ্ন করেন না, মাঝেসাঝে কোরানের দুয়েকটা আয়াতের অর্থ কিংবা শরিয়তের মসলা বিষয়ে টুকটাক কিছু জানতে চাওয়া বাদে।

মসজিদের দক্ষিণের জানালা দিয়ে কেবলা বরাবর তাকালে পাড়ার সবটাই নজরে আসে। একটা লম্বা সরু আঁকাবাঁকা গলির দুদিক জুড়ে জবুথবু সার সার ঘর আর কিছু চায়ের দোকান। সব মিলিয়ে গা গুলিয়ে ওঠার মতো পরিবেশ। দিনের এই সময়টাতে মনে হয় গোটা গলিটাই যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে হাত পা ছড়িয়ে সন্ধ্যার জন্য তৈরি হচ্ছে। দু’চার ঘটি পানি ছড়িয়ে গলিটাকে খানিক সাফসুতরো করা হয়, চায়ের দোকানে সাজানো হয় চেয়ার, একে একে দরজায় টোকা পড়ে, চুপিসারে খুলে যায় তা—যদিও গোটা ব্যাপারটাই সাজানো। চটুল গালগল্পে বিভোর মেয়েরা রংচং মেখে জানালায় এসে দাঁড়ায়, তীক্ষèহাসির হররা আর আগরবাতির ভুরভুর গন্ধে চাঙা হয়ে ওঠে পাড়া। এক বেশ্যার কান্না ছাপিয়ে ওঠে সর্দারনির বাজখাঁই গলা—‘ওঠ মাগী, আর প্যাকনা করিস না, চাক্কু খাইয়া তোর দালাল মরছে হেইডাই কইতে দিরং কইরা আর লোকসান করিস না আমার।’ অন্যদিকে শোনা যায় আরেক বেশ্যার বিলাপ, কিছুক্ষণ আগে খুন হওয়া তার পাশের কামরার সখির শোকে। হঠাৎ কর্কশ গলায় কে যেন কার গোষ্ঠী উদ্ধার করতে শুরু করে, ‘হালার বাটপাড়?’ ফেরদৌসের লগে হুইয়া গেল, একটা পইসাও দিল না, উল্টা হের একশটা ট্যাহা ছিলছিলাইয়া গায়েব হইয়া গেল। এমুন বিলাইত্যা সাহেব বাপের জন্মে দেহি নাই। অন্যদিক থেকে ভেসে আসে অশ্লীল গানের এক যৌথ মহড়ার শব্দ, কিছুক্ষণ পরেই যা পরিবেশিত হবে। অনতিদূরে গলির মাথায় হাতাহাতি চলে দু’জনের, সামান্য কথায় শুরু হয় এখন চেয়ার ছোড়াছুড়ি পর্যায়ে। লিবলিবা নামের মেয়েটি ঘর ছেড়ে সিঁড়িতে এসে বসে। রাস্তার বাতি জ্বলে ওঠে এক সময়, প্রাণের স্পন্দন জাগে গলিতে, স্পষ্ট বোঝা যায়।

একদিন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রধান পরিদর্শক শেখ আবদুর রাব্বুকে টেলিফোনে তলব করেন তার দপ্তরে। তাকে জানানো হয় শহরের সব মসজিদের ইমামের এক সভা হবে। এই তলবের দু’একদিন আগেকার ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে এরকম সভা অস্বাভাবিক নয়, তবু শেখ আবদু পেছনের গূঢ় উদ্দেশ্যটি কী তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এক গণনিন্দিত উচ্চপদস্থ আমলার আত্মীয় এই প্রধান পরিদর্শক সাহেবের প্রতাপ দোর্দাণ্ড। ইমাম মুয়াজ্জিন নিয়োগ ও ছাঁটাই নির্ভর করে তার খেয়াল খুশির ওপর এবং জনগণের অতি শ্রদ্ধার সব প্রতিষ্ঠানকে তিনি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। তার সামনে ইমাম মাত্রেই বলির পাঠার মতো কাঁপেন, কারণ পান থেকে চুন খসলেই তার মেজাজ তেরছা হয়ে ওঠে। শেখ সাহেব তাই দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে সভার জন্য তৈরি হন। কালো প্রায় আনকোরা আলখাল্লাটা গায়ে চাপিয়ে মাথায় পাগড়ি বেঁধে আল্লার নামে রওনা হন।

প্রধান পরিদর্শকের কামরার সামনের বারান্দায় লোকের ভিড় দেখে (তার নিজের ভাষায়) শেখ আবদুর মনে হল যেন হাশরের ময়দান। সমবেত ইমামেরা এই জরুরি তলবের সম্ভাব্য কারণ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন। এমন সময় বিশাল দরজা খুলে তাদের ঢোকানো হল প্রশস্ত অফিস ঘরে, ক্রমে সেখানে লোক আর ধরে না। পরিদর্শক সাহেব যথাযথ সরকারি গাম্ভীর্যসহ তাদের অভ্যর্থনা করলেন এবং সম্মিলিত তোষামোদের জবাবে ঠোঁটের আগায় একটি রহস্যময় চাপা হাসি ঝুলিয়ে রাখলেন। আর্জিপাঠ শেষ হলে নীরবতা নামে। উদ্বেগের মাত্রা ক্রমশ বাড়ে, তিনি একে একে প্রত্যেকের মুখের দিকে নেত্রপাত করেন, অবশেষে মুখ খোলেন। চোখা চোখা কথায় তাদের অভিনন্দনের জবাব দিয়ে বললেন, ইমাম সম্প্রদায়ের ওপর তার পূর্ণ আস্থা আছে। তারপর মাথার ওপর ঝোলানো ছবিটিকে দেখিয়ে মন্তব্য করলেন ‘এনার ও মাননীয় রাজপরিবারের প্রতি কর্তব্য পালনের ওয়াস্তেই আজকের এই জমায়েত।’ উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীর অনেকেই তার কথা বুঝতে না পেরে উসখুস করেন, কিন্তু কেউ কোনো ভাবান্তর দেখান না। তিনি বলে চলেন ‘যে সম্পর্কের বাঁধনে আপনারা তার সঙ্গে বাঁধা সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই পারস্পরিক আনুগত্যের ভিত্তি আমাদের ইতিহাসের মধ্যে প্রোথিত।’ ভেতরের অস্বস্তিটা চাপা দেবার জন্যই যেন শ্রোতারা চোখেমুখে সম্মতির ভাব করে, বক্তা তার বক্তৃতা অটুট রাখেন। ’এখন দেশ জুড়ে যে বিশৃঙ্খলার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার মোকাবেলায় তিনি আপনাদের আনুগত্য প্রার্থনা করছেন।’ শ্রোতাসকলের অন্তর্গত উত্তেজনা বাড়তেই থাকে। ‘আপনারা আপনাদের কর্তব্য করুন। জনগণের সামনে শান্তিভঙ্গকারী ‍দুষ্কৃতিকারীদের মুখোশ খুলে দিন এবং ন্যায়পরায়ণ রাজার সুশাসন নিশ্চিন্ত করুন।’

অনেকক্ষণ এভাবে মূল কথাটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে চলেন তিনি। শ্রোতাদের মুখের ভাব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে জানতে চাইলেন তাঁদের কোনো প্রশ্ন বা বক্তব্য আছে কিনা। তখন নীরবতা ভেঙে অন্য সবার চেয়ে সাহসী একজন ইমাম জানান—তিনি এতক্ষণ তাদের মনে কথাগুলোই যেন বলছিলেন। ওপরওয়ালার হুকুম ছাড়া কোনো কাজ করার নিষেধ না থাকলে অনেক আগেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা এই কর্তব্য পালন করতেন। প্রধান পরিদর্শক বক্তৃতা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই শেখ আবদু আশ্বস্ত হন, এই তলব তাদের কোনো দোষের জন্য নয়, নয় তাদের অবস্থান যাচাইয়ের জন্যও, বরং তাদের সাহায্য চাওয়ার জন্যই ওপরওয়ালা তাদের ডেকেছেন। এতে তাদের বেতনভাতা কিছুটা বেড়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু এই মুহূর্তের সুখচিন্তা ছাপিয়ে পূর্বের অস্বস্তিটা পুনরায় ভর করে থাকে, যে-রকম সাগরের একটি নিটোল ঢেউ বেলাভূমি ছুঁয়েই পরমুহূর্তে ফিরে যায় সাগর গহ্বরে। তার কোনো সন্দেহ থাকে না। এর ফলে এখন থেকে জুম্মার খুতবায় এমন সব কথা বলতে হবে যাতে তার বিবেকের সায় নেই, মুসল্লিদের কাছেও যা ঘৃণিত। তিনি বুঝতে পারলেন এই মুহূর্তে একই সংকটের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছেন তার অন্য সহযোগীও। কিন্তু কীইবা করার আছে তাদের? এই নতুন দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই তিনি মসজিদে ফিরে আসেন। পাড়ার বিখ্যাত দালাল শালদাম তখন মসজিদ থেকে কয়েক কদম দূরে গলির মুখের শুঁড়িখানায় চেলাচামুণ্ডাদের মাঝে মিটিং করছিল। তাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চড়ছিল তার মেজাজ। এক সময় সে চিৎকার করে বলে, ‘মাথা ঢিলা নাবিয়া মাগিটা ঐ বাটকু হরামজাদা হাসাইন্যার লগে পিরিত জমাইছে।’

‘আরে না না। হে অরে হক্কল কাস্টমারের লাহানই বহায়; বেশি ভাইব্যা দিমাগ খারাপ করেন ক্যা ওস্তাদ।’ এই বলে এক চেলা তাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে। এতে কোনো কাজ হয় না। উত্তেজিত শালদাম টেবিলে এমন জোরে খাপ্পড় মেরে ওঠে যে ছালা, চট সব ছিটকে পড়ে। বন্য পশুর মতো ঘর্ঘর গলায় বলে, ‘মিছা কথা, অরে মাগনা হোতায়, আমার এই ছোরার নিশানার লাহান এই কথারও কোনো ভুল নাই, একটা কানা পয়সাও হে অরে দেয় না, উল্ডা মাগিই হেরে হেনতেন কিছু দেয়।’ এই কথায় চেলাদের মুখে ঘৃণা চিকচিক করে ওঠে, মাতাল চোখে ওস্তাদের প্রতি দরদ ও আনুগত্য স্পষ্ট।

‘শুয়োরের বাচ্চাটা এমুন টাইমে আহে যহন ঠিক নাবিয়ার খ্যাপ। আইজ তোরা আগের থন লাইন দিয়া রাহিস, বাকিটা আমার হাতে ছাইড়া দে।’ গ্লাস খালি হয় এক সময় আর প্রত্যেকের চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠে প্রতিশোধের আগুন।

মাগরেবের নামাজের পর শেখের মাদ্রাসা জীবনের দুই দোস্ত, ইমাম খালেদ ও ইমাম মোবারক তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। শেখ তাদের কাছে জানতে পারেন বড়কর্তার কথামতো সরকারি প্রচারণায় রাজি না হওয়ায় কয়েকজন ইমাম বরখাস্ত হয়েছে। ‘এই ইবাদত বন্দেগির জায়গা রাজনীতি আর জালেমের জুলুম জারি রাখার জন্য তৈরি হয়নি’, রাগতস্বরে বলেন ইমাম খালেদ। আবদু রাব্বু ভয়ে নতুন করে শিউরে ওঠেন, সেই পুরানো কথার দোহাই পেড়ে বলেন—‘তুমি কি তাহলে চাও আমরা উপোস করে মরি?’ কেউ কোনো কথা বলে না। শেখ আবদু রাব্বু হার মানার লোক নন, তবু বন্ধুদের সাথে একমত হবার ভান করেন ‘তোমরা যাকে বিতর্কিত বিষয় বলছ, সেটা হয়ত বাস্তবে সঠিকও হতে পারে।’ শেখের মতের এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখে খালেদ আর কথা বাড়ায় না কিন্তু মোবারক তার স্বভাবজাত অসংযত রাগে ফেটে পড়ে ‘তাহলে তো আমরা ইসলামের বুনিয়াদ, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন, থেকেই দূরে সরে গেলাম।’ আবদু রাব্বু বুঝতে পারেন, তিনি বিবেকের সাথে বেইমানি করছেন, এতে তিনি আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মোবারকের ওপর। বলেন, না এতে বরং আল্লাহ ও তাঁর নবীর হুকুমের প্রতি আমাদের আনুগত্য প্রকাশের ইসলামি শিক্ষাটাই পালিত হচ্ছে। প্রচণ্ড ঘৃণায় আন্দোলিত মোবারক তখন বলেন, ‘এই সব লোককে তুমি হুকুমত বলতে চাও?’ আবদু রাব্বু আর কোনো যুক্তি না পেয়ে অগত্যা বলেন, ‘বুকে হাত দিয়ে বল তো তোমরা সত্যি সত্যি এই হুকুম তালিম না করে পারবে।’ মোবারক আর কথা না বাড়িয়ে রেগেমেগে প্রস্থান করেন, খালিদও তার পিছু নেন। শেখ আবদু রাব্বু তার নিজের বিবেক ও দুই বন্ধুকে এক সঙ্গে শাপান্ত করেন।

মধ্যরাতের দিকে সাত নম্বর বাড়ির উঠোন ভরে ওঠে এক দঙ্গল মাতালে। বালি দিয়ে খানিক উঁচু করা একটি জায়গায় হ্যাজাক বাতির নিচে চেয়ার পেতে গোল হয়ে বসে সবাই। মাঝখানে নেচে চলে নাবিয়া। পরনে গোলাপি ঘাগরা, আর ডান হাতে একটা কাঠির আগায় হলুদ রিবন দিয়ে মোড়া ফুলের তোড়া। তালে তালে তালি পড়ে আর থেকে থেকে অশ্লীল চিৎকার ওঠে। দালালেরা উঠোনের এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘাপটি মেরে বসে। আর শালদাম দাঁড়িয়ে সিঁড়ির গোড়ায়, ফটকের দিকে তার নজর। এক সময় হাসানকে ঢুকতে দেখা যায়; চুল পরিপাটি, মুখে হাসির দীপ্তি। শালদাম ক্রুব্ধ চোখে তার দিকে তাকায়। নবাগত নাবিয়া নাচে মন দেয়। তাকে দেখা মাত্রই নাবিয়া একগাল হেসে বিশেষ কামোদ্দীপক ভঙ্গিতে কোমর দুলিয়ে চোখ টিপে স্বাগত জানায়। হাসান প্রসন্ন মনে একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে। শালদামের রক্ত টগবগ করতে থাকে। তার আঙুল নড়ে ওঠে। আলতো একটা শিস দেয় সে। মুহূর্তের মধ্যে তার দুই চেলা একটি নকল যুদ্ধ শুরু করে। অন্যরাও তাতে যোগ দেয়, ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা উঠোনে। হিংসা বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। ঝিমধরা মাতালেরা চমকিত হয়ে চটপট সটকে পড়ে। একটি চেয়ার উড়ে যায় হ্যাজাকের দিকে। চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ে বাতি। মুহূর্তে উঠোন জুড়ে নামে ঘন তমসা। চিৎকার গালাগালি আর দাপাদাপির শব্দে নরক গুলজার হয়ে ওঠে। সমস্ত তাণ্ডব ছাপিয়ে এমন সময় রঙ্গমঞ্চের মাঝখান থেকে অন্ধকার খানখান করে নারীকণ্ঠের আর্তনাদ ও পরমুহূর্তে এক পুরুষের গলাফাটা কান্নার শব্দ ভেসে আসে। উঠোন দ্রুত জনশূন্য হয়ে যায়, শুধু একরাশ ধুলোর মধ্যে, নীরব অন্ধকারে পড়ে থাকে একজোড়া মানব-মানবীর মৃতদেহ।

পরদিন শুক্রবার। জুম্মার ওয়াক্তে মসজিদ ভরে ওঠে মুসল্লিতে। শুধু জুম্মার দিনই কায়রোর আল আতাবা, আল খাজিন্দার প্রভৃতি অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা আসেন এই মসজিদে নামাজ পড়তে। কোরান তেলাওয়াতের পর শেখ আবদু খুতবা পড়তে উদ্যত হন। তার খুতবার রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনে সমবেত জনতা এতটা হতবাক হবেন এটা তিনি কল্পনাও করেননি। ভঙ্গি ও আনুগত্য বিষয়ক ছন্দমেলানো আয়াতগুলো তারা অবিশ্বাস ও বিক্ষোভভরা মন নিয়ে শোনেন। কিন্তু খতিব সাহেব যখন বিপ্লবীরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য জনগণকে আন্দোলনে উস্কানি দিচ্ছেন বলে নিন্দাবাদ শুরু করেন তখন মুসল্লিদের চাপা গুঞ্জনে মসজিদ গমগম করে। ঘৃণাভরা প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় এবং কেউ কেউ ইমাম সাহেবকে গালিগালাজও শুরু করেন। এমন সময় শাদা পোশাকধারী পুলিশের চরেরা বিক্ষোভকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তীব্র প্রতিরোধের মুখে, জোর করে মসজিদ থেকে বের করে দেয়। এর প্রতিবাদে অধিকাংশ মুসল্লি মসজিদ ছেড়ে যায়। ইমাম রাব্বু বাদবাকিদের নিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করেন। বড় ম্লান ও বিষণ্ন নামাজ।

এদিকে গলির বাঁ দিকের দুই নম্বর ঘরে সামারা তার নতুন খদ্দেরের মনোরঞ্জন করছিল। আধা উদোম শরীরে বিছানার এক কোণায় হেলান দিয়ে বসে সে গ্লাসে ডোবানো একটা শশায় কামড় দিচ্ছিল। আর গায়ের জামা খুলে রেখে বিছানার সামনে একটা চেয়ারে বসে খদ্দেরপ্রবর মদ্যপান করছিল। এক সময় সারা ঘরে দৃষ্টি বুলিয়ে সে সামারার শরীরে এসে থামে। মদের বোতলটি সামরার ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে এক চুমুক খাইয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। মসজিদে কোরান তেলাওয়াতের শব্দ শোনা যায়। একটা ভূতুড়ে হাসির রেখা ফুটে ওঠে তার মুখে। চোখ নামিয়ে রাগতস্বরে সে বিড়বিড় করে, ‘শালারা মসজিদ বানাবার আর জায়গা পেল না?’ ‘কেন এই জায়গাটা খারাপ অইলো কোন দিক থিক্যা’ শশা চিবুতে চিবুতে প্রশ্ন করে সামারা। ‘তোর আল্লাহ্ খোদার ভয় নাই নাকিরে মাগি।’ দুই ঢোক ব্রান্ডি গিলে চোখ মুখ উল্টে সে সামারাকে বলে।

‘খোদা আমাগো মাফ কইরা দিও।’ সামারা উত্তরে বলে। খদ্দের খুতবার কথাগুলো খেয়াল করতে চেষ্টা করে; তারপর কী বুঝে যেন বদের হাসি হেসে বলে, ‘শালা ভণ্ড কী বলে শোন।’ তার চোখ আরও একবার সারা ঘর ঘুরে এসে সাদ জগলুলের একটি পুরনো বিবর্ণ ছবির ওপর এসে স্থির হয়। ছবিটাকে দেখিয়ে সে বলে ‘চিনিস?’

‘চিনুম না? বেবাকে চিনে।’ বোতলের তলানিটুকু শেষ করে লোকটি জড়ানো গলায় বলে ‘আমাদের সামারা তাহলে একজন স্বদেশী, আর শালা শেখের বেটা একটা আস্ত দু-মুখো ভণ্ড।’

‘বেডারে আমার হিংসা হয়’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে। সামারা খালি চাপা পাইড়াই মালদার অইয়া গেল, আর আমরা গতরের ঘাম বেইচ্যা দুইডা আধলির মুখ দেহি।’ ‘ব্যাটারা সব আপনি মোড়লের দল, নাকি ভদ্দরলোক। তোদের সঙ্গে তফাৎ খুব একটা বেশি না?’

‘বেবাকে জানে নাবিয়ারে কেডা মারছে। কওনের হিম্মতটা আছে কোন বেডার?’

খদ্দেরটি রাগে দুঃখে মাথা নাড়ে। বলে ‘বেচারি নাবিয়া। এমন একটা কাজ করল কোন পাষণ্ড।’

‘শালদাম! আল্লাহর গজব পড়–ক হের মাথায়’, সামারা গজরায়, ‘হায় খোদা দুনিয়াতে আমাদের চেয়েও বড় পাপী আছে!’

‘হইছে প্যাঁচাল থাক। আমার টাইম নাই’। বিরক্তি প্রকাশ করে সামারা। ওদিকে শেখ রাব্বু ভাবেন মসজিদের ঘটনাটি থেকে কেমন করে ফায়দা লোটা যায়। মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে তিনি জানান, সরকারি নির্দেশে রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে গিয়ে তার এখন সমূহ বিপদ। ফিকির করে একটি দৈনিক পত্রিকাতেও সেই ঘটনার ফলাফল বিবরণ ছাপার ব্যবস্থা করতে সমর্থ হন। রিপোর্টে জোর দিয়ে বলা হয় তাকে বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই পুলিশি হামলা দরকার হয়েছিল। মনে মনে তিনি পদোন্নতির স্বপ্ন দেখতে থাকেন। সে যাই হোক, আসরের ওয়াক্তে কিন্তু মসজিদে একজন লোকেরও দেখা মিলল না। রসওয়ালার দোকানের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখেন মালিক কাজে ব্যস্ত। হাসনাইন চাচা নামাজের কথা ভুলে গেছেন ভেবে রাব্বু মসজিদ থেকে কয়েক পা বাইরে এসে ডাক পাড়েন, ‘ও চাচা, নামাজের ওয়াক্ত হল যে!’ নিজের নাম শুনতে পেয়ে বৃদ্ধ চাচা মসজিদের দিকে তাকান। কিন্তু ইমামের চোখে চোখ পড়তেই প্রত্যাখানের ভঙ্গিতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। অপমানিত রাব্বু মসজিদে ফিরে যেতে যেতে বুড়োকে অভিশাপ দেন।

পরদিন ভোরে মুয়াজ্জিন মিনারে ওঠেন। আকাশে এখনো পাতলা অন্ধকার, শীত শীত ভাব, পূর্ণিমার চাঁদখানি উজ্জ্বল স্থির। ‘আল্লাহ আকবর’ বলে আজান শুরু করতে না করতেই সাইরেনের আওয়াজ শোনা গেল। মুয়াজ্জিনের বুক ধড়ফড় করে ওঠে। বিড়বিড়িয়ে দোয়া পড়তে পড়তে সাইরেন থামার অপেক্ষায় থাকেন তিনি। মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে ইটালি যুদ্ধ ঘোষণার পর থেকে এ-রকম সতর্ক সংকেতের মহড়া মাঝে-মধ্যেই হয়ে থাকে, কিন্তু গুরুতর কিছু ঘটেনি তখন পর্যন্ত। মুয়াজ্জিনের দরদমাখা গলায় পুনরায় ধ্বনিত হয় ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই’। আচমকা চরাচর কাঁপনের শব্দে তার কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। হাড় অব্দি ঠান্ডা হয়ে আসে, পা কাঁপতে থাকে, বিহ্বল দৃষ্টিতে দূরে তিনি আগুনের শিখা দেখতে পান। নিকষ অন্ধকারের ভেতর কাঁপতে কাঁপতে নিচে নেমে আসেন তিনি, ইমাম সাহেবের দিকে ছুটে গিয়ে কম্পিত গলায় বলেন, ‘হুজুর সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটছে মনে লয়। অহন কী উপায়! ইমাম সাহেব খানিকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন, ’সরকারি শেল্টার বহুত দূর। এতক্ষণে চুরমার হইয়া যাওনের কথা। তার থিক্যা আমাগো এই মসজিদ অনেক মজবুত। এডাই ভালা শেল্টার।’

মসজিদের এক কোণায় বসে তারা কোরান পড়তে শুরু করেন। বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি আর ছোটাছুটির ধুপধাপ আওয়াজ শোনা যায়। এর মধ্যে স্নায়ু অবশ করা, বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দেওয়া বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল আবার। খেদমদগার ছেলেটি এতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলে, ‘হুজুর আমার বাপ-মা ঘরের মইধ্যে। বেড়ার ঘরখান কুন সময় যে ভাইঙ্গা পড়ে।’

’খোদার ওপর ইমান রাখ্। মসজিদ থিক্যা বাইর অইস না।’ ফ্যাসফেসে গলায় বলেন ইমাম সাহেব। হঠাৎ একদল লোক মসজিদের দিকে ছুটে আসে। একজনের গলা শোনা যায়, ‘এই দালানটা মজবুত, ল এহানে ঢুকি।’ ইমাম সাহেব শিউরে ওঠেন, সেই বদমাশটা! ওর এখানে ঢোকা মানে কেয়ামতের দেরি নাই। এমন সময় আগের দলের চেয়ে বড় আরেক দল ছুটে আসে, শেখ সাহেবের অচেনা নয় এমন মেয়েদের গলার আওয়াজ কানে আসে। ‘হালার নেশাটাই ছুইটা গেল।’

ইমাম সাহেব আর রাগ সামলাতে পারেন না। ছুটে গিয়ে বলেন ‘দূর হ তোরা। সরকারি শেল্টারে যা। বাইর অ এহান থিক্যা, আল্লাহর ঘরের মান মর্যাদাও রাখবি না তোরা।’ ‘আপনি চুপ করেন হুজুর’, একটি পুরুষ কণ্ঠে জবাব আসে। হাসির হররা ওঠে এতে, কিন্তু বোমার শব্দে পরক্ষণে তা চাপা পড়ে যায়। পশুর মতো চিৎকার চেঁচামেচিতে মসজিদ ভরে ওঠে, ইমাম সাহেব ঘাবড়ে যান। তিনি ধমকে ওঠেন, অনেকটা যেন অদৃশ্য বোমার উদ্দেশে এই ধমক, ‘ভাগ কইতাছি, খোদার ঘর নাপাক করিস না আর’। একটি মেয়ে তখন বলে বসে, ‘হুজুর আপনের নিজেরই শরম করা উচিত।’

‘এই গেলি। খোদার গজব পড়ুক তোগো উপরে।’ ইমাম সাহেব বলেন, ‘এইডা আল্লার ঘর, আপনের বাপদাদার সম্পত্তি না।’ সমানে সমানে উত্তর দেয় মেয়েটি। তখন আগের লোকটি ধমকানোর সুরে বলে ওঠে, ‘হুজুর আপনের চোপা থামান, নাইলে গলা টিপ্যা ধরুম কইলাম।’ এরপর কথাকাটাকাটির আর গালিগালাজের ঢল নামে। অবস্থা বেগতিক দেখে মুয়াজ্জিন ইমাম সাহেবের কানে কানে বলেন, ‘হুজুর আপনি হেগো কথার জবাব দিয়েন না, আমি বেগারতা করতাছি।’ আবদু রাব্বু তবু বলেন, ‘আপনি কি আমারে এই নাপাক মাইয়াগুলারে ঢুকবার দিতে কন?’

‘তয় হেরা যাইব কই। হেগো ঘরের অবস্থা আপনে জানেন না? জোরে বাতাস দিলেই লইড়া ওঠে, আর এইডা কিনা আসমানি বোমা।’ মুয়াজ্জিন হাত জোড় করে বলেন। ইমাম সাহেব এখন তার তালুতে ঘুষি মেরে বলেন, ‘এই পাপীগো লগে থাকবার পারলে তো আমি বাইচ্যাই যাইতাম। হেগোরে এখানে আননের পিছে খোদার কী ইচ্ছা আছে কেডা কইব।’

এমন সময় আরেকটি বোমা ফাটে। মনে হল বুঝি সেটা কাদের আল খাজিন্দারেই পড়েছে। একটা আলোর ঝলক ওঠে, সেই আলোতে এক মুহূর্তের জন্য মসজিদের চাতালে ভয়ার্ত মানুষদের চোখে পড়ে, পরমুহূর্তে সব অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আকাশে এখনো শত্রু বিমানের বিকট গর্জন। মেয়েরা আর্তস্বরে চ্যাঁচাতে থাকে। এমনকি শেখ আবদু রাব্বু নিজের অজান্তে চিৎকার করে ওঠেন একবার। তার মাথায় ঠিক থাকে না, তিনি দৌড়ে বেরিয়ে যান। মসজিদের খেদমদগার ছেলেটি পেছন পেছন গিয়ে তাকে থামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু শেখ রাব্বু তাকে সজোরে ধাক্কা মেরে ভয় জড়ানো কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলেন, ‘আয়, আমার পিছন আয় তোরা, না অইলে মরবি। এই খারাপ মাইয়া পুরুষগো এক লগে করনের পিছনে খোদার কোনো মতলব আছে আমি কইলাম, তোরা এহানে থাকিস না।’ এই বলে তিনি অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যান। বিমান আক্রমণ আরো মিনিট দশকের মতো চলে, এর মধ্যে বোমা ফাটে চারটি। তারপর মিনিট পনেরোর মতো নৈঃশব্দ্যে ডুবে থাকা গোটা শহর। এক সময় ‘অল ক্লিয়ার’ সাইরেন বেজে ওঠে। ধীরে ধীরে সকাল হয়, অন্ধকার দূর করে দিনের আলো নিরাপত্তার আশ্বাস নিয়ে আসে।

কিন্তু সূর্য পুরোপুরি ওঠার আগ পর্যন্ত শেখ আবদু রাব্বুর লাশ পাওয়া যায় না।

//জেডএস//

লাইভ

টপ