কুহুমারিমাম

Send
হামিম কামাল
প্রকাশিত : ১৫:০৫, মে ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৮, মে ২২, ২০১৯

আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। ৯ নং শুভপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ কুহুমা গ্রামে একটাই ছোট্ট মসজিদ ছিল, মুহুরি নদের কাছে। জায়গাটা জলজঙ্গলে বোঝাই। মসজিদ আঙিনারই একপাশের ছোট্ট ঘরে থাকতেন ইমাম। অকৃতদার। বয়স ত্রিশের কোঠায়। শরীরে মেজাজে শ্যামল বাঙাল যাকে বলে। লোকপ্রিয়। নামাজের সময়টা বাদে বাকি সময় গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাটান, হাসিঠাট্টা করেন। বেশ একটা সহজ সম্পর্ক। ধর্মগুরুর গাম্ভীর্য তার ছিল না। তাই বলে খেলোও ছিলেন না যে, কেউ আঙুল তুলে কথা বলতে পারবে। তেমনটা কেউ ভাবতেও পারত না। বয়স্করাও সমবয়েসী জ্ঞানে কথা বলতেন, শ্রদ্ধা করতেন। সবাই তাকে এমনই ভালোবাসত যে কারো ঘরে কোনো বেলা আতিথ্য নিলে মানুষগুলো ধন্য হয়ে যেত। বিপদে আপদে তার কাছে পরামর্শের জন্যে আসত লোকে এবং তার প্রতি আস্থা শেষদিন পর্যন্ত সবার অটুট ছিল।

শেষদিন?

হ্যাঁ, হঠাৎ করেই একটা ছেদ পড়ে এসবে। এমন একটা ঘটনা ঘটে যে, ইমাম ভদ্রলোক বিনা বাক্য ব্যয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। না, গ্রামবাসীদের কেউ তাকে বাধ্য করেনি। তার সাথে কোনো দুর্ব্যবহারও হয়নি। স্রেফ একটা দিনও আর বেশি থাকা তিনি নিরাপদ বোধ করেননি বলে চলে গেলেন।

আমার কোনো রহস্য রহস্য খেলা করার ইচ্ছে নেই। আমি তাই আগেই বলে দিচ্ছি, এখানে একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল।

এ ঘটনায় মানুষের চেনাজানা পৃথিবীর বাইরের কারো হস্তক্ষেপ থাকতে পারে, আবার নাও পারে। হতে পারে ব্যাপারটা মানুষঘটিতই।

কিন্তু এমনই অবিশ্বাস্য সুচারুতায় তা ঘটেছিল যে রহস্য উদঘাটন আজও সম্ভব হয়নি।  

এটা আমি শুনেছি আমার চাচাত ভাইয়ের কাছ থেকে। দু’কথায় ভাইয়ের পরিচয়টা দিচ্ছি। আমার চেয়ে বছর দশেকের বড় এ ভাইটির শখ ছিল ঢাকার চারুকলায় পড়ার। শিল্পী হতে গুণের যতখানি দৈব উপায়ে পাওয়া সম্ভব, বোধ করি তার সবটুকুই পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি মসজিদের ইমাম, ললিতকলার জগৎ থেকে অনেক অনেক দূরে। নিজের ওপর এতোটা চাবুক তিনি কষিয়েছেন। কেন তা আরেক গল্প, সে অধ্যায় আমরা এখন ওল্টাব না। আমরা বরং তিরিশ বছর আগের সেই ইমামের গল্প শুনি, আমার চাচাত ভাই মামুন আজ যার স্থলাভিষিক্ত। মাঝের ত্রিশটি বছর আরো অনেকে সে মসজিদের ইমাম হয়েছেন, কিন্তু আর কারো জীবনে তেমন অতিপ্রাকৃতিক প্রাণসংশয়ী কিছু ঘটেনি।

এখান থেকে বাকি গল্পটা আমার চাচাত ভাই মামুনের মুখেই শুনুন।

আমার বাপ ছিল খুব রাগী; আল্লাহ তারে বেহশত নসীব করুক। আমরা হলাম মহীয়ান বাপের হীন ছেলে। তো যাক, খুব রাগী, লাল লাল চোখ, তবে টানা টানা। সাদা কালো দাড়ি, সরু নাক। দেখতে অবিকল রবীন্দ্রনাথের মতো লাগত তাঁকে। কিন্তু একদিন সেটা বলায় ক্ষেপে গেলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। তার দেখাদেখি আমিও ক্ষুব্ধ ছিলাম। পরে আমার ক্ষোভ কেটে গেলেও তার আর কাটেনি। নাহ, লাল চোখ, রবীন্দ্রনাথ এসব তো আমার আলাপের বাইরে। আমি শুধু খেই হারিয়ে ফেলি। এমন হলে আপনারা টেবিল চাপড়ে আমাকে সজাগ করে দেবেন।

(টেবিলে চাপড়!)

হ্যাঁ, আমার বাপ। সবদিন যে ফজরের আগে আগে ওঠেন তা না। কোনো কোনোদিন আরো আগেও ওঠেন। সেদিন তাহাজ্জতের নামাজ পড়তে পড়তে ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগে থামেন, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন, এরপর ফজরের নামাজে যান, ততক্ষণে আজান পড়ে যায়, কিন্তু তিরিশ বছর আগের যেদিনের কথা বলছি, সেদিন ঘটনাচক্রে তিনি ফজরের বেশ আগে উঠলেন, তাহাজ্জত পড়লেন, এক ধমকে আমাকে ওঠালেন, ওজু করালেন, এরপর বাপে পুত্রে একত্তরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি—ফজরের আজানের সময় পার গেছে কিন্তু আজান পড়ে নাই।

আজান পড়ে নাই কেন? এমন তো কখনো হয় না! বাপ চোখ গরম করে বললেন, শিগগির যা, দেখ, ইমাম কী করে।

যিনি ইমাম, তিনিই মোয়াজ্জেন। সুতরাং আজান না পড়লে তার খোঁজটাই পড়বে। আমি একাই ছুটলাম, আজান দেওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিকভাবে এ মসজিদের ভার আমাদের ওপর। গ্রামের মানুষ এ মসজিদের রুটিনের সাথে সমস্ত ওঠবোস মিলিয়ে নিয়েছে। সুতরাং আজান পড়তে দেরি হলে একটা ওলট পালট উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা। সেটা ঠেকাতেই আমি ছুটলাম। ইমাম কি গতকাল কোনো জেয়াফত খেয়েছেন? এরপর পেট খারাপ নিয়ে সারারাত দৌড়ঝাঁপ, এরপর সকালে আর টের না পাওয়া—এই কি ব্যাপার? আমার মাথায় এটাই এলো। তাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, এরপর কড়া নেড়ে যখন সাড়া পেলাম না, আর দেরি না করে নিজেই আজান দিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে, পশ্চিমে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল, সেদিকে ফিরে আজান দিতে থাকলাম। ওটুকুতে তখনো কারো বসতি ছিল না। তাই আজান অবাধে তিন দিকে এগিয়ে আশপাশের ঘরগুলোয় পৌঁছাত। আমার পেছনেও কয়েক ঘর ছিল। ওদের কানেও তো আজান পৌঁছানো দরকার। ঘুরে সেদিকে ফিরতে গিয়ে আজানের কোন লাইনে ছিলাম, গেলাম ভুলে। এই হলো আমার দশা। তখন থেকেই আমি এমন। আমার সেই রাগী বাপ তো এই থেকে মুক্তি পেতে আমাকে এক ভয়ানক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে কুচকুচে কালো এক মহিলা, ভাই, পর্দার আড়াল থেকে কী জোরে যে আমার কেনো আঙুলে চাপ দিলো, মনে হয়েছিল আমার বুঝি খুলি ফেটে যাবে। কোনো মানুষের এমন শক্তির কথা আমি কল্পনা করতে পারি নাই। মনে হয়েছিল প্লায়ার্স দিয়ে চাপ দিয়েছে। চাপ না, এটাকে বলে চিপ। জিন যত দুষ্ট, এই চিপে নাকি সে তত জোরে চিৎকার করে। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছিলাম।

(টেবিলে চাপড়!)

আজানের লাইন ভুলে গেলেও আত্মবিশ্বাসের সাথে আবার মাঝ থেকে শুরু করলাম। এবার আর ভুল হলো না। ঘুরে ঘুরে সব দিকে মুখ ফিরিয়ে আজান দেওয়া শেষ যখন হলো, ইচ্ছে হচ্ছিল ইমাম হুজুরের হাতে চুমু খাই। কিভাবে তিনি প্রতি বেলা এই কাজ করেন? কঠিনতম কাজ। আমি ছোট মানুষ, চিৎকার মানুষ শুনেছে কিনা কে জানে। তিনি বড় মানুষ, গলায় জোর আছে, তাই বলে এতোটা! তিনশ গজ দূর থেকে কানের পাশে ধ্বনির মতো শোনা যায় তার আজান। একটু বাড়িয়ে বললাম। তবে ব্যাপার কাছাকাছি। এতোদিন ভেবেছিলাম, আজান দেওয়ার কাজটা বাপকে বলে আমি নেবো কিনা। ভেবেছিলাম এটা বুঝি খুবই আরামের কাজ, মজার কাজ। তাই বোধয় ইমাম আর কারো সাথে ভাগ করেন না। যাক, আমার ধারণা বদলে গেল। কিন্তু ইমাম সাহেবকে এর কিছুক্ষণের ভেতরও পাওয়া গেল না। মানুষটা আজান দিতে না পারুক, অভ্যাসের বশে ঘুম তো একটু হলেও পাতলা হওয়ার কথা। আর এরই ভেতর বাপও এসে গেছে, এসেছে সলিম-কলিম দুই কাকা, বিলু ভাই, রইসের দাদা, আরো অনেকে, সবার এতো ডাক, ঘুম তো ভাঙার কথা।

হঠাৎ রইসের দাদা বললেন, তোন্ডা কি মাথা খারাপ অই গেছে নি। মানুষ হিয়ার কোনো বিপদ হইতো হারে, দরজা ভাঙো!

সলিম কাকা বললো, নমাজের ওয়াক্ত পার হই গেলে তই?

কলিম কাকা চট করে ক্ষেপে গেল এ কথায়। ‘মিয়া, মানুষের বিফদ না দেইকলে তোঁয়ার নমাজে আল্লার কী কাম!’

অকাট্য যুক্তি। এরপর সবাই হামলে পড়ল দরজার ওপর। লাগাতার ধাক্কা চলছে। জানালায় চলছে চড় চাপড়। সব ভেতর থেকে বন্ধ এবং ভেতরের মানুষটার কোনো সাড়া নেই। রইসের দাদা বললেন, ‘ধাক্কা দি হইতো ন। ভাঙন লাইগব।’

আমার বাপ সেই প্রথম কথা বলে উঠলেন। ‘হুম। দরজা না। পুব পাশের জানালায় শিক নাই। সেই জানালা ভাঙো। বিলু রে! জানালা ভাঙ।’

ভাঙাভাঙিতে বিলু ওস্তাদ। বেল নারিকেল মাটির কলস থেকে শুরু করে মানুষের দরজা জানালা ভাঙায় বিলু এর আগেও অনেকবার তার ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। পুব-পাশের জানালার কাছে গিয়ে সে ক্লিন্ট ইস্টউডের মতো লম্বা এক ঠ্যাঙ তুলে লাথি কষাল। লাথিটা জুতমতো পড়ে নাই। মুরুব্বিদের দিকে খুব সংকুচিত হয়ে তাকাল বিলু। তখনো আলো ফোটে নাই। তার চোখের দৃষ্টি বোঝা শক্ত। তবু আমি কল্পনা করে নিয়েছিলাম সে লজ্জাই পেয়েছিল। ভাঙার নির্দেশের এমন আনন্দে খেই রাখতে না পারা বিলু ভাই মুরুব্বিদের সামনে এভাবে পা তোলাকে বেয়াদবি জ্ঞান করেছিল নির্ঘাৎ। আর ব্যাপারটা বুঝল মনে হয় তার বাপই সবচে ভালো, আজগর কাকা, বলল, ‘সমস্যা নাই, হুজুরে কইছে ত, তুই ভাঙ।’

এবার লাথিটা জুত মতো পড়ল এবং একটা সবল ঢাং আর মড়াৎ একসঙ্গে হলো। 

কয়েকজনের কাছে টর্চবাতি ছিল। ভেতরে আলো ফেলে যা দেখা গেল তাতে সবার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। বিলু ভাই সাহস দেখাতে গিয়ে ভাঙা জানালা গলে লাফ দিয়ে পড়ল ভেতরে। আর প্রচণ্ড শব্দ হলো, সঙ্গে চিৎকার। একটা উল্টে থাকা চেয়ারের ওপর সে পড়েছে। চেয়ারের পায়ায় লেগে আরেকটু হলে চোখ গিয়েছিল। যাহোক, কোনোক্রমে হামাগুড়ি দিয়ে সে ইমামের কাছে গেল। ভদ্রলোক চিৎ হয়ে পড়ে আছে। পা দুটো অসহায়ভাবে ছড়ানো। হাত দুটো দুপাশে মেলে দেওয়া। মুঠো দুটো আধখোলা, যেন কিছু খামচে ধরতে চেয়েছিল। বিলু ভাইয়ের হাতে টর্চ দেওয়ার জন্য ডাকা হলো। ফিরে এসে সে বলল, গোটা ঘর তছনছ করে গেছে কেউ।

একজন ইমামের ঘর কে এভাবে তছনছ করে যাবে? একটা পুরনো চেয়ারের ওপর বিরাট এক স্টিলের ট্রাঙ্ক ছিল, সেটা নামিয়ে ছত্রখান করা। আলনা উল্টে ফেলে দেওয়া হয়েছে। চেয়ার ভাঙা। একটা বেতের তাক ছিল, কাত হয়ে সব বইপত্র ছড়িয়ে একাকার। বিলু ভাই একটা কোরান শরীফ তুলে নিয়ে কোথায় রাখবে ভেবে পেল না। শেষে এক লাফে জানালার কাছে এসে বাইরে আমার বাপের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ভয়ঙ্কর অবস্থা চাচা। আপনারা ভেতরে ঢোকেন।

কলিম কাকা বললেন, আমরা কি জানালা দিয়ে লাফ মেরে ঢুকব তোমার মতো?

শুনে বিলু ভাই এক দৌড়ে গিয়ে কাঠের বাঁধ সরিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিলো। এরপর লাফিয়ে ইমামের সামনে এসে আবার কলাগাছ। আমি ছোট মানুষ, সবার ফাঁক গলে তার পাশে চলে গেলাম।

ইমাম সাহেবের মাথাটা দেখা যাচ্ছে না। গরমেও শেষরাতের ভরসা হিসেবে তার পায়ের কাছে একটা পাতলা কাঁথা থাকত। সেই কাঁথাটা কেমন পাকিয়ে পড়ে আছে। মুখটার তার আড়ালে। বিলু ভাই বোধয় আমাকে দেখে কিছুটা সাহস পেয়েছিলেন। বসে ঝুঁকে কাঁথাটা সরাতে গিয়ে দেখা গেল, জিনিসটার অনেকখানি তার মুখের ভেতর পোরা। খুব যত্নে একটু একটু করে বের করে আনতে থাকল বিলু ভাই। আর সবাই বিস্ফারিত চোখে তা দেখতে থাকল দাঁড়িয়ে। এতোখানি কাঁথা ঠেসে তার মুখের ভেতর যে ঢুকিয়েছে সে যেমন তেমন লোক নয়। সে কেবল শক্তিধরই নয়। ভয়ানক নৃশংসও। কিন্তু দরজা জানালা তো ভেতর থেকে বন্ধ। সে গেল কোথায়?

ধীরে ধীরে কাঁথার পুরোটা বেরিয়ে এলে বিলু ভাই সেটা মুহূর্তের জন্যে দেখে ছুড়ে ফেলে দিলো ঘরের কোণে। ইমামের মুখের দিকে স্থির তাকিয়ে আছে বড়রা সবাই। সেই প্রিয় মুখ, এখন ফুলে কেমন কালো হয়ে আছে। রইসের দাদা ভাঙা গলায় ধীরে ধীরে বললেন, ‘গেসে গই। নাই।’

মানে মরে গেছে। হ্যাঁ, তিনি বয়স্ক মানুষ, অনেক মৃত্যু দেখেছেন, অমন নিশ্চিত হয়ে বলা তাকে মানায়। কিন্তু আমি তখনো সবুজ। একটা মৃত্যুও দেখিনি। শুধু শুনেছি যে মানুষ মরে। সুতরাং তার কথাকে মানতেই হবে এমনটা মনে করলাম না। ঝাঁপিয়ে ইমামের বুকের ওপর পড়লাম। এবং কান পাতার পরমুহূর্তে চিৎকার করে উঠলাম, ‘আছে, আছে!’

সেদিন সবার ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেল।

কী হয়েছিল আসলে রাতে? দীর্ঘ পরিচর্যার পর, বিকালে আলো যখন নরম সোনালী হয়ে এলে, ইমাম খানিকটা ধাতস্থ হলেন। তিনি তখন নিজ ঘরে নেই। আমাদের বসার ঘরে একটা কাঠের পালঙ্ক আছে, সেখানে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাকে ঘিরে ধরে আছে সকালের মানুষগুলোসহ আরো অনেকে।

বললেন—

বিতরের নামাজটা বাকি আছিল। রাতের খাওয়া এসেছিল এক বাড়ি থেকে। পুঁটি মাছ দিয়ে পুঁইশাক, মুগডাল আর মরিচপোড়া। আল্লার নামে চালায়ে নিলাম। এরপর কিছুক্ষণ হেঁটে মেসওয়াক করে, ছোটঘর সেরে, ঘরে ঢুকলাম। কিছুক্ষণের ভেতর বিছানায় শুয়ে কুপি নিভিয়ে সুরাকালাম পড়ে শরীর সবে বন্ধন করছি, এমন সময় চৌকির চারদিকে চার কি পাঁচটা মূর্তি এসে দাঁড়াইল। পরনের সাদা পোশাক ছাড়া তাদের আর কিছু বোঝা দায়। চেহারা তো দূর। তবে ওরা স্বচ্ছ না। নিরেট শরীর। আর ভয়ানক শক্তি ধরে তাদের একেকটা বাহু। বিছানার পশ্চিম পাশের জন আমার গলার কাছে কাপড় মুঠোয় ধরে আমারে বসিয়ে দিলো। তারপর কেমন অমানুষিক গলায় বলল, ‘এখান থেকে চলে যা। এ ঘর আমাদের ছিল, আমরা আবার এখানে থাকব।’

এ সময় ইমাম সাহেব খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে আমার বাপ তার পিঠে হাত রাখলেন। তাকিয়ে দেখি, তার চোখ দুটো কী কোমল! আমার হিংসা হলো।

রইসের দাদা বললেন, ‘তই, তুঁই কী কইলা?’

ইমাম বললেন, ‘আমি বললাম আপনার কারা। ঘর ছেড়ে কেন যাব। আমি অনেকদিন হলো এখানে আছি। আমি এই মসজিদের ইমাম। আপনারা কারা। চলে যান।’ ইমাম একবার ঢোঁক গিলে পানি খেতে চাইলো। গলাটা একটু ভিজিয়ে আবার বলতে থাকল। ‘আমি ততক্ষণে বুঝে গেছি ওরা কারা। চিৎকার করে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়লাম! তারপর বললাম, আপনারা যেখান থেকে আসছেন সেখানে চলে যান, চলে যান! তখন শুরু হলো তাণ্ডব। তাণ্ডব কারে বলে। গোটা ঘর কেমন ওলট পালট তো আপনারা দেখলেন! এরপর আমাকে মেঝেতে ফেলে একজন গলা চেপে ধরল। আরেকজন তখন ওই কাঁথাটা তাকে দিলো। তারপর ওরা সেটা আমার মুখের ভেতর ঠেসতে শুরু করল, ও মা রে! আমার গলা বন্ধ হয়ে এলো সাথে সাথে। আল্লাহ, আল্লাহ, মনে মনে কলমা পড়ছিলাম, মারা যে যাব কোনো সন্দেহ নাই। যাক, আল্লা হায়াৎ রাখছে, আপনারা আমারে পেলেন। তো বাকিরা তখন আমার হাত পা চেপে ধরে রাখল, আর ওই গুণ্ডা আমার মুখের ভেতর কাঁথা ঠেসতে থাকল। আমারে ওরা বাঁচিয়ে রাখবে না, এটাই মনে হচ্ছিল। আমার কলিজা মনে হলো ফেটে বের হয়ে যাবে। এই। এরপর আর কিছু মনে নাই।’

আমি আবার আমার বাপের চোখের দিকে তাকালাম। তখনও তার চোখ দিয়ে দরদ ঝরছে।

(টেবিলে চাপড়!)

ঘটনার সঙ্গে অতি অপ্রাসঙ্গিক আবেগ, তাই বোধয় অল্পেই টেবিলে চাপড় পড়ল আমার। আর মামুন ভাই তার আবেগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবার কথা বলার উৎসাহ পুরোপুরি হারালেন। তিনি প্রাসঙ্গিক খেই ধরার আগে আইন আমি আবার সম্পূর্ণ নিজ হাতে তুলে নিচ্ছি—ক্ষমাপ্রার্থী।

ইমাম এরপর আর কিছুদিন মাত্র ছিলেন। আবার নিজের ঘরে যেদিন ফিরেছেন, সেদিন শুধু ট্রাঙ্কটা গুছিয়ে—যাকে বলে, ওয়ান ওয়ে জার্নি। বারবার পিছু ফিরে তাকাচ্ছিলেন। আবেগী লোক। গ্রামের সবাই যে তাকে ভালোবাসত তাই শুধু না, তিনিও সবাইকে ভালোবাসতেন, সমান ভাবে। এরপর বহু বছর আর তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি। গল্পটা গোপন থাকত না। যেদিন প্রকাশ পেত সেদিনই নতুন ইমামের ট্রাঙ্কে তালা পড়ত। শেষ কেবল একজনই দীর্ঘদিন ছিলেন। দীর্ঘ বলতে বেশ অনেক বছর। তাকে সবাই বুড়া হুজুর বলে ডাকত। সজ্জন মানুষ, কিন্তু তার সঙ্গে আর ওই সম্পর্কটা কারো হয়নি, যেটা সেই ইমামের সঙ্গে সবার হয়েছিল। ওরকম হুট করে একবারই হয়।

বুড়া হুজুরের সময়ই মসজিদে আলাদা মোয়াজ্জিন নিয়োগ পান। ধীরে ধীরে নানা দিক থেকে অনুদানের টাকা জমে জমে একটা বড় টুকরো হয়ে উঠলে মসজিদ আরো বড়, মজবুত আর ইমামের ঘরটা পাকা করার কাজ হাতে নেওয়া হলো। অনেক দিন কথাবার্তার পর একদিন বুড়া হুজুরকেও তার ছেলে এসে নিয়ে চলে গেল, তিনিও আর এলেন না।

তারপর আর অল্প কিছুদিন আমার চাচা, অর্থাৎ মামুন ভাইয়ের রক্তচক্ষু বাপ, বেঁচে ছিলেন। তিনি অদ্ভুত একটা কাজ করতেন, যেটা এখন মামুন ভাইও চালু রেখেছেন। ‘কেন এই অনুদান গ্রহণ করিবেন’ এই মর্মে লেখা একটা চিঠি দাতাদের কাছ থেকে আদায় করতেন আমার চাচা। চিঠির বাক্যগুলো এক-আধবার পড়েই তিনি বুঝে ফেলতেন, কোন অনুদানের টাকা ভালো পন্থায় উপার্জিত, আর কোন টাকা বাঁকা পথে।  বাঁকা টাকা চাচার চিঠিসহ ফেরত যেত, আর ভালো টাকার মালিক পেতো ধন্যবাদজ্ঞাপক একটা চিঠিই কেবল। আমার ধারণা, চাচার অনুমানে কখনো ভুল হতো না। 

(টেবিলে চাপড়!)

//জেডএস//

লাইভ

টপ