জুলহাসের ফিরে আসার দিন

Send
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:০৬, মে ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৯, মে ২২, ২০১৯

ফিরে আসা

সেই সুপরিচিত ছন্দময় কাঁচি চালানোর শব্দটি এখন আর হচ্ছে না। হাতেখড়ি হবার পর এই প্রথম কম্পিত হাতে কাঁচি চালিয়ে যাচ্ছে নারায়ণ নাপিত। তার ঢাকা হেয়ার কাটিং সেলুনে আর কোনো কাস্টমারও নেই যে, এমন মুহূর্তে বুকে একটু বল পাবে। সেলুনে একমাত্র যে কাস্টমারটি আছে সে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে, দীর্ঘ দেড় বছর পর এলোমেলো চুল-দাড়ি আর বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে। নারায়ণ সবেমাত্র সেলুনটা খুলে ঝাড়ু দিচ্ছিলো, অচেনা হয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠেছিল সে। এই মহল্লায় যে কেউ একে দেখলে চমকে উঠবে এখন!

কারণ, ছেলেটা জুলহাস!

কোনো মাস্তান কিংবা বখাটে না হয়েও, কখনও কাউকে জোরে ধমক না দিয়েও, জ্বলজ্যান্ত এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে সে।

নারায়ণ এ পাড়ার অনেক মাস্তান আর খুনখারাবি করা লোকজনেরও চুল-দাড়ি কাটে একেবারে ভয়ডরহীনভাবে। ঠাট্টাতামাশা করে ভয়ঙ্কর সেই সব মানুষজনদের সাথে। শরীর আর মাথা বানিয়ে দেবার সময় ইচ্ছে করে চড়-থাপড় আর কিলও মারে কখনও কখনও। মনে মনে পুলকিত হয় এই ভেবে, বিরাট বড় মাস্তানও তার কাছে এলে চড়-থাপ্পড় খায়! যেভাবে বলে সেভাবে মাথা নিচু করে রাখে! কিন্তু এর আগে কখনও ভয়ে ভয়ে কোনো কাস্টমারের চুল-দাড়ি কাটেনি।

এ মুহূর্তে আয়না দিয়ে বারবার জুলহাসের দিকে চোরাচোখে তাকাচ্ছে সে। চুল-দাড়িতে ঢাকা ছেলেটা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। চোখেমুখে কেমন এক ধরণের প্রশান্তি! যেন জগত সংসারের সমস্ত সমস্যার উর্ধ্বে উঠে গেছে। কিন্তু এ পাড়ার অনেকের মতো নারায়ণও জানে, জুলহাস বাড়ি ছেড়েছিল জঙ্গি হবে বলে। সম্ভবত গতকাল ভয়ঙ্কর একটি ঘটনা ঘটাতে গিয়ে লেজেগোবরে করে ফেলেছে এই ছেলে, এখন ব্যর্থ হয়ে আর কোনো আশ্রয় না পেয়ে দীর্ঘ সময় পর ফিরে এসেছে নিজের জন্মস্থানে। হাল ছেড়ে দেয়া নাবিকের মতো লাগছে তাকে। আত্মসমর্পণের একটি ভঙ্গি আছে তার চোখেমুখে।

জুলহাসের প্রথম দিন শেভ করার ঘটনাটির কথা মনে পড়ে গেল নারায়ণের। কলেজে ওঠার আগেই জুলহাস এসেছিল তার কাছে। আগে থেকেই নারায়ণের কাছে চুল কাটাতো সে, তাই চুল কাটানোর পর লাজুকভাবে বলেছিল, শেভও করতে চায়। তখন শেভিংয়ের রেট ছিল ত্রিশ টাকা, শেভ হওয়ামাত্র জুলহাস তাকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে তড়িঘড়ি বিদায় নিয়েছিল। আর কারণটা একটু পরই নারায়ণ আবিষ্কার করে যখন তার সেলুনে এসে হাজির হয় এলাকার পঞ্চায়েতের মুরুব্বি, সর্বজন শ্রদ্ধেয় গণিচাচা। এমনই লাজুক ছিল সে। 

সামান্য নাপিত হলেও নারায়ণের সাথেও কখনও খারাপ ব্যবহার করেনি জুলহাস। ভদ্র ছেলে হিসেবে এ পাড়ায় সবাই তাকে জানতো, কিন্তু সেই ছেলেই এক সময় কীভাবে কীভাবে যেন বদলে গেল। তার এই পবিরর্তন এতো দ্রুত ঘটেছিল যে, চারদিকে ফিসফাস থামানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ক’দিন আগেই ভয়ঙ্কর এক জঙ্গি হামলায় বিশজনের মতো মানুষ নিহত হয়েছিল এই শহরে, আর সেই অপকর্মটি করেছিল জুলহাসের সমবয়সী কিছু ছেলেপেলে। পরে জানা যায়, তাদের অনেকেই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিল। কারো কারোর মা বয়স হবার পরও মুখে ভাত তুলে খাইয়ে দিতো। অন্য সবার মতো এসব কথা টিভি আর পত্রপত্রিকার মারফত জেনেছে নারায়ণ।

বদলে যাওয়ার পর জুলহাসকে দেখে চিনতে বেগ পেতো অনেকেই। তার মসৃণ মুখে বাড়ন্ত দাড়ি-গোঁফ। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তে শুরু করে দিয়েছিল সে, এরপর যোগ হলো প্রায়শই চিল্লায় যাবার নাম করে তিন-চার দিনের জন্য বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাবার ঘটনা। খুব দ্রুতই চিল্লার সময়কাল বাড়তে শুরু করলো, এক সময় সেটা চল্লিশ দিনে গিয়ে ঠেকলো। ছেলে ধর্মকর্ম করছে—এটা তার মা-বাবার জন্য মোটেও সুখকর ব্যাপার ছিল না। আগের দিন হলে, ছেলে সুপথে আছে ভেবে এক ধরণের স্বস্তি পেতো, কিন্তু অল্পবয়সীদের আচমকা ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিপদ সম্পর্কে ততদিনে অন্যান্য বাবা-মায়ের মতো তারাও অবগত হয়ে গেছিল।

এরকমই এক চিল্লায় যাবার কথা বলে বাড়ি ছেড়েছিল জুলহাস। তারপর চল্লিশ দিন পার হয়ে মাসের পর মাস গড়ালেও সে আর ফিরে আসেনি। এদিকে সরকার বারবার ঘোষণা দিচ্ছিল, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, নিখোঁজ সন্তানের ব্যাপারে যেন স্থানীয় থানায় রিপোর্ট করা হয়। জুলহাসের মা-বাবা অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর নিজেদের মধ্যে শত শত ঘণ্টা ঝগড়া-বিবাদ করার পর অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়, ছেলের নিখোঁজ হবার খবরটি থানায় জানাবে। থানাকে জানানোর পর পরই অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের লোকজন জুলহাসদের বাড়িতে এসেছিল। বিস্তারিত তদন্ত শেষে ছেলে সম্পর্কে আসল সত্যটি জানতে পেরেছিল তার মা-বাবা : জুলহাস কোনো ধর্মীয় চিল্লায় যায়নি। তাকে শেষ দেখা গেছে একটি সাইবার-ক্যাফেতে। তার সমবয়সী দুইজন ছেলের সাথে মিলিত হবার পর ওখান থেকে বের হয়ে যায় সে, এরপর আর তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ঐ তিন-চারজনের মধ্যে আগে থেকে অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের লিস্টে থাকা এক ছেলেও ছিল!

কথাটা মহল্লায় রটে গেলে অনেকের বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়, জুলহাসের মতো নম্রভদ্র ছেলে এমন কিছুতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ঘটনার পর জুলহাসের মমতাময়ী মা শয্যা নেয়। তার হাসিখুশি স্বভাবের ব্যবসায়ী বাবাকে দেখলে মনে হতো চিরশোকে আক্রান্ত একজন মানুষ। পুরো পরিবারটি একমাত্র সন্তানের এমন পরিণতিতে প্রায় কবরের মতো স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ছোট্ট সেলুনের মেঝেটা ঘন-লম্বা কালোচুলে ভরে উঠেছে টেরই পেলো না নারায়ণ। একেবারে সুবোধ ছেলেদের মতো ছোটছোট চুল আর ক্লিনশেভড হয়ে সেলুন থেকে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো জুলহাস। চুল-দাড়ি কাটার টাকা হাতে নিয়ে জুলহাসের অপসৃয়মান অবয়বের দিকে তাকিয়ে নারায়ণের মনে কেবল একটা প্রশ্নেরই উদয় হলো—এই ছেলের পরিবার এতদিন পর নিজ সন্তানের ফিরে আসায় খুশি হতে পারবে কি?

কাহার মিল্লাতের নার্ভ বেশ শক্ত হলেও প্রতিটি অভিযানের আগে নিজেকে ধাতস্থ করে নিতে একটু সময় লাগে তার। চোখ বন্ধ করে পর পর দুটো সিগারেট শেষ করে অভিযানের জন্য প্রস্তুত করে নেয় নিজেকে, তবে আজকে আর সে রকম কিছুর দরকার পড়ছে না।

গত রাতের সফলতাকে নিছক সফলতা বললে কমই বলা হবে। পুরো দেশ তো বটেই, সারা দুনিয়া জেনে গেছে, বিরাট বড় একটি সন্ত্রাসী হামলা বানচাল করে দিয়েছে কাহার মিল্লাতের অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াড। আর এই প্রথম আত্মঘাতী একটি জঙ্গিগোষ্ঠীকে কোনো রকম প্রাণহানি ছাড়াই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। দুনিয়া তোলপাড় করা এই ঘটনার নায়ক বনে গেছে সে। গত রাত থেকে তার চেহারা কতো বার টিভির পর্দায় দেখা গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আজ সকালে বিবিসি আর সিএনএন’ও তার একটি ইন্টারভিউ প্রচার করেছে। সুতরাং প্রমোশন আর প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পদক পাওয়া নিয়ে সে মোটেও ভাবছে না। ধরে নেয়া যায়, ওটা অবধারিতভাবেই পেয়ে গেছে।

পাঁচজন জঙ্গির আত্মঘাতী একটি দল অস্ত্রেসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আবারো চেষ্টা করেছিল বিশাল একটি ঘটনা ঘটাতে। এবার তারা কোনো বিদেশী রেস্টুরেন্ট নয়, হোটেলও নয়, ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় চার্চকে বেছে নিয়েছিল, তাও আবার বড়দিনে। কিন্তু তাদের কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, চার্চে তাদের জন্য একদল প্রার্থণাকারী অপেক্ষা করছিল না!

মুচকি হাসলো কাহার মিল্লাত। ধরা পড়ার পর সন্ত্রীদের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া চেহারাগুলোর কথা মনে পড়ে যাওয়ার কারণে নয়, বরং আজ সকালে সিএনএন-এর রিপোর্টার যে তাকে ‘মি. ক্যাহার মিলাট’ সম্বোধন করেছিল সে কথা মনে পড়ে গেছে।

সিগারেটে আরেকটা টান দিলো সে। আধখান সিগারেটের দিকে চকিতে তাকালো, ফেলে দেবে কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না। এ মুহূর্তে আসন্ন অপারেশনের চেয়েও অন্য একটি বিষয় তার ভাবনা জুড়ে আছে। গতকালের সাফল্যের পেছনে তাকে যে কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে তাতে একটা খচখচানি আছে কিন্তু সেটা অন্য কেউ জানে না। তার দলের কিছু কিছু সদস্য শুধু জানে, খুবই কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কাহার মিল্লাত সাফল্যের সাথেই জঙ্গি-সন্ত্রাসী দলের অভ্যন্তরে নিজের একজন ‘লোক’ ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে।

আদতে এরকম কিছুই সে করেনি!

গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত যে কয়জন জীবিত জঙ্গিকে ধরতে পেরেছে সেটাই যথেষ্ট, তারপরও এখন যাকে ধরতে যাচ্ছে সে-ই ছিল পুরো অপারেশনের কো-অর্ডিনেটর। তাকে নিয়ে গভীর কৌতুহল তৈরি হয়েছে তার মধ্যে। এই ছেলেকে অনেক দিন থেকেই ট্র্যাক ডাউন করার চেষ্টা করছিল সে। গত বছর ছেলেটার বাবা যখন থানায় রিপোর্ট করল তখন থেকেই কেসটা খতিয়ে দেখার জন্য তার অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কাহার মিল্লাত তাদের টিমের ডিজিটাল ফরেনসিক এক্সপার্টকে দিয়ে ছেলেটার কম্পিউটার চেক করে দেখেছে। সন্দেহ করার মতো কিছু লিঙ্ক আর ওয়েবসাইটের হদিস বের করা গেছিল তখন। এরপরই তদন্ত করে জানতে পারে, নিখোঁজের দিন ঢাকার একটি সাইবার ক্যাফেতে গিয়েছিল ছেলেটা। সেখানকার সিসিক্যাম ফুটেজ দেখে কাহার মিল্লাত নিশ্চিত হয়, আরো দুই যুবকের সাথে দেখা করার পর ছেলেটা ক্যাফে থেকে বের হয়ে যায় দুই যুবকের সাথে। তাদের সবার সঙ্গে ছিল ব্যাগপ্যাক। যে দুইজনের সাথে তাকে দেখা গেছে তাদের একজন অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের রেড লিস্টে আগে থেকেই জায়গা করে নিয়েছিল। সুতরাং, ব্যাপারটার সাথে যে জঙ্গি কানেকশন আছে সেটা একদম পরিষ্কার হয়ে যায়।

হঠাৎ করে বদলে যাওয়া এই যুবকের নাম সানিয়াত আহম্মেদ জুলহাস—সবাই তাকে জুলহাস নামেই চেনে। নিজের এলাকায় খুবই সজ্জন আর নির্বিবাদি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যেতে শুরু করে সে। তারপর অন্য সব জঙ্গিদের মতোই একদিন নিখোঁজ হয়ে যায়।

মাত্র দুটো পিকআপ ভ্যান নিয়ে কাহার মিল্লাত ছুটে যাচ্ছে বিশেষ সেই টার্গেটের মুখোমুখি হবার জন্য। স্থানীয় থানার ইনফর্মার মাউরা কাশেম খুবই কাজের লোক, এত দ্রুত জুলহাসের ফিরে আসার খবরটা কিভাবে পেলো সে কে জানে! কাশেমের ভাষ্যমতে, সকালবেলা এই মহল্লার এক সেলুনে জুলহাসকে সে দেখেছে। পরে তাকে অনুসরণ করে দেখে, নিজের বাড়িতেই গেছে সে।

কাহার মিল্লাত সব সময় পেছনের সিটে বসলেও আজকে বসেছে বসেছে ড্রাইভারের পাশে। এমন নয় যে, নিজেকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া জেনারেল ভাবে সে, বরং এই অপারেশনটি যাতে কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সে জন্যে বেশ তৎপর। রওনা দেবার আগেই দলের বাকি সদস্যদের বলে দিয়েছে, কোনো রকম প্রাণহানির ঘটনা যেন না ঘটে। তাদের টার্গেট অল্প বয়েসী এক ছেলে, আর সে একেবারেই নিরস্ত্র অবস্থায় আছে। সম্ভবত কোনো রকম প্রতিরোধ করার চেষ্টাও করবে না।

তার কাছ থেকে এরকম কথা শুনে স্কোয়াডের বেশ কিছু অভিজ্ঞ সদস্য ভুরু কুঁচকে ফেলেছিল। এত খবর কী করে তাদের কমান্ডার জানতে পারলো—এ রকম প্রশ্ন তাদের মনে উদয় হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।  

“আমার কাছে রিলায়েবল ইন্টেল আছে,” কাহার মিল্লাত নিজে থেকেই তাদেরকে আশ্বস্ত করে বলেছিল। যদিও সে জানে, ইন্টেল এমনই এক রসগোল্লা যেটার স্বাদ একেক সময় একেক রকম হয়। কেউই জোর দিয়ে বলতে পারবে না, সেটা সব সময় মিষ্টিই হবে! কখনও কখনও একেবারে টক কিংবা তেতো স্বাদেরও হতে পারে! আর তখনই তারা তিক্ততার সাথে আবিষ্কার করে, দুনিয়ার কোনো কিছুর উপরেই শতভাগ নির্ভর করা যায় না।

“চিন্তার কিছু নেই,” অবশেষে বলেছিল। “আমিই প্রথম কনফ্রন্ট করবো তাকে। তোমরা আমার ব্যাকআপে থাকবে।”

তার টিমের কেউ কিছু না বললেও ব্যাপারটা পুরোপুরি অস্বাভাবিক। তারা এখন পর্যন্ত কোনো কমান্ডারকে সামনে থেকে জঙ্গিদেরকে মোকাবেলা করতে দেখেনি। এ কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও থাকতে হয়। কাহার মিল্লাতের প্রশিক্ষণ থাকলেও অভিজ্ঞতা যে নেই সে ব্যাপারে তার টিমের সবাই অবগত আছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর থেকে প্রমোশন পেয়ে অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের কমান্ডার হয়েছে সে। তদন্ত কাজে বেশ দক্ষ হলেও জঙ্গি মোকাবেলার রেকর্ড খুব বেশি নেই—গতকালেরটা বাদ দিলে! 

যাই হোক, কমান্ডারের এমন কথার প্রতিবাদ কেউ করেনি, চুপচাপ মেনে নিয়েছে। কাহার মিল্লাত জানে, এসব ক্ষেত্রে টার্গেট নার্ভাস হয়েও অনেক সময় অস্বাভাবিক আচরণ করে ফেলে, আর তখন অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের পোড়খাওয়া সদস্যরা একদমই ঝুঁকি নেয় না। তাদের মধ্যে একটা কথা বেশ প্রচলিত আছে : যারা আত্মঘাতী হয়েছে তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার কী দরকার! যদিও তাদের টিমের প্রাইমারি গোল থাকে টার্গেটকে জীবিত গ্রেফতার করার, তাই বলে দলের মূল্যবান সদস্যদের সামান্যতম ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিলেই রিঅ্যাক্ট করতে কালক্ষেপণ করে না।

কিন্তু এই নির্দিষ্ট টার্গেটকে জীবিত ধরতে চায় অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের কমান্ডার। গ্রেফতার হওয়া এক জঙ্গি জিজ্ঞাসাবাদ আর টর্চারের ফলে অবশেষে স্বীকার করেছে, ভণ্ডুল হওয়া অপারেশনটির কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্বে ছিল এই জুলহাস।

চমৎকার কাজ করেছে কো-অর্ডিনেটর!

একটু উদাস হয়ে গেল কাহার মিল্লাত। দেড় বছর আগে ঢাকার এক রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় বেশ কিছু দেশি-বিদেশি নাগরিক নিহত হয়। জঙ্গিদের মধ্যে নিম্নবিত্ত পরিবারের দুইজনের পাশাপাশি তিনজন ছিল উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। এ ঘটনায় বেশ বিস্মিত হয়েছিল তারা। এর আগে সাধারণভাবে মনে করা হতো, নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্যরাই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার জন্য সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকে। তাদেরকে রিক্রুট করাও সহজ। কিন্তু রেস্টুরেন্টের ঘটনার পর থেকে তারা সবাই নতুন করে ভাবতে শুরু করে। কাহার মিল্লাত তখনই বুঝতে পারে, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা আরো বাড়বে। তার এমনটা মনে করার পেছনে কারণও ছিল। পাশের দেশের রাজধানী দিল্লি শহরে বাসে ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর পর এ দেশেও একই রকম ঘটনা ঘটতে শুরু করে। অপরাধের প্রচার নতুন করে অপরাধ করতে উৎসাহ জোগায় নিশ্চয়!

তবে জুলহাসের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যাবে না!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে সামনের দিকে তাকালো সে। ঢাকার রাস্তায় জ্যাম নেই। সকাল নয়টা বাজে বলেই এটা সম্ভব, নইলে জ্যামের মধ্যে বসে থাকতে হতো বেশ কিছুটা সময়।

পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়ার ডিস্টিলারি রোডে অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের পিকআপ ভ্যান দুটো ঢুকতেই এলাকার লোকজন উৎসুক হয়ে পড়ল। তাদের স্কোয়াডটি এতদিনে বেশ পরিচিতি পেয়ে গেছে মিডিয়ার কল্যাণে।

জুলহাসের বাড়িটা কাহার মিল্লাত বেশ ভালো করেই চেনে, এর আগে দুয়েক বার এসেছিল এখানে। গাড়ি থেকে নেমে সোজা সেই বাড়ির দিকেই পা বাড়ালো সে। তাকে অনুসরণ করলো টিমের বাকি সদস্যরা। বাড়ির মেইন দরজাটা খোলা, তবে সিঁড়ির গোড়ায় যে কলাপসিবল গেটটা আছে সেটা বন্ধ। চার তলার বাড়িটার তিনতলায় থাকে জুলহাস। বাকি তলাগুলোতে থাকে ভাড়াটেরা। 

কাহার মিল্লাত কলিংবেল বাজালে তার পেছনে থাকা টিমের সবাই একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। এর আগে কখনও কোনো জঙ্গির বাড়িতে গিয়ে কলিং বেল বাজানোর ঘটনা তাদের অভিজ্ঞতায় নেই। তিনবার বেল বাজানোর পর এক বয়স্ক লোক ভেতর থেকে বের হয়ে এল।

কাহার মিল্লাত আর তার সঙ্গে থাকা অস্ত্রধারী এটিএস-এর সদস্যদের দেখে দারোয়ান লোকটা ভয়ে ভয়ে সালাম দিলো নিঃশব্দে। কী একটা কাজে বাড়ির ভেতরে গিয়েছিল সে।

“গেট খোলো।”

দারোয়ান সঙ্গে সঙ্গে চাবি দিয়ে খুলে দিলো গেটের তালা।

“জুলহাস বাড়িতে আছে না?”

ঢোক গিলল লোকটা। “উপ্রে আছে...আসর পর থিকা নামে নাই আর।”

“দরজা খোলাই থাক, আমার লোক থাকবে এখানে।” আর কিছু না বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল কাহার মিল্লাত, তাকে অনুসরণ করলো দুইজন বাদে টিমের বাকি সদস্যরা।

তিন তলায় উঠতেই কমান্ডার দেখতে পেলো ফ্ল্যাটের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জুলহাসের বাবা-মা। মহিলা নিরবে কাঁদছেন। শাড়ির আঁচল কামড়ে কান্নাটাকে নিঃশব্দ রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। জুলহাসের বাবা ইনসান আহম্মেদ মূর্তি বনে গেছেন যেন।

“আসার পর থেকে কিচ্ছু বলেনি,” জুলহাসের বাবা বললেন চাপাকণ্ঠে। “আমাদের কোনো কথার জবাবও দেয়নি। চুপচাপ নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।”

“ও কিচ্ছু করেনি, করলে বাসায় ফিরে আসতো না,” বোবা কান্নার মধ্যেই বললেন জুলহাসের মা। “আপনারা ওকে কী করবেন?”

কাহার মিল্লাত হাত তুলে আশ্বস্ত করলো বয়স্ক দুজনকে। “আমি ওর সঙ্গে আগে কথা বলবো। এটা খুবই জরুরি। আপনারা দয়া করে নিজের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করুন।”

জুলহাসের বাবা-মা দাঁড়িয়ে রইলেন এক জায়গায়।

“প্লিজ, নিজেদের ঘরে যান,” এবার হুকুমের সুরে বলল কাহার মিল্লাত।

জুলহাসের বাবা স্ত্রীকে নিজের ঘরে যাবার জন্য তাগিদ দিলেও ভদ্রমহিলা অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন ছেলের ঘরের দরজার সামনে। আরো কিছুক্ষণ ছেলের পক্ষে সাফাই গাইলেন জুলহাসের মা, কিন্তু কমান্ডার তাকে বোঝাতে সক্ষম হলো, দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াতে। এক পর্যায়ে স্কোয়াডের দুই নারী সদস্য অনেকটা বাধ্য করলো মহিলাকে নিজের শোবার ঘরে চলে যেতে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের কমান্ডার জুলহাসের ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো, একটা সিঙ্গেল খাটে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে ব্যর্থ অপারেশনের কো-অর্ডিনেটর! সদ্য চুল কাটা আর দাড়ি কামানো ছেলেটাকে দেখে বোঝার উপায় নেই কতো বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফিরে এসেছে সে!

কিছু না বলে টিমের বাকি সদস্যদের বাইরে রেখে একাই ঘরে ঢুকলো কাহার মিল্লাত। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ঘুমন্ত ছেলেটার দিকে। পেছনে ফিরে তার টিমের বাকি সদস্যদের চোখেমুখে অবিশ্বাস আর বিস্ময় দেখে অবাক হলো না। স্কোয়াডের দুই সদস্য দরজার কাছে অস্ত্র উঁচিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। হাত তুলে তাদেরকে নিবৃত্ত করলো সে।

“জুলহাস?” আস্তে করে ডাকলো কাহার মিল্লাত। “জুলহাস?”

ছেলেটা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।

অবাক হলো না কমান্ডার। না জানি কতো দিন এভাবে ঘুমাতে পারেনি সে!

জুলহাসের কাঁধে হাত রাখলো কাহার মিল্লাত। “জুলহাস?” ডাক দেবার সাথে সাথে মৃদু ঝাঁকুনিও দিলো।

ঘুম ভাঙলো এবার। তবে চোখ মেলে কাহার মিল্লাতকে দেখে মোটেও চমকালো না। শান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসলো সে।

পাশের ঘর থেকে জুলহাসের মায়ের কান্নার শব্দটা ভেসে এল।

কাহার মিল্লাত বসে আছে জুলহাসের বিপরীতে। মাথা নিচু করে রাখলেও ছেলেটার মধ্যে কোনো রকম অনুশোচনা দেখতে পাচ্ছে না। 

“অপারেশন ব্ল্যাক নাইটের কো-অর্ডিনেটর ছিলে তুমি?” আস্তে করে বলল কমান্ডার। জুলহাসের বিছানার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসেছে সে। ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছে তার স্কোয়াড।

আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলো জুলহাস। কাহার মিল্লাত একটু ভেবে নিলো। ছেলেটা যেহেতু সহযোগীতা করছে তাই তার কাছ থেকে বিস্তারিত জানাই ভালো। “একেবারে শুরু থেকে বলো...এসবে কীভাবে জড়ালে, কে তোমাকে প্ররোচিত করেছে...সেখান থেকে শুরু করে কালকের অপারেশন পর্যন্ত।”

গভীর করে নিশ্বাস নিয়ে নিলো জুলহাস। “লম্বা কাহিনী।”

মুচকি হাসলো কাহার মিল্লাত। “সময় নিয়ে ভেবো না...ওটা তুমি অনেক পাবে।”

স্থির চোখে কমান্ডারের দিকে চেয়ে রইলো ছেলেটা। “আমি ওদের সাথে নিজে থেকেই যোগাযোগ করেছি।”

একটু অবাক হলো মিল্লাত। “সেটা কবে?”

“এক-দেড় বছর আগে...বাড়ি ছাড়ার কয়েক মাস আগের ঘটনা এটা।”

মাথা নেড়ে সায় দিলো কমান্ডার। “কিন্তু তুমি কী করে জানলে কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে? আর কেউ চাইলেও নিজ থেকে যোগাযোগ করতে পারে না। এটা করলে ওরা সন্দেহ করে। ভাবে, ইন্টেলিজেন্সের কেউ...মানে, টিকটিকি।”

“প্রথমে আমি ওদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি ফেসবুকে এক্সট্রিম পোস্ট দেয়ার মাধ্যমে।”

কাহার মিল্লাত আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিলো।

“প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ইস্যু নিয়ে এক্সট্রিম পোস্ট দিতাম। আমার পোস্টে এসে অনেকেই কমেন্ট করতো একমত পোষণ করে। তাদের মধ্যে বেশ কিছু ছেলের সাথে আমার ইনবক্সে কথা হতো। অনেকেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল...এভাবে সুমন নামের একজনের সাথে বেশ ভালো খাতির হয়ে যায়।”

“সিগারেটে সমস্যা নেই তো?” সিগারেটের প্যাকেটটা পকেট থেকে বের করে নিলো কাহার মিল্লাত।

“না।”

“গুড।” সিগারেট ধরালো কমান্ডার।

“ফেসবুকে পরিচয় হবার এক মাস পর দেখা করেছিলাম আমরা। ও আমাকে কিছু ধর্মীয় বইপত্র দিলো, নিয়মিত নামাজ পড়ার তাগিদ দিলো।”

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লো কাহার মিল্লাত। এসব গল্প তার কাছে নতুন নয়।

“সুমনের সাথে আলাপ হবার পরই আমি নামাজ পড়তে শুরু করি, দাড়িও রাখি।” একটু থেমে আবার বলল জুলহাস, “সুমন আমাকে ওয়াহাব নামের একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো কিছু দিন পর। আমরা তিনজন দেখা করলাম, কথা বললাম। এর পর থেকে ওয়াহাব মাঝেমধ্যেই আসতো দেখা করতে। ধর্ম নিয়ে কথা বলতো সে। মুসলমানদের যে দুরাবস্থা সেটা নিয়ে আলাপ করতো অনেক। এক সময় ওয়াহাব আমাদেরকে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গার কিছু মসজিদে নিয়ে যেতে শুরু করে। ওখানে কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হয় আমার। এভাবে একটা সার্কেল গড়ে ওঠে আমাদের।”

“তুমি যে চিল্লার কথা বলে প্রায়ই বাড়ি থেকে চলে যেতে, তখন কি এদের সাথেই দেখা করতে যেতে?”

“হুম,” আস্তে করে বলল জুলহাস। “আমার এসব কাজকর্ম নিয়ে মা-বাবা মোটেও খুশি ছিলেন না। বাবা মাঝেমধ্যেই বলতেন, এই বয়সে পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে না ভেবে এতো ধর্মকর্মে মন দেয়ার দরকার নেই। এসব করার অনেক সময় পাবো ভবিষ্যতে।”

দীর্ঘশ্বাসের সাথে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো কাহার মিল্লাত।

“যাই হোক, একদিন ওয়াহাব আমাকে protectedtext.com-এ একটি আইডি খুলে দিলো। ওই আইডিতে প্রায়ই ওয়াহাব আর সুমনসহ অনেকের সাথেই চ্যাট বক্সে জিহাদ নিয়ে আলোচনা করতে থাকি দিনের পর দিন।”

এখন পর্যন্ত কাহার মিল্লাত যা শুনেছে সেটা একেবারেই টিপিক্যাল জঙ্গি রিক্রুটমেন্টের ঘটনা। এভাবেই শত শত ছেলেমেয়েকে রিক্রুট করে থাকে বিভিন্ন উগ্রপন্থী দল।

“ওয়াহাব একদিন আহমেদ নামের একজনের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার সাথে কোরান-হাদিস আর জিহাদের বিষয়ে অনেক কথা হয়। এক পর্যায়ে আহমেদ আমাকে কিছু দিনের জন্য ওর সাথে এক জায়গায় যাবার কথা বললে আমি রাজি হয়ে যাই।”

“তুমি জানতে চাওনি, কেন যাচ্ছো, কোথায় যাচ্ছো?”

“না,” মাথা দুলিয়ে বলল জুলহাস। “আহমেদ আমাকে মিরপুর দশ নাম্বারের একটি মসজিদে নিয়ে গেছিল। আমি সেখানে গেলে শাহাব নামের একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। শাহাব আমার মোবাইল নম্বর নিয়ে ‘সলো রানার’ নামে একটি আইডি খুলে দেয়। এই আইডি থেকে শাহাবের সাথে চ্যাট করা শুরু করি আমি।”

সিগারেটটা শেষ করে জুলহাসের দিকে চেয়ে রইলো কাহার মিল্লাত। ছেলেটা গরগর করে সব বলে যাচ্ছে, তাকে কোনো চাপই দিতে হচ্ছে না।

“আহমেদ আমাকে বলেছিল, জেহাদে যোগ দিতে চাই কি না। আমি বলেছিলাম, চাই। তখন সে আমাকে বলে, এখন থেকে পরিচিতজনদের কথা ভুলে যেতে হবে। এমনকি তার সাথেও আর দেখা হবে না। কখন বাড়ি ছাড়তে হবে সেটা পরে জানিয়ে দেবে আমাকে। এর কিছু দিন পরই শাহাব চ্যাট বক্সে মেসেজ দিয়ে আমাকে আরামবাগের এক সাইবার ক্যাফেতে আসতে বলে। আমি ওখানে গিয়ে শাহাবকে মেসেজ দিলে সোবহান আর ফারুক নামের দুইজন আসে আমাকে রিসিভ করতে। সোবহানের কথামতো আমি আমার মোবাইলফোনের সিম আর ব্যাটারি ফেলে দেই।”

জঙ্গিরা প্রথম দিকে বুঝতো না, মোবাইলফোন বন্ধ করে দিলেও সেটের ভেতরে থাকা জিপিএস ঠিকই সিগন্যাল পাঠাতে থাকে। তবে ব্যাটারি খুলে ফেললে আর সেটা সম্ভব হয় না। আল-কায়দার জঙ্গিরাই প্রথম এটা জানতে পারে, তাদের থেকে এখন সব র‌্যাডিক্যাল দল আর সন্ত্রাসীরা শিখে নিয়েছে এটা।

“সোবহান আর ফারুক আমাকে সেখান থেকে টঙ্গির কলেজ গেট এলাকার বর্ণমালা গলি দিয়ে এক বিল্ডিংয়ের নিচতলায় দুই রুমের বাসায় নিয়ে যায়।”

সোবহান নামের এই জঙ্গি আগে থেকেই অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের তালিকায় ছিল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ধরা সম্ভব হয়নি।

“আগে থেকেই ওখানে আরো দুইজন ছিল, কিছুক্ষণ পর আরো একজন যোগ দেয়। প্রথমে তারা আমাকে নিজেদেরকে পলাশ, সৈয়দ আর রাফি বলে পরিচয় দেয়। পরে জানতে পারি, এগুলো ওদের আসল নাম ছিল না। আমাকেও তিনটা নাম দেয়া হয়, বলে দেয়া হয় কখন কোথায় কোন নাম ইউজ করবো।”

“কি নাম দিয়েছিল তোমার?”

“সাব্বির, সাকিব আর সাদিক।”

“হুম,” মাথা নেড়ে সায় দিলো অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের কমান্ডার। ভালো করেই জানে, জঙ্গিরা একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করে।

“ঐ বাড়িতে আমি প্রায় তিন মাস ছিলাম। ওখানে সোবহান আমাদেরকে কোরান-হাদিস পড়াতো, শারীরিক ব্যায়ামও করাতো। শেষের দিকে আরজু নামের একজন এসে অটোমেটিক অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দিয়ে যায়। ওখানে কারো বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করা নিষেধ ছিল। কিছু দিন পর রাফি, সৈয়দ আর পলাশ চলে যায়, এরপর আসে মহসিন, জব্বার, ইয়াহিয়া আর আবিদ নামে নতুন চারজন। আমাদেরকে আরজু গ্রেনেড ছোড়ার প্রশিক্ষণও দিয়েছিল।”

“ওরা বলেনি, ঠিক কোন মিশনের জন্য এসব প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তোমাদেরকে?” কাহার মিল্লাতের আরেকটা সিগারেট ধরানোর ইচ্ছে করলেও নিজেকে বিরত রাখলো। ছোট্ট ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে। চোখ জ্বালাপোড়া করছে এখন।

“তখনও কিছু বলেনি। আর আমরাও কোনো প্রশ্ন করতাম না...আগেই বলেছি।”

মাথা নেড়ে সায় দিলো কমান্ডার।

“এর মধ্যে একদিন ‘বড় হুজুর’ এল। সে-ই নেতা। হুজুর বলল, আল্লাহর জন্য জিহাদ করতে হবে। ইহুদি-নাসারারা মুসলমান হত্যা করছে, পৃথিবীর যেখানেই সুযোগ পাওয়া যাবে সেখানেই সেসব হত্যার বদলা নিতে হবে।”

“ঐ নেতার নাম কি?”

মাথা দোলালো জুলহাস। “তার নাম জিজ্ঞেস করা নিষেধ ছিল। নিজেকে মুত্তাকী নামে পরিচয় দিলেও সেটা তার আসল নাম ছিল না।” একটু থেমে আবার বলল সে, “আমরা শুধু জানতাম, সে জিহাদের জন্য সিরিয়াতে গিয়েছিল, ওখানেই ছিল কয়েক বছর। সবাই তাকে বড় হুজুর বলেই ডাকে।” একটু থেমে আবার বলল সে, “ঐ লোক বলল, গত বছরের চেয়েও বড় ঘটনা ঘটাতে হবে আমাদেরকে।”

“গত বছর মানে?” কাহার মিল্লাত উৎসুক হয়ে জানতে চাইলো।

“রেস্টুরেন্টের ঘটনাটা।”

“ওহ,” বুঝতে পারলো কমান্ডার।

“আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে বলা হলো। সময় হলেই সব জানানো হবে।”

“কবে জানালো চার্চের অপারেশনের কথা?”

মাথা দোলালো জুলহাস। “চার্চের না, একটা ফাইভস্টার হোটেলের কথা বলেছিল।”

“তাই নাকি!” অবাক হলো কমান্ডার।

“আমি তখন বললাম, হোটেলে আক্রমণ করাটা বেশি কঠিন হয়ে যাবে। আর খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি করাও সম্ভব হবে না। হোটেলগুলোতে এখন কড়া নিরাপত্তা থাকে।”

“এ কথা শুনে বড় হুজুর কী বলল?”

“একটু ভেবে দেখলো সে। হয়তো আমার কথাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল তার কাছে।”

“তখনই সে হোটেল বাদ দিয়ে চার্চকে বেছে নেবার কথা বলল?”

“না। চার্চের প্রস্তাবটাও আমিই দিয়েছিলাম।”

বিস্ময়ে ভুরু কুঁচকে জুলহাসের দিকে চেয়ে রইলো কাহার মিল্লাত।

 “তাকে বললাম, বড়দিনে ঢাকার সবচেয়ে বড় চার্চে হামলা করলে সারা বিশ্বের মিডিয়াতে ঘটনাটা বেশি প্রচার পাবে। তাছাড়া, ওখানে ঢাকায় যেসব পশ্চিমা দেশের অ্যাম্বাসি আছে সেখানকার কর্মকর্তারাও যায় সপরিবারে। এক সাথে অনেকগুলো বিদেশি জড়ো হয়, ওখানে হামলা করলে অনেক বেশি ক্যাজুয়ালটি ঘটানো সম্ভব।”

প্রশংসার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল কমান্ডারের চোখেমুখে।

“বড় হুজুর বলল, বড় দিনে চার্চের নিরাপত্তা থাকবে অনেক বেশি, কাজটা সহজ হবে না। আমি তখন বললাম, ফাইভস্টার হোটেলে এর চেয়ে বেশি নিরাপত্তা থাকবে। তাছাড়া, চার্চের বাইরের প্রাঙ্গনে শামিয়ানা টাঙিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হবে অস্থায়ীভাবে, আর ওটা মেইন গেট থেকে খুবই কাছে। কোনোভাবে আমাদের লোকজন মেইন গেট দিয়ে ঢুকে পড়লেই হবে, বিরাট ক্যাজুয়ালটি ঘটানো যাবে তখন। হোটেলে এটা করা যাবে না। এক সাথে খুব বেশি লোককে ওখানে পাওয়াটাও কঠিন। বেশিরভাগ গেস্ট নিজেদের রুমেই থাকবে।”

মাথা নেড়ে সায় দিলো কাহার মিল্লাত। “বড় হুজুর তোমার প্রস্তাব মেনে নিলো?”

“হুম, তবে সঙ্গে সঙ্গে না। এক সপ্তাহ পর জানালো, আমার আইডিয়াটা তার পছন্দ হয়েছে। তার আগে সে জেনে নিয়েছিল, এত কিছু আমি কীভাবে জানতে পারলাম।”

“তুমি কী বললে?”

“বললাম, এর আগে আমার এক ক্রিশ্চিয়ান বন্ধুর সাথে ঐ চার্চে গেছিলাম বড়দিনে।”

তীর্যক হাসি ফুটে উঠলো কমান্ডারের ঠোঁটে। “তারপর থেকে চার্চের অপারেশনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল?”

“হ্যাঁ। প্রথমে আমিসহ দশজনকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পর আমাদেরকে দুটো দলে ভাগ করে আলাদা আলাদা জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমিসহ পাঁচজন গেলাম উত্তরার আশকোনার একটি বাড়িতে। বাকিরা কোথায় গেছিল সেটা অবশ্য জানতাম না।”

“কতো দিন ছিলে ওখানে?”

“আরো তিন-চার মাস। ওখানে ধর্ম চর্চার সাথে সাথে প্রশিক্ষণও দেয়া হলো আরো। আমাকে নিয়ে পুরো অপারেশনের ছক করলো বড় হুজুর। আমাদেরকে বলা হলো, ঘটনার আগে জানানো হবে কে কে অংশ নেবে।”

“কিন্তু তুমি তো অংশ নাওনি,” কাহার মিল্লাত বলল। “তুমি কো-অর্ডিনেটর ছিলে। এটা কী করে সম্ভব হলো? যোগ দেবার পর এত দ্রুত এরকম দায়িত্ব পাওয়াটা তো বিরাট ব্যাপার।”

“আশকোনায় থাকার সময় বড় হুজুর একদিন এসেছিল, আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে অনেক কথা বলেছিল সে। তখনই জানায়, আমাকে তারা আরো বড় কাজ দেবে। আমার মাথা আছে, ওটা ব্যবহার করবে তারা।”

“আর বাকিদের মাথা ছিল না?” ঠাট্টারছলে বলল কাহার মিল্লাত। “ওহ, ভুলে গেছিলাম, ওগুলো তো অলরেডি ওয়াশড করে ফেলেছিল বানচোতের দল!”

জুলহাস এ কথার কেনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সে বলে যেতে লাগল, “হুজুর জানতে পেরেছিল আমি কম্পিউটারে বেশ পারদর্শি, পড়াশোনাও ভালো করেছি। তাছাড়া আমি ঢাকার ছেলে, শহরটা ভালো করে চিনি। এরকম নানান কারণে আমাকে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।”

“আর এটা করে যে হুজুর কতো বড় ভুল করেছে, সেটা নিশ্চয় হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এখন?”

জুলহাস চুপ মেরে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য নেমে এলো সুকঠিন নীরবতা।

“যাই হোক, তারপর কী হলো, বলো?”

“চার্চের হামলায় কারা অংশ নেবে সেটা ঠিক করে দেয় হুজুর। মোট পাঁচজনকে বেছে নেয়া হয়, আমাকে দেয়া হয় কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব। সোহরাব অস্ত্র আর গুলির ব্যবস্থা করে। আমরা ঠিক করি একটা অ্যাম্বুলেন্সে করে অপারেশনটা করবো।”

কাহার মিল্লাত জানে, অপারেশনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে প্রাইভেট হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্স ছিনতাই করে জঙ্গিরা, সেটা নিয়েই চার্চে প্রবেশে করেছিল।

“অপারেশনের ঠিক আগে আমি চার্চের সামনে দিয়ে ঘুরে আসি। চার্চ থেকে একটু দূরে গিয়ে ওদেরকে গ্রিন সিগন্যাল দেই।”

“বড় হুজুরের কি একবারও সন্দেহ হয়নি, তোমাদের ভেতরে একজন লোক ছিল, যে আমাকে আগেভাগেই হামলার খবর দিয়ে দিয়েছিল?”

জুলহাস কিছুই বলল না।

“আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, গত দেড় বছর আগে রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ঘটনার প্রায় পর পরই তুমি বদলে যেতে শুরু করো। যে কেউ ধরে নেবে ঐ নৃশংস ঘটনাটি পত্রপত্রিকায় আর টিভিতে দেখার পর তুমি উদ্বুদ্ধ হয়েছো। এ রকম ঘটনা যে একদমই ঘটে না তা কিন্তু নয়, তবে সেটা তাদের সাথে ঘটে যাদের ভেতরে র‌্যাডিক্যালিজম আগে থেকেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে। যতোটুকু জানতে পেরেছি, তোমার মধ্যে সে রকম কিছু ছিল না।”

জুলহাস এবারও নিশ্চুপ।

“তোমাকে কেউ মোটিভেটও করেনি, নিজে থেকেই তুমি ওদের সাথে যোগাযোগ করেছো। চার্চে হামলার প্রস্তাবও দিয়েছো তুমি। এমন কি অপারেশনের কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও ছিলে। তারপর কী হলো?”

মুখ তুলে তাকালেও জুলহাস কিছু বলল না।

“একেবারে হাস্যকরভাবেই ব্যর্থ হলো তোমাদের ঐ দলটি। একজনের রাইলেফলও কাজ করেনি। কারোর অস্ত্র থেকেই গুলি বের হয়নি। সবাই ধরা পড়ে গেল, শুধু ঐ বড় হুজুর ছাড়া।”

জুলহাস আবারো মাথা নিচু করে ফেলল।

“তোমাদের দলের ভেতরে কেউ একজন আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল। সে-ই সব কিছু জানিয়ে দেয় আমাকে। তার কারণেই পুরো অপারেশনটি ভণ্ডুল হয়েছে। সে-ই স্যাবোট্যাজ করেছে। কিন্তু সে আমাদের লোক ছিল না। তাকে আমরা ঢুকিয়ে দেইনি জঙ্গিদের সেলের ভেতরে—যদিও কাজটা করতে পারলে নিজেকে অনেক বেশি সফল মনে করতাম।” একটু থেমে কমান্ডার সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে তুলে নিলো আবার। “কথা হলো, কে সে?” একটা সিগারেট না বের করে পারলো না। “কেনই বা এ কাজ করলো?” সিগারেটে জোরে টান দিলো এবার। “তার স্বার্থটা কি!” ছেলেটাকে চুপ থাকতে দেখে কাহার মিল্লাত বলল, “রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ঘটনায় তোমার নামও কিন্তু এসেছিল।”

জুলহাস স্থিরচোখে চেয়ে রইলো কমান্ডারের দিকে।

“যদিও অন্যভাবে, তবে এসেছিল। আমাদের ডেটা-বেইসে অনেক তথ্যের সাথে এটাও রয়ে গেছিল। তুমি যখন বাড়ি ছাড়লে, তোমার বাবা যখন থানায় রিপোর্ট করলো ঘটনাটা, অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডকে দায়িত্ব দেয়া হলো এটা তদন্ত করার জন্য। তখনই রেস্টুরেন্টের ঘটনার সাথে তোমার সম্পর্কের কথাটা জানতে পারি আমি।”

জুলহাস আবারো মাথা নিচু করে ফেলল।

“এই অপারেশনের কো-অর্ডিনেটর ছিলে তুমি...তুমিই সব কিছু পণ্ড করে দিয়েছো সুপরিকল্পিতভাবে!” কাহার মিল্লাত জোর দিয়ে বলল, “এ ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই।” সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লো কমান্ডার। “তুমি জানো কিনা জানি না, অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে ফেললেও ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অ্যাকাউন্টের সব রেকর্ড থেকে যায়। ইউজার হয়তো ভাবে ডিলিট করে দিলেই সব কিছু শেষ হয়ে গেল, আদতে কোনো কিছুই ডিলিট হয় না। এ জন্যেই আমি ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলাম তোমার অ্যাকাউন্টের যাবতীয় তথ্য আমাকে প্রোভাইড করার জন্য। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে তারা আমার প্রস্তাবে সাড়া দেয়। চার্চের অপারেশনের মাত্র ক-দিন আগেই তোমার ডিলিট করা ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পেরেছিলাম আমি।”

মুখ তুলে তাকালো জুলহাস।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কাহার মিল্লাত। “আমি শ্রাবন্তীর বিষয়টা জানি!”

. শ্রাবন্তীর জন্য...

শ্রাবন্তী হায়দার মাত্র আট বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে কানাডায় চলে যায়। দুয়েক বছর পর পর দেশে আসতো বাবা-মায়ের সাথে। অন্য এক বন্ধুর মাধ্যেমে ফেসবুকে তার সাথে পরিচয় হয় জুলহাসের। বাস্তব জীবনে লাজুক আর স্বল্পভাষী জুলহাসের সাথে এর আগে কখনও কোনো মেয়ের সখ্যতা তৈরি হয়নি। ছোটবেলা থেকেই সে মেয়েদের সামনে বেশ আড়ষ্ট থাকতো। পারতপক্ষে মেয়েদের এড়িয়েই চলতো সব সময়। কিন্তু শ্রাবন্তীর সাথে তার সখ্য গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। সম্ভবত শ্রাবন্তীর সারল্য আর বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব তার এই আড়ষ্টতা কাটাতে সাহায্য করেছিল। এক সময় জুলহাস অবাক হয়েই আবিষ্কার করে, তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে সুদূর কানাডায় বসবাস করা এই মেয়েটি। শ্রাবন্তীর সাথে সব কথা শেয়ার করতো সে। একেবারে অকপটে, বিনাদ্বিধায় সব কিছু বলতে পারতো। যে সব কথা তার বন্ধুদের বলতেও লজ্জা পেতো, এই মেয়ের সাথে বলতে কোনো রকম দ্বিধা বোধ করতো না। সম্পর্কটা বন্ধুত্ব থেকে অন্য কিছুতে না গড়ালেও, নিশ্চিতভাবেই তারা একে অন্যকে ভীষণ পছন্দ করতো। এই ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের বয়স যখন প্রায় দুই বছর গড়ালো তখনই শ্রাবন্তী জানালো কিছু দিন পরই বাবা-মাসহ দেশে আসছে সে, আর দেশে এলে জুলহাসের সাথে দেখা করবে, আড্ডা দেবে, অনেক জায়গায় বেড়াতে যাবে। খবরটা শুনে অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়েছিল জুলহাসের।

শ্রাবন্তী তার বাবা-মায়ের সাথে দেশে আসার পর দিন জুলহাসের সাথে তার দেখা করার কথা হয় অভিজাত এলাকার এক রেস্টুরেন্টে। শ্রাবন্তী তার দুই কাজিনসহ সেখানে থাকবে। তো, ঐদিন শ্রাবন্তীর সাথে দেখা করার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় জুলহাস কিন্তু ঢাকা শহরের কুখ্যাত জ্যামের কারণে রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতে একটু দেরি করে ফেলে সে। ফোনে দুইবার কথাও হয় মেয়েটার সাথে। তারপর যখন জ্যাম পেরিয়ে রেস্টুরেন্টের কাছে চলে আসে, দেখতে পায় রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে পুলিশ। ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন। ট্যাক্সিক্যাবটা ছেড়ে দিয়ে উৎসুক জনতার সাথে কথা বলে জুলহাস জানতে পারে, এক দল জঙ্গি হামলা চালিয়েছে বিদেশি একটি রেস্টুরেন্টে!

ঐ এলাকায় এরকম অনেক রেস্টুরেন্টই আছে, ঠিক কোন রেস্টুরেন্টে হামলা হয়েছে কেউই তখনও বলতে পারছিল না। সঙ্গে সঙ্গে জুলহাস ফোন দেয় শ্রাবন্তীকে। দুই-তিনবার রিং হলেও তার কলটা রিসিভ করা হয় না। মেয়েটার চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে সে। বুঝতে পারে, শ্রাবন্তী যে রেস্টুরেন্টে দেখা করার কথা বলেছিল সেখানেই হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। কিন্তু জুলহাস যেটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি সেটা হলো, তার এই ফোনকলের কারণেই লুকিয়ে থাকা শ্রাবন্তী ধরা পড়ে যায় জঙ্গিদের হাতে!

পরে সবটাই জেনেছিল সে।

সুতীব্র কষ্টে এলোমেলো হয়ে গেছিল তার জীবনটা। নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে রাতের পর রাত বোবা কান্নায় ভাসিয়ে দিতো বিছানার বালিশ। সেদিন শ্রাবন্তীসহ আরো বিশ-বাইশজন দেশি-বিদেশি নাগরিককে হত্যা করে একটি জঙ্গি গোষ্ঠী। পত্রপত্রিকা আর নিউজ চ্যানেলের বদৌলতে জুলহাস জানতে পারে, আরো অনেকের সাথে মেয়েটাকে কী নির্মমভাবেই না জবাই করে হত্যা করেছে তারই সমবয়েসী জঙ্গিরা!

এই নারকীয় ঘটনার পর প্রায় দুই সপ্তাহ জুলহাস বিপর্যস্ত হয়ে ছিল। তার বাবা-মা জানতে চাইতো কী কারণে তার এমন বেহাল অবস্থা, কী হয়েছে তার—কিন্তু তাদের তো দূরের কথা, কাউকেই সে শ্রাবন্তীর কথা বলেনি। তীব্র কষ্ট আর অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিল সে। তারপরই, একটা চিন্তা তার মাথায় আসে, নিজেকে বদলে ফেলে জুলহাস। প্রথমে ফেসবুকে নিয়মিত উগ্র মতবাদসংবলিত পোস্ট দিতে শুরু করে, নিজেকে উপস্থাপিত করে একজন উগ্রপন্থী হিসেবে। এভাবেই ফেসবুকে তার সঙ্গে সমমনা কিছু ছেলের যোগাযোগ ঘটে। অচিরেই তাদের কারো কারো সাথে গড়ে ওঠে সখ্য। এরপর নামাজ পড়তে শুরু করে নিয়মিত। এতে করে তার বাবা-মা একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। আগের দিন হলে ধর্মকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়লে বাবা-মাসহ পরিচিত সবাই খুশিই হতো, কিন্তু রেস্টুরেন্টের ঘটনার পর পত্রপত্রিকা আর নিউজ চ্যানেলগুলোর বদৌলতে সবাই জেনে গেছিল, কিভাবে সমাজের উঁচুশ্রেণী থেকে শুরু করে একেবারে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিবাদের খপ্পড়ে ফেলা হয়; কীভাবে কাদের প্ররোচনায় একদল মানুষ এমন সিদ্ধান্তে আসে যে, নিষ্পাপ মানুষ হত্যা করাই জেহাদ!

ততদিনে জঙ্গি সেলের নজরে পড়ে গেছিল জুলহাস। এক পর্যায়ে তারা যোগাযোগ করে তার সাথে, সদস্য হিসেবে রিক্রুট করে নেয় নিজেদের দলে।

 

কাহার মিল্লাতের খুব সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু উপায় নেই, তার প্যাকেটে যে কয়টা সিগারেট ছিল এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। জুলহাসের ছোট্ট ঘরে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা ধোঁয়া। অদ্ভুত লাগছে দৃশ্যটা। তাদের দু’জনের মাঝে ধোঁয়ার পর্দা ভাসছে এখন।

“সব কিছু যদি তোমার পরিকল্পনামতো না ঘটতো তাহলে কী করতে?”

এই প্রথম মুচকি হাসলো জুলহাস। “শুরুতে আমার মাথায় কেবলমাত্র ওদের দলে ঢোকার কথাই ছিল। একবার ঢুকে পড়ার পর ঘটনা যে দিকে গড়াবে সেভাবেই পরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। আগে থেকে সব কিছু পরিকল্পনা করিনি আমি।”

প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালো কমান্ডার। “তোমাকে যদি আত্মঘাতী দলের সদস্য করা হতো তাহলে ভিন্ন রকম পরিকল্পনা করতে, তাই না?”

মাথা নেড়ে সায় দিলো জুলহাস।

“তুমি ঠিক কী করেছিলে, বলো তো...ওদের কারোর রাইফেল আর পিস্তল থেকেই গুলি বের হয়নি!”

গভীর করে শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো জুলহাস : “অস্ত্র আসার অনেক আগেই গুলি আর কিছু হ্যান্ড গ্রেনেড চলে আসে, বড় হুজুর ওগুলো আমার কাছেই রাখতে বলে দেয়। আমি ওগুলো কাপড়ের ব্যাগে ভরে পানির ট্যাঙ্কে রেখে দিয়েছিলাম। প্রায় দশ দিন ছিল ওভাবে।”

কাহার মিল্লাতের ভুরু কপালে উঠে গেল আবার।

“কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম না, এতে করে ওগুলো অকেজো হবে কি না। গুগল আর ইউটিউবে সার্চ করে দেখেছি, এতে কাজ হয়। তবে এটাও জানতে পারি, নামকরা অনেক ব্র্যান্ডের অ্যামুনিশন আর গ্রেনেড দীর্ঘদিন পানিতে থাকলেও সক্রিয় থাকে। এ কারণে শেষের দিকে এসে আমি সবগুলো গুলির সীসা ভাইস আর প্লাঞ্জ দিয়ে খুলে ফেলি...বারুদগুলো ফেলে বালি ঢুকিয়ে দেই। গ্রেনেডগুলোও একইভাবে অকেজো করে রেখেছিলাম।”

“এ কাজ তুমি কীভাবে করলে? এগুলো তো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ!”

“এ রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল আমাদেরকে। বাকিটা আমি ইউটিউবের ভিডিও দেখে দেখে শিখে নিয়েছিলাম।”

“তুমি কি তখন একা ছিলে?”

“না। তবে অপারেশনের কো-অর্ডিনেটর হবার পর আমাকে আলাদা রুম দেয়া হয়। ওখানে আমি ভাইস আর কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে এলে আমার সাথে যারা ছিল তারা কোনো সন্দেহ করেনি। ধরে নিয়েছিল, আমি অস্ত্র কিংবা বোমা নিয়ে কাজ করছি।”

মাথা নেড়ে সায় দিলো কাহার মিল্লাত।

বড় দিনে চার্চের বাইরে একটি অ্যাম্বুলেন্স চলে আসে। কমান্ডার জানতো কোন অ্যাম্বুলেন্সে করে ঠিক কতোজন সন্ত্রাসী হামলা চালাতে আসছে—সবটাই তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছিল ‘ব্লিডিং হার্ট’ ছদ্মনামের রহস্যময় একজন। এটাও বলে দেয়া হয় তাকে, সবাইকে জীবিত ধরতে চাইলে কমান্ডার যেন ট্রাঙ্কুলাইজার গান ব্যবহার করে। জঙ্গিদের কোনো অস্ত্রই কাজ করবে না!

অপারেশনের কো-অর্ডিনেটর জুলহাসের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাবার পর আত্মঘাতী দলটি যখন চার্চে প্রবেশ করে তখন সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য ছিল না, কাহার মিল্লাত ততক্ষণে পুরো এলাকাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল। আর এটা জঙ্গিদের কারো কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হয়নি জুলহাসের কারণেই। সে-ই ওদেরকে জানিয়েছিল, চার্চের বাইরে কোনো রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই—এখনই সুযোগ হামলা চালানোর!

জঙ্গিদের অ্যাম্বুলেন্সটা যখন চার্চের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে তখন দেখতে পায় সামিয়ানা টাঙানো সামনের প্রাঙ্গণটি একেবারেই ফাঁকা। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে অস্ত্র হাতে ঘিরে ধরে কাহার মিল্লাত আর তার অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের সদস্যরা। পাঁচজন জঙ্গি মরিয়া হয়ে গুলি ছোঁড়ার চেষ্টা করে, সঙ্গে সঙ্গে স্কোয়াডের সদস্যরা তাদেরকে ট্রাঙ্কুলাইজার গান দিয়ে গুলি করে বসে। ফলাফল, ইতিহাসে প্রথম বারের মতো আত্মঘাতী হামলা চালাতে গিয়ে পুরো একটি জঙ্গিদল জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার হয়ে যায়।

কিছু একটা মনে পড়তেই উদগ্রীব হয়ে উঠলো কাহার মিল্লাত, “কিন্তু তোমার ঐ বড় হুজুর...তাকে কি তুমি কিছু করেছো?”

মাথা নিচু করে ফেলল জুলহাস।

ভুরু কুঁচকে গেল কমান্ডারের। “পালিয়ে গেছে?”

“না।”

“তাহলে?!”

“তাকে আমি শাস্তি দিচ্ছি।”

“শাস্তি দিচ্ছো?!” সামনের দিকে ঝুঁকে এল কাহার মিল্লাত। “কীভাবে?”

চুপ মেরে রইলো জুলহাস।

কাহার মিল্লাতও কয়েক মুহূর্ত দ্রুত ভেবে নিলো। “যদি বাঁচতে চাও, আমাকে বলো ‘বড় হুজুর’ কোথায় আছে? তাকে তুমি কী করেছো। তুমি বুঝতে পারছো না, জুলহাস। যা করেছো, শ্রাবন্তীর জন্যই করেছো! কিন্তু আইনের হাত থেকে এত সহজে বাঁচতে পারবে না।”

মুখ তুলে তাকালো জুলহাস।

“এই মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলবে, দীর্ঘদিন তোমাকে জেলে থাকতে হবে। মামলার এক পর্যায়ে বিচারক বুঝতে পারবেন তুমি কী করেছো। তিনি তোমাকে অবশ্যই রেহাই দেবেন কিন্তু সেটাও তোমার জন্য ভালো কিছু হবে না।”

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো ছেলেটা।

“তুমি হয়তো হিরো বনে যাবে কিন্তু ওরা তোমাকে ছাড়বে না। মামলা পর্যন্ত গেলে তোমার এই কাহিনী সবাই জেনে যাবে।” একটু থেমে আবার বলল কাহার মিল্লাত, “আর যদি আমার কথা শোন, তাহলে তুমি আজকের মধ্যেই, আমি এখান থেকে চলে যাবার পরই মুক্ত মানুষ হয়ে যাবে তুমি।”

কথাটা জুলহাস বিশ্বাস করলো কিনা বোঝা গেল না।

“জুলহাস, তুমি আমার হয়ে কাজ করেছো! আমার কথামতো জঙ্গিদলে ঢুকে সব তথ্য দিয়েছো। তাদের অপারেশনটা স্যাবোট্যাজ করেছো। নিরাপত্তার কথা ভেবেই তোমার পরিচয় গোপন রেখেছি আমি।”

উঠে দাঁড়ালো কমান্ডার। “এখন বলো, বড় হুজুরকে কী করেছো, কোথায় আছে সে?”

জঙ্গিরা সবাই ধরা পড়ার আগেই জুলহাস ওখান থেকে চলে যায় বাড্ডার সাতারকুলে বড় হুজুরের গোপন আস্তানায়। এই বাড়ির ঠিকানা কেবলমাত্র জুলহাস আর সোবহানই জানতো। ওখানে গিয়ে সে দেখতে পায় বড় হুজুর অপেক্ষা করছে টিভির সামনে বসে। জুলহাসকে দেখে একটু অবাক হয়েছিল হুজুর। তারপর অস্ত্র বের করে যখন লোকটাকে বাধ্য করে মাটিতে শুয়ে পড়তে তখন রীতিমতো বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছিল জঙ্গিনেতা। লোকটার হাত-পা-মুখ বেধে ঐ বাড়ির সব বাতি, ফ্যান বন্ধ করে দরজায় বড় তালা মেরে চলে আসে সে নিজের মহল্লায়। সোবহান এক মাসের জন্য ঢাকার বাইরে গেছিল। সুতরাং কেউই ঐ বাড়িতে আসবে না কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত।

কাছে এসে জুলহাসের কাঁধে হাত রাখল কাহার মিল্লাত। “আমি যা বললাম সেটাই তুমি করবে। তোমার বাবা-মায়ের জন্য...শ্রাবন্তীর জন্য!”

অশ্রুসজল চোখে কমান্ডারের দিকে তাকালো জুলহাস।

১৬/০৫/২০১৯

//জেডএস//

লাইভ

টপ