বলরাম আর ডাকবাংলো

Send
অর্ণব রায়
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, মে ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০১, মে ২৩, ২০১৯


আজ সন্ধেবেলা মাস্টার দুটো এসেছিল।

আসে তো কত লোকই। কিন্তু এই মাস্টার দুটো এলে বলরামের মনটা খানিক খুশি খুশি হয়ে ওঠে। এই দু’কুড়ি দশ পার করে যাওয়া বয়সে মন কি আর কচি বাছুরের মতন তিড়িং বিড়িং করবে? দুনিয়ার হালচাল দেখে দেখে চোখ হেজে যাওয়ার বয়স। সে ছিল মন ছেলেকালে। তখন অমন কুচুটে ছোটপিসি অবধি বাড়ি এলে মনটা সোনাব্যাঙের মতন লাফ পাড়ত। সে ছোটপিসি তাকে দু’চোক্ষে দেখতে পারত না। সামনেই বলত, কেলে বলা। গায়ের রংটা সূদন ধোপার এক নাদা কাপড় কাচার পর জলটার মতন ছিল তো! সে পিসির দুই ছেলেমেয়ে, দ্যাখো, বলরামেরই পিঠোপিঠি বয়স হবে, অথচ দেমাক সারাক্ষণ গ্যাটম্যাট গ্যাটম্যাট। যতবার আসতো বলরামের হরলিক্সের শিশি ভর্তি টিপ্পি মার্বেলের অর্ধেকের বেশি নিয়ে তবে যেত। সব কি আর খেলে জিততো বাপু? কিন্তু সেকথা বলতে যাও! প্রথমে ছেলেমেয়ে, তারপর তাদের মা মিলে শুধু তাদের বাড়ি কেন, গোটা গৌরপুর গাঁ মাথায় তুলে নিত। তবু ওরা এলে বলরামের একরাশ শাদা দাঁত ছিতরিয়ে হাসি বেরোতো। মনের ভেতর ফুটবলে সাতগোল দিতো। আর এখন, কেউ হাতে করে দুনিয়া তুলে দিলেও মনের কথা মন বলবে, ঠিক আছে, ভালো কথা। তাতে কী?

তবু ওরই মধ্যে এই মাস্টার দুটো এলে ভালো লাগে। এরা আসে। বাইক দুটো কম্পাউন্ডের ভেতরে রেখে সিঁড়িতে বসে।  বলরামকে হাঁক দিয়ে ডাকে। অবশ্য বলরাম হাঁক দেওয়ার আগেই বেরিয়ে এসেছে। মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক পেচ্ছাপ করতে কি পোয়া মাইল দূরে অমরের চায়ের দোকানে যায় না তা নয়। এসে দেখে, ওরা বসে আছে। চুপচাপ সিগারেট খাচ্ছে, নয়ত কথা বলছে। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় দু’জনে দু’জনের মতো বসে মোবাইল খোঁচাচ্ছে। অন্ধকারে মোবাইলের আলোয় ওদের মুখ ভূতুড়ে দেখায়।

বলরামকে দেখে ওরা বলে, সিগারেট খাও, বলরামদা।

বলরাম লজ্জা লজ্জা ভাব করে বলে, আরে না না। এই তো বিড়ি আছে।

বলে প্যাকেট খচমচিয়ে বিড়ি বের করে ফেলে প্রায়।

ওরা হৈ হৈ করে ওঠে, আরে বিড়ি তো রোজই খাচ্ছো। সিগারেট খাও একটা।

বলে তার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেয়।

তা বলে কি ফোকটে সিগারেট খেতে পায় বলে বলরাম ওরা এলে খুশী হয়? যতই খাতায় কলমে পাকা চাকরী না হোক, যতই মাইনের নামে হাতে যা আসে তা বড়ো তেমাথার মুখে বসে থাকা নুলো আব্বাস ভিখিরির খুচরোর থেকেও কম হোক না কেন, যতই মিউনিসিপ্যালিটির পিওন লাল্টু অবধি তার ওপর তড়পাক না কেন, সে, বলরাম হালদার, এই এত্তোবড়ো এলাকা নিয়ে ছড়িয়ে থাকা পৌরসভার একমাত্র ডাকবাংলোটির একমাত্র নাইটগার্ড বটে কি না? সরকারের লোক বটে কি না? তার কি বাঁশরীর গুমটি থেকে আলে-কালে একটা আধটা সিগারেট কিনে খাবার ক্ষমতা নেই? ওসব নয় ওসব নয়। হ্যাঁ ঠিক, মোটা মাস্টারটা গোল্ড ফ্লেক খায়। আর এখন একটা গোল্ড ফ্লেকের দামে সুন্দরী মাসীর হরেকৃষ্ণ হোটেলে তিনটে রুটি ঝালঝাল আলু কুমড়োর তরকারি দিয়ে মেরে হাত চাটতে চাটতে বেরিয়ে আসা যায়। আর সে ধোঁয়ার কী সোয়াদ! তেমন মিষ্টি গন্ধ ছাড়ে। বিড়ির মতন কি আর বদখদ! কিন্তু, ওসব নয় ওসব নয়। এরা বলরামের কাছে সময়ে অসময়ে দেশলাই চায়। কিন্তু অন্যদের মতন বোতল খোলার জন্য ঘর খুলে দেওয়ার আবদার করে না। সেসব ঝক্কি তো বলরামকে কম পোয়াতে হয় না! সরকারি জায়গা বলেই হয়ত মেয়েমানুষ নিয়ে আসার কথা বলে উঠতে পারেনি কেউ এখনও। যা দিনকাল, সেকথাও উঠে পড়লে বিচিত্র কী! তা, এতগুলো ঘরের চাবি ঝনঝনিয়ে বলরাম বলেছে, একটা ঘর খুলে দিই? ভেতরে এসে ফ্যানের তলে বসেন। লোকবসত থেকে এত দূরে শহরের একটেরে এই ভর সন্ধেবেলা কে আর দেখতে যাচ্ছে।

ওরা বলেছে, না না, এই তো বাইরে বেশ হাওয়া।

বলেছে আর চটপটিয়ে মশা মেরেছে।

সেই যেদিন সন্ধে থেকেই খুব গুমোট করেছে, গাছের একটা পাতাও নড়ে না, বিড়ির ধোঁয়া ছাড়লে সে ধোঁয়া মুখের সামনেই থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে, সেইদিন অনেক বলে কয়ে বলরাম যে ছয়কোণা ঘরটাতে রাতে, মানে শেষরাতের দিকে শোয়, সেই ঘরে ওদের আনতে পেরেছিল।

আর ঘর দেখে ওরা থ। হবে নাই বা কেন, বলরাম ভাবে।

ওর নিজের এই ঘরটাকে প্রথমবার দেখার কথা মনে পড়ে যায়। ওদের রকম-সকম দেখে মনে মনে, ছোটবেলার মতো দাঁত ছেতরিয়ে নয়, কিন্তু ঠোঁটের একপাশ দিয়ে বেশ ভালোরকম একটা বাঁকা হাসি হেসে নেয় বলরাম। ঠিক যেমন সক্কাল বেলায় বাজারে সবজিওয়ালার সবজিকে টাটকা বলে তারিফ করলে সবজিওয়ালা হাসে।

এই মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান তখন পশুপতি ভটচাজ। শোনা যায় ওঁর দাদুর আমল অবধি এই এলাকার অর্ধেকের বেশি অংশে ওদের মালিকানা ছিল। ক্রমে ক্রমে ইটভাটা কাঠমিল বাজারে হার্ডওয়ারের দোকান। তা পশুপতি ভটচাজ যখন চেয়ারম্যান হলেন, তখনও ফেলে ছড়িয়ে যা ছিল, তার ফিরিস্তি আমার আপনার মতন লোকের মাথাটা বোঁ করে ঘুরিয়ে দেবার জন্যে যথেষ্ট। এই পশুপতি ভটচাজের বাড়িতে বলরামের বাবা ফুট কাজ করত। কাজের কোনও ডান-বাঁ ছিল না। আজ গোয়ালঘরে খড় জ্বেলে মশা তাড়াচ্ছে তো কাল খোদ পশুপতি ভটচাজের ফাইল বগলে দুপুরবেলা মিউনিসিপ্যালিটি দৌড়োচ্ছে। শোনা যায়, তাকে দিয়ে নাকি ব্যবসা বা জমিজমার টাকাপয়সা বা গোপন খাতাপত্তরও এদিক ওদিক পাঠানো হত। কোনওদিনও চুলমাত্র অবিশ্বাসের কাজ করেছে বলে কেউ শোনেনি।

সেই বাবাকে দুম করে একরাতের মধ্যে হার্টফেলে হারিয়ে কাছা পরে তেঢ্যাঙ্গা কালো খসখসে, খড়ি ওঠা চুল, মুখে ব্রণের খদরাবদরা, রোঁয়া রোঁয়া দাড়ি আর গোঁফ নিয়ে বলরাম যখন পশুপতি ভটচাজের সদর উঠোনে খালিপায়ে দাঁড়ালো, ভটচাজের মুখে সত্যিই দুঃখ খেলা করতে দেখল সে। তিনি মাথাটা আফশোসের মতন দুদিকে নাড়িয়ে বললেন, তাই তো, হলধরটা যে অমন দুম করে মরে যাবে, আমরা একেবারে বুঝতে পারিনি। তা তোর নাম কী? ক ভাইবোন তোরা?

পাড়ার নদাকাকা আর ওসমান কাকা ছিল বলরামের সাথে। ওসমান বলে, জী ওরা দুবোন দুভাই। এই বলরামই আপনার সবচেয়ে বড়। সবকটা ওর পরে। আর ছোটোটা তো ধরেন গে মায়ের কোলঝাড়া। এখনও মাটির সাথে কথা কয়।

পশুপতি ভটচাজের কপালে দুটো ভাঁজ পড়ে। সেটা বলরামের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে, না কি ওসমানের আগ বাড়িয়ে গড়গড় করে কথা বলার জন্যে, বলরাম ঠাহর করতে পারে না।

ভটচাজ বলে, তোর তো একটা গতি করতে হয় রে। তোর বাপের কাজটাই তোকে দিতাম, কিন্তু তুই এখনও ছোট আছিস। আর একটু বড়ো হ, বুদ্ধিসুদ্ধি খানিক পাকুক, তখন ভেবে দেখা যাবে। তা লেখাপড়া কদ্দুর করেছিস?

বলরাম এতক্ষণ মাথা নিচু করে এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আর একপায়ের নখ দিয়ে মাটির ওপর আঁকিবুকি কাটছিল। প্রশ্ন শুনে তার সে আঁকিবুকি কাটার গতি বেড়ে গেল। যেন ওই বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়েই সে মাটির ভেতর সেঁধিয়ে যাবে।

তাকে ঢ্যাঁটার মতন ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পশুপতি ভটচাজ বিরক্ত হন। বলেন, আরে এ ছোঁড়াটা বোবা না কি? বলি ইস্কুলে পড়িস? আট কেলাস পাশ দিয়েছিস?  

বলরাম মাথা নিচু রেখেই দুদিকে মাথা নাড়ে, না।

তখন সেরকমই সব দিনকাল ছিল। বাবুদের বাড়ির লোকেরাই পার্টি করত। তাদের শাদা ধবধবে পোশাক। উঠোন থেকে চারধাপ ছয়ধাপ সিঁড়ি উঠে বারান্দা। দুপরে ভাতঘুম দিয়ে বাবুরা ফুলো ফুলো চোখমুখ নিয়ে সিংহাসনে বসার মতন করে চেয়ারে বসতেন। আর সেই চেয়ারে বসে যা বলতেন, সেই মুখের কথাতে লোকজনের চাকরি হত। সরকারি চাকরি।

এখন বলরাম ভাবে, নাহ, তার কপালটাই মন্দ! নয়ত অমন সস্তাগণ্ডার দিনেও তার চাকরি পার্মানেন্ট হয় না! সেই যে কাছাপরা অবস্থায় মাথাগুঁজে থাকাকালে পশুপতি ভটচাজ বলে দিলেন, শোন, মিউনিসিপ্যালিটির একখানা ডাকবাংলো হয়েছে গত বছর, সে খবর জানিস তো? বাইরে থেকে বড়ো বড়ো লোকজন এলে থাকবে। বিয়েশাদির অনুষ্ঠানও হতে পারে। তা ওটা তৈরি হওয়া ইস্তক পড়েই আছে। তুই ওটাতেই আপাতত দিনের বেলাটা থাকা শুরু কর। পাম্পটাম্প চালিয়ে জল তুলবি। মেথর মালি মজুর সব কাজ করবে, ওদের কাজকম্মো দেখাশুনো করবি। আজেবাজে লোকজন যাতে আড্ডা না জমায়, সেদিকটা লক্ষ রাখবি। এইসব। রাতে থাকার জন্য রাখাল তো আছেই। দিনের বেলাটা তুই আপাতত থাক, তারপর দেখা যাচ্ছে।

না কোনও মাইনের কথা, না লিখিত পড়িত কিছু। চাকরি হয়ে গেল। প্রথমের দিকে কয় বছর বলরাম দিনের বেলা চৌকিদারি করেছে। তারপর রাখালকে তার ভায়রা ভাই ব্যবসার লোভ দেখিয়ে জলপাইগুড়ি না কোথায় নিয়ে চলে গেলে ভটচাজকে বলে কয়ে রাতের ডিউটিটা চেয়ে নেয়। রাতের ডিউটিতে করার আছেটাই বা কী? সন্ধে হলে গিয়ে চাবি বুঝে নাও। ঘরদোর জানালা দরজা তালা ছিটকিনি সব টর্চ মেরে মেরে দেখে নাও। তারপর ইয়াব্বড়ো যে ছয়কোণা ঘরটা তোমাকে দিয়েছে, যেখানে একখানা সেগুন কাঠের খাট, না খাট না পালঙ্ক, সেই পালঙ্কে তোফা ফ্যানের তলায় বসে পা দোলাও, বিড়ি খাও, উস্তুম কুস্তুম ভাবো। তারপর চোখের পাতা ভারি হয়ে এলে সেই পালঙ্কের ওপরেই হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।

এমনটাই বলে এসেছে রাখালদা। এমনটাই শুনেও এসেছে বলরাম। কিন্তু সেই যে রাতের ডিউটির চাবি বুঝে নিলো, তারপর থেকে তার জীবনটা সেরকম সুখের হল কই!  

ডাকবাংলো না ডাকবাংলো। বলরাম খুব একটা বারমুখো ছিলোও না কখনও। মাঝে মাঝে এদিকপানে এলেও, বাড়ি না বাড়ি, তৈরি হচ্ছে। কোনওদিন ঘুরেও দেখেনি। শুনেছে মিনসিপ্যালটি থেকে ডাকবাংলো তৈরি হচ্ছে, বলরামের ইচ্ছেও হয়নি যে, যাই দেখে আসি। সেই প্রথমবার, প্রথমবার পশুপতি ভটচাজের লোক গাগলুর সাথে ভেতরে ঢুকে সবটা ঘুরে ঘুরে দেখল। দেখল আর হাঁ হয়ে গেল না টেরিয়ে গেল না কী যে হল, বলরামই আজ পর্যন্ত বলে বোঝাতে পারেনি, তো আমরা কী বলব। শুধু মনে আছে, একটা কথাই তার বারবার মনে হচ্ছিল, বাপরে কী পরিষ্কার! মেঝেতে শাদা পাথর। তাতে হালকা সবজে সবজে শিরার মতন। এত মোলাম যে চটি পায়ে চলতে বাধোবাধো ঠেকে। চটি খুলে বলরাম মেঝেতে পা রাখে। কী ঠান্ডা রে!

সেই যে সেই ঠান্ডা পায়ের তলা থেকে পা বেয়ে কোমর পেট বেয়ে বুক বেয়ে চোঁ করে মাথায় উঠে মাথার ঘিলুটাকে চড়াম করে জমিয়ে দিলো, সে আর এজন্মে ঠিক হল না। তার সাথে যোগ হল মসৃণ, হেমামালিনীর গালের মতন দেওয়াল। দিনের পর দিন রাতের পর রাত বলরাম এই দেওয়ালগুলোয় হাত বুলিয়েছে। হাত বুলোতে বুলোতে এঘর ওঘর করেছে। রাত ডিউটি পেয়ে রাতের পর রাত ঘুমোয়নি। দিনের বেলা যেমন তেমন। মালি কুদরত সেখ আসে। সপ্তায় একদিন বনোয়ারী এসে বাথরুম পায়খানা আর ড্রেনগুলো সাফ করে দিয়ে যায়। তাছাড়া বিকেলের দিকে ছেলেপুলে ব্যাটবল খেলতেও আসে কখনও সখনও। দিনের ডিউটিতে এসব দেখেছে বলরাম। কিন্তু রাত! রাত হলে কেউ নেই। বলরাম আর এই ডাকবাংলো। দিন মাস বছর কেটে গেছে। বলরাম বুঝতেই পারেনি, এই এতবড় বাড়ি, এতগুলো বড় বড় ঘর, দুখানা হলঘর বারান্দা—আর এত বড় রাত, এ নিয়ে সে কী করবে! তাই তো, রাতের পর রাত দেওয়ালে হাত বুলিয়ে এঘর ওঘর করেছে। কেউ দেখছে না জেনে দেওয়ালে গাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে কতোক্ষণ। বড়ো হলঘরের ঠিক মাঝামাঝি মেঝেতে বসে পড়েছে। যে ঠান্ডা প্রথম দিন তার পায়ের তলা বেয়ে উঠে মাথার মধ্যের ঘিলু জমিয়ে দিয়েছিল, সেই ঠান্ডা সে হাতের চেটো পেতে অনুভব করেছে। তাতেও না কুলালে, সেই গভীর রাতে জামাকাপড় সব খুলে, সম্পুর্ণ উলঙ্গ, উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাথরের মেঝের ঠান্ডা তার গন্ধ স্পর্শ বলরামের পা হাঁটু থাই বুক মুখ হাত পুরুষাঙ্গ দিয়ে তার শরীরে ঢুকে গেছে বিন্দু বিন্দু।

প্রথম প্রথম লাইট জ্বেলে ঘোরাফেরা করতে হলেও বছর ঘুরতে না ঘুরতে, যা হয় আরকি, বাড়ির প্রতিটি কোণা ধাপ ইঞ্চি ইঁদুরের খচমচ সব চেনা হয়ে যায়। তখন তার চোখ অন্ধকারে পেছনের বাগানের ভামগুলোর থেকেও ভালো চলে। ততোদিনে টর্চ রাখতে হয় তাই রাখা। ততোদিনে রাত হলে বাড়িটা বলরামকে টানে। (সে টান আপনারা নিজেদের সুবিধে মতন যা যা অপ্রতিরোধ্য, মিষ্টি, মদ, সিগারেট, মেয়েমানুষ, স্বামীর বেতনের দিনে মার্কেটিংয়ে যাওয়া, যা ইচ্ছে ভেবে নিতে পারেন)। ততদিনে বলরাম এক বোনকে পার করে দিয়েছে। বাকি দু’ভাইবোন ইস্কুলে পড়ে। বলরাম নিজেও ঘেমেনেয়ে ছাদনাতলায় দাঁড়িয়ে পড়েছে।

নতুন বৌ। নামও নবীনা। চটক আছে একখানা আলগা। গতরও মন্দ কী! কিন্তু টান হল কই? দিদি শাশুড়ি বলল, পুরুষমানুষ রেতের কালে ঘরে না থাকলে ঘরের মাগের ওপর টান থাকে?

নতুন বৌ, নাম নবীনা, তাত খেয়ে বলল, হ্যাঁ গা, তোমার ডিউটিখানা দিনের বেলা করো না কেন!

বলরাম বলল, দেখি। চেয়ারম্যানকে বলে দেখি।

ততোদিনে পশুপতি ভটচাজ দুনিয়া থেকে ফরসা। যা হোক একটা মাইনে যেটা বলরাম হাতে পায়, সেটা আনতে ফি মাসের প্রথমেই পৌরসভার বাড়িতে যেতে হয়। কাজটা হোক না হোক, চেয়ারম্যানকে বলাটা এমন কিছুই কঠিন নয়। বললেই হল। বলরাম বলতে পারে না। তাকে কিসে আটকায়, বুঝতে পারে না। 

বেশি পেড়াপেড়ি করলে, নতুন বৌকে মিথ্যে বলে। বলে, বলেছি। চেয়ারম্যান বলেছে, দেখছি। বোঝোই তো, বিশ্বাসী লোক পাওয়া কঠিন।

তা বৌয়ের কাজ বৌ করেছে। সন্দেহ করেছে, বলরাম অন্য মেয়েমানুষের চক্করে আছে। তা নিয়ে কয়েকদিন খুব ঠারে ঠারে বাঁকা কথা মান অভিমান চালিয়েছে। বলরাম বৌয়ের আচরণে তাজ্জব খেলেও ভেবেছে, সোয়ামী রাতে ঘরে থাকতে পারে না বলে হয়ত এরকম। তারও রাগ হয়েছে। রাতে থাকতে পারি না তো কী হয়েছে বাপু, সকাল থেকে চৌপর বেলা সংসারের ঊনকোটি চৌষট্টিটা কাজ করে দিচ্ছি না? তোমার সাধ আহ্লাদ, মেলায় বেড়ানো, কাঁচপোকা টিপ সাধ্যমতন কোনটা বাকি রেখেছি? তাও এত দেমাক কেন? এমনকি আপদকে ঘাড় ধরে বাপের বাড়ি পাঠানোর কথা অবধি ভেবে ফেললেও, তার বৌ যে তাকে অন্য মেয়েমানুষ নিয়ে সন্দেহ করে, একথা তার মাথার আশেপাশেও ভনভনায়নি। এতে আপনারা বলরামকে গাড়ল বললেও, এই পদ্ধতিতে এই জায়গা থেকে গল্পটির অন্য খাতে বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বন্ধ করা গেল।

টান থাক না থাক, জীবচক্র থেমে থাকে না। কথার পিঠে কথার মতন বলরামের মেয়ে আসে দুনিয়ায়। বাপ হয়ে গিয়ে বলরাম বড়োই থতমত খেয়ে যায়। ওই সাইজের একখানা হাত পা নাড়া গোটা মানুষ নিয়ে কী করতে হবে বুঝতে বুঝতেই মেয়ে তার ওইটুকু থাকল কই! তারই মধ্যে হাম, জ্বর, টিকা নেওয়া, সাইকেলে ঘোরানো সবই করেছে বলরাম। মানে যতোটা বাপের পক্ষে করা যায়।

এদিকে ডাকবাংলোরও গায়ে গতরে বয়স লেগেছে। বাইরের সাদা রংয়ে কালো কালো ছোপ পড়েছে জায়গায় জায়গায়। ছাদের নালিগুলো দিয়ে বর্ষায় বর্ষায় জল পড়ে পড়ে দেওয়ালের গায়ে শ্যাওলার লম্বা লাইন। দিন যাচ্ছে, শহর পাল্টাচ্ছে, লোকজনের মন মানসিকতাও আর আগের মতন থাকছে না। আগে লোকে নিজের বাড়িতেই ছেলেমেয়ের বিয়ে থা দিত। ক্রমে শহরে জায়গার অভাব হল। বিয়ে-থাওয়া শ্রাদ্ধ অন্নপ্রাশন সবেতেই লোকে এই ডাকবাংলোতে ভিড় করতে লাগলো। আর এটা তৈরিও তো হয়েছিল এই উদ্দেশ্যেই। লোকে ডাকবাংলো ভাড়া নিচ্ছে, পৌরসভা টাকা পাচ্ছে, আর বলরাম ফ্রিতে ভোজবাড়ির চর্ব্যচোষ্য শুধু খেতে পাচ্ছে না, বাড়ির জন্য একফাঁকে বেঁধেও নিয়ে যেতে পারছে। আজ এই কাজ যদি সে না করত, তার ক্ষমতা ছিল বৌ মেয়ের মুখে হামেশাই অমন মাছমাংস পোলাও কালিয়া তুলে দেওয়ার!

তবু ডাকবাংলোতে অনুষ্ঠান লাগলে বলরামের মনের ভেতর অম্বলের মতন কিছু একটা চোঁয়ায়। সে আলো ঝলমল বাড়িটার চারপাশে, ভেতর বাইরে, ঝকঝকে লোকেদের মাঝে ভূতের মতন ঘুরে বেড়ায়। লোকে দেখে, বাঁদিকের টুনিটা জ্বলছে না রে! ডাক বলরামকে। বলরাম দেখে, ওই শালা বেগুনী জামা পড়া লোকটা সিগারেট খেয়ে ঘরের মধ্যেই ফেললো। তারপর মেঝেতে পা দিয়ে পিষে নেভালো। মেঝেতে ছাইয়ের একটা কালো লম্বা দাগ হয়ে গেলো। লোকে দেখে, ও বলরাম, বাথরুমে মগ রাখা নেই কেন? বলরাম দেখে, বেসিনে লোকজন মুখ ধুতে ধুতে হাত ধুতে ধুতে কুলকুচি করতে করতে বেসিনের পাইপ জাম হয়ে যাচ্ছে। বেসিন থেকে নোংরা জল উপচে আসছে। ডাকবাংলোর পেছন দিকের ছোট চাতালটা, যেখানে এখন ক্যাটারারের লোকেরা ছাগল কাটে, সেখানে জল দিয়ে দিয়েও থকথকে রক্ত যাচ্ছে না। মাছি ভনভন করছে। লোকে পেচ্ছাপ করে জল দিচ্ছে না। দাঁত খোঁচানোর কাঠি যেখানে সেখানে ফেলছে। রান্নার ঘরের মেঝেতে পা দেওয়া যায় না, এত তেলচিটে। বেসিনের আয়নাগুলোয় কিছুতেই আর মুখ দেখা যায় না। বলরাম আর কত বলবে! সে তো নাইটগার্ড। প্রথম প্রথম রাতের ডিউটি পার করে সকাল পার করে আধবেলাখানেক থেকে মেথরদের খুব বলেছে ভালো করে সাফসাফাই করার জন্য। তারাও খিটখিট করেছে। পৌরসভায় বলতে গিয়ে ধাতানিও খেয়েছে বলরাম। আস্তে আস্তে বলা ছেড়ে দিয়েছে।

এখন সে অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে কখন অনুষ্ঠান শেষ হবে। নিজের খাওয়াদাও মিটে গেলে, বাড়িতে পাঠানোর থাকলে পাঠিয়ে এখন সে একপাশে পাঁচিলের ধারে চুপ করে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকার হয়ে অপেক্ষা করে। শুধু বিড়ির আগুন তার ধৈর্যের মতন জুগজুগ করে জ্বলে। তারপর এক এক করে সব লোক চলে যায়। ক্যাটারার বাসনপত্র গুটিয়ে ম্যাটাডর ভটভটিয়ে কম্পাউন্ডের বাইরে চলে গেলে ঝিঁঝি আর ব্যাঙের ডাকের মধ্যে বাড়িটা হাতপা ছিতিয়ে পড়ে থাকে। তার ভেতরে খাবারের গন্ধ পাক খায়। বাসি ফুলের চাপ গন্ধ, ধোঁয়া আর এত মানুষের এত রকমের সেন্টের গন্ধ পাক খায়। বলরাম সব জানলা খুলে দেয়। সব ফ্যান চালিয়ে দেয়। মেইন গেটে তালা মেরে নিজের ঘরে এসে চুপ করে বসে থাকে। সব গন্ধ শব্দ বেরিয়ে গেলে অন্ধকারের মধ্যে বাড়িটাকে তার চেনা মনে হয়। নিজের মনে হয়।

তেমনই চুপ করে বলরাম বসে রইল যখন, সেই যে বৌ, নাম নবীনা, এখন চটক মটক সব চলে গিয়ে কলতলার আর পাঁচটা বৌয়ের মতনই, বলল, বয়স তো হল, এবার মেয়েটার বিয়ে থা দেওয়ার কথা চিন্তা করো।

না, গেরস্থ বাড়িতে অমন সিনেমার মতন করে স্ত্রী-রা স্বামীদের একথা বলে না। মেয়ের কি ছেলের বিয়ের কথা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয় আস্তে আস্তে। বেশ কিছুদিন ধরে। খণ্ড খণ্ড করে। আর বলরামও কিছু উদো পুরুষমানুষ নয় যে বৌ তাকে পাখিপড়া করে সব কথা বুঝিয়ে দেবে তবে সে বুঝবে। দুনিয়ার ডান-বাঁ ভালোই জ্ঞানগম্যি আছে তার। মেয়ে বড়ো হয়েছে। কলেজে পড়ছে। এসব তো আর হাওয়ায় হাওয়ায় হয়নি। তার স্কুল কলেজের খরচ, টিউশন মাস্টারের মাইনে, একটা বয়স অবধি সাইকেলের পেছনের কেরিয়ারে বসিয়ে দিয়ে আসা নিয়ে আসা, সব বলরামের ওপর দিয়েই তো গিয়েছে। মেয়ের বিয়ে আজ হোক কাল হোক দিতে তো হবেই।

কিন্তু টুসকির মা যখন দু’একদিন পরে বলল, মেয়ে বোধহয় পাত্র নিজে নিজেই ঠিক করে রেখেছে, তখন বলরামের ভেতরে সেই অম্বল চোঁয়ানো অনুভুতিটা ফিরে এলো। না, বাপ হয়ে মেয়ের পাত্র নির্বাচন করার সুযোগ বা অধিকার হারানো ইত্যাদি ব্যাপার নয়, বরং তার মন গুরগুর করে উঠল, আজ না হোক কাল নয়, বিয়েটা এবার দিতেই হবে।

দুনিয়াটা এমনিতে মন্দ জায়গা হলেও, আমাদের গল্পের ভেতরের দুনিয়াটা মন্দ জায়গা নয়। এখানে বলরামের মেয়ের পছন্দ করা পাত্রটি কমবয়সী এক প্রাইমারি মাস্টার হয়। সরকারি চাকরি দেখে বলরামের আর কিছু বলার থাকে না। তার ওপর খোঁজখবর করে দেখা যায়, স্বভাবচরিত্র ভালো, ফ্যামিলি ভালো। শুধু বড্ডো দূর, এই যা। সেই বর্ধমান। মোটকথা বিয়ে ঠিক হয়ে যায় ও দিনক্ষণ হাওয়ায় চেপে হুড়মুড় করে এগিয়ে আসে।

বলরাম গিয়ে চেয়ারম্যানের সামনে দাঁড়ায়।

চেয়ারম্যান বলরামকে দেখে হেসে বলেন, শুনেছি। কবে?

বলরাম বলে, আজ্ঞে ডিসেম্বরের বাইশ। ডাকবাংলোটা যদি…

চেয়ারম্যান বলেন, সে আর বলতে। তুমি এতদিন ধরে সার্ভিস দিচ্ছো।

বলরাম বলে, আজ্ঞে ভাড়াটা যদি একটু…

চেয়ারম্যান হাত দিয়ে মাছি তাড়ান, আরে ও নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি এমপ্লয়ি। যা পারবে দেবে।

বলরাম প্রণাম করতে যায়। চেয়ারম্যান চওড়া টেবিল টপকাতে দেন না।

বলেছিলাম না, আমাদের গল্পের ভেতরটা খুব ভালো জায়গা।

দিন আরও এগিয়ে এসে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল আর বলরাম কন্যাকর্তা সেজে বসল। এবার তাকে কোরা ধুতি পরে কন্যাদান করতে বসতে হবে। এবার তাকে মাথায় এককোটি চিন্তা নিয়ে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে হবে। রান্নার লোক রে, অতিথি স্বজন রে, ক্যাটারার রে, বরযাত্রী রে—সব সব সব দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এর মাঝেই দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে এনে সিংহাসনের মতন চেয়ারটাতে বসানো হয়। ওই চেয়ারে নেই নেই করে একশো দেড়শো মেয়েকে কনে সেজে বসতে দেখেছে বলরাম। আজ তবে কেন ঘুরেফিরে কাজে অকাজে মেয়েটাকে একপলক হলেও দেখছে সে? দেখছে আর একটু একটু করে কোথাও যেন কিছু মুচড়ে উঠছে। মেয়ের পিসি মাসি সব মিলে তাকে ধরে নিয়ে গেল মেয়ের সামনে।

—ও দাদা, ও জাঁইবু, একবার দেখেন। মেয়েকে কেমন লাগছে বলেন।

বলরাম মাথা নেড়ে অনেক কাজ অনেক কাজ বলে পালিয়ে আসে।

সব মিটে যায়। বলরাম বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ায়। পৃথিবীর সব মেয়ের বাবার মতন ভাবে, যাক ভালোভাবে মিটে গেল। বিড়ি বের করতে গিয়ে খেয়াল পড়ে, শালাবাবু কখন যেন এক প্যাকেট সিগারেট ঢুকিয়ে দিয়েছিল পকেটে। মেয়ের বাবা বলে কথা। ‘মেয়ের বাবা’ কথাটা ফস করে দেশলাইয়ের আগুনের সাথে বলরামের মুখের সামনে জ্বলে ওঠে। মেয়েটা তো কাল সকালেই চলে যাবে। সেই বর্ধমান। চোখের সামনে ইঞ্চি ইঞ্চি করে বড়ো হয়ে ওঠা মেয়েটাকে দেখবার জন্য রাস্তায় চোখ পেতে রাখতে হবে। কাল সকালে এই বাড়ি থেকেই বিদায় হয়ে যাবে। মা বাবাকে রেখে যেভাবে এতদিন অন্যলোকের মেয়েদের যেতে দেখেছে। তারপর থাকবে বলরাম আর এই ডাকবাংলো। যেভাবে সব বিয়েবাড়ি শেষ হলে থাকে।

বলরাম এখানে দাঁড়িয়েই সেই ফাঁকা বাড়ির মেঝের ঠান্ডা তার পায়ের তলায় টের পাচ্ছে। সে ঠান্ডা তার পা বেয়ে কোমর বেয়ে পেট বেয়ে উঠে তার হৃৎপিণ্ড জমিয়ে দিচ্ছে। সে মনে মনে প্রাণপণে সব ঘরের জানলা দরজা আরও ভালো করে আটকে দিচ্ছে। যাতে খাবারের ফুলের মানুষের হাসির আনন্দের গন্ধ শব্দ একফোঁটাও না বেরিয়ে যায়। যাতে এই বিয়েবাড়ি কিছুতেই না ফুরোয়।  

//জেডএস//

লাইভ

টপ