সেই জিনিসটা || দানিল খার্মস

Send
অনুবাদ : দিলওয়ার হাসান
প্রকাশিত : ১১:০০, মে ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০০, মে ২৬, ২০১৯

দানিল খার্মস ১৯০৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম দানিল ইভানোভিচ ইওভাসেভ। তিনি ছিলেন স্যুররিয়ালিস্ট ও অ্যাবসার্ড ধারার কবি, লেখক ও নাট্যকার। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে ক্ষমতায় এলেও সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যখন নিজেরাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে তখন খার্মস প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। ১৯৩১ ও ১৯৪১ সালে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়, সেখানে কাগজ-কলম কেড়ে নিয়ে তাকে চুপ থাকতে বলা হয়। ১৯৪২ সালে লেনিনগ্রাদে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ১ ফেব্রুয়ারি খার্মস জেলখানার ভেতরেই মারা যান।

মা, বাবা আর গৃহপরিচারিকা নাতাশা একই টেবিলে বসে মদ পান করছিল।

বাবা দারুণ রকমের মদারু। মা এই নিয়ে কম চিন্তিত নয়; কিন্তু বাবা এ সবের তোয়াক্কাই করে না। একটা চেয়ারে দুলতে-দুলতে মুচকি-মুচকি হাসছিল—নির্মল আর নিষ্পাপ সেই হাসি। নাতাশা একটা ঝালর দেওয়া অ্যাপ্রোন পরে আছে। খুবই লাজুক লাগছে তাকে। বাবা দাড়িতে আঙুল চালানোর ক্রীড়ায় মগ্ন, লজ্জায় চোখ নামিয়ে রেখেছে নাতাশা—সে লজ্জা পাচ্ছে।

মা খুব লম্বা মহিলা, আজ চূড়া খোঁপা বেধেঁছে, ঘোড়াদের স্বরে কথা বলছে। তার কণ্ঠস্বর সারা ডাইনিংরুমে ছড়িয়ে গিয়ে বারান্দা আর অন্য ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

প্রথম রাউন্ডের মদ্য পান শেষ করার পর সবাই নীরবে সসেজ খাচ্ছিল। একটু পরে তারা কথাবার্তা বলতে লাগল।

হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে দরজায় টোকা শোনা যায়। মা, বাবা কিংবা নাতাশা কেউ-ই অনুমান করতে পারে না যে, এ সময় কে এলো।

বাবা বলল, ‘আশ্চর্য! কে হতে পারে?’ মা তার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাল। তার পালা না হলেও গ্লাসে মদ ঢালল, শব্দ করে টেবিলে রাখল, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

বাবা বেঁটেখাট মানুষ, মায়ের একেবারে উল্টো। মা লম্বা চওড়া, নাদুস নুদুস, ঘোড়াদের মতো গলার আওয়াজ, বাবা কেবলমাত্র তার স্বামী। তার সারা মুখে মেছতার দাগ।

সে দরজার কাছে গিয়ে বলল, ‘কে?’ দরজার পেছন থেকে কেউ একজন বলল, ‘আমি।’ দরজা খোলার পর দেখা গেল একজন চাকরানি। নাতাশা সহ অন্য সবাই বিভ্রান্ত, লজ্জাও পাচ্ছিল—ফুলের মতো, হ্যাঁ ফুলের মতো দেখতে সে।

বাবা বসে পড়ল।

মা আর একটুখানি মদ নিল।

নাতাশা আর আজ যে নতুন এসেছে, দেখতে ফুলের মতো, লজ্জায় একেবারে জড়সড় হয়ে আছে। বাবা তাদের দিকে তাকাল, তবে বকা-টকা দিল না; বরং সে আর একটুখানি মদ ঢালল গ্লাসে, মা-ও তাই করল।

বাবা টক আপেলের পেস্ট্রির একটা কৌটা খুলে একটুখানি খেল যাতে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।

সবাই তখন খুব হাসিখুশি। খানাপিনা চলল সকাল অবধি। কিন্তু মা একেবারে স্তব্ধ হয়ে পড়ল। চেয়ার থেকে উঠতেই পারছিল না। খুব নাজুক একটা অবস্থা।

বাবা তখন একটা গান গাওয়ার উদ্যোগ নিলে জানালায় একটা আঘাতের শব্দ হলো। মা ভয়ে লাফিয়ে উঠল, আর বলল জানালার বাইরে থেকে কে যেন তাকিয়ে আছে। সবাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, এটা তিন তলা, রাস্তার দিক থেকে কারও পক্ষে এ ভাবে তাকানো সম্ভব নয়, তা ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানো যে-ই হোক না কেন।

কিন্তু তা সে মানতে নারাজ। কেউ তাকে বোঝাতে পারবে না জানালা দিয়ে কেউ উঁকি দেয়নি। শান্ত করার জন্যে তাকে আরও এক পেগ মদ দেওয়া হলো। মা গ্লাসটা ঠক করে টেবিলে রাখল। বাবাও আর একটুখানি মদ নিল।

নাতাশা আর ফুলের মতো দেখতে মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে। তারা নানা রকমের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছে। ‘জানালা দিয়ে কেউ বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকলে মোটেও ভালোলাগে না আমার।’ বলল মা।

মাকে আশ্বস্ত করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠল বাবা। কিন্তু কী করে তাকে শান্ত করবে? সে বাধ্য হয়ে নিচের আঙ্গিনায় নেমে এসে ওপরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল আসলেই ওখানে কেউ আছে কিনা।

একেবারেই অসম্ভব ব্যাপারটা। কিন্তু মাকে তা কে বোঝাবে? শেষমেষ বাবা কিচেনে গিয়ে ভালো করে দু’পেগ মদ বানিয়ে এনে টেবিলে রাখল। নিজে এক পেগ নিয়ে আর এক পেগ স্ত্রীকে দিল। পানীয় গলাধঃকরণ করে মা বলল, তাদেরকে জানালার বাইরে থেকে কেউ দেখছে, শুধু এই কারণে সে এইটুকু পান করেছে।

বাবা হাত বাড়িয়ে জানালাটা খুলে মাকে বলল—এই দেখ। নোংরা একটা কোট গায়ে ছুরি হাতে একটা লোক জানালা গলিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। এ দৃশ্য দেখে বাবা দ্রুত জানালা বন্ধ করে বলল—কেউ নেই ওখানে।

কিন্তু লোকটা জানালা দিয়ে তাকিয়েই রইল। শুধু তা-ই নয় জানালা খুলে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এতে খুবই বিরক্ত হলো মা। সে উন্মাদের মতো করতে লাগল। বাবা তাকে যে পানীয়টুকু দিয়েছিল তা শেষ করে একটুখানি মাশরুম খেল। অতপর শান্ত হলো সে। বাবাও শান্ত হলো। আবার সবাই টেবিলে গিয়ে বসল আর মদ্যপান শুরু করল।

বাবা কাগজ নিয়ে বেশ খানিকটা সময় ধরে সামনে-পেছনে ওল্টাতে লাগল এটা বুঝতে যে, কোনটা ওপরে আর কোনটা নিচে। যতটা সময়ই সে এ বাবদে খরচ করুক না কেন, ব্যাপারটা সুরাহা করতে পারল না। কাগজগুলো পাশে সরিয়ে রেখে মদ পানে মনোযোগ দিল। ‘বেশ ভালো,’ বলল বাবা, ‘আমাদের আচার কিন্তু শেষ।’

মা ঘোড়ার মতো একটা আওয়াজ করল, যা ছিল খুবই অযথার্থ। এতে পরিচারিকাদের দৃষ্টি টেবিলক্লথের দিকে আকৃষ্ট হলে তারা নীরবে হাসতে লাগল।

বাবা আর এক পেগ মদ গলাধঃকরণ করে মাকে আকড়ে ধরল, তারপর তাকে বসিয়ে দিল আলমারির ওপর। মায়ের পাকা, বড় বড় হালকা চুল কাঁপছিল। তার সারা মুখ ছেয়ে গিয়েছিল লাল লাল চাকা চাকা দাগে। এক কথায় বলতে গেলে সে খুব উতলা হয়ে পড়েছিল।

বাবা নিজের প্যান্ট ঠিকঠাক করে নিয়ে বক্তৃতা দিতে শুরু করল। সেই সময় মেঝেতে একটা গোপন কুঠুরি দেখা দিল, আর সেখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল একজন সাধু।

পরিচারিকারা এত বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল যে, তাদের একজন বমি করতে লাগল। নাতাশা বাম হাত দিয়ে তার কপাল টিপে ধরল, যা ঘটছিল তা লুকানোর চেষ্টা করল।

গোপন কুঠুরি থেকে যে সাধু বেরিয়ে এসেছিল, বাবার কান লক্ষ্য করে এমন জোরে একটা ঘুষি মারল যে, তার ফলে বাবার মাথায় যে ঘণ্টাধ্বনি বাজল সবাই তা শুনতে পেল। বক্তৃতা শেষ না করেই বসে পড়ল বাবা। সাধুটি তখন এগিয়ে গেল মায়ের দিকে তারপর নিচ থেকে হাত কিংবা পা দিয়ে মারল এক লাথি। মা চিৎকার করে সাহায্য প্রার্থনা করল।

এরপর সাধু পরিচারিকাদের অ্যাপ্রন ধরে বাতাসে ঘোরাতে ঘোরাতে এমনভাবে ছেড়ে দিল যে, তারা দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল। সাধু তখন সবার অলক্ষ্যে হামাগুড়ি দিয়ে মেঝের গোপন কুঠুরিতে ঢুকে তা বন্ধ করে দিল।

দীর্ঘ সময়ের জন্য বাবা, মা আর নাতাশা আত্মস্থ হতে পারল না। পরে খানিকটা তাজা হাওয়া পেয়ে নিজেদের ঠিকঠাক করতে করতে আর এক পাত্র করে মদ পান করল, তারপর টেবিলে গিয়ে সালাদ খেতে শুরু করল। আরও এক পেগ করে মদ্যপান করে তারা নীরবে কথাবার্তা বলতে লাগল।

হঠাৎ বাবার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠল আর সে চিৎকার করে বলতে লাগল : কী, কী ভাব তোমরা? পোঁদ মারাই? অ্যা? তোমরা আমার দিকে এমনভাবে তাকাও যেন শয়তানকে দেখছ! তোমাদের ভালোবাসার কোনো দরকার নেই আমার। সব শয়তানের দল! এসব কথা শুনে মা আর নাতাশা এক দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। মা আর পুরোপুরি ঘাবড়ে যাওয়া নাতাশা ফিসফিস করে বলতে লাগল—বের হও এখান থেকে, একেবারে বদ্ধ মাতাল হয়ে গেছে।

বাবা সকাল অবধি ডাইনিং রুমেই বসে রইল। এক সময় ব্যাগটা হাতে নিয়ে সাদা একটা হ্যাট মাথায় দিয়ে চুপচাপ কাজে চলে গেল।

//জেডএস//

লাইভ

টপ