২য় পর্ব আমি মনে করি চরম সত্য বলে কিছু নাই : সৈয়দ জামিল আহমেদ

Send
শ্রুতিলিখন : মাসুদ আল-হাসান
প্রকাশিত : ০৮:০০, জুন ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৮, জুলাই ০৪, ২০১৯

বাংলা ট্রিবিউন ঈদ সংখ্যা ২০১৯-এ প্রকাশিত অংশের পর থেকে

সুতরাং আপনি যদি মনে করেন নাটক করতে গেলে এটা এটা করতে হয়, মানে একটি নির্দিষ্ট ছক রয়েছে যেগুলো না মানলে নাটক হয় না, তারপর যদি থিয়েটার করা শুরু করেন; অভিনয় করা শুরু করেন, তাহলে আমার মতে এখানে গণ্ডগোল আছে। কারণ আপনি প্রশ্ন করছেন না, প্রশ্ন তুলছেন না।

আমি নির্মাণ করতে পছন্দ করি এবং আমি মনে করি চরম সত্য বলে কিছু নাই। আমি নাটকের ক্ষেত্রে, থিয়েটারের ক্ষেত্রে বোঝার চেষ্টা করি এখানে টেক্সটটি কী এবং সেটা দর্শকের কাছে কী অর্থ বহন করে, দর্শকের কাছে কী অর্থ পৌঁছে দিতে চায়, সেটা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমার যা করার দরকার, একজন পরিচালক হিসেবে দর্শকের জায়গায় বসে আমি সেগুলো করার চেষ্টা করি। এবং আমার কাছে এটা হয়তো আপনার প্রশ্নও যে থিয়েটারের সাথে যুক্ত হতে হয় কীভাবে এবং এর কোন স্থানগুলো এটা গুরুত্বপূর্ণ।

আমি মনে করি একজন পরিচালকের উচিত সবসময় তার চারপাশে কী ঘটছে সেটা খেয়াল করা। যেমন আমি যখন বাজারে যাই, যে মানুষটি মাছ বিক্রি করছে, আমি বোঝার চেষ্টা করি সে আমার থিয়েটার দেখতে আসবে কিনা, কিংবা আমার নাটকে কী থাকলে সে আসতে আগ্রহী হবে, কোন লেভেলে কথা বললে আমি তার সাথে কথা বলতে পারবো; কানেক্ট করতে পারবো।

আসলে আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো গোঁড়ার বিষয়টি এই—আপনি যে পরিবেশে আছে আপনার চারপাশের সেই পরিবেশকে না বোঝেন, যদি এসব জীবনকে না উপলব্ধি করেন তাহলে আপনার কাছে হিউম্যান কানেকশন্সগুলো প্রকৃতভাবে তৈরি হয় না। এই বিষয়ে আমি বলছি না আমি সফল, আমার ব্যর্থতা আছেই। আমি কোনো মাছ বিক্রেতাকে থিয়েটার দেখতে নিয়ে আসতে পারিনি, আমার যে গাড়ি চলায় শাহীন তাকে আমি বলেছিলাম নাটক দেখতে, সে দেখে বলেছিলো ভালো কিন্তু আমি জানি না তার কাছে কতটুকু ভালো লেগেছে। কর্মজীবী মানুষেরা সচারচর আমার নাটক দেখেন না। তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন আমার নাটক কারা দেখে—মধ্যবর্তী জীবনযাপন যারা করেন, মধ্য আয়ের যারা, তারা আমার নাটক দেখতে আসেন। তারা আমাদের দর্শক।

এবারে কথা হচ্ছে, এই দর্শক যারা, তারা থিয়েটার নিয়ে যা ভাবেন সেটা থিয়েটারে উঠে আসে কিনা!

এই পয়েন্টটি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য করুন, শেকসপীয়র কীভাবে সার্থক ছিলেন? মুকুন্দ দাস কেনো সার্থক ছিলেন? উত্তর আসবে এরকম যে, তারা এমন কিছু উত্থাপন করেছেন, যা তার ওই সমাজের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মুকুন্দ দাস খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে বঙ্গভঙ্গের সময় স্বদেশী যাত্রা শুরু করেছিলেন, এবং এটা সে সময়ের প্রেক্ষিতে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, কাজেই আপনার প্রশ্ন উত্থাপন এবং তার বিষয়টি যদি গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে সময়ের সাথে যুক্ত হবে। আর দ্বিতীয় কথা আমার মনে হয়, যদি শেকসপীয়রের জায়গাটা দেখি, তার জায়গাটা এই—তিনি মুকুন্দ দাসের থেকেও অনেক বেশি সফল ছিলেন, মুকুন্দ দাস শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেননি, উনি এমন একটি ভাষায় উত্থাপন করেছেন সেটা ছিলো তার নিজের বা ইউনিক এবং সাথে সাথে পপুলার, তার মানে ভাষা কিন্তু আবার মুখের ভাষা না। আপনারা জানেন শেকসপীয়রের ভাষা কত কঠিন ভাষা। কিন্তু সেই কঠিন ভাষার পারফর্মেন্স অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে থিয়েটারের মাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা সহজবোধ্য ছিলো, মানে তার নাটকের পারফর্মেন্স দর্শকের কাছে অর্থপূর্ণ হয়েছে, তার টেক্সটের অর্থ দর্শকের কাছে সার্থকভাবে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। সুতরাং আমার কাছে মনে হয় থিয়েটারের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো : একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা এবং পপুলার ল্যাঙ্গুয়েজে, যেটা মানুষের কাছে টেক্সটটের সঠিক অর্থটি পৌঁছে দিতে পারবে। এবং তখনই আপনার নাটকটি নাড়া দিতে পারবে, এসথেটিক্যালি সাকসেসফুল হবে। চলবে

সুত্র : বটতলা’র আলাপ–৪ : সৈয়দ জামিল আহমেদ এর থিয়েটার ভাবনা, প্রেক্ষিত বাংলাদেশের থিয়েটার

ছবি : ব্রাত্য আমিন

ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত অংশ পড়ুন :

আমি যখন কাজ করতে বসি নিয়মের ধার ধারি না : সৈয়দ জামিল আহমেদ

//জেডএস//

লাইভ

টপ