একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ

Send
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
প্রকাশিত : ১৩:১৯, জুন ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৩, জুন ২৩, ২০১৯

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধার মানুষ। একজন আদর্শবাদী ব্যক্তির জীবনে যা যা গুণাবলী থাকা দরকার, সেসবের প্রায় সবই তার মধ্যে বিরাজমান বলে আমার বিশ্বাস। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, আমরা বাতাসের ভেতর ডুবে থেকে বাতাসের গুরুত্ব বুঝিনা। তেমনি—আমাদের সমাজে তিনি স্ব-শরীরে উপস্থিত; কিন্তু আমরা তার গুণাবলির মূল্যায়ন করিনা।

স্যারকে কবে থেকে চিনি এবং পরিচয়; আজ তা মনেও পড়ছে না। তবে তার কিছু অসাধারণ বিষয় আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি, তার যে সান্নিধ্য এবং স্নেহ পেয়েছি; তা আমার সারা জীবনের সম্পদ। তাকে কতভাবে যে বিরক্ত করেছি! ১৯৮৭ সালে আমার সম্পাদনায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: নির্বাচিত কবিতা’ বের করলো নওরোজ কিতাবিস্থান। স্যারকে বললাম, একটা ভূমিকা চাই। তিনি তা সানন্দে লিখে দিয়েছিলেন।

আজ তার আরো দুটি ঘটনার কথা বলবো। বিটিভিতে আমার প্রস্তাবিত শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘দৃষ্টি এবং সৃষ্টি’-এর অনুমোদন হলো। কিন্তু বাগড়া দিলেন তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার কাজী আবুজাফর সিদ্দিকী। ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে আমাকে দিয়ে তিনি উপস্থাপনা করতে দেবেন না। তাই, আমার মাথার ওপর একজন রাখার জন্য ফাইলে নোট দিলেন।

বাধ্য হয়ে, আমি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করলাম। তারা মিটিং-এ সেই প্রস্তাব অনুমোদন করলেন।

কুমিল্লায় অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানের পর তিতাশ চৌধুরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

স্যারকে অনুরোধ করলাম। তিনিও আমার কারণে ‘না’ করতে পারলেন না। সেই সময় কাজ করতে গিয়ে তাকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাছে পেয়েছি এবং তার কাছ থেকে যৎসামন্য শিখেছি।

যেমন, চুক্তিপত্রে সই করার জন্য বা তার চেক পাঠানোর জন্য আমার পিয়নকে ক্যাম্পাসে অথবা স্যারের বাসায় পাঠাতে চাইলে তিনি বলতেন—‘দুলাল, দরকার নেই। আমি যাবার পথে তোমার অফিসে আসবো। চা খাবো’। আমার কি পরম সৌভাগ্য যে তিনি আজিজ মার্কেটের তিল তালায় সেই ছোট্ট অফিসে চলে আসতেন। একদিন নয়; অনেক দিন।

অনুষ্ঠানের পর ফটোসেশনে কবীর চৌধুরী এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে আমরা।

‘দৃষ্টি এবং সৃষ্টি’ চলছে, স্যার মূখ্য উপস্থাপক হিসেবে ভূমিকা দেন এবং ইতি টানেন। বাকী উপস্থাপনা আমিই করি। একদিন রেকডিং-এর সময় স্যার একটু দেরি করে আসলেন। অনুষ্ঠানের প্রযোজক সৈয়দ জামান স্টুডিও সাজিয়ে বসে আছেন। স্যার ঢুকলেন। স্বাগত জানানোর জন্য হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশ্যাক করতে গিয়ে দেখি, তার হাত প্রচন্ড গরম এবং রীতিমত শরীর কাঁপছে! অর্থাৎ গায়ে ভীষণ জ্বর।

—একি স্যার। জ্বরে তো আপনার শরীর পুড়ে যাচ্ছে!

—তবু এলাম। তোমাদের অনুষ্ঠানের সমস্যা হবে। তাই...

—স্যার, একটা ফোন করে বললেই পারতেন।

—একবার তাই ভেবেছিলাম। আবার তোমাদের কথা ভেবে রিক্সা নিয়ে চলে এলাম।

আমি তো রীতিমতো থ খেয়ে, দাঁড়িয়ে রইলাম।

দ্রুত রেকর্ডিং শেষ করে জামান ভাই একটা গাড়ির জন্য রিকুজিশন দিতে চাইলেন। তখন স্যার বললেন, ‘থাক, লাগবে না। দেরি হবে। আমি একটা রিকশা নিয়ে চলে যাবো।’ এই হচ্ছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সাদামাটা, নিরহংকার, শান্ত, বিনয়ী, ভদ্র, সাদা মনের মানুষ, নির্লোভী, এসব ইতিবাচক কোন শব্দটি বাদ দেবো, বলুন!

আরো অনেক বিষয় আছে, যা লক্ষ্য করলেই টের পাওয়া যায়। যেমন—তিনি ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হয়েও যখন বাংলায় কথা বলেন বা বক্তৃতা করেন, তখন পারতপক্ষে কোনো ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন না।

একুশের শ্রেষ্ঠ সংকলন হিসেবে ‘সূচিপত্র’ মুক্তধারা পুরস্কার অর্জন করে। সম্পাদক হিসেবে প্রধান অতিথি কবীর চৌধুরী এবং চিত্ত রঞ্জন সাহার কাছ থেকে তা গ্রহণ করছি। পাশে সভাপতির আসনে বসে আছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

আরো দেখেছি—অনুষ্ঠানের সময় তাকে যেখানে শেষ করার জন্য ‘কিউ’ দেয়া হতো, তিনি ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে সেখানেই অদ্ভুতভাবে সমাপ্তি টানতেন। কি এক অসাধারণ কথক!

আজ ২৩ জুন তার জন্মদিন। যারা চলে গেছেন, তাদের নিয়ে দুটি স্মৃতিগদ্য গ্রন্থ (‘কাছের মানুষ দূরের মানুষ’ এবং ‘দূরের মানুষ কাছের মানুষ’) লিখছি। ভাবছি এবার যারা আমাদের সমাজে অভিভাবক হয়ে আছেন, তাদের নিয়েই পরবর্তী বই লিখবো—শুরু করবো সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দিয়ে।

স্যার, আপনার জন্মদিনে সাত সমুদ্র তেরো নদীর এপার থেকে, তেরো হাজার কিলোমিটার দূর থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি!

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ