৩য় পর্ব জাতীয়তাবাদী নাট্য ভাবনা : সৈয়দ জামিল আহমেদ

Send
শ্রুতিলিখন : মাসুদ আল-হাসান
প্রকাশিত : ০৮:০০, জুন ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩১, জুলাই ০৪, ২০১৯

গত পর্বের পর থেকে

আরেকটি পয়েন্টে কথা বলতে চাই। জাতীয়তাবাদী নাটক নির্মাণ থেকে আমি সরে এসেছি বা ওই ধরনের নাটক আমি নির্মাণ করছি না, এই বিষয়টি কোনো গহ্বর নয়, এটা এক ধরনের উত্তরণ। আমি মনে করি এখন জাতীয়তাবাদী নাট্য আঙ্গিকে আমার কোনো কাজ নেই, ওই ধরনের কাজগুলো দেখতে আমার ভালোলাগে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ওটা আমি পার হয়ে এসেছি। একটা সময় ছিলো যখন জাতীয়তাবাদী নাট্য আঙ্গিক নির্মাণ করা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। কারণ আমরা সেই সময় পার করে এসেছি। বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ায় মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তের লাভ হয়েছে। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় আমি আগ্রহী হয়েছিলাম জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের প্রতি, যেটা ভারতে এসেছিল ষাটের দশকে এবং বাংলাদেশে এসেছে আশির শেষে নব্বইয়ের শুরুতে—আশির একদম শেষে সেলিম আল দীন ঢাকা থিয়েটারে যেটা করেছিলেন। আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি, আমার জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠা ঢাকা থিয়েটারে, আমি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য ছিলাম। আমি যেমন মনে করি নাসির উদ্দীন ইউসুফ অসাধারণ পরিচালক, তার অনেক গুণ আছে, যিনি বিভিন্ন সময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমি তার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। এই জাতীয়তাবাদী নাট্য আঙ্গিকের সাথে আমি যখন যুক্ত হই ঢাকা থিয়েটার তখন শকুন্তলা করছিলো। আমি এর আগে ভারতে ঘুরেছি এবং জাতীয়তাবাদী নাট্য আঙ্গিকের বেশ অনেক নাটক দেখেছি এবং তারপর আমার মনে হয়েছে এই ধরনের নাট্যের মাধ্যমে আমরা উত্তর-ঔপনিবেশিক অবস্থান থেকে জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করতে পারি এবং আরেকটি ব্যাপার হলো এই যে, লোকজ নাটক যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে একটি ভাষা তৈরি করে ফেলেছে যার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানো অনেক সহজ; কারণ মানুষ অলরেডি সেই ভাষাটি বুঝে ফেলেছে, আমি সেই ভাষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি।

আমার মনে আছে আমি যখন ফিরে আসলাম, আমি বলেছিলাম সেলিম (সেলিম আল দীন) ভাইকে, বাচ্চু (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) ভাইকে, আমরা কেনো যাত্রা নিয়ে কাজ করি না? কারণ আমার তখন ধারণা ছিলো না বাংলাদেশে কত ধরণের লোকনাট্য আছে। এরপর যাত্রা নিয়ে প্রথম কাজ শুরু হলো, ওই কাজটার নাম ছিলো ‘কেরামতমঙ্গল’। কেরামতমঙ্গলের শেষে আপনি দেখবেন যে, সুবর্ণা টেক্সট হাতে নিয়ে একটি বর্ণনা উপস্থাপন করেন। এবং তারপর থেকে বর্ণনার এই রীতির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং নানভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—এটা কিন্তু ৮৬’ বা ওই সময়ের কথা। আমি কাউকে ছোট বা বড় করছি না, তবে আমার কাছে মনে হয় যে কোনো ধারণার আদি কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, যিনি কোনো ধারণার প্রবর্তন করেন যে ধারণাটি নিয়ে আমরা চলা শুরু করি। এটাই আইসিসের গণ্ডগোল। আইসিস ওইটাই প্রতিষ্ঠা করতে চায়—তারা একটি ধারণার কথা বলে এবং প্রতিষ্ঠা করতে চায় সেটা ছাড়া অন্য কোনো ভিন্ন পথ নেই। আপনি যদি সেলিম আল দীন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, কিংবা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একই ধরণের কথা বলা শুরু করেন তাহলে আপনি কিন্তু একই ধরনের চিন্তার ভেতরে একই ধরনের ব্যাপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছেন এবং ঘুরপাক খাচ্ছেন। আর এটাই হলো ডেমোক্রেসি বলেন আর শিল্পকর্ম বলেন, তার জন্য গণ্ডগোলের জায়গা। আপনি নাটক লিখছেন, নাটক করছেন, বিবেচনা দর্শকের উপর ছেড়ে দেন। আইসিস যেমন তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে মারতে যায়, ওরকম হয়েন না। সবকিছু দর্শকের উপর ছেড়ে দেন এবং নিজের কাজ করে যান। যদি নাটক শিল্পের জন্য যোগ্য না হয় তাহলে প্রত্যাখ্যিত হবে। এটা কখনই ধরে নেওয়া উচিত না যে, আমিই একমাত্র মানুষ যে একমাত্র শিল্প বোঝে, যে একমাত্র বঙ্গবন্ধু বা বাংলাদেশকে ভালোবাসে। কোন নাটক দেশদ্রোহী, কোন নাটকে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে সেটা দর্শকের উপর ছেড়ে দেন। এটা সবসময় মনে রাখবেন।

যা হোক, অনেক কথা বললাম। আসলে থিয়েটারের ব্যাপারে আমার কাছে অন্যতম প্রধান ব্যাপার হলো প্রশ্ন উত্থাপন করা। যা আগেও বলেছি। যদি আপনার শিল্পকর্ম প্রশ্ন উত্থাপন করতে সক্ষম না হয় তাহলে আমার মতে আপনার কাজে বড় একটি অপূর্ণতা থাকবে।

যে কোনো একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আর ওই প্রশ্নটা যদি শুধু আমার না হয়ে যদি আমাদের সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয় এবং সেটা মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারেন, এবং সেই উপস্থাপন করতে পারেন যদি এমন ভাষায় যে ভাষাটা জনপ্রিয়, যেটা জনগনের কাছে অর্থপূর্ণ হবে, মানে বহন করতে সক্ষম, তাহলে ওই নাটকটি সার্থক না হওয়ার কারণ আমি দেখি না। আশা করি নাটক সার্থক হওয়ার ব্যাপারে আমার কাছে যে প্রশ্ন এসেছে সে সম্পর্কে আমার মন্তব্য আপনাদেরকে বোঝাতে পেরেছি।

আমার কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, বাংলাদেশ হয়ে কাদের লাভ হয়েছে, পাকিস্তান থাকলে কাদের লাভ হতো না। অবশ্যই বাংলাদেশে পরিবর্তন এসেছে। গত সরকারের আমলে এটা ব্যাপকভাবে হয়েছে। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সে জন্য আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাকে হ্যাটস অফ। কিন্তু কী দাম দিতে হয়েছে আমাদের। বড় লোক এবং গরীবের পার্থক্য কতটুকু কমেছে। কতগুলো মানুষ শিল্পকর্ম দেখার জন্য ঝুঁকেছে, কারা থিয়েটারের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। আমি থিয়েটারকর্মী হিসেবে বাংলাদেশের উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি। এখনকার মতো তখন যাতায়াত এতো সহজ ছিলো না, এই আজকের যমুনা নদী পার হতে ছয় ঘণ্টা, আট ঘণ্টা লেগে যেত, অধিকাংশ মানুষের পায়ে স্লিপার দেখতাম। বেশিরভাগ মানুষের একটি জামা ছাড়া কিছু নেই। কারো কারো একটি জামা থাকতো তোলা, বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা আত্মীয়বাড়ি যেতে গেলে সেইটেই পরতো। এখন মানুষের সেই অবস্থা নেই, হাতে হাতে মোবাইল ফোন, ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশে। পরার কাপড় নিয়ে কেউ ভাবে না। কাজেই আমাদের রাজনীতিবিদ, আমাদের উন্নয়নকর্মীদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

এখন এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি—কথাটা হচ্ছে যে, এইজন্য আমার কাছে মনে হয় জাতীয়তাবাদ, রবীন্দ্রনাথ যেটা ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে গেছেন তার ‘ন্যাশনালিজম’ বইতে—ইংরেজিতে লেখা, এবং এগুলো সব বিদেশে ভাষণ দেওয়া। আপনারা অনেক সময় আমার উপরে বিরক্ত হন, আমি কেনো ইংরেজিতে লিখি। রবীন্দ্রনাথ তার কাজের চল্লিশ ভাগ লিখেছেন ইংরেজিতে, যদি তার সমগ্র রচনাকে বিবেচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয়তাবাদ থেকে সমাজ গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয়তাবাদ এসেছে ১৭৭০-৮০ এর মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে। সুতরাং জাতীয়তাবাদ চিরস্থায়ী ধারণা না। আমরা আজকাল জাতীয়তাবাদের ধারণা তৈরি করি, আমাদের ইতিহাসবিদরা, আমরা ইতিহাসের টুকরোগুলো একত্র করে জাতীয়তাবাদ তৈরি করেন। জাতীয়তাবাদ একটি ধারণার উপর নির্ভরশীল এবং আমার মতে শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ আমাদের দেশীয় বুর্জোয়াকে শক্তিশালী করে তোলে। এবং তারা যে ব্যাংক লোন নিয়ে বড়লোক হয়ে আমাদেরকে এতো উপকার করেছেন, সেই সম্পর্কে কথা বলার জায়গাও নেই। এই সমস্ত গোলকধাঁধার ভেতরে আমার কাছে মনে হয় জাতীয়তাবাদী নাট্যচর্চা শেষ পর্যন্ত এই জাতীর ধারণাটাকে উজ্জীবিত করে। এবং সেটা করে বাজার সংরক্ষণের জন্য, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর বাজার সংরক্ষণ হলে এখানে পুঁজির বিকাশ হবে, যেটা হতে পারেনি পাকিস্তান যতদিন ছিল, এবং পুঁজির বিকাশের জন্যই বাংলাদেশ। এবং এই জায়গা থেকে বাংলাদেশকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। চলবে

সুত্র : বটতলা’র আলাপ–৪ : সৈয়দ জামিল আহমেদ এর থিয়েটার ভাবনা, প্রেক্ষিত বাংলাদেশের থিয়েটার

ছবি : ব্রাত্য আমিন

আরো পড়ুন :

আমি যখন কাজ করতে বসি নিয়মের ধার ধারি না : সৈয়দ জামিল আহমেদ

আমি মনে করি চরম সত্য বলে কিছু নাই : সৈয়দ জামিল আহমেদ

//জেডএস//

লাইভ

টপ