লোক গবেষণার সাদা শাপলা গোলাম এরশাদুর রহমান

Send
সরোজ মোস্তফা
প্রকাশিত : ১৫:৫৯, জুলাই ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২২, জুলাই ০৯, ২০১৯

চলে গেলেন ‘চন্দ্রকুমার দে’ পরবর্তী নেত্রকোণার লোকসাহিত্য গবেষোণার প্রবাদ-পুরুষ গোলাম এরশাদুর রহমান। গত ৬ জুলাই রাত এগারোটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যুর সাথে সাথে নেত্রকোণার লোকায়ত সাহিত্য, সংস্কৃতি, আচার ও রীতি সম্পর্কে অনবরত অনুধ্যানী একটি জীবন্ত মিউজিয়ামের দ্বার রুদ্ধ হলো।

দুই

গবেষণা কিংবা লেখালেখি ছিলো তার জীবনদর্শনের দ্যোতক। মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি মাটির সাহিত্য খুঁজতেন। মোট কথা তিনি টেবিল রাইটার কিংবা টেবিল গবেষক ছিলেন না। প্রান্তিকজনের ভেতরে থেকে প্রান্তিকজনের জীবনাচারকেই তিনি গবেষণার বিষয় করেছেন। এই ক্ষেত্রে অবশ্যই তিনি চন্দ্রকুমার দে, দীনেশ চন্দ্র সেন কিংবা কবি জসীমউদ্দীনের উত্তরাধিকারী। বাউলগান, যাত্রাগান, পালাগান, ঘাটুগান, গাইনেরগীত, লম্বাকিচ্ছা, মালজোড়া গান কিংবা কবিগান সম্পর্কে জানতে আগ্রহী আগন্তুক মাত্রই তার ছায়া পেতেন। শান্তি ও পরমানন্দে তিনিও তার অর্জিত মিউজিয়ামে প্রবেশ করতে দিয়ে আগন্তুকের জন্য অভিজ্ঞানের সবগুলো আলমিরা খুলে দিতেন।  

অনেকেই নানান তকমা ও তরিকায় নেত্রকোণার বাউল গানকে বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু নেত্রকোণার বাউলদের যে একটি নিজস্ব দৃষ্টি ও কাব্যধারণা রয়েছে এটা তিনিই আবিষ্কার করেন। চন্দ্রকুমার দে, বিজয়নারায়ণ আচার্য, সিরাজুদ্দিন কাশিমপুরি, রওশন ইয়াজদানীর পর তিনিই নেত্রকোণার ফোকলোর ধারার মৌলিক গবেষক। নেত্রকোণার বাউলদের সম্পর্কে তিনিই প্রথম লিখেছেন। নেত্রকোণার বাউল ও বাউল গানকে বোঝার জন্য তার ‘নেত্রকোণার বাউলগীতি’ গ্রন্থটি মূলত দরজা খোলা নদী।

তিন

নেত্রকোণার গ্রামগুলো মূলত বাউল ও লোকগানের তীর্থভূমি। আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে মানুষের জীবন প্রবাহে রূপান্তর ও পরিবর্তন আসলেও লোকগানের গায়ক ও গায়কির মৃত্যু ঘটেনি। কুষ্টিয়া কিংবা নদীয়ায় বাউলচেতনা থেকে নেত্রকোণার বাউল সাধকেরা কেনো ভিন্ন, তার একটি যৌক্তিক ও মৌলিক বক্তব্য তিনি উপস্থাপন করেন। জনপদের ইতিহাসের ভেতরেই থাকে জনমানসের চিন্তা ও চিন্তন পটভূমি। নেত্রকোণার বাউলচর্চার ইতিহাস অনুসন্ধান করে তিনি স্পষ্ট করে, ‘১৮২৭ সনে বিদ্রোহের অপরাধে ইংরেজ শাসক কর্তৃক টিপু পাগল মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। পাগল বিদ্রোহ ছিল মূলত একটি কৃষক-প্রজা বিদ্রোহ। লেডিরকান্দার আছমত আলী শাহ্‌ ফকির ছিলেন ফকির বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী ফকির-দরবেশদের প্রত্যক্ষ বংশধর। তাছাড়া বিশ শতকের গোড়াতে নেত্রকোণার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে কৃষক আন্দোলন। যার ফলে ১৯৪৫ সনে নেত্রকোণায় অনুষ্ঠিত হয় সর্ব-ভারতীয় কৃষক সম্মেলন। ফলে ফকির সম্প্রদায় ছিলেন ইংরেজ শাসনের প্রধান চিহ্নিত দুশমন। তাই নেত্রকোণার ফকির সাধকগণ বাউল নামে আত্মপ্রকাশ করেন। সুফিবাদের চেতনার সংগে অনিবার্য কারণে তাদের সাধনায় যুক্ত হয় মানবপ্রেম ও প্রকৃতি প্রেমের জীবন্ত সত্তা। এই সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নির্যাসরূপে বিকাশ লাভ করে মালজোড়া গানের ধারায় নেত্রকোণার বাউল গীতির মানসপট। আর মহুয়া, মলুয়া, সোনাই, মদিনার বিরহ-বেদনাসিক্ত সামাজিক মূল্যবোধ নেত্রকোণার বাউল গীতিকে দান করে এক গণচরিত্র।...সহজ কথায় বলতে গেলে মৈমনসিংহ গীতিকার পালাগীতি হলো নেত্রকোণার বাউল গীতির মৌলিক উৎস’।

চার

গণমানুষের ভেতরে থেকেই তিনি এই অঞ্চলের সংস্কৃতি চর্চার উৎস অনুসন্ধান করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অম্লান ইতিহাসের ধারক ও বাহক। স্বাধীনতার আগে তিনি যেভাবে রাজনীতি শুরু করেছিলেন, স্বাধীনতার পরে সেই রাজনীতিই থেকে সরে ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। ১৯৬২ সালে মোহনগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত তিনি নেত্রকোণা জেলা (তৎকালীন মহকুমা) ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি নেত্রকোনা জেলা মুজিব বাহিনীর (বি.এল.এফ) কমান্ডার ছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি নেত্রকোণায় জাসদ প্রতিষ্ঠায় নিবিদিত হন। ১৯৭২ সালে জেলা জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। এভাবেই তিনি জেলা জাসদের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় জাসদের সহসভাপতি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। বাটার দোকানের সাথে ছোট পার্টি অফিসে একা একা চুপচাপ বসে থাকতেন। অসাধারণ বক্তৃতা করতেন। বাস্তবের পৃথিবীতে তাকে প্রতিদিন সইতে হয়েছিলো হুলিয়া ও রাজনৈতিক অভিঘাত। প্রতিবার হুলিয়া মাথায় নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের ভেতরে চলে গেছেন। গ্রামে-গঞ্জে এই পলাতক জীবন থেকে তিনি মানুষের সংস্কৃতিকেই বুঝতে চেয়েছেন। গ্রামীণ জীবনের সাথে আরো নিবিড় সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করেছে এই পলাতক জীবন। পলাতক জীবনের এই অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই সাজিয়েছেন লোকসাহিত্যের গবেষণা।

পাঁচ

এরশাদুর রহমান থাকতেন কালিবাড়ি সংলগ্ন মগরার তীরে। শহরের বিপুল ব্যস্ততা কিংবা আত্মস্বার্থের মন্ডা-মিঠাইয়ি আয়োজনে উঁনি ছিলেন না। বাইরে বেরুনো কিংবা ফেরার পথে দেখতাম ঔষধের দোকানে চুপ মেরে সুপ্ত শঙ্খের মতো তাকিয়ে আছেন। তাকে দেখে মাঝে মাঝে মনে হতো মৃত মগরার মতো একাকী, সরল ও নিঃসঙ্গ। মেলায় তার বক্তৃতার আলাদা একটা মর্যাদা ছিলো। বক্তা গোলাম এরশাদুর রহমানের একটা পরিচিতি এই জনপদে ছিলো। তিনি যে অন্যান্য বক্তাদের দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলতেন—এমনটা নয়। কিন্ত যতটুকু বলতেন, যৌক্তিক ও মৌলিক কথা বলতেন। একটা দরদি কণ্ঠে ছন্দে ও আবেগে বলতেন—পৌষ মেলার মাঠ ভর্তি শ্রোতারা সহজেই আকৃষ্ট হতো।

তার রচিত ‘মুক্তি সংগ্রামে নেত্রকোণা’ নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রামাণ্য ইতিহাস। এই বইটি পড়তে গিয়ে পাঠককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে একজন মুক্তিযুদ্ধা লিখছেন জনপদে ঘটে যাওয়া রক্তাত ইতিহাস। সে সময়ে ঘটে যাওয়া  প্রায় লুপ্ত ও অনেক বিপন্ন ইতিহাস আছে এই গ্রন্থে। মনে রাখতে হবে ১৯৭১ সালে তিনি নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি। মুজিব বাহিনির জেলা কমান্ডার তিনি। তাই তার রচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উঠে এসেছে গণমানুষের লড়াকু দিনের প্রতিচ্ছবি।

‘নেত্রকোণার লোকায়ত গল্পগুজব’ এবং ‘নেত্রকোণার লোকায়ত খেলাধুলা’ নেত্রকোণার সমাজ ও সংস্কৃতিকে জানা বোঝার জন্য দুটি প্রমান্য গ্রন্থ। নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক, সামাজিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম উপাদান এই লোকায়ত গল্পগুলো। ভাষা এবং চরিত্রে গল্পগুলোতে খুঁজে পাওয়া যাবে ইতিহাস যাপিত পূর্বপুরুষের লড়াই ও সুদৃঢ় মন। লোকমানসে রস ও রসিকতা যে কী পরিমানে বিদ্যমান গল্পগুলো তারই স্বাক্ষ বহণ করছে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ