সমালোচনার প্রয়াস : 'আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে'

Send
অমল চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ০৮:০০, জুলাই ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৫, জুলাই ১৮, ২০১৯

টি এস এলিয়ট লিখেছেন, কোনো কবিকে একা আলোচনা করা যায় না, তাকে তুলনা করতে হয় পূর্ববর্তী আরো অনেক কবির সঙ্গে। যতদূর জানি এডগার এলান পো’র ‘টু হেলেন’র সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার মিল নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে গিয়েছে। এর সঙ্গে ডাব্লিউ বি ইয়েটসের ‘সেইলিং টু বাইজান্টিয়াম’র আলোচনা যুক্ত করলে মন্দ হয় না। কিন্তু এই তিনটি কবিতার আর্কিটাইপাল সমালোচনা রীতিতেও যে পাশাপাশি আলোচনা করার সুযোগ আছে, তা ভুলে গেলে চলবে না। তিনটি কবিতা পাশাপাশি রেখে পড়লে একটি সামষ্টিক অবচেতনের কাঠামো পাঠকের চোখ এড়াবে না।

আর্কিটাইপাল সমালোচনা মনোবৈজ্ঞানিক কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর চিন্তাপ্রসূত। এই ধারণামতে মানুষের একটি ‘সমষ্টিগত অচেতন’ বা এক ধরনের সার্বজনীন স্মৃতি আছে, যা স্বপ্ন এবং কল্পনার মধ্যে উদ্ভাসিত হয়। এই সামষ্টিক অবচেতন প্রকাশ পায় হাজার বছরের উত্তরাধিকারে পাওয়া সাহিত্য আর মিথের মাধ্যমে। আর্কিটাইপ মানবজাতির ভাগ করে নেওয়া সাধারণ ঐতিহ্য। ‘টু হেলেন’ বা ‘সেইলিং টু বাইজান্টিয়াম’ বা ‘বনলতা সেন’ কবিতা ত্রয়ীর মধ্যে ব্যক্তি কবি-মানস ও কাল এবং সময়ের যত ব্যবধান থাকুক না কেনো, ভেতরে ইয়ুং বর্ণিত সেই সামষ্টিক স্বপ্ন ও মিথের অভিযাত্রা সতত বহমান।

‘টু হেলেন’ ও ‘বনলতা সেন’ কবিতা দুটিই নারীর প্রেম আর সৌন্দর্য দ্বারা অনুপ্রাণিত। বলা হয় এডগার এলান পো ‘টু হেলেন’ লিখেছেন তার বন্ধুর মা জেন স্ট্যানার্ডের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে; কিন্তু জীবনানন্দ কার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছিলেন তা আমরা জানি না। যদিও ড. আকবর আলী খান গবেষণা করে দেখাতে চেয়েছেন যে, এর পেছনে কোনো এক বেশ্যার ছায়া আছে। এডগার এলান পো তার কবিতা শুরু করেছিলেন হেলেনকে সরাসরি সম্বোধনের মাধ্যমে:

'হেলেন, তোমার সৌন্দর্য আমার কাছে
দূরবর্তী কোনো এক সময়ের নিশিয়ান জলযানের মতো লাগে।
পৌঁছে দেয় সুরভী মাখা সাগরের তীর ঘেঁষে
ক্লান্ত ভ্রমণকারীকে আপন গন্তব্যে'

এখানে ভ্রমণের অনুষঙ্গে এডগার এলান পো মানব সম্প্রদায়ের হাজার বছরের অবচেতন যাত্রার কথা বলেছেন। হেলেনের অনুপম সৌন্দর্যের মধ্যে খুঁজে পান ক্লাসিক্যাল সময়ের নান্দনিকতা আর চিরন্তন বোধকে। সুরভিত সমুদ্রতট ধরে কবি যাবেন গ্রিস ও রোমের গৌরবের সময়ে হেলেনের হাত ধরে। এলান পো শুধু প্রেম ও কল্যাণের পথে হাঁটছেন না; তিনি চেতনা ও চেতনারহিত জগতে প্রবেশ করবেন তার ভ্রমণ-পিয়াসী মন নিয়ে। আমরা পো'র কবিতায় সমুদ্র ও রোমান সভ্যতার শব্দচিত্র পাই। বর্তমানকে অতীত ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে কবি চিরকালীনতা এনে দিয়েছেন। এর মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি নারী হেলেনকে এনে দিয়েছে লৈঙ্গিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে গতি আর বিশুদ্ধতার মেলবন্ধন—

'বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে দীর্ঘ ভ্রমণ করা
তোমার কৃষ্ণকালো চুল, চিরায়ত মুখশ্রী
তোমার নাইয়াদ চাহুনি নিয়ে যায়
গ্রিসের রূপমাধুরিতে,
আর প্রাচীন রোমের গৌরব ভূমিতে।'

আফ্রোদিতির মানসকন্য প্যারিস-পত্নী হেলেনের মধ্যে কবি অনন্ত সুখ খুঁজে পেয়েছেন। যদিও আরেক কবি ইয়েটস ‘নো সেকেন্ড ট্রয়’ কবিতায় সুন্দরী হেলেনের স্বার্থপরতার মধ্যে নারীর সৌন্দর্যের ধংসাত্মক বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন। এলান পোর হেলেন কোনো বিভ্রান্তি নয়, বরং আলো হাতে বন্দরে কবিকে পৌঁছানোর স্বস্তি এনে দিচ্ছেন। শেষ স্তবকে এডগার এলান পো হেলেনকে একটি স্থির ভাস্কর্যের মতো দেখাতে চেয়েছেন। যার হাতে একটি প্রদীপ বা ‘agate lamp’ আছে, যার সৌন্দর্য কবিকে ‘পবিত্র ভূমি’-তে পৌঁছে দেবে।

আমরা কী ‘বনলতা সেন’ কবিতার কাঠামোয় এই পরিব্রজা দেখি তুলনামূলকভাবে আরো নান্দনিক সুষমায়। জীবনানন্দ শুরু করেছেন হাজার বছরের পরিব্রাজনের কথা বলে। তিনি হাজার বছর ধরে পৃথিবীর এখন ক্লান্ত পথিক। নিশ্চিতভাবে এই ভ্রমণ কোনো ব্যক্তি মানুষের মগজের কুঠুরিতে ঘুরপাক নয়; এর সাথে পুরো মানব সমাজের ‘সামষ্টিক কাল-যাত্রা জড়িত’।

'অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।'

যদিও জীবনানন্দ দাশ তার কবিতাকে আরো নৈর্ব্যক্তিক করার প্রয়াস পেয়েছেন অনুষঙ্গ আর সময়ের বহমানতার উপর বেশি জোর দিয়ে। বনলতাকে সরাসরি সম্বোধনের না করে হেলেনের মতই নারীকে উপস্থাপন করেছেন পুরুষের অনুপম শান্তি ও পরিতৃপ্তির রূপক হিসেবে—ঠিক যেন সুজাতার হাতে পরিবেশিত পায়েস—যা খেয়ে একদা প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন কোনো বোধিতলের গৌতম।

জীবনানন্দ আলোচনায় মনোসমীক্ষণবাদী মূল্যায়ন বেশ কেজো এই কারণেই যে এখানে ‘ধূসর, নিশীথ, অন্ধকার, ইত্যাদি শব্দচিত্র একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আমাদের ঠেলে দেয়—কবির যাত্রাপথ—ভৌগোলিক মালয় সাগর বা সিংহল সমুদ্র নয়, এটা যে চিরন্তন মানব মনের গোপন গহীন কোণের আলো আঁধারির পথ অনুসন্ধানের একটি উপলক্ষ্য মাত্র। জীবনানন্দের কবিতায় আমরা দেখি হাল ভাঙা অসহায় নাবিক, যে দারুচিনি দ্বীপের ভেতর দিশা খুঁজে পায়। এলান পোর ক্লান্ত নাবিক সুধা খুঁজে পায় হেলেনের মাধুরীতে—অবশ্য তিনি তাকে নাবিক না বলে বলেছেন ‘ক্লান্ত পরিব্রাজক’। হেলেনের সৌন্দর্য কবিকে তার আবাসভূমি রোমে পৌঁছে দেয় আর বনলতা সেনের অনুপম রূপমাধুরী জীবনানন্দের কথককে মুখোমুখি দাঁড় করায়—
‘সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন,
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার নাটোরের বনলতা সেন।’
প্রকৃতপক্ষে এখানে ‘বনলতা সেন’ জীবনের ক্লান্তির বিপরীতে জীবনমুখী এক যাত্রার প্রতীক হিসেবে একটি কাঠামো হয়ে এসেছে।

ডাব্লিউ বি. ইয়েটসের ‘সেইলিং টু বাইজান্টিয়াম’ কবিতায় এই পরিব্রাজনার কাঠামোচিত্র আরো ব্যাঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। কবি লিখছেন—
'থাকবো না আমি এই দেশে আর / চলে যাবো বাইজান্টিয়াম।'

এই এষণা পো বর্ণিত প্রাচীন রোমে ও গ্রীস সভ্যতা যাত্রার মতো রূপক। এর সঙ্গে জীবনানন্দের বিম্বিসা, বিদিশা, বিদর্ভ নগরের মিল দেখতে পাই। কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং যেমনটা লিখেছেন ‘আর্কিটাইপাল যাত্রা, আমরা এই তিন ভ্রমণের মধ্যে তা দেখি যা নিছক দৈহিক অভিজ্ঞতার বাইরে আরো কিছু। ইয়েটসের ভাষায় বৃদ্ধ লোক; লাঠিতে খাড়া করা কাকতাড়ুয়া ছাড়া আর কী?’ এই প্রাণহীন ও অবসাদগ্রস্ত জীবনের বাইরে নতুন পথ খোঁজার প্রচেষ্টা তিনটি কবিতায় সমানভাবে আছে। শেষ স্তবকে ইয়েটস জানাচ্ছেন একবার যদি বাইজান্টিয়াম যেতে পারেন তিনি আর শারীরিক রূপে ফিরবেন না, তিনি পাখি হয়ে যাবেন সোনালি গাছে বসে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের গান গাইবেন।
‘বনলতা সেন’ কবিতার শেষ পঙক্তিতে অন্ধকার থাকে বহুমাত্রিক ইঙ্গিত নিয়ে—এই অন্ধকার কী রোমান্টিক রহস্যময়তা না মানসিক নির্বেদের ইঙ্গিতবাহী তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু হেলেনের হাতে এডগার এলান পো আলোকবর্তিকা দেখেন গ্রীক দেবী সাইকি রূপে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পরাবাস্তবতা আর বিচ্ছিন্নতাবাদের যে দুইটি ধারা দৃশ্যমান তার মধ্যে প্রথমটি এডগার এলেন পো চর্চা করলেও দ্বিতীয়টি কখনো করেননি। জীবনানন্দ এই বিচ্ছিন্নতাবোধকে রূপ দিয়েছেন অনন্য মাত্রায়। সঙ্গে যোগ করেছেন সময়চেতনা। এডগার এলান পো প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিভীষিকা আর বিচ্ছিন্নতাবাদের দোলাচলের মুহূর্ত ধারণ করেননি তার কবিতায়। ইয়েটসের কবিতায় অবশ্য গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ ও বেদনার ছাপ আরো সুস্পষ্ট।

এডগার এলান পো, ডব্লিউ বি ইয়েটস এবং জীবনানন্দ দাশের তিনটি কবিতার আমরা একটি প্যাটার্ন খুঁজে পাই। একটি  সামষ্টিক অন্বেষা কবিতা তিনটিকে একটি সাধারণসূত্রে গেঁথেছে। তিন দেশের তিন ভিন্ন সময়ের তিন কবির তিনটি বিখ্যাত কবিতায় তাহলে ‘পরিব্রাজন’ বারবার ঘুরে আসা একটি প্রতীক বা রূপকপল্প যেখানে রোমন্টিক ইচ্ছা অন্তঃসলিলার মতো বয়ে চলছে। এই তিনটি কবিতাতেই রোমান্টিক চেতনা একটি আত্মভ্রমণ, একটি চিরায়ত ভ্রমণ রূপকল্পের সঙ্গে মিশে গেছে। এখানে ভ্রমণ কথকের ব্যক্তি জীবনের হতাশা, অবসাদ, আত্মগ্লানির জগৎ থেকে সৃজনীশক্তি ও পরিপূর্ণতার জগতে উত্তরণের উপায় করে দিয়েছে। এলান পো’র গৌরবময় গ্রীক-রোমান জগৎ, ইয়েটসের বাইজান্টিয়াম, জীবনানন্দ দাশের বিদর্ভ নগর মূলত এক ও অবিচ্ছেদ্য।

//জেডএস//

লাইভ

টপ