পড়োভূমির কথকথা

Send
অমল চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ১৮:১১, জুলাই ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৩, জুলাই ২৩, ২০১৯

১৯২২ সালে ৪২১ লাইনের একটি কবিতা প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে সাহিত্যের আকাশে এক নতুন ঝড় উঠলো। কবি জন্মসূত্রে আমেরিকান; থাকেন ইংল্যান্ডে; কাজ করেন কেরানির—লয়েড ব্যাংকে, আর লেখেন সম্পূর্ণ নতুন ভাষায়। নাম থমাস স্টার্নস এলিয়ট। সংক্ষেপে টি. এস. এলিয়ট। আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা তিনি; তার কবিতা ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ বা ‘পড়োভূমি’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্য নতুন এক সন্ধিক্ষণে পা দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিরান, নিরীশ্বরবাদী, তামসিক পৃথিবীর কাহিনি নিয়ে এই বিশাল কবিতা যার নির্মাণপর্ব বেশ চমকপ্রদ ও নাটকীয়। পাঁচটি অংশে বিভক্ত এই কবিতাটি জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’-এর মতো বহুমাত্রিক ও দুর্বোধ্য। বিস্ময়ে প্রশ্ন জাগে, একশ বছর পরেও এই কবিতা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে সমানভাবে সমাদৃত কেনো?   

শুরুতে ‘He do the police in different voices’ নাম ছিলো কবিতাটির। অসংখ্য আচমকা কণ্ঠস্বর, বেখাপ্পা কথকের উপস্থিতিতে পুরাণ ও আধুনিকতার অদ্ভুত মিশ্রণ এবং পরোক্ষ উল্লেখের জন্য কবিতাটি বিখ্যাত। যার ফলে কবিতাটি একইসাথে দুর্বোধ্য ও অনন্য হয়ে উঠেছে। এই বহুমাত্রিকতা কবিতাটিকে আধুনিক সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যে রূপ দিয়েছে।

‘দ্য ওয়েস্ট  ল্যান্ড’ বুঝতে হলে শুরুতে অবশ্যই আধুনিকতাবাদ ও এর লক্ষণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আধুনিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন প্রথাগত সাহিত্যরীতিকে প্রত্যখ্যান করে নতুন সংবেদনশীলতাকে একটি স্বকীয় ভাষা ও ভঙ্গিতে প্রকাশ করে। আধুনিকতাবাদী সাহিত্যকর্ম যেমন টি. এস. এলিয়ট-এর ‘পড়োভূমি’, ভার্জিনিয়া উলফের ‘মিসেস ডালোওয়ে’, জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’-এ আত্মসচেতন, অন্তর্মুখী এবং মানব প্রকৃতির অন্ধকার দিকগুলো অন্বেষণ করে। এলিয়টের কবিতায় আমরা ভাষার নানারকম নিরীক্ষা যেমন দেখি, তেমনি চমৎকৃত হই অবক্ষয় ও মানসিক ক্লীবতার বাখান শুনে।

এলিয়টের কণ্ঠস্বর বারবার পরিবর্তিত হয়। তিনি একাধিক বিদেশি ভাষা যেমন : ল্যাটিন, গ্রিক, ইতালীয়, জার্মান, ফরাসি এবং সংস্কৃত থেকে বিভিন্ন বাক্য তার লেখায় অন্তর্ভুক্ত করে নেন, যাকে বলা যায় এজরা পাউন্ডের প্রভাবের ফল। সহজ করে বললে, আধুনিকতা সাহিত্যের মধ্যে সরলরৈখিক বর্ণনার স্থানে বহুমাত্রিক এবং বিচ্ছিন্ন স্বর এনে মনোবিজ্ঞান এবং সাহিত্যের প্রকাশভঙ্গীর মাঝে দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে আরো কঠিন হয়ে গেছে কবিতার জগৎ। 

‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতায় অসংখ্য মিথ ও ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহার বাইরে থেকে পাঠকের কাছে অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন স্বরের জগাখিচুড়ি মনে হতে পারে। তবে গভীর পাঠে এই এলোমেলো মিথ-কিংবদন্তি এবং স্বগতোক্তির মধ্যে সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যাবে। আর সেটাও যে খুব বিতর্কের উর্ধ্বে তা বলা কঠিন। স্বয়ং টি. এস. এলিয়ট নিজে বইটির একটি ব্যাখ্যাসহ সংস্করণ বের করে এই কবিতা সহজ করে বোঝতে গিয়ে বরং আরো জটিল করে ফেলেছেন। ১৯৩৬ সালে ই. এম. ফস্টার লিখেছেন : ‘দ্য ওয়েস্ট  ল্যান্ড’ একটি আতঙ্কের কবিতা। কবিতার প্রথম থেকে শেষ পযর্ন্ত একটি বিভীষিকাময় পৃথিবীর চালচিত্র খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে পুরুষ বীর্যহীন, নারী পলাতক, আর বিশ্বাসের শেকড় আমূল উৎপাটিত। কবিতার ইমেজগুলো একটির সাথে আরেকটি এলোমেলোভাবে সংযুক্ত, আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন, কিন্তু ব্যাপকতায় একটি সুনিদির্ষ্ট অর্থ বহন করে। আঙ্গিকে পরিষ্কারভাবে প্রথাবিরোধী এই কবিতা এক যুগ থেকে অন্য যুগে বার্তাবাহী হিসেবে কাজ করেছে। এই কবিতার প্রথম চারটি পঙক্তি আধুনিক জীবনের হতাশা আর দহনকে প্রকাশ করে:

“নিষ্ঠুরতম মাস এপ্রিল, মৃতপুরীর লাইলাক ফুলকে প্রস্ফুটিত করে,

 মিশ্রিত করে ইচ্ছা আর স্মৃতির মেল,

 বৃষ্টির ধারায় মরা শেকড়ে প্রাণ আনে।”

চসার ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’-এ এপ্রিল মাসকে বসন্তের বার্তাবাহী মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এলিয়ট তার উল্টো। তার চোখে এপ্রিল নিষ্ঠুর, কারণ মৃতদের কবর থেকে জাগতে চায় এই মাস—এই পড়ো অনুর্বর জামিনে কিছুই ফলে না, আর তাই পুনর্জীবন এখানে দুরাশা মাত্র। এই কবিতায় নষ্ট সময়ের জন্য একটি গভীর দুঃখবোধ রয়েছে প্রতিটি ছত্রে ছত্রে:

“জড়িয়ে রাখার মতো শেকড় কই; এই

পাথুরে জঞ্জাল থেকে কি শাখা বেরুবে, আর মানবপুত্র ভাববে কী আর বলবেও কী,

তুমিতো জানো শুধু এক স্তুপ ভাঙা চিত্র 

মরা গাছ দেবে কি ছায়া শুকনা পাথরে, নেই ঝর্ণার গান!”

এই উদ্ধৃতিই প্রমাণ করে যুদ্ধোত্তর অমানিশাকালের কী চিত্র এলিয়ট তার কবিতায় আমাদের জন্য উপহার দিচ্ছেন। ‘উটপাখি’ কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তেরও সেই প্রশ্ন:

“অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?

কেবল শূন্যে চলবে না আগাগোড়া।”

এলিয়ট বর্ণিত হতাশা, শূন্যতা ও অর্থহীনতা বোঝার জন্য সুধীন দত্তের কবিতাটি পাশাপাশি পড়া যেতে পারে। যা এলিয়টের কবিতার ছত্রে ছত্রে আরো স্পষ্ট হয়। আধুনিক সময়ের যে চিত্র এলিয়ট এঁকেছেন তা আরো মর্মান্তিক। অমিয় চক্রবর্তীর ‘সংগতি’ কবিতায় দেখি নৈরাশ্যের বেদনা:

“তোমার সৃষ্টি, আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে 

যত কিছু সুর, যা-কিছু বেসুর বাজে 

মেলাবেন।”

কিছুই আর মেলানো যায় না। রবীন্দ্রনাথের গানে শুনি : ‘জীবন যখন শুকিয়ে যায়, করুণা ধারায় এসো’। এলিয়টের  জগতে শুকনো প্রস্তরে কোনও শান্তি নেই। বিশ্বাস মৃত; আস্থায় ভেটো দিয়েই এর শুরু। এলিয়টের নৈরাশ্যের জগতে কিছুই মেলানো যাবে না, এখানে রাবীন্দ্রিক সত্য ও স্থিতি অনুপস্থিত। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ রোমান্টিক কবিতার ধারা প্রত্যাখান করে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। কবির প্রথম উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘এ লাভ সং অফ জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’—ড্রামাটিক মনোলগের বা নাটকীয় স্বগতোক্তির অসামান্য প্রয়োগে আধুনিক মানুষের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফারাক লিখেছেন ট্রাজিক-কমিক ভাষায়। কিন্তু ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতায় যে পৈচাশিক বিশ্বচিত্র অঙ্কিত হয়েছে তা আরো ভয়ানক।

‘পড়োভূমি’ এমন এক কবিতা যেখানে এলিয়ট বক্তব্য ও প্রকরণে সবদিক থেকেই ভিন্ন মাত্রা এনেছেন। এখানে এলিয়ট ফরাসি কবি লাফার্গের স্টাইল অনুসরণ করেছেন। এলিয়ট খ্রিস্টানদের পবিত্র মদপাত্র (Holy Grail)-এর সন্ধানে অনুসন্ধান-যাত্রার সাথে এই কবিতাকে তুলনা করেছেন। আবার প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার নীলনদে মূর্তি বিসর্জনের মিথ ব্যবহার করে এই কবিতার প্রথম চারটি অংশে ধূসরতা, বন্ধ্যা সময় ও আধ্যাত্মিক সংকটকে আলোকপাত করলেও শেষ অংশে এলিয়ট উপনিষদের বাণীর মধ্য দিয়ে পথ খুঁজতে চেয়েছেন। এই কবিতা শুরু হয়েছে ইউরোপের অবক্ষয়কে কেন্দ্র করে, আর শেষ হয়েছে হিন্দু উপনিষদের বাণীকে বিশ্লেষণ করে। অবক্ষয়িত, আত্মঘাতী জীবনধারা মানুষকে কোরিওলেনাসের মতো পৃথক কক্ষে কারাগারে বন্দি করেছে, মুক্তির দরকারে:

“দত্যা, দয়াধম্য, দামইত্তা 

শান্তি, শান্তি, শান্তি”

দান, দয়া, আর রিপুকে দমনে আদৌ কি সফল হয়েছিলেন? শান্তির প্রতীক পানি এর জন্য এই বিশাল কবিতার প্রতিটি লাইনেই আক্ষেপ। রবীন্দ্রনাথের করুণাধারা নেই, পানি নেই, শান্তির বারি নেই, মিশরীয় নীলনদের পুনর্জীবনের লক্ষণ নেই—আছে শুধু পাপ, কাম ও ব্যাভিচার।

এলিয়ট আধুনিক সভ্যতাকে বলেছেন ‘এক স্তুপ ভাঙার ছবি' পড়োজমিতেও এই হাবিজাবি বিচ্ছিন্ন চিত্র খুঁজে পাই। এলিয়ট-এর ‘লন্ডন’ মনে করিয়ে দেয় চার্লস বোদলেয়ারের ‘প্যারিস’ বা দান্তের নরকের দৃশ্য। এই কবিতায় বরাবর একটি ধ্বংসের চিত্র ফুটে ওঠে : এক কথক বারবার বলছে পড়ে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে, লন্ডন ব্রিজ। এখানে লন্ডন সেতুকে আধুনিক ইউরোপিয়ান সভ্যতার প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর নেতিবাচক সময়ে তার কোনই অর্থ বহন করে না। আরেক কথক জানাচ্ছে : টেমস নদী এখন কলুষিত। কথক বলছেন : আমরা কানাগলির নেংটি ইঁদুরের মতো যেখানে মৃতরা হাড়গোড় ফেলে গেছে। জীবনানন্দের কবিতায় পচা আর গলিত ইদুরের চিত্র পাই। এই শব্দচিত্র মানুষের অসূয়া জীবন এবং অসুস্থতাকে ইঙ্গিত করছে। এই কবিতায় বরাবর একটি ধ্বংসের স্বচিত্র ফুটে ওঠে।

এলিয়ট ­বারবার জিজ্ঞাসা করছেন, ‘শেকড় কী?’ কিন্তু উন্মূল সময়ে কবি আস্তিকতা পাবেন কোথায়? তাই এখানে অর্থহীন পাগলের প্রলাপ ছাড়া কী পাওয়া যাবে? অন্ধ টেরেসিয়াসের চোখ দিয়ে আধুনিক সময় দেখছেন কবি। যেন এর প্রধান রোগ নৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন।

এবার আসা যাক কবিতা সম্পাদনা নিয়ে। অনেকেই কবিকে অনুপ্রাণিত করেছেন—স্ত্রী ভিভিয়েন, বন্ধু এজরা পাউন্ডসহ অনেকেই—কিন্তু সবচেয়ে বড় অবদান এজরা নিজের কাঁধে নিয়েছেন। এর মূল খসড়া, কবিতাটি প্রকাশিত সংস্করণের প্রায় দ্বিগুণ। এর কারণ এলিয়ট তার বন্ধু এজরা পাউন্ডের সব পরামর্শের প্রত্যেকটি ব্যবহার করেছেন, এমনকি এই কবিতাটি পাউন্ডকে উৎসর্গ করেছেন। এজরা পাউন্ড অনেকটা এককভাবে কাঁচি হাতে এলিয়টের বিশাল কবিতাকে কেটেকুটে প্রায় অর্ধেক সাইজে এনে দিয়েছেন। এলিয়ট নিজে স্বীকার করেছেন, এতে তার অসলগ্ন এলোমেলো কবিতাটি আরো সংহত রূপ পেয়েছে। 

সাহিত্যের ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে—এজরা জহুরীর দক্ষতা দিয়ে—খনির হীরাকে শিল্পীত হীরা বানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ইয়েটসের ভূমিকা সম্বলিত গীতাঞ্জলির মতো এজরা পাউন্ড সম্পাদিত ‘দা ওয়েস্ট ল্যান্ড’ বিশ্ব সাহিত্যের কোহিনূর।

এলিয়টের কবিতায় ইতিহাস, ভূগোল, সাম্প্রতিক রাজনীতি, চিরায়ত পুরাণ, ধর্মবাণী, খৃষ্টান মিস্টিসিজম সব মিলে এমন পরিবেশনা তৈরি করা হয়েছে যা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। তবে প্রশ্নটি থেকেই যায়, কেনো এলিয়ট তার কবিতাকে মিথ ও বিশ্বসাহিত্যের মিশেলে এতো দুর্বোধ্য করে তুললেন? এর উত্তর হয়তো খোঁজা যেতে পরে এলিয়ট চিন্তার দিকে লক্ষ্য করলে। আধুনিক সময়ের চাপকে তিনি ধারণ করতে চেয়েছিলেন। এলিয়ট শুধু যে ভিন্ন ভাষায় লিখেছেন তা নয়, অন্যের জন্য একটি ভিন্ন সাহিত্যিক ভাষা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলা সাহিত্যে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসুসহ ত্রিশ দশকের কবিরা এলিয়ট প্রভাবিত। যে এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবাদ এলিয়টকে ‘দা ওয়েস্ট ল্যান্ড’ লিখতে প্রভাবিত করেছে, সেই মানস এদেরকেও কম-বেশি প্রভাবিত করেছে। একটামাত্র কবিতা দিয়েই সাহিত্যিক মানচিত্র পরিবর্তন সহজ ব্যাপার না। আধুনিক কবিতায় দুটি সূত্র বিবেচ্য—‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’র আগে, না পরে? কবিতার ইতিহাসকে পাল্টে দেবার এই কবিতাকে বুঝতে না পারলে আধুনিক কবিতার পুরোটাই বাকী  থাকবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ