কবি শামসুর রাহমানের পুরাণ-আশ্রয়

Send
তারেক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:০৪, আগস্ট ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১১, আগস্ট ১৭, ২০১৯


যে কোন সৃজনশীল মানুষের সৃজনভুবনই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ধারায় স্নাত হয়ে স্বাতন্ত্র্য সংযোজনায় সক্রিয় থাকে। নিজস্ব নিভৃতি থেকে নেমে এসে অন্য সময় ও সমাজের সঙ্গে তাঁকে নিবিড় হতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমগ্র মানবের নৃতাত্ত্বিক অভিজ্ঞানের যোগবন্ধন সুদৃঢ় হলেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি অর্জিত হয়। ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্ম মানুষ কখনো নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবেন না, সবার সঙ্গে রঙ মেলানোর নানা আয়োজনের ভেতর দিয়ে তিনি মূলত শেকড়ের টানকে স্বীকৃতি দিতে শেখেন। এই শেকড়-অন্বেষাই বোধকরি একজন সাহিত্যিককে পুরাণ ভাবনায় প্রাণিত করে।
শামসুর রাহমানের (১৯২৯-২০০৬) কবিতা তাঁর সময়-সমাজ-রাজনীতি সচেতনতারই উজ্জ্বল স্মারক। তাঁর সময়ে বাঙালি জীবনের সমস্ত স্মরণীয় ঘটনাই তাঁর কবিতার বিষয় হয়েছে। আপসহীন এক পবিত্র শিল্পসত্তায় নিজেকে সমর্পণ করেছেন তিনি। আমাদের যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনায় তিনি প্রাণিত-পল্লবিত হয়েছেন এবং সেই ঘটনার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়াজাত সবচেয়ে প্রোজ্জ্বল-প্রতিনিধিত্বশীল কবিতাই তাঁর লেখা। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে তিনি যেমন সোচ্চার থেকেছেন, তেমনি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপক্ষেও তিনি রাজপথে নেমেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে নিভৃতচারী এই মানুষটির হাতে হাত রেখেই আমাদের শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমন্বয়ে রচিত হয়েছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রবল-প্রগাঢ় মানববন্ধন। পৌরাণিক অনুষঙ্গের আশ্রয়ে এই সংযোগ-সেতু রচনার কাজটিই তিনি সততার সঙ্গে এবং শিল্পসফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
রাহমানের প্রতিনিধিত্বশীল পুরাণাশ্রিত কবিতারগুলোর প্রায় সবগুলোই গ্রীক পুরাণ অবলম্বনে রচিত এবং প্রত্যেকটি কবিতায় তিনি বাঙালি জাতির স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকে বিষাদময় রূপকল্পে নির্মাণ করেছেন। বিশেষ করে পরাধীন দেশের ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষকে মুক্তির পথ দেখানোর মতো দেশপ্রেমিক এবং দূরদর্শী নেতার জন্য বিশৃঙ্খল বাঙালির প্রতীক্ষাকে তিনি গ্রীক বীর অডিসিউস ও পেনিলোপীর পুত্র টেলেমেকাসের অপেক্ষার সঙ্গে রূপকায়িত করেছেন। ট্রয় যুদ্ধ শেষে জন্মভূমি ইথাকায় ফেরার সময় রাজা অডিসিউস সমুদ্রদেবতা পোসাইডনের ষড়যন্ত্রে পথভ্রষ্ট হন। পেনিলোপী নানা কৌশলে তাঁর পাণিপ্রার্থীদের অপেক্ষায় রাখেন। পিতামহের জন্য একটি কাপড় বোনার নাম করে তিনি কালক্ষেপণ করেন। নিজ দেশে পরবাসী জীবন এবং মাতা শঙ্কিত পেনিলোপীর এই অপেক্ষা পুত্র টেলেমেকাসকে দগ্ধ করেছে। রাহমান পুত্রের এই অপেক্ষার ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিত্রিত করেছেন। বিপন্ন ইথাকার মধ্যে তিনি পরাধীন বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছেন। বিপর্যস্ত প্রোষিতভর্তৃকা পেনিলোপীর দীর্ঘশ্বাসের ভেতর দিয়ে কবি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যের গৌরবগাথা :
বিদেশীরা রাত্রিদিন করে গোল ইথাকায়; কেউ
সযত্নে পরখ করে বর্শার ফলার ধার, শূন্য
মদের রঙিন পাত্র ছুঁড়ে ফেলে কেউ, লাথি ছোঁড়ে,
কেউ বা উত্যক্ত করে পরিচারিকাকে। মাঝে-মাঝে
কেবলি বাড়ায় হাত প্রোষিতভর্তৃকা জননীর
দিকে, যিনি কী-একটা বুনছেন কাপড়ে
দিনে, রাতে খুলছেন সীবনীর শিল্পে।
(‘টেলেমেকাস’/নিরালোকে দিব্যরথ)
টেলেমেকাস বিদেশী প্রভূদের প্রলুব্ধ দৃষ্টি ও বহুবিধ অশোভন আচরণে বিধ্বস্ত ইথাকার যে চিত্র তুলে ধরেছেন, বাংলাদেশও সেই রকম দুঃসময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। ‘নয়তো নগণ্য দ্বীপ সুজলা সুফলা শস্যশ্যাম/ইথাকা আমার ধনধান্যে পুষ্পেভরা’ বলার সঙ্গে সঙ্গে কবিতায় যেন বাংলাদেশের হৃদয়খানিই তার আপন ঐশ্বর্যের অতীতসহ উপস্থিত হয়। নিজ দেশে পরবাসী জীবনযাপনের গ্লানি কবি টেলেমেকাসের জবানীতে তুলে ধরেছেন।
অডিসি মহাকাব্যে হোমার টেলেমেকাসের অপেক্ষার ভেতর দিয়ে পরাধীন জাতির বিড়ম্বনাকে তুলে ধরেছেন। শামসুর রাহমান এই বীর্যবান যুবকের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাঙালি জাতির স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছেন। ফলে আমাদের অপেক্ষাও মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে, আর মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে রচিত হয়েছে অমর মহাকাব্য বাংলাদেশ। তাই টেলেমেকাসের পালিয়ে বেড়ানো, জনসমাবেশে বাধা সৃষ্টি পরাধীন বাংলাদেশের বিপন্ন এবং ভয়াবহ বাস্তবতাকেই বিবৃত করে। অডিসিউসের জন্য টেলেমেকাসের এই অপেক্ষা বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য অপেক্ষাকেই রূপায়িত করে। এই মহান নেতা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য বারবার কারাবরণ করেছেন। টেলেমেকাসের বীরোচিত আহ্বান বাঙালির স্বপ্নপুরুষ বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায় ব্যাকুল দেশবাসীর আবাহনের সঙ্গে একীভূত হয়ে বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের মহানায়ক শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভূমিকাই শিল্পিত হয়েছে।
শামসুর রাহমান অন্য একটি কবিতায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবকে ইলিয়াড মহাকাব্যের অন্যতম প্রধান চরিত্র আগামেমননের তেজস্বিতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক মুহূর্ততে কবি ইলিয়াড-এর মহাকাব্যিক পটপ্রেক্ষায় কাব্যরূপ দিয়েছেন। আগামেমনন-কন্যা ইলেকট্রার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিজ্ঞার সঙ্গে শেখ হাসিনার স্বপ্নকে অন্বিত করেছেন কবি। ক্ষমতালোভী স্বৈরশাসকের হীন চক্রান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের পাশবিকতার প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করেছেন। শেখ হাসিনার পিতৃভবন, ‘একদা যেখানে কত বিদূষক প্রসাদ কুড়িয়ে/হয়েছে ধন্য, প্রধান কক্ষ ফুলে ফুলে গেছে ছেয়ে’, তার স্মৃতি তাঁকে তাড়িত-পীড়িত করেছে। বিজয়ী বীর বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার জ্বলজ্বলে স্মৃতি, সেই দিনের বিপুল আয়োজন, জয়ঢাক, জন-উল্লাস, মুক্তির দূত হিসেবে পথ-প্রান্তরের বিচিত্র কীর্তন দেশপ্রেমিক মানুষের মন থেকে মুছে যাওয়ার আগেই—
নন্দিত সেই নায়ক অমোঘ নিয়তির টানে
গরিয়ান এক প্রাসাদের মতো বিপুল গেলেন ধসে।
বিদেশী মাটিতে ঝরেনি রক্ত; নিজ বাসভূমে,
নিজ বাসগৃহে নিরস্ত্র তাঁকে সহসা হেনেছে ওরা।

নিহত জনক, এ্যাগামেমনন, কবরে শায়িত আজ।
(‘ইলেকট্রার গান’/ইকারুসের আকাশ)
একজন সৃজনশীল মানুষের চিন্তা ও কল্পনার ডানা মেলে দেওয়ার জন্য একটি বিশাল আকাশ প্রয়োজন। শিল্পী মানেই যেন ‘বন্ধনহীন, নিত্য স্বাধীন, চিত্তমুক্ত শতদল’। গ্রিক পুরাণের খ্যাতিমান কারিগর ডিডেলাস, যার তৈরি মূর্তি নিজে নিজেই নড়াচড়া করতো। ডিডেলাস এবং পুত্র ইকারুস পাখির পালকের ডানা তৈরি করে ক্রীট থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিতার নির্দেশ অমান্য করে অনেক উচু দিয়ে উড়তে গেলে তাঁর পাখার মোম গলে যায় এবং ইকারুস সমুদ্রের পানিতে পড়ে মারা যায়। এই মৃত্যু তাঁকে মৃত্যুহীন প্রাণ উপহার দিয়েছে। ইকারুস বাবার উপদেশ মতো শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারতেন কিন্তু ইকারুস উপলব্ধি করেছেন, এই রকম ঝুঁকিহীন, ঝঞ্ঝামুক্ত জীবন শিল্পীর জন্য নয়। মুক্ত আকাশ ছাড়া একজন শিল্পী হাত পা ছুঁড়ে কণ্ঠ ছেড়ে বললে পারেন না, ‘আমি আছি’। কবিও জীবনকে ঝঞ্ঝা ও ঝুঁকির ঘায়ে ক্ষতক্ষত করে তাঁর অন্তর্নিহিত শক্তির স্বরূপ উপলব্ধির প্রয়াস পেয়েছেন। পুরাণের আশ্রয়ে শিল্পী শামসুর রাহমানের জীবনভাবনা এবং শিল্পদৃষ্টিরই যেন প্রাণবন্ত প্রকাশ ঘটেছে :
কখনো মৃত্যুর আগে মানুষ জানে না
নিজের সঠিক পরিণতি। পালকের ভাঁজে ভাঁজে
সর্বনাশ নিতেছে নিশ্বাস
জেনেও নিয়েছি বেছে অসম্ভব উত্তপ্ত বলয়
পাখা মেলবার, যদি আমি এড়িয়ে ঝুঁকির আঁচ
নিরাপদ নিচে উড়ে উড়ে গন্তব্যে যেতাম পৌঁছে
তবে কি পেতাম এই অমরত্মময় শিহরণ?
(‘ইকারুসের আকাশ’/ইকারুসের আকাশ)
এভাবেই ইকারুসের আকাশ পৃথিবীর যে-কোনো সৃজনশীল মানুষের আকাশ হয়ে যায়। এই আকাশ ব্যক্তিগত বোধ-ঐশ্বর্যে হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন। ইকারুসের এই বলিদান সমস্ত শিল্পীর জন্য নিজস্ব আকাশ নির্মাণের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। রাহমানের শিল্পভাবনা পৌরাণিক আবহে হয়ে উঠেছে ব্যঞ্জনাময় এবং শিল্পঋদ্ধ।
ইকারুসের এই আত্মদানকে পুত্র ডিডেলাসের জবানীতেও মহিমান্বিত করেছেন শামসুর রাহমান। ইকারুসের বেড়ে ওঠা, তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার নানা স্মৃতি ডিডেলাসকে ব্যথিত করলেও তিনি বলেন, ‘না আমি বিলাপ করবো না তার জন্যে, স্মৃতি যার/মোমের মতন গলে আমার সত্তায়, চেতনায়’। রাহমান ডিডেলাসের মধ্যে পিতৃস্নেহের শাশ্বত রূপটিই চিত্রিত করেছেন। তাই সমুদ্রের জলে আত্মদানকারী ইকারুস সারাক্ষণ ছায়ার মতো তাকে ঘিরে থাকে। ডিডেলাসের সাবধান বাণী উপেক্ষা করে ইকারুসের এই যে ডানা মেলে দেয়ার সাহসী পদক্ষেপ, যার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু তার জন্য শোক করছেন না গৌরবদীপ্ত পিতা। তাঁর এই অকুতোভয় আত্মনিবেদনের মধ্যে ডিডেলাস একজন সার্থক শিল্পীর ছবি দেখকে পেয়েছেন। রাহমান এভাবেই শিল্পীর স্বাধীনতাকে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় শিল্পিত করেন :
সূর্যের অনেক কাছে প্রকৃত শিল্পীর মতো সব
বাধা, সর্ততা
নিমেষে পিছনে ফেলে, আমি
শঙ্কিত অথচ মুগ্ধ হয়ে রইলাম চেয়ে
তার দিকে, দেখলাম তাকে
পরিণাম বিষয়ে কেমন
উদাসীন, ক্রূর, রৌদ্রঝলসিত, সাহসী, স্বাধীন।
(‘ডেডেলাস’/ইকারুসের আকাশ)
শামসুর রাহমান অত্যন্ত চমৎকারভারে পৌরাণিক অনুষঙ্গে একজন প্রকৃত শিল্পীর প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছেন। একজন সৎ শিল্পী তাঁর নিজস্ব আকাশের জন্যই আজীবন সংগ্রাম করেন। নিজেকে মেলে দেয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা আসবেই, তাকে উপেক্ষা করার শক্তি অর্জন করতে ব্যর্থ হলে সেই শিল্পী হারিয়ে যায়। শামসুর রাহমান ইলিয়াড-এর কেন্দ্রিয় চরিত্র একিলিসের শরীরের আঘাতসাধ্য গোড়ালির টেনডন, যেখানে ট্রয়রাজ প্রায়াম ও রানী হেকিউবার পুত্র প্যারিসের, মতান্তরে প্যারিসরূপে অ্যাপোলের শরাঘাতে একিলিস নিহত হন, সেই গোড়ালির অনুষঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সীমিত আয়ুর অমোঘ পরিণতির প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছেন। একটি বয়সে এসে প্রতি মুহূর্তে মানুষ মৃত্যুর পদধ্বনি শুনে। শরীরের প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করলেও প্যারিস বা অ্যাপেলোর স্বররূপী মৃত্যু মানুষের শরীরে প্রবেশের উপযুক্ত পথটি খুঁজে নেয়। ইলিয়াড-এর প্রধান চরিত্র একিলিস, যাঁর মাতা থেটিস পুত্রকে চিরঞ্জীব বীরে পরিণত করার জন্য স্টিক্স নদীতে ডুবিয়ে নেন, কিন্তু ডুবানোর সময় থেটিসের হাত একিলিসের গোড়ালি ধরে থাকায় গোড়ালির টেনডনে পানি প্রবেশ করেনি। ফলে আঘাতসাধ্য স্থান থাকায় একিলিসকেও যেমন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়নি। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই মৃত্যু অনিবার্য। রাহমানের ভাষায় :
যকৃৎ তুখোড় আজো, যা কিছু পাঠাই নিত্য জঠরে হজম
হয় সবই রীতিমতো; যম
অসৌজন্যমূলক ভ্রুকুটি হেনে ঈশ্বরের স্বত্বতার মতো
প্রাচীনতা নিয়ে হাসে, করে পায়চারি ইতস্ততঃ
ঈগলদৃষ্টিতে খোঁজে খালি
আমার ধ্বস্ত এ-অস্তিত্বে এ্যাকিলিসের গোড়ালি।
(‘এ্যাকিলিসের গোড়ালি’/ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই)
বাংলাদেশে সামরিক শাসন বার বার মানুষের মৌলিক অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করে নিজেদের ভাগ্যবদলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দেশপ্রেমিক মানুষের মন থেকে চিরতরে মুছে ফেলার প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়েছে তারা। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে এমনভাবে গেঁথে দিয়েছে যে, সময়মতো সম্মিলিত জনতার হেঁচকা টানে স্বৈরতন্ত্রের সিংহাসন পদদলিত হতে বাধ্য। তাই সামরিক জান্তার দানবীয় উল্লাস থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আনন্দঘন উপকথায় একটি দুপুরকে উপভোগ্য করতে চাইলেও কানে এসে বাজে বুটের শব্দ। তাই গ্রীক পুরাণের প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির আগমন এখানে তেমন সুখকর মনে হয় না। ব্যর্থ, গ্রহণ-অযোগ্য শাসন কাঠামো ও তার বিবিধ-বিচিত্র বর্বরতার পাশে আফ্রোদিতির উপস্থিতি হঠাৎ আলো ঝলকানির মতোই বিস্ময়কর মনে হয়। রাহমানের উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ কাব্যের ‘একটি দুুপুরের উপকথা’ কবিতায় তাঁর বোধের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো এক দূরবর্তী দুঃস্বপ্নই আফ্রোদিতির উপস্থিতিকে মহিমান্বিত করেছে। আফ্রোদিতিকে রাহমান বার বার তাঁর স্বপ্নের শিয়রে এনে হাজির করেন। স্বপ্নের কোনো সীমাবদ্ধ ব্যাকরণ নেই বলেই তাতে ঘর ও সমুদ্রের ব্যবধান অদৃশ্য হয়ে যায়। যে নিশিথে রজনীগন্ধা চৈতন্যের শিরায় শিরায় আগুনের রেণু ছড়িয়ে দেয়, সেখানেও আফ্রোদিতির অবাধ গতায়াত অনুভব করেন কবি :
ঘর কি সমুদ্র হতে পারে? নইলে কী ক’রে সেখানে
সহজেই আফ্রোদিতি আসে তার সমস্ত শরীরে
স্বপ্নের মতন ফেনা নিয়ে?
(‘নেকড়ের মুখে আফ্রোদিতি’/বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে)
শামসুর রাহমান নগরের পুলিশকে গ্রীক পুরাণের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ-কবি-পুরাণকার অর্র্ফিয়ুসের সঙ্গে তুলনা করেন। অর্ফিয়ুসের বাঁশির মনোহর সুর পৃথিবীর তাবৎ প্রাণী, গাছপালা এমন কি ঝর্ণাধারা পর্যন্ত মন্ত্রবৎ শ্রবণ করতো। বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে কাব্যের নাম-কবিতায় রাহমান লিখেছেন, ‘নগর পুলিশ অর্ফিয়ুস নাকি বলে কেউ কেউ/করোটিতে তবলা বাজায়।’ অর্র্ফিয়ুসের সেই মহিমান্বিত বাঁশির সঙ্গে পুলিশের বাঁশির প্রতিমান অন্বেষণ বিস্ময়কর।
গ্রীক পুরাণ প্রয়োগেই শামসুর রাহমানের কৃতিত্ব সর্বাধিক প্রোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। ব্যক্তিগত উপলব্ধির সঙ্গে বাঙালির সামগ্রিক চৈতন্যের মেলবন্ধন রচনার অভিপ্রায়ে তিনি যখন পৌরাণিক কাহিনির শরণ নিয়েছেন তখনই তা অভিনব ব্যঞ্জনায় শিল্পিত হয়েছে। বাঙালির সংগ্রামী সত্তার সঙ্গে পৌরাণিক ঘটনাপ্রবাহ ও তার পাত্রপাত্রীকে হাজির করে তিনি যেমন ঐতিহ্যসচেতন শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি জাতির আবেগ অনুভূতিকে তিনি মহাকাব্যিক বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার সঙ্গে সংহত করে বাঙালি জাতির সংগ্রামী জীবনপ্রবাহকে মহিমান্বিত করেছেন।
ভারতীয় পুরাণের ব্যবহার রাহমানের কবিতায় তুলনামূলকভাবে কম। ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে রামায়ণ-মহাভারতের নানা ঘটনা ও চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ করা গেলেও ঐতিহাসিক ঘটনা কিংবা বাঙালির সংগ্রামী জীবনাগ্রহ চিত্রায়ণে তা তেমন সমৃদ্ধ ও শিল্পঋদ্ধ হয়ে ওঠেনি। তবে উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ গ্রন্থের ‘চাঁদ সদাগর’ কবিতাটি শামসুর রাহমানের একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি, যেখানে আমাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির উজ্জ্বল অধ্যায়কে তিনি অপরিসীম নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে শিল্পিত করেছেন। লোকায়ত অনুষঙ্গে হতবল বাঙালির গৌরবময় অতীতকে কবি চাঁদ সদাগরের জবানীতে ব্যক্ত করেছেন। শামসুর রাহমান আরো কিছু ভারতীয় মিথ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু মিথিক আবহে সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন কবিতা নির্মাণের প্রয়াস তেমন চোখে পড়ে না। বিচ্ছিন্নভাবে কখনো শব্দ আকারে, কখনো বা বিশেষ প্রবণতাকে চিত্রায়ণের প্রয়োজনে কোনো ভারতীয় পুরাকাহিনি বা তার কোনো চরিত্রের শরণ নিয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে বন্দী শিবির থেকে কাব্যের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা কাব্যের ‘দরজার কছে’, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে কাব্যের ‘ডুবসাঁতার’ প্রভৃতি কবিতার কথা স্মরণ করা যেতে পারে।
শামসুর রাহমান মুসলিম ঐতিহ্যকেও তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিভুক্ত করেছেন। সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা-দুর্ঘটনা এবং মানুষের মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয়কে চিত্রিত করতেও মুসলমানের বিবিধ ধর্মীয় অনুষঙ্গের শরণ নিয়েছেন কবি। মুসলিম ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে কবির আধুনিক জীবনদৃষ্টির প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি কাব্যগ্রন্থের ‘নূহের জনৈক প্রতিবেশী’ কবিতায়। রাহমানের মুসলিম ঐতিহ্যপুষ্ট কবিতা হিসেবে মাতাল ঋত্বিক কাব্যের ‘কবিতার মৃত্যুশোক’, আমার ক’জন সঙ্গী কাব্যের ‘ওরা চলে যাবার পরে’ ও ‘ওরা চলে যাবার পরে’, টেবিলে আপেলগুলো হেসে ওঠে কাব্যের ‘পূর্বসূরীদের উদ্দেশে’ প্রভৃতি কবিতার শরণ নেয়া যায়।
শামসুর রাহমানের কবিতার জগৎ বিশাল-ব্যাপক-বিস্তৃত। বিষয়ের ক্ষেত্রে তিনি যেমন বৈচিত্র্যের পিয়াসী, তেমনি প্রকরণের ক্ষেত্রেও তিনি আন্তরিক, অনুসন্ধিৎসু। তাঁর কবিতায় তিনি প্রবলভাবে উপস্থিত। তাঁর সময়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রকৃতি ও প্রতিকৃতিই তাঁর কবিতা। জাতীয় জীবনের দুর্যোগ-দুঃসময়কে রাহমানের কবিতা ধারণ করলেও তা নীতিকথা কিংবা শ্লোগান থেকে দূরবর্তী। পুরাণ-প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত উপলব্ধিজারিত জাতীয় চৈতন্যের সমন্বিত রূপটিকেই ধরার চেষ্টা করেছেন কবি। আর এই সমন্বয়ী-সমবায়ী কণ্ঠস্বর সৃষ্টির কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে তিনি গ্রীক পুরাণের শরণ নিয়েছেন। মহাভারত ও রামায়ণের চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও তাঁর পুরাণ ভাবনার প্রোজ্জ্বল প্রকাশ লক্ষ করি। লোকায়ত পুরাণ প্রয়োগেও তাঁর সার্থকতা চোখে পড়ার মতো। পুরাণাশ্রিত অধিকাংশ কাহিনি যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাতমুখর হলেও তার ভেতর কবি আধুনিক জীবনবোধ ও শিল্পদৃষ্টির শেকড় অন্বেষণ করেছেন। পৌরাণিক অনুষঙ্গে রচিত শামসুর রাহমানের কবিতা পাঠককে সামষ্টিক চৈতন্যের সঙ্গে একীভূত হতে প্রাণিত করে, যূথবদ্ধ জনতার মিলিত কণ্ঠস্বরকে স্বীকরণ করে আমাদের জাতীয় চৈতন্যের স্বরূপ উন্মোচন করতে শেখায়। পুনর্মুদ্রণ

/জেড-এস/

লাইভ

টপ