হঠাৎ এখন স্তালিনের ওপর আক্রমণ কেন?

Send
জাকির তালুকদার
প্রকাশিত : ১০:২৬, আগস্ট ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১, আগস্ট ২৩, ২০১৯

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে গত শতকের নব্বই দশকের শুরুতে। আর স্তালিন তো সেই ১৯৫৩ সাল থেকে নিজের দেশেই ব্রাত্য। তার মৃত্যুর দিন থেকে স্তালিনের নাম মুছে ফেলার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নে লাগাতার কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। স্তালিনপন্থিরা বাদ পড়েছেন সব ধরনের প্রশাসনিক এবং পার্টির পদ থেকে। অনেককেই চরমভাবে অপমানিত করা হয়েছে। অনেককে বিচারে বা বিনা বিচারে শাস্তি এবং নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। সেইসাথে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিনকে ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসংখ্য কুৎসামূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে। বলা যায়, ইউরোপ-আমেরিকার পুঁজিবাদী প্রপাগাণ্ডা-হোতারা স্তালিনকে নিয়ে যত মিথ্যাচার এবং অপপ্রচার চালিয়েছে, তার চাইতেও বেশি হয়েছে খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নেই। সারা পৃথিবীতে রুশপন্থি কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও সুর মিলিয়েছে স্তালিনের নিন্দায়। ছাত্র ইউনিয়ন এবং সিপিবি-র সাথে আমার খুব অল্পদিনের সাংগঠনিক সংযুক্তির সময় দেখেছি, কেউ স্তালিনের নাম নেয় না। নিলেও নিন্দাসূচক বিশেষণ যুক্ত করে দেয় স্তালিনের নামের সাথে। তার ফলে আমাদের মনেও স্থির প্রত্যয় জন্মেছিল যে, স্তালিন নিশ্চয়ই সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতন্ত্রের জন্য একটি বিষফোঁড়া।

পার্টিকাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার পরে মার্কসবাদ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে পড়াশোনার চেষ্টা করেছি। সেই পড়াশোনা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে। সবাই যখন নিশ্চিত হয়েছিল যে, সমাজতন্ত্র একটি বাতিল মতবাদ, সেই সময়েই আমি এবং আমরা কয়েকজন মার্কসবাদ এবং বিভিন্ন দেশে মার্কসবাদী বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করতে শুরু করি বেশি করে। তত্ত্ব পড়ি, তথ্যও পড়ি। পার্টি সম্পর্কে, পার্টির নেতৃত্ব সম্পর্কে, বিপ্লবে কার কী ভূমিকা ছিল সে সম্পর্কেও। অন্য সবাই জেনে বা না জেনে মার্কসবাদকে বাতিল ঘোষণা করে বসে আছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, মার্কসবাদকে যদি বাতিল ঘোষণা করতেই হয়, তাহলে তার সবদিক জেনে তারপর বাতিল করতে হবে। সেই সময়েই ব্যক্তি স্তালিন, নেতা স্তালিন, সেনাপতি স্তালিন সম্পর্কে কিছুটা পড়াশোনা করা সম্ভব হয়েছিল।

আমার মনে হয়েছিল স্তালিনের কিছু বৈশিষ্ট্য অন্য সোভিয়েত নেতাদের চাইতে ভিন্ন ছিল।

প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে স্তালিনই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি জাতিগতভাবে রুশ নন। তিনি ছিলেন জর্জিয়ান। তার মাতৃভাষাও রুশ ছিল না। তাই প্রবলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসরতার অহংকারে আচ্ছন্ন রুশ নেতাদের কাছে তিনি কখনোই তার যোগ্যতার স্বীকৃতি পাননি। বলশেভিক পার্টির সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সমর্থনে তিনি পার্টির সেক্রেটারি হয়েছিলেন। পার্টির ত্যাগী এবং বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যে তার প্রবল জনপ্রিয়তা রুশ কমরেডদের তার নেতৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করেছিল।

দ্বিতীয়ত, পার্টির অন্য নেতারা বছরের পর বছর প্রবাসে কাটালেও স্তালিন স্বদেশের মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। জেল-জুলুম-নির্যাতন-নির্বাসন সহ্য করেছেন। পার্টি গড়েছেন, পার্টিকে শক্তিশালী করেছেন। বিপ্লবের সময় রাস্তায়-ব্যারিকেডে অস্ত্রহাতে সঙ্গীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। লেনিন, ট্রটস্কি এবং আরো অনেক নেতা বছরের পর বছর প্রবাসে আংশিক নিরাপত্তায় বসবাস করেছেন। রুশ বিপ্লব শুরু হলে দেশে ফিরেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সেই বিপ্লবের জন্য মাঠকর্ম যারা করেছেন, তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন স্তালিন। ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনে’ ট্রটস্কি ছিলেন হেড কোয়ার্টারে। দেশি-বিদেশী সাংবাদিক-লেখকরা তার সাথে ছিলেন। তাই জন রিড-এর পুরো বইতে শুধুমাত্র ট্রটস্কির নাম। কিন্তু স্তালিন ছিলেন ব্যারিকেডে-মিছিলে। সম্মুখযুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন জার-কেরেনস্কির অনুগত সেনাদল, জেনারেল এবং প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে। তাই বিপ্লবের দিনপঞ্জিতে তার নাম সেভাবে উল্লেখিত হয়নি। যখন লেনিনের উত্তরসূরি হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে প্রায় কোনো মানুষই জানত না, কে এই স্তালিন।

তৃতীয়ত, সোভিয়েত নেতাদের মধ্যে একমাত্র স্তালিনই ছিলেন প্রান্তিক সর্বহারা শ্রেণীর সন্তান। লেনিন, ট্রটস্কি, বুখারিন, ক্রুশ্চেভ, ব্রেজনেভ, গর্বাচভ—সবাই ছিলেন সম্পন্ন শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। অন্যদিকে স্তালিনের পিতা ছিলেন একটি ছোট জুতো কারখানার শ্রমিক। সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়তে পাঠানোর সাধ্য তার ছিল না। স্তালিনের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল খ্রিস্টান মিশনারী মাদ্রাসার লিল্লাহ বোডিং-এ। যাজক বা পুরুত না হয়ে জীবন ও বাস্তবতার আগুনে পুড়ে পুড়ে তিনি বিপ্লবী হয়ে উঠেছিলেন। মাক্সিম গোর্কির সাথে তার জীবনের অনেকটাই মিল, তবে কর্মপথ আলাদা। লেনিন বা অন্যদের এই চিন্তা ছিল না যে, তার অবর্তমানে পরিবারের সদস্যরা কী খেয়ে বাঁচবে। কিন্তু স্তালিন যুবক হয়ে ওঠার পরে মাকে প্রচণ্ড কষ্ট করে সংসার চালাতে দেখে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি কি বিপ্লবের পথে হাঁটবেন, নাকি মাকে একটু ভালো রাখার জন্য সাধারণ একজন মানুষ হয়ে জীবিকার পেছনে ছুটবেন। সেই দ্বিধা তিনি কাটিয়েছিলেন এই চিন্তা দিয়ে যে—বিপ্লব বিজয়ী হলে সারা দেশের কোটি কোটি নিরন্ন গরিব মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হবে। তখন তাদের সাথে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পাবেন তার মা-ও। তাই বিপ্লবকে বিজয়ী করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন স্তালিন। দেশবাসী এবং মা যাতে শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি পান।

মানুষ হত্যা করেছেন স্তালিন। কারণ বিপ্লবকে বাঁচানো এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব যার কাঁধে, তিনি অহিংস হতে চাইলেও বিরোধীরা হিংসা ত্যাগ করবে না। লেনিনের অকাল মৃত্যু স্তালিনের কাঁধে বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল। দেশের মধ্যে ছিল প্রতিবিপ্লবী অভিজাত চক্র, জারের অনুগত শ্বেত-সন্ত্রাসী বাহিনী। দেশের বাইরে থেকে তারা একটানা সামরিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাচ্ছিল। সেইসাথে ১৪টি দেশের সেনাদল এগিয়ে প্রতিবিপ্লবীদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করতে এসেছিল। সেইসাথে চলছিল পার্টির ভেতরে ক্ষমতার লড়াই। বিপ্লব এবং সোভিয়েতকে টিকিয়ে রাখতে হলে স্তালিনকে একদিকে যেমন কঠোর হতে হবে, একই সাথে হতে হবে দূরদর্শী এবং থাকতে হবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। স্তালিন ঠিক সেটাই করেছিলেন। প্রতিবিপ্লবীদের কাউকে হত্যা করা হয়েছিল, কাউকে পাঠানো হয়েছিল শ্রমশিবিরে।

কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রটস্কি। বারবার স্তালিনের নামে মিথ্যা কুৎসা প্রচার করেছেন তিনি। স্তালিনের অনুসারীরা দাবি জানাচ্ছিলেন ট্রটস্কিকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হোক। উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হোক। একা ট্রটস্কি নয়, জিনোভিয়েভ এবং কামেনেভও যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করছিলেন স্তালিনের বিরুদ্ধে। এরা দুইজন ছিলেন সেই পুরনো পাপী যারা ১৯১৭ সালের বিপ্লবী অভ্যুত্থানের ব্লুপ্রিন্ট তুলে দিয়েছিলেন শত্রুদের হাতে। বিপ্লব ভেস্তে যেতে বসেছিল এই দুইজনের বিশ্বাসঘাতকতায়। লেনিন তাদের ক্ষমা করেছিলেন। তাই স্তালিনও তাদের সহ্য করে চলতেন। বুখারিন খুব পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদ বুঝতেন না। কৃষিতে যৌথখামার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার সময় তিনি বড় জোতদারদের পক্ষ নিয়ে পার্টির বিরোধিতা করেছিলেন। তবু স্তালিন তাদের কাউকেই পার্টি থেকে বহিষ্কার করেননি। এমনকী পার্টির সর্বোচ্চ স্তর পলিটব্যুরো থেকেও সরাননি তাদের। পার্টির মধ্যম এবং তৃণমূলের কমরেডরা ছিলেন স্তালিনের মূল শক্তি। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ত্রয়োদশ কংগ্রেসে তাদের বহিষ্কারের জন্য চাপ আসতে থাকে স্তালিনের ওপর। কিন্তু স্তালিন পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন—‘কিন্তু এই চরম দাবির অর্থ কী? এর অর্থ রাইকভকে বাদ দিয়ে পার্টি চালাও; কালিনিন, টমস্কি, মলোটভ, বুখারিনকে বাদ দিয়ে পার্টি চালাও। যে কমরেডদের নাম করলাম, তাদের বাদ দিয়ে পার্টি চলতে পারে না।’

পলিটব্যুরোতে যথারীতি বহাল রইলেন ট্রটস্কি, জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, স্তালিন, রাইকভ, টমস্কি এবং বুখারিন। এদিকে পলিটব্যুরোর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন জিনোভিয়েভ, স্তালিন নন। অর্থাৎ স্তালিন যৌথ নেতৃত্বই চেয়েছিলেন। কিন্তু বিনিময়ে কেবল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে।

ট্রটস্কি যখন অসুস্থতার অজুহাতে পলিটব্যুরোর সভাতে আসা বন্ধ করলেন, তখন স্তালিন সভা করার জন্য ট্রটস্কির বাড়িকেই ভেন্যু বানাতে চাইলেন; বললেন, ট্রটস্কির বাড়িতেই সভা চলুক। ডাক্তার-নার্স পাশের কক্ষে স্ট্যান্ডবাই থাকবে।

কিন্তু তবু রাজি হলেন না ট্রটস্কি।

পরবর্তী অর্থাৎ চতুর্দশ কংগ্রেসে পরিস্থিতি আবারো অন্যরকম হয়ে গেলো। জিনোভিয়েভ চলে গেলেন ট্রটস্কির বিরুদ্ধে। যথারীতি ট্রটস্কিকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন। সেদিনও স্তালিন সরাসরি জানিয়ে দিলেন—‘জিনোভিয়েভ এবং লেনিনগ্রাদের কমরেডরা ট্রটস্কির বহিষ্কার চাইছেন। কিন্তু আমরা কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠরা একমত হইনি। তখন লেনিনগ্রাদ-প্রতিনিধিরা এবং কামেনেভ দাবি করলেন, ট্রটস্কিকে অন্তত পলিটব্যুরো থেকে বাদ দেওয়া হোক। কিন্ত আমরা রাজি হইনি। কারণ মাথা কেটে ফেলার নীতিটা পার্টির জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। আজ একটা মাথা কাটবেন, আগামীকাল আরেকটা, তারপর তৃতীয়...পার্টির আর কী বাকি থাকবে?’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল। নিহত হয়েছিলেন কেউ কেউ। বিচারে মৃত্যুদণ্ডও হয়েছিল কারো কারো।

কিন্তু যখন ক্রুশ্চভ এবং আমেরিকা-ইউরোপ চিৎকার করে যে, স্তালিন লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছেন, তখন কেউ প্রশ্ন করে না যে, ‘লক্ষ লক্ষ’ মানে আসলে কতজন?

বিশ্বজুড়ে স্তালিনের নামে কুৎসা গেয়ে বেড়াতেন রয় মেদভেদেভ। স্তালিনকে হত্যা করার পরে প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চভ ডেকে আনেন তাকে। দায়িত্ব দেওয়া হয় স্তালিনের হত্যাকাণ্ডের একটি বিবরণী রচনার। তার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্ত আর্কাইভ। অনেকদিন ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজে মেদভেদেভ লিখলেন—‘আমার বইতে সাতশো জনের নাম দেওয়া হচ্ছে। তারা ছাড়াও স্তালিনের হাতে নিহত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।’

‘সাতশো’ এবং ‘লক্ষ লক্ষ’।

এখন তো কেজিবি, গোপন পুলিশ, শ্রম শিবির, স্তালিন আমলের মোহাফেজখানা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে পশ্চিমা গবেষকদের জন্য। তারা বছরের পর বছর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও চরম শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ১০ হাজারে তুলতে পারছেন না।

তবু চলছে সেই একই বুলি—স্তালিন হত্যা করেছেন লক্ষ লক্ষ মানুষকে।

স্তালিন-কন্যার বই:

স্তালিনের কন্যা সোয়েতলানার লেখা একটি বইকে ব্যবহার করা হচ্ছে স্তালিনের সময়কালের নানা ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য হিসেবে।

বাংলাদেশে বসে স্তালিনের মনোভঙ্গিকে ঠিক বুঝতে পারা কঠিন। এদেশে যেকোনো রাষ্ট্রপ্রধানের পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, এমনকী বাঁদি-নফর পর্যন্ত রাষ্ট্রের ভিআইপি হয়ে পড়ে। তারা যোগ্যতা ছাড়াই চাহিবামাত্র রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় পদ পায়। অনেক সময় রাষ্ট্রপ্রধান তার পরিবারের লোকজনের কথা শুনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন।

কিন্তু স্তালিন এমন ধরনের কোনো সুযোগ তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের দেননি। রাষ্ট্রীয় এবং পার্টিসংক্রান্ত  ব্যাপারে তিনি কখনোই পরিবারের কারো সাথে কোনো আলাপ করতেন না। ফলে স্তালিনের সময়কাল সম্পর্কে তাদের স্মৃতিচারণে আলাদা করে কোনো তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই। পুত্র চাকুরি করতেন সেনাবাহিনীতে। কোনো জেনারেল, মার্শাল, এমনকি ক্যাপ্টেন পদেও নয়। তিনি ছিলেন সামান্য একজন করপোরাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীর পুত্র লালফৌজের সামান্য একজন করপোরাল মাত্র ছিলেন। পিতার নাম বা পদ তাকে কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়নি।

কন্যা সোয়েতলানাও কোনো রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না। তাই তিনিও এমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি, যা পশ্চিমা অপপ্রচারকারীদের জানা ছিল না। তবু পশ্চিমে তাকে নিয়ে লাফালাফির একমাত্র কারণ তিনি ছিলেন স্তালিনের কন্যা। তিনি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো সমালোচনা করেন, তখন তা পশ্চিমা আপপ্রচারকারীদের জন্য অনেক বেশি অনুপ্রেরণার কারণ হয়ে ওঠে।

শুরুর কথা দিয়েই শেষ:

কথাটি ছিল এত বছর পরে হঠাৎ স্তালিনকে নিয়ে নতুন করে কুৎসা রটনার কারণটা কী?

বলাবাহুল্য, সঠিক উত্তরটি আমার জানা নেই। তবে ধারণা করা যায় যে, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পরে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে যে উল্লাস দেখা দিয়েছিল, ‘পুঁজিবাদই ইতিহাসের শেষ’ বলে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তাতে মরচে পড়ে গেছে অনেকটাই। পুঁজিবাদ যে মানুষের মুক্তির পথ নয় তা এখন ইউরোপ-আমেরিকার মানুষই সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারছে। পুঁজিবাদের বীভৎস চেহারা এবং পরিণতি দেখে খোদ পুঁজিবাদের প্রবক্তারাই স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন। তারা জানেন না এই পুঁজিবাদ নামক দানবটিকে কীভাবে বশে রাখা যাবে। পুঁজিবাদের জয়-জয়কারের মধ্যেও কয়েক বছর আগেও ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতিতে ধস নেমেছিল। পুঁজিবাদের অমানবিকতার শিকার লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ খোদ আমেরিকাতে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন করেছেন। তার আগে সিয়াটলে সারা পৃথিবীর মানুষ পুঁজিবাদকে ‘না’ বলেছে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে।

এদিকে বর্তমান রাশিয়া এবং অন্যান্য সোভিয়েতভুক্ত রাষ্ট্রের মানুষ ক্রমেই বর্তমানের পুঁজিবাদী শাসন এবং বাজার-ব্যবস্থা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন। অকালমৃত্যুর কারণে লেনিন বেশিদিন সোভিয়েত রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাননি। সোভিয়েত ইউনিয়নকে সত্যিকার অর্থে গড়ে তুলেছিলেন স্তালিন। একটি পিছিয়ে পড়া দেশকে পরাশক্তির পর্যায়ে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। শ্রমিকদের প্রকৃত আয় বেড়েছিল ৭০০ গুণ। বিশ্বের মানুষকে হিটলারের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন স্তালিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ হিটলারের অজেয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল ‘পিতৃভূমি এবং স্তালিনে’র নামে। তাই আজকের সময়ের সাথে তুলনা করতে গিয়ে প্রাক্তন সোভিয়েত দেশের মানুষ স্তালিনের আমলকেই মানদণ্ড হিসাবে ধরতে চাইছে। এবং দেখতে পাচ্ছে যে, স্তালিনের আমলে মানুষ সবদিক থেকেই বর্তমানের চাইতে ভালো ছিল। এই তুলনা এবং প্রতিতুলনা স্তালিনকে তুলে আনছে বিস্মৃতির অতল থেকে আবার জনজীবনের জীবন্ত চিন্তায়।

একদিকে পুঁজিবাদের ব্যর্থতা অন্যদিকে স্তালিনের পুনর্জীবন—এই দুই ঘটনাই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট বিশ্বনেতাদের কাছে। সেই বিপদ যাতে বাড়তে না পারে, তার জন্য আগে থেকেই তারা স্তালিনবিরোধী প্রচারণাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বই লিখছে, সিনেমা তৈরি করছে, মিথ্যে ডকুমেন্টারি বানাচ্ছে, নাটক লিখছে ও লেখাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই। কবর থেকে পুরোপুরি উঠে দাঁড়ানোর আগেই স্তালিনকে আবার কবরে পাঠিয়ে দেওয়া।

আরো পড়ুন : নাটক স্তালিন প্রসঙ্গে

//জেডএস//

লাইভ

টপ