রিজিয়া রহমান : নিজেকে কখনোই সীমাবদ্ধ রাখেননি

Send
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
প্রকাশিত : ১১:২৩, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৫, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯

যে কোনো লেখকের লেখার প্রধান উপজীব্য মানুষ, মানুষের জীবন, জীবনের আনন্দ-বেদনা। কিন্তু ক’জন শেকড়সন্ধানী লেখক সত্যিকার অর্থে তার অনুসন্ধানী অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে মানুষকে, মানুষের বেঁচে থাকার নিগূঢ়তম সত্য, সৌন্দর্য এবং বিচিত্রতাকে তুলে আনতে পারেন? রিজিয়া রহমান দক্ষতার সাথেই তা পেরেছেন।

বিশ্বসাহিত্যে যেসব কথাশিল্পী নোবেল পেয়েছেন, তাদের অনেকের চেয়েই রিজিয়া রহমানের উপন্যাস কোনো অংশেই কম শক্তিশালী নয় বলে আমার বিশ্বাস। ১৯৫৮ সালে বেলুচিস্তান বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত চেতনায় নাড়া দেয়ার মতো তার উপন্যাস ‘শিলায় শিলায় আগুন’ কিংবা নিষিদ্ধ পল্লীর যৌনকর্মীদের মানবেতর দৈনন্দিন ঘটনাবলী নিয়ে লেখা ‘রক্তের অক্ষর’ অনূদিত হলে বিশ্বসাহিত্যে রিজিয়া রহমানের শক্ত আসন এবং শক্তিশালী অবস্থান যে তৈরি হত, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তিনি প্রত্বতাত্ত্বিকদের মতো ইতিহাস আর ঐতিহ্য খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে এনেছেন প্রায় প্রতিটি উপন্যাস। যেমন, ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটি বাঙালির জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তণের ইতিহাস নিয়ে রচিত। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি। বাংলার সাধারণ মানুষ সবসময়ই অবহেলিত, নির্যাতিত এবং উপেক্ষিত। তারা কোনোদিনই অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক মুক্তি পায়নি। তবে শেষে স্বাধীনতা পেয়েছে।

আবার রিজিয়া রহমান নীল বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে খুলনা অঞ্চলের এক বিপ্লবী রহিমউল্লাহর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বীরত্বগাঁথা নিয়ে লিখেছেন ‘অলিখিত উপাখ্যান’। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সাঁওতাল শ্রমিকদের জীবনচিত্র পর্যবেক্ষণ করে তিনি রচনা করেছেন ‘একাল চিরকাল’। ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’ উপন্যাসে লিখেছেন ঢাকার অতীত ও বর্তমান জীবনযাপন। বিলুপ্ত মসলিন তাঁতীদের নিয়ে লেখা ‘আবে রঁওয়ার কথা’ তার এক অনন্য সৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘কাছেই সাগর’, ‘একটি ফুলের জন্য’ অথবা নব্বইয়ের স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘হারুণ ফেরেনি’ আমাদের ইতিহাসকে তুলে ধরে।

অপরদিকে চট্টগ্রামে হার্মাদ জলদস্যুদের অত্যাচার এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন ‘উত্তর পুরুষ’ উপন্যাসে। যাতে চিত্রিত হয়েছে আরাকান-রাজ-সন্দ-সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব, পর্তুগিজদের ব্যবসায়ীদের গোয়া, হুগলি, চট্টগ্রাম দখলের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস, বাঙালির জাতিসত্তা, জাতিসত্তার জাগরণ, জাতিসত্তা গঠনের বিবর্তন, তৃণমূলের জীবনযুদ্ধ, ইত্যাদি তার উপন্যাসগুলোতে উঠে এসেছে।

তিনি নদী ভাঙনের সর্বহারা মানুষের শহরে এসে গড়ে তোলা বস্তিজীবন নিয়ে যে উপন্যাস লিখেছেন তার নাম ‘ঘর ভাঙা ঘর’। চা বাগানের জীবনচিত্র নিয়ে লিখেছেন ‘সূর্য-সবুজ রক্ত’, অভিবাসীদের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে লিখেছেন ‘সোনার হরিণ চাই’ নামে একটি উপন্যাস। কিশোরদের জন্যও ‘আজব ঘড়ির দেশে’ লিখেছেন, শিক্ষামূলক এই সায়েন্স ফিকশনে পৃথিবীর উৎপত্তি থেকে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবর্তন, প্রাণীর বিবর্তন থেকে আধুনিক পৃথিবীকে উপস্থাপন করেছেন।

তিনি মাটি ও মানুষের জীবনধারা ও ভাষা-সংস্কৃতির রূপকার। তার গল্প-উপন্যাসে গণমানুষের যাপিত জীবন, চারপাশের অসংগতি ও বৈষম্য ধরা পড়ে সহজেই। রিজিয়া রহমান কখনোই কোনো গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকেননি, সীমাবদ্ধ রাখেননি নিজেকে। তার প্রতিটি উপন্যাসের প্রেক্ষাপট স্বতন্ত্র, ভিন্ন, বিবিধ, বিচিত্র এবং বহুমাত্রিক।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে আধুনিক বাংলাদেশের জন্ম, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতা, বস্তিবাসী, বারবণিতা, চা-শ্রমিক, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন-লড়াই, প্রবাস জীবনের নানা সংকট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তার উপন্যাসের উপজীব্য। তিনি লিখেছেন আশ্চর্য নির্লিপ্ততায়; কঠিন শ্রম ও সাধনায়। [ দ্রঃ রিজিয়া রহমান: যে পথে অনন্য/ মোজাফ্ফর হোসেন, বিডি আর্টস, ১৮ আগস্ট, ২০১৯। ঢাকা]।

এভাবেই রিজিয়া রহমান নির্মাণ করেছেন তার লেখালেখির জগৎ। শেষ বয়সেও উত্তরার বাসায় একাই নীরব জীবন-যাপন করেছেন এবং নিভৃতে চলে গেলেন। কখনো খ্যাতির জন্য ভাবেননি, স্বীকৃতি বা সম্মাননার জন্য আপোষ করেনি।

বৃটিশ লেখক কেন ফোর্ড-পাওয়েল তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘Rahman focuses often on the plight of women in Bangladesh. Readers find poverty, cruel treatment at the hands of husbands, and an often excessively patriarchal society at the core of her work, and she represents Bengali women skilfully and empathically’. অর্থাৎ ‘রহমান প্রায়ই বাংলাদেশের মহিলাদের দুর্দশার দিকে মনোনিবেশ করতেন। পাঠকরা দারিদ্র্য, স্বামীর হাতে নিষ্ঠুর আচরণ এবং অত্যাধিক পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে তার কাজের মূল অংশ হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন এবং তিনি বাঙালি নারীদের দক্ষতার সাথে প্রতিনিধিত্ব করেছেন’। [দ্র: Caged in Paradise and Other Stories by Rizia Rahman/ Ken Ford-Powell | RASt3, June 25, 2013, United States.]

//জেডএস//

লাইভ

টপ